ডা. মো. তাহমিদুল ইসলাম

ডা. মো. তাহমিদুল ইসলাম

সহকারী কমিশনার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, যশোর

( ৩৭তম বিসিএস প্রশাসনে মেধা তালিকায় তৃতীয়)

সাবেক সহকারী সার্জন (৩৫তম বিসিএস )

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (২০০৮-০৯)


০৬ মার্চ, ২০২০ ০৩:৫৫ পিএম
নতুন যুগে নতুন দিগন্ত

যে ১০টি আবিষ্কার বদলে দেবে নতুন যুগের স্বাস্থ্যসেবা

যে ১০টি আবিষ্কার বদলে দেবে নতুন যুগের স্বাস্থ্যসেবা

থমাস আলভা এডিসন বলেছিলেন, ‘There is a way to do it better-find it’. যদিও বাংলাদেশে বিপুল জনসংখ্যার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেই আমাদের চিকিৎসকরা প্রতিনিয়ত হিমশিম খান, তবুও আধুনিক বিশ্বে নিত্যনতুন গবেষণার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় কী কী পরিবর্তন আসছে তার খোঁজ-খবর রাখাও প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবা একটি ক্রম পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র। সুতরাং টেলিকমিউনিকেশন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং বিভিন্ন মডার্ন টেকনোলজিই নির্ধারণ করবে কেমন হবে আগামীর স্বাস্থ্যসেবা।

নতুন যুগে ১০টি আবিষ্কার:

১. রোবোটিকস:

রোবট এখন শুধু যান্ত্রিক সুবিধাই দেয় না, ধারণ করে বিশাল পরিমাণ ডিজিটাল ডাটা। রোবট প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে সার্জারির ধারণা এখন অলীক কল্পনা নয়, সেই দিন বেশি দূরে নয়, যখন রোবটের মাধ্যমে সার্জারি খুবই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হবে। রোবোটিক ডেমো বডির মাধ্যমে মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং সার্জনরা-সিমুলেশনের (Simulation) মাধ্যমে শিখবেন সার্জারি, করবেন নিত্যনতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

এখানেই শেষ নয়, রোবোটিক মস্তিষ্ক ধারণ করবে রোগীর বিবরণ, রোগের ইতিহাসসহ রোগীর বিভিন্ন ডাটা। তাতে করে রোগী-চিকিৎসক দূরত্ব কমবে অনেকটাই। এছাড়া প্রস্থেটিক (Prothestics) সার্জারিতে বিপ্লব আনবে রোবোটিকস। মাইক্রোবট (Micro Bot), কৃত্রিম অর্গান, কৃত্রিম লিম্বসসহ (limbs) সকল অঙ্গহানির প্রতিকার করবে রোবোটিকস।

২. আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স:

যদিও রোবোটিকস এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কাছাকাছি বিষয়। তদুপরি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিকে কৃত্রিম উপায়ে প্রযুক্তি-নির্ভর করার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সঙ্গীর মতো রোগীর সাথে থেকে তার স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ওষুধ সেবন, নিয়মিত পরীক্ষা ইত্যাদির ব্যাপারে তাকে গাইড করতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ক্যান্সার, জেনেটিক্যাল রোগবালাইসহ বিভিন্ন ধরনের ডায়াগনোসিসে সহায়তা করছে এবং ভবিষ্যতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। এছাড়া বিভিন্ন মেডিকেল যন্ত্রপাতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সই প্রাথমিক ভূমিকা পালন করবে।

৩. ত্রুটিপূর্ণ জিন মেরামত:

ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীরা মানব ভ্রূণ থেকে একটি ত্রুটিপূর্ণ ডিএনএ সরিয়ে জিন মেরামত করতে সক্ষম হয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অগ্রগতির ফলে এ রকম বংশ পরম্পরায় চলে আসা ১০ হাজারেরও বেশি ত্রুটি বা স্বাস্থ্য সমস্যা সংশোধন করার দরজা খুলে গেলো। যে প্রক্রিয়ায় ভ্রূণ থেকে ত্রুটিপূর্ণ ডিএনএটি দূর করা হয়েছে এই এডিটিং প্রযুক্তিকে বলা হয় ক্রিসপার। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক এবং এর মাধ্যমে জেনেটিক ত্রুটি সংশোধনের মাধ্যমে সিসটিক ফিব্রোসিস থেকে শুরু করে স্তন ক্যান্সারের মতো রোগও প্রতিরোধ করা সম্ভব।

৪. স্বয়ংক্রিয় পিল:

ক্রনিক রোগীদের ক্ষেত্রে তারা সঠিক সময়ে সঠিক ডোজ গ্রহণ করেছেন কিনা তা মনে রাখতে অসুবিধা হতে পারে। বিজ্ঞানীরাএমন নতুন পিল তৈরি করেছেন, যাতে একটি ক্ষুদ্র সংবেদক রয়েছে। এটি গ্রহণ করার সময় রেকর্ড করে এবং রোগীর গায়ে পরে থাকাডিভাইস দ্বারা প্রেরণ করা তথ্য তারপরে একটি স্মার্টফোনে প্রেরণ করা হয়। রোগী এবং চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা নিশ্চিত করতে পারেন।

সিজোফ্রেনিয়া, আলজেইমার্সসহ বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসায় ইতিমধ্যে ব্যবহৃত একটি উদ্ভাবন হতে পারে এই স্বয়ংক্রিয় পিল।

৫. ডিপ্রেশন ডায়াগনোসিসকারী স্মার্টফোন:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ হতাশায় ভুগছেন এবং প্রতিবছর আত্মহত্যার কারণে প্রায় ৮০০,০০০ মানুষ মারা যান এবং যা ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। হতাশায় আক্রান্তদের অর্ধেকেরও কম চিকিৎসা পান এবং অনেক দেশে এই সংখ্যা ১০% এরও কম। ক্যালিফোর্নিয়ার একটি সংস্থা বলেছে যে স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারী কিভাবে ফোনে ট্যাপ, স্ক্রোল এবং ক্লিক করে এমন আচরণ বিশ্লেষণ করে স্মার্ট ফোনগুলি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি নির্ণয় করতে পারে, যা চিন্তা-ভাবনা এবং মেজাজের অবস্থার পূর্বাভাস দিতে পারে। ফোনগুলো বিভিন্ন ট্র্যাকার এবং অ্যাপসের মাধ্যমে মানসিক রোগ নির্ণয়ে সহায়তা প্রদান করতে পারে।

৬. কৃত্তিম অগ্ন্যাশয় (Hybrid Closed-Loop Insulin Delivery System):

বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম অগ্ন্যাশয় হিসাবে অভিহিত, হাইব্রিড ক্লোজ-লুপ ইনসুলিন বিতরণ সিস্টেম টাইপ 1 ডায়াবেটিসকে আরও ভালোভাবে মোকাবেলা করতে সহায়তা করে। এফডিএ দ্বারা অনুমোদিত এই নতুন প্রযুক্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে রক্তের গ্লুকোজ স্থিতিশীল করার জন্য অবিচ্ছিন্ন গ্লুকোজ নিরীক্ষণ ডিভাইস এবং ইনসুলিন পাম্পের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে এবং গ্লুকোজ মাত্রা ঠিক রাখে। প্রযুক্তিটি পূর্বের ‘ওপেন লুপ’ ধারণাটিকে প্রতিস্থাপিত করে, যা রোগীদের তাদের অবিচ্ছিন্ন গ্লুকোজ মনিটর থেকে তথ্য ব্যবহার করার জন্য ইনসুলিনকে কতটা ইনজেকশন দিতে হবে তা নির্ধারণ করতো।

৭. যথার্থ ওষুধ (Precision Medicine):

প্রত্যেক মানুষের আলাদা জেনেটিক স্বাতন্ত্র্য এবং জীবন ধারণের আলাদা পারিপার্শ্বিকতা রয়েছে। Precision Medicine রোগের চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের জন্য একটি সিস্টেম যা প্রতিটি ব্যক্তির জন্য জিন, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার স্বতন্ত্র পরিবর্তনশীলতার বিষয়টি বিবেচনা করে (NIH Precision Medicine Initiative Cohort Program, 2015)। উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে গ্লিভেক (আইমেটিনিব) নামক একটি ড্রাগ যখন ক্যান্সারের কোষগুলোতে একটি নির্দিষ্ট জিনগত মেকআপ থাকে, কেবল তখনই লিউকেমিয়া নিরাময়ের জন্য কাজ করে।

সুতরাং গ্লিভেক ব্যবহার করে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত বাকি সবার সাথে চিকিৎসা করার পরিবর্তে, চিকিৎসকরা সেই নির্দিষ্ট জিনগত মেকআপ বিশিষ্টলোকদের পরীক্ষা করেন এবং কেবল তাদের মধ্যে ড্রাগ দেন। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ব্যাক্তির জন্য গড়পড়তা ওষুধ না দিয়ে যা তার শরীরে কাজ করবে সেই ওষুধ ব্যবহার করার পদ্ধতিই হলো Precision Medicine

৮. নতুন ব্যাথানাশক পদ্ধতি  হিসেবে (Close loop spinal stimulation):

অনেক রোগেই ক্রনিক ব্যথা খুবই কমন সমস্যা এবং opioid ওষুধ prescribe করার অন্যতম কারণ। ক্রনিক ব্যথার জন্য স্পাইনাল কর্ড স্টিমুলেশন একটি জনপ্রিয় চিকিৎসা যার মাধ্যমে একটি ইমপ্লান্টযোগ্য ডিভাইস মেরুদণ্ডের কর্ডকে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা সরবরাহ করে এবং ব্যাথানাশক হিসেবে কাজ করে। তবে এই ধরনের স্টিমুলেশন এ সাবথেরাপিউটিক বা ওভারস্টিমুলেশন ইভেন্টগুলির কারণে অসন্তুষ্টিজনক ফলাফল ঘটে থাকে। সেক্ষেত্রে ক্লোজড-লুপ স্টিমুলেশন ব্যবহার করে ডিভাইস এবং মেরুদণ্ডের কর্ডের মধ্যে আরও ভাল যোগাযোগের মাধ্যমে আরও অনুকূল উদ্দীপনা এবং ব্যথার স্বস্তি লাভের অনুভূতি দিতে পারে।

৯. স্ট্যাটিন গ্রুপের বিকল্প হিসেবে বেম্পেডোইক এসিড:

রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল প্রায় পুরো পৃথিবী জুড়েই বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা এবং ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেয়। যদি চিকিৎসা না করা হয়, এই কোলেস্টেরল হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণত বিভিন্ন ধরনের স্ট্যাটিন দিয়ে চিকিৎসা করা হলেও কিছু ব্যক্তি স্ট্যাটিন গ্রহণ করলে পেশী ব্যথাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা অনুভব করেন। এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো এড়িয়ে বেম্পেডোইক এসিড ক্ষতিকর লো ডেনসিটি-কোলেস্টেরল হ্রাস করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।

১০. নতুন ধরনের ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি:

এই নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে ক্যান্সারের রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়। এটি একটি কৌশল, যাতে ইমিউন কোষগুলো সংগ্রহ করা হয় এবং তাদেরকে বিশেষ ক্যান্সার-প্রতিরোধী যোদ্ধা হিসেবে ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়। এদের চিমেরিক অ্যান্টিজেন রিসেপ্টর বলা হয়। এই পদ্ধতিটি ইতিমধ্যে দুরারোগ্য ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের এবং শিশুদের জীবন বাঁচিয়েছে। বর্তমানে স্তন, প্রস্টেট, কোলন, ডিম্বাশয়, অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারসহ আরও বিভিন্ন ক্যান্সারে কাজ করার উপযোগী করে তোলার জন্য বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। ২০১৮ সালেজেমস অ্যালিসন এবং তাসুকু হনজো inhibition of negative immune regulation এর মাধ্যমে ক্যান্সারের চিকিৎসায় ইমিউন কোষের ব্যবহার নিয়ে গবেষণার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন।

করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম গুলো মেনে চলুন। সর্দি কাশি জ্বর হলে হাসপাতালে না গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা দানকারী হটলাইন গুলোতে ফোন করুন। আইইডিসিআর হটলাইন- 10655, email: [email protected]
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

এক বছর প্রয়োগ হবে সেনা সদস্যদের দেহে

চীনে করোনার প্রথম ভ্যাকসিন অনুমোদন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত