২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৬:৩৯ পিএম
'সবুজ সংস্কৃতি' তৈরির স্বপ্ন 

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অভিনব জন্মদিন পালন

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অভিনব জন্মদিন পালন

বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা; জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার আজ পুরো পৃথিবীর মানুষ। একজন মানবিক অনুভূতিশীল মানুষ হিসেবে নাবিলের কি করার কিছুই নেই? পেশায় তিনি ভবিষ্যতের ডাক্তার, তাই অসুস্থ রোগীদের দেখভাল করা তার দৈনন্দিন কাজ। কিন্তু জলবায়ু বদলের এই ক্রমবর্ধমান সংকট তো তাকে নিয়ত পোড়ায়। সেই চিন্তা থেকেই নাবিল শুরু করেছেন ‘গ্রিন ফাইটিং মুভমেন্ট’। কথা হলো মেডিকেল শিক্ষার্থী নাবিলের স্বপ্ন আর বাস্তবতার নানা আঙ্গিক নিয়ে। 

মাহমুদ: কেমন আছেন নাবিল?

নাবিল: এইতো, ভালোই৷

মাহমুদ: নাবিল, আমরা জানি আপনি একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী। ডাক্তারি পড়ালেখার ভিতরেই 'Green Fighting movement' নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। এই আইডিয়া কিভাবে মাথায় এলো? 

নাবিল: পৃথিবীজুড়ে এই যে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আমি বহুদিন ভেবেছি৷ স্বল্প পরিসরে হলেও কিছু কি আমাদের দেশে করা যায় কিনা, আমি দেখতে চেয়েছি। এই তো সেদিন পত্রিকায় এলো, AQI ইনডেক্সে ঢাকা পৃথিবীর বিষাক্ততম নগরী। আমি অবাক হয়ে চিন্তা করি, পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত বাতাসে আমরা নিশ্বাস নিচ্ছি। আর কোনো হতভাগা নেই যে আমাদের চেয়ে বেশি বিষাক্ত বাতাস বুকে টেনে নিচ্ছে! বলুন তো, কি ভয়ানক একটা ব্যাপার। 

মাহমুদ: হ্যাঁ, সত্যিই তো!

নাবিল: তো, চিন্তা করলাম, দেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী জানেই না আসলে আমরা কি ভয়ানক একটা ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি৷ প্রথমত তাদেরকে এটা জানাতে হবে। একই সাথে তাদেরকে সুযোগ করে দিতে হবে তাদের জায়গা থেকে যেন ক্লাইমেট ক্রাইসিস মোকাবিলায় তারা এগিয়ে আসতে পারে। এমন একটা 'সবুজ সংস্কৃতি' তৈরির স্বপ্ন নিয়ে আমাদের পথচলার সূচনা। 

মাহমুদ: চমৎকার আইডিয়া৷ 

নাবিল: আমরা ভিশন হাতে নিলাম, দেশকে সবুজে ছেয়ে দেওয়ার। ক্লাইমেট ক্রাইসিস মোকাবিলায় দেশের সকল মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা বাসযোগ্য দেশ উপহার দেওয়ার।

মাহমুদ: কিন্তু সব মানুষকে কিভাবে ক্লাইমেট একটিভিস্ট বানানো সম্ভব? 

নাবিল: আসলে আমার কাছে মনে হয়েছে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং সংক্রান্ত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় আমাদের একটা কাজ করা খুব জরুরি, গাছ লাগানো। আমরা আমাদের প্রতিদিনের সংস্কৃতির ভিতরে তথা ডে টু ডে লাইফের ভিতরে গাছ লাগানোকে ঢুকিয়ে দিতে চাই। যেমন ধরুন, জন্মদিনে গাছ উপহার দেওয়া অর্থাৎ গ্রিন বার্থডে পালন। 'জন্মদিনে দেশ ছেয়ে যাক বৃক্ষে'—এই হ্যাশট্যাগ দিয়ে আমরা আমাদের সহপাঠীদের জন্মদিনগুলো পালন করি। 

মাহমুদ: আচ্ছা, 'গ্রিন বার্থডে'। খুব ভালো লাগলো শুনে। তো, এটার শুরুটা কবে ছিলো?

নাবিল: শুরুটা ২০১৯ সালের  নভেম্বরে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে, আমার ক্যাম্পাসেই। ওই বছরের ডিসেম্বরের চার তারিখে প্রথমবার ফ্রেন্ডদের জন্মদিনে গাছ দেওয়া শুরু করেছিলাম। আমরা মেডিকেলের ১৩ তম ব্যাচ। ১৩ ব্যাচের কিছু অসম্ভব উদ্যমী তরুন-তরুণীর পরিশ্রমের ফলাফল আজকের এই মুভমেন্ট। গাউসুল, শরিফ, লুবাবা, মুন,  সুইটি, মিম, আকশা, রিনি, কুইন, হান্নান, মিমি,জিম, সুবর্না, শাকিক, সাইদ, অর্জিতা, শুভ, শরিফুল রাকিব, রাকিব আরাফাতসহ আরো ক'জন এতোটা পরিশ্রম করেছে, ওদের ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করার নয়। সব মিলিয়ে আমাদের ক্যাম্পাসের তিনটা ব্যাচে এই গাছ উপহার দেওয়ার প্রাক্টিস চলছে। 

মাহমুদ: অন্য কোনো ক্যাম্পাসে কি এই চমৎকার সংস্কৃতিটুকু ছড়িয়ে দেওয়া যায় না?

নাবিল: ডিসেম্বরেই ঢাকা মেডিকেল কলেজে আমাদের সহপাঠীরা গাছ দেওয়া শুরু করে। পরে জানুয়ারিতে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল, ফরিদপুর মেডিকেল, জামালপুর মেডিকেল, কিশোরগঞ্জ মেডিকেলে গ্রিন বার্থডে পালন শুরু হয়।

মাহমুদ: একটা বিষয়, নাবিল। আন্দোলনে তো শুধুই মেডিকেলের প্রাধান্য দেখছি।

নাবিল: (হাসতে হাসতে) মেডিকেলে পড়ার কারণে বিভিন্ন মেডিকেলে আমাদের প্রত্যেকের অনেক ফ্রেন্ড আছে। মেডিকেলে রিচ করা আমাদের জন্য সহজ বলেই প্রথম মেডিকেলগুলোতে কাজ শুরু করেছি। তবে শুধু মেডিকেলেই না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শের-এ-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন জন্মদিনে গাছ দেওয়ার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে।

মাহমুদ: বাহ! বেশ ভালো। ভবিষ্যতে এই আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করার ইচ্ছে আছে কিনা?

নাবিল: আমরা চাই, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গ্রিন রিসেপশান এর সংস্কৃতি চালু করা। নতুন ব্যাচ আসলে তাদের গাছ দিয়ে বরণ করে নেওয়া। প্লান করছি, সামনের মাসেই গ্রিন রিসেপশান করার। আমাদের কো-অর্ডিনেটর ম্যাম, প্রিন্সিপাল স্যারের কাছ থেকে অনুমতিও পেয়েছি আমরা। আমরা চাই, র‍্যাগ ডেতেও গাছ লাগানোর সংস্কৃতি চালু করতে। বড় ভাইয়া আপুদের বলতে চাই—আপু, ভাইয়া, আপনারা তো ক্যাম্পাস থেকে চলে যাচ্ছেন, স্মৃতি হিসাবে অন্তত একটা গাছ লাগিয়ে রেখে যান।

মাহমুদ: আচ্ছা। এই যে গাছ দিচ্ছেন, এই গাছ লাগানোর যায়গা কি আসলেই আছে। যতদূর জানি, আপনাদের ক্যাম্পাস অনেক ছোট। 

নাবিল: হ্যা, ভালো বলেছেন। আমাদের ক্যাম্পাসে মাটিতে গাছ লাগানোর জায়গা নেই বললেই চলে৷ এই কারণেই আমরা টবের গাছ দিচ্ছি। জাস্ট ক্রিয়েটিং এন এক্সাম্পল৷ প্রাক্টিস তৈরি। আমাদের ক্যাম্পাসে জায়গা নেই, বাট যাদের আছে তারা বড় গাছ লাগাবে। এইতো।

মাহমুদ: এই উদ্যোগ কি পুরোপুরি ব্যক্তিগত অর্থায়নে নাকি কলেজ প্রশাসন থেকে সহায়তাও পাচ্ছেন?

নাবিল: আসলে আমাদের স্যাররা খুবই খুশি আমাদের এই কাজে। আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার ক্যাম্পাসে মাটিতে লাগানোর মতো সব গাছ দেবেন আমাদেরকে। ক্যাম্পাসে একেবারেই জায়গা নেই—বিষয়তো সেটা না। যেটুকু যায়গা আছে ওখানেই প্রায় ১০০ এর মতো গাছ লাগানোর পরিকল্পনা আমাদের।

এপ্রিল-মে মাসে গাছগুলো লাগাবো আমরা। আমরা এই যে গ্রিন ক্যাম্পাস নির্মাণ করতে যাচ্ছি, এতে আমরা 'গো গ্রিন' হ্যাশট্যাগ ইউজ করবো।

মাহমুদ: আপনি এই মুভমেন্টের মাধ্যমে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন দেখতে চান? অর্থাৎ চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠা কোন ছবির পিছনে আপনি ছুটছেন?

নাবিল: এমন কোন জন্মদিন পালিত হবে না, যেখানে গাছ লাগানো হবে না। এমন কোন শিক্ষার্থী থাকবে না, যে একটা গাছ না পেয়ে নতুন শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশ করবে। ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাওয়ার মূহুর্তে এক টুকরো সবুজ স্মৃতি সবাই রেখে যাবে। আমাদের ইচ্ছে, একটা প্রজন্ম দাড় করিয়ে দেওয়া, যাদের গাছের সাথে রইবে আত্মার সম্পর্ক।

মাহমুদ: স্মৃতি সবারই থাকে, আপনারা সেই জায়গায় চাইছেন 'সবুজ স্মৃতি' বুনে রাখতে। 

নাবিল: একদম তাই। আমাদের এই মুভমেন্টে অংশগ্রহণকারী সবাই একেকজন গ্রিন ফাইটার। প্রত্যেকেই এই মুভমেন্টের পতাকাবাহক। 

স্বপ্ন কি থেমে থাকে? স্বপ্ন এগিয়ে চলে বন্ধুর পথের সীমা ছাড়িয়ে কল্পনার সমান উচ্চতায়। দূরে, বহুদূরে। আগামীর বাংলাদেশের প্রতিজন মানুষ হবেন একেকজন 'গ্রিন ফাইটার' এই স্বপ্ন নাবিল এবং তার সহযোদ্ধাদের মত আমাদের সবার।

[নাবিল আহমদ বর্তমানে পড়াশোনা করছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শিবলী মাহমুদ।]

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স