ডা. ওয়াসিফ আদনান হক

ডা. ওয়াসিফ আদনান হক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সেশন: ২০০৭-০৮
রেজিস্ট্রার, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ।


২৩ মার্চ, ২০২০ ১১:৫৯ এএম

করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় আমরা কি আসলেই প্রস্তুত?

করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় আমরা কি আসলেই প্রস্তুত?

মিরপুরের মধ্য দিয়ে এখন সন্দেহাতীতভাবে করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) কমিউনিটি ট্রান্সমিশন প্রমাণিত। অর্থাৎ বিদেশ থেকে আসা বা তাদের পরিবারের মধ্যে সীমিত নাই। হাসপাতাল তো বটেই, যে কোন পাবলিক প্লেস, দোকানদারের ফেরত দেয়া টাকা থেকে শুরু করে মসজিদের সিজদার জায়গা বা বাসার ডোর নব, যেকোন কিছুতে লুকায়ে থাকতে পারে এই ভাইরাস।

কোভিড-১৯ এর আদি কেন্দ্র চীনের উহান থেকে শিক্ষা নিলে লকডাউন করা ছাড়া কিভাবে এই ভাইরাস আটকানো যায়, আমার ছোট মাথায় আসছে না। কিন্তু লকডাউন মুখের কথা না। আমাদের দেশে সরকার সোশাল সিকিউরিটি দেয় না। দিতে পারার কথাও না। চিকিৎসা ব্যয় যেমন নিজেদের, তেমনি চীন বা ইউকের মত দুঃস্থদের জন্য আলাদা সুবিধার প্রশ্নই আসে না।

স্কুল, কলেজ, অফিস-আদালত না হয় বন্ধ দেয়া গেল, প্রথমে প্রচার পরে কার্ফিউ দিয়ে হয়তো মানুষজনকে ঘরে পাঠানোও যাবে, কিন্তু ঢাকা শহরে বড় একটা অংশ খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়। তাদের ঘর নাই, মাস্ক হ্যান্ডওয়াশ কফ হাইজিন তো পরের কথা। আরো বিশাল একটা অংশ দিন আনে দিন খায়। কোন জমানো টাকা নাই। এই দেশে ওদের চিকিৎসা -হাসপাতাল-আইসিইউ বাদই দিলাম, দিনের তিন বেলা খাবার কে দিবে? ওরা খাবার না পেলে চুপ করে রাস্তায় বসে থাকবে? এটা সম্ভব? এপোক্যালিপ্টিক সিনেমা মঞ্চায়িত হবে না তো?

চীনে হেলিকপ্টারে করে খাবারের প্যাকেট দিয়ে গেছে। আমাদের সেনাবাহিনী নিামিয়ে লিস্ট করে বাড়ি বাড়ি বা রাস্তায় রাস্তায় খাবার দেয়া একটা সমাধান। যুদ্ধের সময়কার মত লঙ্গরখানা বানানো সম্ভব না। কারণ এখন পাবলিক গ্যাদারিং মানে ভাইরাসের জ্বালানি দেয়া। আমাদের দেশে এটা সম্ভব? বঙ্গবন্ধুর নিজের কম্বলই তো চুরি গেছে, আর এ তো লকডাউনের সময়কার খাবার! তাছাড়া সরকার ডাক্তারদেরই প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট দিতে পারছে না। আর্মি নামলে শুধু ইউনিফর্ম দিয়ে গা ঢাকলে হবে? তাদের পিপিই লাগবে না?

ওদিকে গণমাধ্যমে দেশের বড় ডাক্তার স্যারেরা বলে যাচ্ছেন এটা সাধারণ সর্দিকাশি, ২% মানুষ মরতে পারে। স্যার, ২% মানে বুঝেন? আমাদের তো ২০১৭ তে শুধু ঢাকাতেই চিকনগুনিয়া হয়েছিল লক্ষাধিক। আমাদের যে ঘনবসতি, তাতে চীনে ২ লাখ হলে আমাদের কয়েক লাখ তো হবেই (আল্লাহ না করুক)। কোন একটা গবেষণায় দেখলাম সেটা কোটি ছাড়াবে। এক কোটির ২% মানে কিন্তু ২ লাখ। ২ লাখ মানুষ! সবার নাম আছে। পরিবার আছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে। এমন সব মানুষ। এটা শুধু সংখ্যা না।

আর ২% ছিল চায়না তে৷ ইতালিতে ১০% এরও উপরে, যেখান থেকে আমাদের ভাইরাসটি আসার সম্ভাবনা বেশি। কারণটাও সবাই জানে।

অদৃশ্য এই শত্রুর সাথে যুদ্ধে সবচেয়ে বড় সৈনিক কিন্তু ডাক্তার আর আমাদের হেলথ টিম। সরকার উন্নত বিশ্বের চেয়েও ভাল প্রস্তুতি নিয়েছে বলে সবাই জানলেও ডাক্তারদের পিপিই নাই। এই সপ্তাহে মাত্র কিছু ছবি দেখলাম ডাক্তাররা পাওয়া শুরু করেছেন। না হয় নিজ গরজে বানিয়ে নিয়েছেন। পিপিই ছাড়া এই ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে রোগীর গায়ে হাত দেয়া মানে নিশ্চিতভাবে নিজে আক্রান্ত হওয়া। নিজের ইমিউনিটি (রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা) ভালো থাকলে হয়তো জুনিয়র ডাক্তারদের সিরিয়াস কিছু হবে না, আল্লাহ ভালো জানেন। কিন্তু সেই জীবাণু ছড়াবে অন্য রোগীতে।

এক হাসপাতালে করোনা রোগী যাওয়া মানে আশপাশের সব রোগী রিস্কে চলে যাওয়া। সেখান থেকে বাসায় গেলে ডাক্তারদের পরিবার আক্রান্ত হবে। সবার মা বাবা আছে, এবং বেশিরভাগই হাই রিস্ক। আরেক স্যার বললেন রোগী না দেখার জন্যে ডাক্তাররা টাকবাহানা করছে।

প্রিয় স্যার, বেশির ভাগ ডাক্তার এই যুদ্ধে নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত, বিশ্বাস করেন। কিন্তু সেটা নিজের ফুটফুটে সন্তান কিংবা বাপ মায়ের জীবনকে বাজি রেখে না।

অনেকে বলছেন নিজের ইকুইপমেন্ট নিজে ম্যানেজ করো। এত সোজা? না হয় মাস্ক, গ্লাভস, গাউন কিনলাম। কিন্তু এগুলো সব ডিস্পোজেবল, না হয় ডিসইনফেক্ট করতে হবে। সেই ব্যবস্থা কই? ব্যবহার করা গাউন আর মাস্ক কই ফেলবো? এগুলো আবার মার্কেটে আসবে না তার গ্যারান্টি কি? আর প্রতিদিন এত টাকার ইকুইপমেন্ট নিজ খরচে কেনা সম্ভব? বিশেষ করে যারা ইমার্জেন্সি সামলায়, সেই ডাক্তারদের বেতন কত জানেন? অন্তত ঢাকা মেডিকেলের বড় একটা অংশ শূন্য টাকা বেতনে ট্রেনিংয়ের নামে কাজ করে যায়। জানেন তো? আর হেলথ সিস্টেমে শুধু ডাক্তার না। এটা একটা টিম। এই রোগীটা এক্সরে করতে যাবে। গেটের দারোয়ান থেকে শুরু করে যে ট্রলি ঠেলবে সেই ওয়ার্ড বয় আর টেকনিশিয়ানের পিপিই কে দিবে?

সুতরাং যা হওয়ার তাই হচ্ছে। রোগীর লক্ষণ শুনে সামান্য সন্দেহ হওয়া মাত্র সরকার ঘোষিত চার করোনার জন্যে প্রস্তুত হাসপাতালের দিকে রেফার। কিন্তু ওখানে যাওয়া মাত্র বলবে, টেস্ট করেছেন? এটা শুধু করোনা পজিটিভদের হাসপাতাল। ওদিকে টেস্ট করার সেন্টার মাত্র একটা। হটলাইনে হাজার হাজার মানুষ কল দিচ্ছেন। লাইন পেলে তারা সাফ জানিয়ে দিবে আপনি বিদেশ থেকে না আসলে, অথবা তার পরিবারের না হলে টেস্ট হবে না (মিরপুরের মৃত রোগীটা ছিল ব্যতিক্রম, যাকে দিয়ে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন প্রমাণ হলো)। কারণ যাকে তাকে টেস্ট করার মত কিট নাই। আমরা তিন মাসে কি কঠিন প্রস্তুতি নিয়েছি তার প্রমাণ।

এখন এই রোগী কই যাবে? আর তিনি যদি আসলেই কোভিড-১৯ রোগী হয়ে থাকেন, এই পিংপং খেলার পথে কতগুলো মানুষ আক্রান্ত হলো? প্রথম হাসপাতালের রোগীগুলো ঝুঁকিতে পড়লো না? অ্যাম্বুল্যান্স, সিএনজিওয়ালা সবাই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা। এভাবে প্রতিদিন কোয়ারেন্টিনের সংখ্যা বাড়ছে। এখনও সংখ্যাটা দুই অংকে আছে, কয়দিন পর শত শত ডাক্তার কোয়ারেন্টিনে যাবে।

আমাদের রোগীরাও কম চালাক না। মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে সবাই এখন করোনা এক্সপার্ট। সুন্দর মত এক্সপোজার হিস্ট্রি আর লক্ষণ লুকিয়ে ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছেন। এতে কার ক্ষতি হচ্ছে? করোনার শ্বাসকষ্ট কি অ্যান্টিবায়োটিকে যাবে? আর এতগুলো মানুষকে বিপদে ফেলতে একটুও বিবেকে বাঁধে না?

আবার পৃথিবীর রাজা ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনার চিকিৎসা দিয়ে দিয়েছেন টুইটারে। অথচ ছোট্ট দুইটা ট্রায়ালে আইসিইউ ভর্তি রোগীদের মৃত্যুহার কমানোর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে মাত্র। তারাও বলেছে আরও বড় ট্রায়াল না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত না এটা কতটা কাজ করে। সাধারণ করোনা এমনেই সেরে যায় ৭০-৮০% ক্ষেত্রে। কিন্তু আমরা পন্ডিত। আমাদের ডাক্তাররা কি পৃথিবীর মহারাজার চেয়ে বেশি বুঝে? সেই দেখে বাঙ্গালী ঐ দুই ওষুধ মার্কেট আউট করে দিছে।

ভাই, ওষুধ মাত্রই বিষ। এগুলো ওষুধের অনেক সাইড ইফেক্ট আছে। যাকে তাকে যখন তখন দেওয়া যায় না, দেওয়া হয়ও না। এমনকি হার্ট বিট এলোমেলো হয়ে ঠুস করে হার্ট বন্ধ হয়ে যেতে পারে ভালো মানুষের। এই কথাটা এক আত্মীয়কে বলার পর উনি বললেন, বাবা হার্ট এটাকে মরি সেও ভালো, করোনায় মরতে চাই না। আমি নির্বাক।

মাথায় এত এত প্রশ্ন। পাগল হয়ে যাচ্ছি মনে হয়। সামনের দুই মাসে কি হবে কেউ জানে না। আমরা করোনায় কয়জন মরবো আর কয়জন সোশাল ক্রাইসিসে, এটাই আমার কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তবে একটা দিক ভালো। শেষ পর্যন্ত প্রেস বৃফিংয়ে করোনা রোগীর সংখ্যা দিনে তিনটাই মনে হয় থাকবে। পৃথিবী অবাক তাকিয়ে দেখবে, জ্বলে পুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়। সাবাশ বাংলাদেশ।

  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না