১২ মার্চ, ২০২০ ০৪:৩২ এএম
মেডিভয়েসকে বিএসএমএমইউ প্রোভিসি

সব বিভাগীয় শহরে কিডনি হাসপাতাল প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী পদক্ষেপ

সব বিভাগীয় শহরে কিডনি হাসপাতাল প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী পদক্ষেপ
অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম। ছবি: সাহিদ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট : দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে কিডনি হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম। 

তিনি বলেন, কিডনির চিকিৎসার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। (ওই বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো চালু হলে) তখন জনসাধারণ খুবই উপকৃত হবেন। যাতায়াতের দূরত্ব কমে যাওয়ায় তারা নির্বিঘ্নে সেবাটা নিতে পারবেন।  

সম্প্রতি মেডিভয়েসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। 

নতুন হাসপাতালগুলো চালু করতে যে পরিমাণ জনবল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন সেই পরিমাণ জনবল রয়েছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে বিএসএমএমইউ প্রোভিসি ডা. রফিকুল আলম বলেন, সেই পরিমাণ জনবল এই মুহূর্তে নেই, তবে আমরা প্রতি বছর ৩০-৪০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বের হচ্ছে। আমাদের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ এবং বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এমডি কোর্স চালু আছে। বিসিপিএসে এফসিপিএস নেফ্রোলজি কোর্স চালু আছে। যার ফলে আমাদের কিডনি বিশেষজ্ঞ প্রতি বছর বাড়ছে। অচিরেই আমরা আমাদের দেশের কাছাকাছি চলে যাব।

তিনি বলেন, কিডনি বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো চালু হয়ে গেলে আমরা আশা করছি যে, এগুলো আমরা দেখভাল করতে পারব। তার কারণ হলো, এখন দেশের বেশিরভাগ কিডনি বিশেষজ্ঞ এখন ঢাকা কেন্দ্রিক। তখন কিন্তু ডিসেন্ট্রালাইজ হবে। এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

তিনি জানান, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রচুর।  প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি কিডনি রোগী। প্রতি বছর ৩০-৪০ হাজার নতুন রোগী কিডনির বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন,  কিডনি চিকিৎসায় যে পরিমাণ ব্যয় হয় রাষ্ট্রের পক্ষে সেটা বহন করা সম্ভব না। কিডনি রোগীদের সরকারি হাসপাতাল পুরো ভার নিতে পারছে না। সরকারি হাসপাতাল নামমাত্র মূল্যে, বেশিরভাগ বিনামূল্যেই ডায়ালাসিস সেবা দিচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে এটা হচ্ছে। আর বেসরকারি পর্যায়ে যেসব ডায়ালাসিস সেন্টার রয়েছে সেখানে তারা তাদের মত করে ডায়ালাইসিসের মূল্য নির্ধারণ করে। সেখানে ড্রপআউটের সংখ্যা খুবই বেশি। সার্বিকভাবে ১০ ভাগের বেশি রোগী এটি ছয় মাসের বেশি চালাতে পারে না। তারা ঝরে পড়ে। এ জায়গায় যদি স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে পারি তাহলে এ সমস্যা সমাধান হতে পারে। এখানে বিভিন্ন এনজিওকেও এখানে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। ব্র্যাকের মতো এনজিও এখানে এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব নিতে পারে। সরকারও ভাগাভাগি করে দায়িত্ব নিতে পারে। পুরোটা সরকারের পক্ষে হয়তো সম্ভব না। কারণ, আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করলে এ জায়গায় পৌঁছাতে আরেকটু সময় লাগবে। 

কিডনি রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কী?

প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রফিকুল আলম বলেন, এখন সারা বিশ্বে কিডনি ক্রোনিক, কিডনি ডিজিজ বা কিডনি ফেইলুরের প্রধান কারণ ডায়াবেটিস। দ্বিতীয় প্রধান কারণ, উচ্চ রক্তচাপ। এছাড়া নেফ্রাইটিস রোগ বাড়ছে। খাদ্যের ভেজালও কিডনি রোগ বাড়ার অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, আর আমাদের দেশে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই রোগীরা যে হারে ফার্মেসি বা ঔষধের দোকানে গিয়ে ইচ্ছামাফিক ওষুধ কিনে খায়, তাও কিন্তু তাদের কিডনি সমস্যার কারণ। আমাদের দেশে যেভাবে যে কোনো ঔষধ কিনে নিতে পারবেন, কিন্তু উন্নত দেশে সেগুলো পারবেন না। 

‘ওটিসি বা ওভার দ্যা কাউন্টার দুই একটা ড্রাগ ছাড়া কোনো ওষুধ  ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া নিজে কিনতে পারবেন না। আমার দেশে সেগুলো নাই’।

‘ইউনানী আয়ুবেদি ও অন্যান্য জায়গায় রেগুলেটরি সিস্টেম খুব দুর্বল, সেখানে তাদের যে ঔষধপত্র হেবি মেটাল এবং অন্যান্য অনেক কিছুই থাকে যেগুলোর কম্পোপজিশন আমরাও ভালোভাবে জানি না। এগুলোর প্রভাব কিডনির ওপর গিয়ে পড়ছে’। 

বাংলাদেশ রেনাল এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন, আকস্মিক কিডনি ফেইলুরের কারণ আমরা নিজেরাই। যেমন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে বা হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের তিন-চারটা পর্যন্ত এন্টিবায়োটিক দেয়া হয়। সেই এন্টিবায়োটিকগুলো বেশিরভাগই কিডনির ওপর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। 

তিনি বলেন, গর্ভকালীন প্রসাবকালীন সময়ে জটিলতার কারণে আপনার কিডনি ফেইলুর হয়। তারপর সিজরিয়ান অপারেশনগুলো বেশিরভাগ আনহাইজানিক পরিবেশে করা হয়- সেগুলোতে কিডনি ফেইলুর হচ্ছে।

‘ডায়রিয়া ডেসিন্ট্রতে কলেরা প্রাদুর্ভব যেহেতু আগের চেয়ে কমেছে কিন্তু পাশাপাশি অসংক্রমক ব্যাধি বেড়ে যাচ্ছে। সংক্রমক ব্যাধি কমেছে, ননকমিনেকেবল ডিজিজগুলো বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়াও ধুমপান কিডনি রোগের রিস্ক ফ্যাক্টর’। 

‘এখন শিশুরা ফাস্টফুড জাঙ্কফুডে অভ্যস্ত হচ্ছে। পানীয় জাতীয় কোকাকোলা, ফান্টা ইত্যাদি খাচ্ছে শিশুরা। আর শিশুদের খেলার মাঠ নেই, তারা কম্পিউটার সামনে বসে থাকে। তাই তারা মোটা হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে কিডনি রোগের হার বেড়ে যাচ্ছে’। 

কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় করণীয় কী?

অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন, কিডনি রোগের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। তাই এর চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে বেশি নজর দেয়া উচিত। শুধুমাত্র ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখা, যত্রতত্র ওষুধ সেবন না করা, স্থুলতা যাতে না হয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখা। পেইন কিলার যত্রতত্র সেবন না করা। আর স্বাস্থ্যকর খাবার ও প্রতিদিন পর্যাপ্ত (২-৩ লিটার) পানি পান করা। অনেকে কিডনি ভালো রাখার জন্য ৫-৭ লিটার পানি পান করেন, এটার দরকার নেই। এটাতে (প্রয়োজনের চেয়ে অতিমাত্রায় পানি পান) কিডনির ওপর আরও চাপ বেড়ে যায়। অনেকেই মনে করেন যে, পানি বেশি পান করলেই কিডনি ভালো থাকে, এটা ঠিক নয়। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না। 

আমাদের কিডনির বিশেষজ্ঞ সংখ্যা বাড়াতে হবে। মেডিকেল কলেজ ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কোর্সগুলিকে আরও সংগঠিত করতে হবে এবং সংখ্যা বাড়াতে হবে।

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা পর্যাপ্ত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বিএসএমএমইউ প্রোভিসি অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন, আমাদের আসনগুলো এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত। এরপরেও এগুলো বাড়ানো সম্ভব, এগুলো কোন ফিক্সড না। যখনই দরকার হয় এগুলো বিশ্ববিদ্যলয় চাইলে সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে আসন সংখ্যা বাড়াতে গেলে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর অনুপাতেরও একটা ব্যাপার আছে। সেটাও একটা উন্নত দেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে করতে হয়। যেমন ধরুন এখানে ২জন শিক্ষক আছে আপনি ছাত্র দিয়ে দিলেন ১০-১২ জন তাহলে পারবে না। তাদেরকে সুপারভাইজ করতে হবে। এখানে কিডনি বিশেষজ্ঞ, কিডনি ডায়ালাইসিস, কিডনি চিকিৎসায় সম্পৃক্ত নার্স ইত্যাদির সংখ্যা বাড়াতে হবে। কিডনি সংযোজনের জন্য কিডনি ট্রান্সপ্ল্যানটেশন সংখ্যা বাড়াতে হবে। এজন্য সুযোগ-সুবিধাগুলো বাড়াতে হবে। ট্রান্সপ্ল্যানটেশনের রোগীদের ওষুধপত্রগুলোর দাম বেশি, সেসবের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ করে সেগুলো সহজলভ্য করতে হবে। 

সিএপিডি বলে একটা ডায়ালাইসিস আছে যেটা peritoneal ডায়ালোসিস বলে। এটা ঘরে বসে করা যায়। কেউ এটা হোম এটাকে হোম ডায়ালাইসিস বলে। এটাতে একটা ক্যাথেটার ফিট করে রাখা হয়। এটার মাধ্যমে একটা ডায়ালাইসিস সলিউশন পেটের মধ্যে ঢুকানো হয়, এটা ছয় ঘন্টা রেখে আরেকটা টিউবের আরেক প্রান্ত দিয়ে বের করে আনা হয়। এটা বাংলাদেশের জন্য খুবই উপযোগী মনে করা হচ্ছে। দূর-দূরান্তের রোগীরা এটা ঘরে বসে করতে পারবেন। এটা বাংলাদেশে নেই। এটা আমদানি করতে হয়। বছরে এটার জন্য রোগীদের প্রত্যেকের প্রায় আড়াই লাখ টাকার মতো ফ্লুইডের পেছনে খরচ হয়ে যায়। সিএপিডির ফ্লুইডটা যদি সরকার দেশে তৈরির ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে জনসাধারণ উপকৃত হবেন।  

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি