ডা. নাজিরুম মুবিন

ডা. নাজিরুম মুবিন

মেডিকেল অফিসার, মিনিস্ট্রি অব হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার


০৯ মার্চ, ২০২০ ১২:৩৪ পিএম

করোনাভাইরাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন ও তার সমাধান

করোনাভাইরাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন ও তার সমাধান

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) বিশ্বের অন্তত ১০০টি’রও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও এখন পর্যন্ত তিনজনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে এই ভাইরাসে তিন হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আক্রান্ত অবস্থায় আছে এক লাখেরও বেশি। তবে অনেক গবেষক মনে করছেন, আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ১০ গুণ হতে পারে।

করোনাভাইরাস নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা কৌতুহল। সবার মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে এ ভাইরাস নিয়ে হাজারো প্রশ্ন। এ ভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা জায়গায় নানা ধরনের স্বাস্থ্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তবে অনলাইনে যেসব স্বাস্থ্য পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে, যেসব প্রায়ই হয় অপ্রয়োজনীয় নয়তো বিপজ্জনক।

১. করোনাভাইরাস কিভাবে ছড়ায়?

উত্তর: করোনা ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, লালা ও নাকের নিঃসরণের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়ায়। তখন ঐ ব্যক্তির একদম কাছে থাকলে করোনা সংক্রমণ হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস প্রশ্বাসজনিত কণার মধ্যে এই ভাইরাসটি থাকে। কণাটি ভারি হওয়ায় এটি বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে না বরং মানব শরীর থেকে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বের হয়ে এটি মাটি বা অন্য কোন তলে (যেমন- ফার্নিচার) বসে থাকে। সেখান থেকেও করোনা সংক্রমণ হতে পারে।

২. করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে কী করবো?

উত্তর: সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুবেন অথবা অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড রাব ব্যবহার করতে পারেন। জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকবেন। জন সমাগম হয় এমন স্থানে যাবেন না। একই সাথে নিজে হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় কনুই ভাঁজ করে নাক এবং মুখ ঢাকবেন অথবা টিস্যু ব্যবহার করবেন এবং সেটা ঢাকনাযুক্ত বিনে ফেলবেন। অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক, মুখ স্পর্শ করবেন না। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলবেন। অসুস্থ হলে ঘরে থাকবেন। কারো সাথে হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলি করা থেকে বিরত থাকবেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন।

৩. করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতে কারা আছে?

উত্তর: করোনা ভাইরাস সংক্রমণ যে কারো হতে পারে তবে বৃদ্ধরা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ব্যক্তির যদি একই সাথে অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট জনিত রোগ এবং/অথবা হৃদরোগ এবং/অথবা ডায়বেটিস থাকে তাহলে তার অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা দানের সাথে জড়িত পেশাজীবীদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সকল বয়সের এবং সকল পেশার মানুষকে করোনা সংক্রমণ থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছে।

৪. করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক কি কার্যকরী?

উত্তর: না। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। তবে বেশি অসুস্থ রোগীদের একই সাথে ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশনও হতে পারে। তাদের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫. আমার নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন দেয়া আছে। আমার কি করোনা সংক্রমণ হতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ হতে পারে। নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন যেমন নিউমোকক্কাল ভ্যাক্সিন বা হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি এর ভ্যাক্সিন, নতুন এই করোনা ভাইরাসের বিপরীতে আপনাকে সুরক্ষা দিবে না। তবে এই ভ্যাক্সিন নেয়া আপনার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

৬. আমি নিয়মিত সারা শরীরে সরিষার তেল/অলিভ অয়েল/বডি লোশন ব্যবহার করি। করোনা কি আমার শরীরে প্রবেশ করতে পারে?

উত্তরঃ সরিষার তেল/অলিভ অয়েল/বডি লোশন আপনাকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিবে না। কিছু রাসায়নিক জীবাণুনাশক আছে যা করোনা ভাইরাসকে মারতে পারে যেমন- ব্লিচিং পাউডার, অ্যালকোহল, প্যারা অ্যাসিটিক এসিড, ক্লোরোফরম। যদিও এসব আপনার ত্বকে বা নাকে ব্যবহার করে আপনি করোনা থেকে সুরক্ষা পাবেন না। বরং এটা আপনার ত্বকের জন্য ভয়ংকর ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

৭. ধোঁয়া/ধূপের ধোঁয়া/কয়েলের ধোঁয়া কি করোনা ভাইরাসের ঘরে প্রবেশ ঠেকাতে পারে?

উত্তর. না। বরং এইসব ধোঁয়ায় রয়েছে সালফার ডাই অক্সাইড যা আপনার চোখ, নাক, মুখ, গলায় জ্বালা এবং অস্বস্তি বাড়াবে এমনকি অ্যাজমাও হতে পারে।

৮. রসুন খেলে কি আমি করোনামুক্ত থাকতে পারবো?

উত্তর: রসুন একটি স্বাস্থ্যকর খাবার। অনেক জীবাণু ধ্বংসে এর ভূমিকা আছে তবে নতুন এই করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে রসুনের ভূমিকা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি।

৯. নিয়মিত লবণ-পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করলে কি আমি করোনা প্রতিরোধ করতে পারবো?

উত্তর: সাধারণ সর্দি কাশি থেকে পরিত্রাণ পেতে নিয়মিত লবণ-পানি দিয়ে নাক পরিষ্কারের স্বল্প ভূমিকা থাকলেও করোনা প্রতিরোধে এর কোন ভুমিকা নেই।

১০. মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে কি করোনা প্রতিরোধ করা সম্ভব?

উত্তর: করোনা মুখের লালার মাধ্যমে ছড়াতে পারে। মুখের অন্যান্য জীবাণু ধ্বংসে জীবাণুনাশক মাউথওয়াশের ভূমিকা থাকলেও করোনা প্রতিরোধ বা প্রতিকারে মাউথওয়াশের কোন ভূমিকা নেই।

১১. করোনা ভাইরাস কি মশার কামড়ের মাধ্যনে ছড়াতে পারে?

উত্তর: না। এখন পর্যন্ত এরকম কিছু জানা যায়নি।

১২. করোনা প্রতিরোধে বাসায় কী সতর্কতা অবলম্বন করবো?

উত্তর: বাইরের জুতো বাসায় ঢোকানো যাবে না। বাইরে পড়া পোশাক নিয়মিত ধুয়ে ফেলতে হবে। বাইরে থেকে এসে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। ঘরের ফার্নিচার, মেঝে নিয়মিত জীবাণুনাশক দ্রবণ(যেমন অ্যালকোহলযুক্ত বা ক্লোরিন-পানি) দিয়ে মুছতে হবে।

১৩. করোনা প্রতিরোধে কর্মস্থলে কী সতর্কতা অবলম্বন করবো?

উত্তর: অফিসের চেয়ার, টেবিল, টেলিফোন, কীবোর্ড, হাতের সংস্পর্শে আসে এমন সকল জায়গা অ্যালকোহল বা ক্লোরিনযুক্ত জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত মুছতে হবে।

১৪. আমি অ্যালকোহল বা ক্লোরিন-পানি দিয়ে গোসল করলে কি করোনা মুক্ত থাকতে পারবো?

উত্তর: না। যে করোনা ভাইরাস শরীরের ভিতরে ঢুকে গিয়েছে তা এই পদ্ধতিতে মারা যাবে না বরং এই পদ্ধতি ত্বকের ক্ষতি সাধন করবে। যার ফলে অন্য ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশের সুযোগ পাবে।

১৫. অ্যালকোহল খেলে কি শরীরের ভিতরে প্রবেশ করা করোনা ভাইরাস মারা যাবে?

উত্তর: না। করোনা ভাইরাস শরীরের যে জায়গায় বাসা বাঁধবে সেখানে আপনার পান করা অ্যালকোহল পৌঁছাবে না।

১৬. গ্রীষ্মকালে কি এই ভাইরাস মারা যাবে?

উত্তর: না।

১৭. কখন মাস্ক পড়বো?

উত্তর: আপনি যখন কোন সন্দেহভাজন রোগীর সেবা করছেন তখন মাস্ক পড়ুন। আপনি যখন হাঁচি কাশি দিচ্ছেন তখন মাস্ক পড়ুন। মাস্ক পড়া তখনই কার্যকর হনে যখন আপনি একই সাথে সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুবেন।

১৮. আমি সুস্থ থাকলে কিভাবে মাস্ক পড়বো আর অসুস্থ হলে কিভাবে মাস্ক পড়বো?

উত্তর: আপনি সুস্থ থাকেন আর অসুস্থ থাকেন নীলদিক সব সময় বাইরে থাকবে, মাস্কের যে বর্ডারে শক্ত তারের মতন থাকনে সেটা নাকের দিকে থাকবে এবং চাপ দিয়ে সেটা নাকের উপর বসিয়ে দিবেন, বাইরের দিকের ভাঁজ নিম্নমুখী হয়ে থাকবে। আরেকভাবে বলা যায়, খসখসে দিকটা বাইরে থাকবে, নরম দিকটা ভেতরে থাকবে। শক্ত বর্ডার নাকের দিকে থাকবে। ওয়ান টাইম সার্জিক্যাল মাস্ক একবার ব্যবহার করেই ফেলে দিতে হবে। একজনের ব্যবহার করা মাস্ক, আরেকজন পড়া যাবে না। হাঁচি কাশি দেয়ার সময় মাস্ক পড়ে থাকতে হবে।

১৯. আমি ১৫ মিনিট পরপর পানি খাই যাতে করোনা ভাইরাস আমার শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এটা কি সঠিক?

উত্তর: না। করোনা ভাইরাস আপনার শ্বসনতন্ত্র দিয়ে প্রবেশ করে। মুখ দিয়ে যদিওবা অল্প পরিমাণ করোনা ভাইরাস প্রবেশ করে কিন্তু বারংবার পানি খেলে করোনা ভাইরাস শরীর থেকে বের হয়ে যায় না।

২০. আইসক্রিম বা ঠান্ডা জাতীয় খেলে কি করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে?

উত্তর: না। এরকম কোন তথ্য এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

২১. রোদে দাঁড়িয়ে থাকলে কি করোনা ভাইরাস মারা যায়?

উত্তরঃ না। এরকম কোন তথ্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

২২. টাকার নোট থেকে কি করোনা ছড়াতে পারে?

উত্তর: সম্ভাবনা কম হলেও ছড়াতে পারে। তাই টাকা গোনার পর হাত ধোয়া উচিত। যতদুর সম্ভব কার্ড করুন।

২৩. হ্যান্ড স্যানিটাইজার তো দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া গেলেও অনেক বেশি দাম চাচ্ছে। এখন আমি কী করবো?

উত্তর: হ্যান্ড স্যানিটাইজার পাওয়া না গেলে আতংকের কিছু নেই। সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়াই যথেষ্ট।

২৪. বাজারে তো এখন মাস্ক পাচ্ছি না কী করবো?

উত্তর: মাস্ক ব্যবহার সবার জন্য বাধ্যতামূলক না। যার হাঁচি-কাশি তিনি পড়লেই হবে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা দানের সাথে যারা জড়িত তারা মাস্ক ব্যবহার করবেন। মাস্ক ব্যবহার তখনই কার্যকর হবে যখন একই সাথে সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া হবে।

‘চিকিৎসা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হলাম, এর মধ্যে আবার এ হয়রানি’
যৌন হয়রানির শিকার শেবাচিমের নারী ইন্টার্ন চিকিৎসক

‘চিকিৎসা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হলাম, এর মধ্যে আবার এ হয়রানি’

যৌন হয়রানির শিকার শেবাচিমের নারী ইন্টার্ন চিকিৎসক

‘চিকিৎসা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হলাম, এর মধ্যে আবার এ হয়রানি’

করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

এক বছর প্রয়োগ হবে সেনা সদস্যদের দেহে

চীনে করোনার প্রথম ভ্যাকসিন অনুমোদন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে