২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০১:১৭ পিএম

ফার্মেসিওয়ালার হাতের যশ

ফার্মেসিওয়ালার হাতের যশ

ডা. মাকসুদ উল্যাহ: ফার্মেসিতে ওষুধের ব্যবসায় অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি মানবসেবা করার সুযোগ থাকে। কেননা, রোগীর জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ফার্মেসিতে সংরক্ষণ করা হয়। এজন্য এই মহান ব্যবসাকে অনেকে সৌখিন পেশাও বলে থাকে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সম্প্রতি অনেক ফার্মেসিওয়ালা চিকিৎসকের ভূমিকা গ্রহণ করে চিকিৎসাখাতকে কলুষিত করে ফেলছে। তবে শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের ফার্মেসিওয়ালাদের মধ্যে এই অযাচিত ডাক্তারি প্রবণতা বেশি। 

অসৎ ফার্মেসিওয়ালাদের দৌরাত্ম্যে গ্রাম এলাকার মানুষের অপচিকিৎসার প্রবণতা দিনে দিনে বাড়ছে। উপজেলায় কর্মরত ডাক্তার এবং গ্রামের রোগীরা ফার্মেসিওয়ালাদের কাছে অনেকটা জিম্মি। অনেক সময় দেখা যায়, একজন রোগী যখন এমবিবিএস ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ওষুধ কেনার জন্য ফার্মেসিতে যায়, তখন কোনো কোনো ফার্মেসিওয়ালা রোগীকে নিজের খেয়ালখুশিমতো এমন ওষুধ দেয়, যার সঙ্গে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের কোনো সম্পর্কই নেই। কিন্তু আরোগ্য লাভের বিপরীতে রোগীর সমস্যা যখন আরও বাড়তে থাকে তখন রোগী ডাক্তারকে দোষারোপ করতে থাকে। কিছু কিছু ফার্মেসিওয়ালা মনে করেন, ডাক্তারের চেয়ে তিনি নিজেই বরং আরও ভালো ডাক্তারি জানেন। 

এ বিষয়ে অভিযোগ করেও ফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ‘রিঅ্যাকশন’ শব্দটা আমাদের দেশে রোগীদের কাছে খুব পরিচিত একটা শব্দ। যেমন ডেঙ্গুজ্বর হলে, শুরু থেকে ষষ্ঠ-সপ্তম দিনে রোগীর শরীরের চামড়ায় স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের দাগ উঠতে পারে। এমন সময় রোগী কোনোক্রমে একবার ফার্মেসিওয়ালার মুখোমুখি হলে অসাধু ফার্মেসিওয়ালা রোগীকে বলেন, ডাক্তারের চিকিৎসায় আপনার শরীরে রিঅ্যাকশন হয়ে দাগ উঠেছে।

একদিকে অপচিকিৎসা অন্যদিকে ডাক্তারের বদনাম। গ্রামের অধিকাংশ রোগীই ডাক্তার আর ফার্মেসিওয়ালার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে বলে মনে করে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের অনেক রোগী ফার্মেসিওয়ালার কথায় এমবিবিএস ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের ভালো-মন্দ যাচাই করে থাকে।  

একজন এমবিবিএস ডাক্তার যখন রোগীকে জিজ্ঞাসা করেন, ফার্মেসিওয়ালা বা কবিরাজের কাছে গিয়ে সময় আর টাকা নষ্ট করলেন কেন? তখন অনেক রোগী উত্তর দেন, আপনারাও ডাক্তার, তারাও ডাক্তার। ব্যথা হলে এই ওষুধ আর পাতলা পায়খানা হলে ওই ওষুধ দিতে হয়, এটা ডাক্তারি নয়। বরং ডাক্তারি হচ্ছে কোন রোগীকে কোন অবস্থায় কোন ওষুধ দেওয়া যাবে না এবং কেন দেওয়া যাবে না। 

একই রোগীকে কোন দুটি ওষুধ একসঙ্গে দেওয়া যাবে না। চিকিৎসা-বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী এমবিবিএস ডাক্তার সবসময় চেষ্টা করেন রোগীকে সবচেয়ে কম ক্ষমতার ওষুধ সবচেয়ে কম ডোজে সবচেয়ে কম মেয়াদে দিতে। যেন এক রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে রোগীর অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি না হয় বা অন্য কোনো রোগ সৃষ্টি না হয়। এতে করে কাজ না হলে পরে তিনি ক্রমান্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ওষুধের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু গ্রামের অনেক ফার্মেসিওয়ালা ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভদের মুখ থেকে হাতে গোনা কিছু উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ওষুধের নাম মুখস্থ করে নিজের কথিত ‘হাতের যশ’ দেখানোর জন্য এবং নিজেকে এমবিবিএস ডাক্তারের চেয়েও অনেক বড় ডাক্তার প্রমাণ করার জন্য শুরুতেই রোগীকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একাধিক ওষুধ দেয়।

ব্যথা বা যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যা এমবিবিএস ডাক্তারের চিকিৎসায় ভালো হতে দেরি হলে অনেক রোগী ওষুধের দোকানে গিয়ে ব্যথার ওষুধ চেয়ে থাকে। কোনো এক ফার্মেসিওয়ালার দেওয়া ওষুধে দ্রুত ব্যথা সেরে গেছে; তাহলে বুঝে নেবেন আপনি কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যা এ মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ফার্মেসিওয়ালার এই কথিত হাতের যশের কারণে পরে আপনি কোনো এক সময় আরও বড় স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিলে তিলে কিডনি নষ্ট হওয়ার একটি কারণ হচ্ছে যখন-তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে ব্যথার ওষুধ গ্রহণ করা। 

বাস্তবতা হচ্ছে, উভয় কিডনি প্রায় সম্পূর্ণ নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বাইরে থেকে কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। অনেক মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পাস যুবককে দেখেছি এক উপজেলার লোক হয়ে অন্য উপজেলাতে গিয়ে কোনো এক ফার্মেসিওয়ালার কাছ থেকে ব্যথার চিকিৎসা নিতে। আফসোস! তারা কেমন করে মনে করতে পারে, একজন ফার্মেসিওয়ালা একজন এমবিবিএস পাস করা ডাক্তারের চেয়ে ভালো চিকিৎসা জানে। তারা কি মনে করে এসব ওষুধের নাম-পরিচয় ভালো ডাক্তাররা জানে না? একজন শিক্ষিত যুবক এমন কুসংস্কারে ডুবে থাকলে গ্রামের অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত লোকজন কী করবে? চিকিৎসা-বিজ্ঞানে এক রোগীকে একই সময়ে একটির বেশি ব্যথানাশক ওষুধ দিতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ তা করলে কিডনি, পাকস্থলী এবং হূদযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এমনকি সেটা রোগীর মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট হতে পারে। 

কিন্তু দেখা যায়, অনেক ফার্মেসিওয়ালা নিজের হাতের যশ দেখানোর জন্য এক রোগীকে একই সময়ে ইনজেকশনসহ মোট চারটি উচ্চক্ষমতার ব্যথার ওষুধ দিয়েছে! এতে তাড়াতাড়ি ব্যথা সেরে ফার্মেসিওয়ালার খুব সুনাম হয়। সবাই বলতে থাকে এই ফার্মেসিওয়ালার হাতের যশ খুব ভালো! কিন্তু রোগীর কিডনি, পাকস্থলী আর হৃদযন্ত্রের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে তা ফার্মেসিওয়ালা আর ওই রোগী কেউ জানে না। তাই এ ধরনের হাতের যশ বা আলগা খ্যাতিসম্পন্ন অসাধু ফার্মেসিওয়ালা থেকে রোগীদের দূরেই থাকাই উচিত। সেইসঙ্গে এসব অসাধু ফার্মেসিওয়ালার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রামের সাধারণ মানুষের অপচিকিৎসা বন্ধে উৎসাহিত করবে।  

লেখক : ডা. মাকসুদ উল্যাহ

চিকিৎসক , ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।
 

Add
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না