২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ১২:৩৯ পিএম

মালয়েশিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনায় ডা. আজিজাহ?

মালয়েশিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনায় ডা. আজিজাহ?
আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী ডা. ওয়ান আজিজাহ। ফাইল ছবি

মেডিভয়েস ডেস্ক: মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষেক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গী পিকেআরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার ইব্রাহীমের স্ত্রী ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলের। 

প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে মাহাথির মোহাম্মদের পদত্যাগের পর এ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও এর আগে নতুন প্রধানন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গী পিকেআরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার ইব্রাহীমের কথাই ভাবা হচ্ছিল। তবে মাহাথিরের হঠাৎ পদত্যাগের পর সমীকরণ পাল্টে গেছে। আনোয়ার ইব্রাহিমের পরিবর্তে স্ত্রী দাতুক সেরি ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলকে প্রধানমন্ত্রী করা হচ্ছে বলে মালয়েশিয়ার ইংরেজি দৈনিক মালয় মেইল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

দেশটির একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মাহাথির মোহাম্মদ পদত্যাগ করায় মালয়েশিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন দেশটির বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল।

ডা. ওয়ান আজিজাহ ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গী আনোয়ার ইব্রাহীমের স্ত্রী। তিনি মাহাথিরের আস্থাভাজন হিসেবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ওয়ান আজিজাহ মালয়েশিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতাসীন প্রিবুমি বেরসাতু মালয়েশিয়া (পিপিবিএম) নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপান জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওয়ান আজিজাহর নাম প্রস্তাব করেন মাহাথির মোহাম্মদ। 

সোমবার মাহাথিরের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন দেশের রাজা আবদুল্লা অব ফাহাং। এরপরই রাজার সঙ্গে দেখা করেন আনোয়ার ইব্রাহিম ও তাঁর স্ত্রী ড. ওয়ান আজিজাহ। রাজার সঙ্গে দেখা করে আসার পরেই ওয়ান আজিজাহ মালয়েশিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে।

তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাহাথিরকে দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন রাজা।

গত শনিবার পদত্যাগ করার পর রাতে আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মাহাথির। এরপরই নতুন সরকার গঠন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য দফায় দফায় বৈঠক ও ক্ষমতাসীন জোটে ভাঙনের গুঞ্জন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সোমবার দুপরে আনোয়ার ও তাঁর স্ত্রী রাজার সঙ্গে দেখা করার পর সেই জল্পনা নুতন রূপ নেয়। হাওয়া অন্যদিকে বইতে শুরু করে।

দেশটির একটি সংবাদমাধ্যম ওয়ান আজিজাহ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বলে খবরও প্রকাশ করেছে। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। সূত্র বলেছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আনোয়ার ইব্রাহিম যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারেন, সে জন্য রাজনৈতিক মিত্ররা নতুন জোট গঠনের জন্য আহ্বান জানালে এ পদক্ষেপ নেন মাহাথির।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ের পর পাকাতান হারাপান জোটের প্রধান হিসেবে ওই বছরের ১০ মে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেন মাহাথির মোহাম্মদ। নির্বাচনের আগে দুই বছরের মাথায় জোট নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমকে প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব দিয়ে বিদায় নেয়ার কথা থাকলেও এতদিন ক্ষমতা ছাড়েননি মাহাথির।

এর আগে দুই দশকের বেশি ক্ষমতায় থাকার পর ২০০৩ সালে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। এতে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ পান নাজিব রাজাক। বর্তমান দুর্নীতির অভিযোগে তার বিচার চলছে।

চিকিৎসক ওয়ান আজিজাহর সংগ্রামী জীবনের গল্প 

ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাঈল মালয়েশিয়ার একজন প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ। দৃষ্টি সমস্যায় যারা ভুগেন তাঁদের আরোগ্যের কারিগর তিনি।  তিনি মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহীমের স্ত্রী এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সভাপতি।

আনোয়ার ইব্রাহীম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়ে জেলে যাওয়ার পরে তিনিই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে এসেছেন।

১৯৫২ সালে জন্মগ্রহণ করেন ডা. আযিযাহ ইসমাইল। বিখ্যাত Tunku Kurshiah কলেজে অধ্যায়নের পরে তিনি আয়ারল্যান্ডের রয়াল কলেজ অব সার্জনে পড়তে যান। সেখানে গাইনোকলোজি ও অবসটেট্রিকসে কৃতিত্বের স্বাক্ষর হিসাবে গোল মেডেল পান।

পরে অপথ্যালমলজিতে বিশেষজ্ঞ হন। সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়ার পরে দীর্ঘ ১৪ বছর চিকিৎসা সেবা দেন। এরপরে সামাজিক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং জাতীয় ক্যান্সার কাউন্সিলের একজন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে তার আগমন অনেকটা হঠাৎ করেই।

১৯৯৮ সালে যখন আনোয়ার ইব্রাহীম গ্রেফতার হন তারপর থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৯৯ সালে Keadilan Rakyat নামে দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। তার দল পরে মালয়েশিয়ান পিপলস পার্টির সাথে একীভূত হয়। সেখানেও তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। ডাঃ আযিযাহ ইসমাইল প্রথম সংসদ নির্বাচন করেন ১৯৯৯ সালে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

গত জাতীয় নির্বাচনে তার দল মাহাথির মোহাম্মাদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে। মূলত আনোয়ার ইব্রাহীমের অনুপস্থিতিতে দলকে ধরে রাখা, সামাজিকও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈষম্য দূর করাই ছিল তার রাজনীতিতে আসার মূল কারণ। পেশা এবং রাজনীতির বাইরে তিনি একজন চমৎকার ব্যক্তিও।

৬ সন্তানের জননী তিনি। নাতি নাতনি নয়জন। সবারই তার খুব ভক্ত। মায়ের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার বড় মেয়ে, যিনি নিজেও একজন সংসদ সদস্য, নুরুল ইজ্জাহ আনোয়ার বলেন, ‘আমার মা জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এসেছেন। তিনি একজন আধ্যাত্নিক মানুষ। সবকিছুতে তিনি স্রষ্টার উপরে নির্ভর করেন। শত ব্যস্ততার পরেও তিনি পরিবারকে সময় দেন। সপ্তাহে একদিন সন্তান ও নাতি নাতনিদের নিয়ে একসাথে বসেন পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় রাখতে।’ সবসময় হাসি খুশি থাকতে পছন্দ করেন আযিযাহ ইসমাইল।

আনোয়ার ইব্রাহীম গ্রেফতার হওয়ার পরে ২০০০ সালে একবার এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকরা তাকে বলেন, কষ্টের মাঝেও আপনি দেখছি সবসময় হাসিমুখে কথা বলেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি কুরআন পড়ি। ওখানে একটা আয়াত আছে যে, আল্লাহ কাউকে তার দায়িত্ত্বের ওপরে কিছু চাপিয়ে দেন না। তাই আমি মনে করি যা কিছুই ঘটুক তার পিছনে কল্যাণ আছে। হতে পারে আমাদের এই দুঃখ কষ্ট মালয়েশিয়ার জনগণকে সমাজের অবিচারের বিরুদ্ধে জেগে উঠতে সাহায্য করেছে। 

এই সংগ্রামী নারীর জীবন সংগ্রাম নিয়ে লেখা হয়েছে “স্ট্রাগল ফর জাস্টিস: দি স্টোরি অব ডা.ওয়ান আযিযাহ ওয়ান ইসমাইল অব মালয়েশিয়া” নামক বইটি।

এই বইতে উঠে এসেছে আনোয়ার ইব্রাহিম গ্রেফতার হওয়ার পরের কঠিন সময়ে কীভাবে সবকিছু সামাল দেন তার গল্প। একজন সুযোগ্য কন্যা, একজন মমতাময়ী মা একজন দায়িত্বশীল স্ত্রী, একজন সমাজসেবক, একজন রাজনীতিবিদ – সবকিছুর সমন্বয় ঘটেছে ৬৭ বছর বয়সী এই নারী চিকিৎসকের জীবনে। অভিনন্দন ডা. ওয়ান আযিযাহ ওয়ান ইসমাইল–মালয়েশিয়ার প্রথম নারী উপপ্রধানমন্ত্রী!

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত