১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৩:৩৫ পিএম

একটু সময় পেলেই আমি লিখতে থাকি: ডা. ফারহানা মোবিন

একটু সময় পেলেই আমি লিখতে থাকি: ডা. ফারহানা মোবিন

ডা. ফারহানা মোবিন, একজন তরুণ চিকিৎসক ও লেখক। পেশায় চিকিৎসক হলেও লেখালেখি করেন নিয়মিত। শৈশব থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় নিয়মিত যুক্ত আছেন তিনি। এছাড়া সামাজিক কাজ উপাস্থাপনাসহ নানা কাজে যুক্ত আছেন রাজধানীর সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজের সাবেক এই শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি পাবলিক হেলথে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে পড়াশুনা করছেন।

অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা, সমাজ সচেতনতামূলক লেখা, টিভি অনুষ্ঠান ও বহুবিধ সামাজিক কাজের জন্য তিনি এরই মধ্যে স্বাধীনতা সংসদ, আলোকিত নারী অ্যাওয়ার্ডসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এবারের বই মেলায় ডা. ফারহানা মোবিনের লেখা শিশুতোষ গল্পের বই ‘গোলাপি রং পেন্সিল’  এবং সামাজিক সমস্যা ও তার প্রতিকার বিষয়ক ‘আমিও মানুষ’ শিরোনামে দুইটি বই প্রকাশিত হয়েছে।

সম্প্রতি বই মেলায় মেডিভয়েস মুখোমুখি হয়েছিল এ চিকিৎসকের। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তার লেখক ও ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানভীর সিদ্দিকী

মেডিভয়েস: কেমন আছেন?

ডা. ফারহানা মোবিন: আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। অসংখ্য ধন্যবাদ মেডিভয়েসকে।

মেডিভয়েস: এই বইমেলায় আপনার কী কী বই এসেছে?

ডা. ফারহানা মোবিন: এইবারের অমর একুশে বই মেলায় আমার দুটি বই এসেছে। বিদ্যা প্রকাশনী থেকে সামাজিক সমস্যা ও তার প্রতিকার বিষয়ক  বই ‘‘আমিও মানুষ’’ এবং শিশুতোষ গল্পের বই ‘‘গোলাপি রঙ পেন্সিল’’ প্রকাশিত হয়েছে। আমার এ পর্যন্ত মোট বই প্রকাশিত হয়েছে ৬টা।

মেডিভয়েস: ‘‘আমিও মানুষ’’ এই বইটি নিয়ে কিছু বলুন।

ডা. ফারহানা মোবিন: আমিও  'মানুষ'  বইটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা। কিছু সামাজিক সমস্যার বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। কখনো প্রতিবেদন, কখনো নিবন্ধ আবার রুপক অর্থ দিয়েও কিছু লেখা লিখেছি। যৌতুকের জন্য সমাজের কিছু মুখোশধারী মানুষের ভয়ানক লালসাবোধ, বৃদ্ধাশ্রমের নেতিবাচক দিক, আমাদের দেশে চাইল্ড কেয়ার হোমের প্রয়োজনীয়তা, জীবিকার তাগিদে অফিসের চরিত্রহীন বসের সাথে কাজ করতে বাধ্য হওয়া, মাদকাসক্ত নারীদের সঠিকভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থাহীনতা, পিতা মাতার জন্য আমাদের করণীয়, কিশোর শ্রমিকের আহাজারি... এই ধরনের সমস্যাগুলোর করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।

যেসব পেশাতে নারীদের নাইট ডিউটি করতে হয় (যেমন- চিকিৎসক, সেবিকা, পাইলট, বিমানবালা), সেসব নারীদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়তে হয়। এই নেতিবাচক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সব নারী সফল হতে পারেন না। নারীরা যদি পুরুষের মতোই এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে বদলে যাবে পুরো সমাজ। এই জন্য দরকার সমাজের মানুষের সচেতনতাবোধ। দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। 

দেশের উন্নয়নের জন্য নারী পুরুষকে সমান ভাবে এগিয়ে যেতে হবে, আমি বিষয়টা পাঠককে উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি মানুষ যেন সামাজিক সমস্যাতে হতাশ না হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে, সেই জন্য কিছু সফল ও হৃদয়বান মানুষের জীবনী ছোট করে লিখেছি। এছাড়াও যারা ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা, দুঃখ-কষ্ট আর অভাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সফল হয়েছেন (যেমন: পৃথিবী বিখ্যাত লেখক জেকে রাওলিং, টাঙ্গাইলের কুমুদিনী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা রণদা প্রসাদ সাহা), এই সফল মানুষগুলোর উদাহরণের মাধ্যমে আমি হতাশ ও পিছিয়ে পড়া মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালতে চেয়েছি। আবার যুব সমাজকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা মূলক লেখা লিখেছি। 

আমি মনে করি, নিজেকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজন সীমাহীন অনুপ্রেরণা, সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য পাহাড়সম মানসিক শক্তি, বাঁধভাঙ্গা স্বপ্ন, মানবপ্রেম আর দেশপ্রেম। আমি কিছু প্রতিবেদনে এই বিষয়গুলোর অবতারণা করেছি। এক কথায় আমার এই বইটি সামাজিক সমস্যা ও তার জন্য সচেতনতা বোধের বাস্তব প্রতিফলন। খুব সাধারণ ও সহজ ভাষায় লিখেছি। হতাশার সাগরে ডুবে থাকা কেউ এই বইটি পড়লে খুঁজে পাবে অনুপ্রেরণার আলো, পরিশ্রম করার মানসিক শক্তি।

মেডিভয়েস: কবে থেকে আপনার লেখালেখি শুরু?

ডা. ফারহানা মোবিন: আমি ক্লাস ফোর থেকে লিখি। ক্লাস ফাইভ থেকে আমার লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হতে থাকে। লেখালেখিটা আমার একধরনের নেশা। ছোটবেলা থেকেই আমার লেখালেখিতে যে মানুষটা খুব বেশি সহযোগিতা করেছেন তিনি হলেন আমার মা, বাবা আমাকে এতোটা সময় দেয়ার সুযোগ পেতেন না। আর বিয়ে হওয়ার পরে শ্বশুড়বাড়ি থেকেও অনেক উৎসাহ পাই।

মেডিভয়েস: আপনি একজন স্বনামধন্য লেখক এবং একই সাথে একজন চিকিৎসক। দুটো বিষয় একই সাথে কিভাবে সমন্বয় করেন?

ডা. ফারহানা মোবিন: একজন ডাক্তার হিসাবে প্রতিনিয়ত নানা বেশিরভাগ সময়েই ব্যস্ততায় থাকতে হয়। তুবও লেখালেখিটা যেহেতু আমার কাছে একটা নেশা, সেহেতু একটু সময় পেলেই আমি লিখতে থাকি।

আমার একজন চিকিৎসক সহকর্মী যখন কাজের অবসরে ফেসবুকিং করছে, ইউটিউব দেখছে, তখন আমি কাগজকলম নিয়েই ব্যস্ত থাকি, দুই লাইন লেখার চেষ্টা করি।

এছাড়া জ্যামের শহরে এদিক-ওদিক যাতায়াতের সময়ে গাড়িতে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়। এসময়টাও আমি শুধু শুধু বসে না থেকে লেখি। বাসায় সবাই যখন বিশ্রাম নিতে থাকে, ঘুমায় তখন আমি লিখি। এভাবেই লেখালেখি চলছে।

মেডিভয়েস: আপনার জন্ম, শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।

ডা. ফারহানা মোবিন: আমার জন্ম ২৭ জুন রাজশাহী শহরে। আমি ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। মা ফেরদৌসী বেগম এবং পিতা মরহুম আবদুল মোবিন। সরকারি পিএন গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেছি। পরে ঢাকার শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল থেকে এমবিবিএস পাশ করেছি। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে এখনো লেখাপড়া করছি আর পাবলিক হেলথে গবেষণারত আছি। এছাড়াও বারডেম হাসপাতাল থেকে ডায়াবেটিস এবং হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল থেকে হৃদ রোগের উপর সার্টিফিকেট কোর্স করছি। এগুলোর পাশাপাশি আমি সাত বছর ঢাকার পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে স্ত্রী ও প্রসূতি বিভাগের মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলাম।

মেডিভয়েস: আপনি কোন বিষয়ে স্পেশালিস্ট হতে চান?

ডা. ফারহানা মোবিন: আমার পড়াশোনা এখনও শেষ হয়নি। আমি গাইনী স্পেশালিস্ট হবো।

মেডিভয়েস: লেখালেখি করতে গিয়ে কখনো কোন সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিন হয়েছেন কিনা? 

ডা. ফারহানা মোবিন: আমি আসলে লেখালেখির প্রতি খুবই নিবেদিত। লেখালেখি করতে গিয়ে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়। তবে ফ্যামিলি থেকে আমি অনেক সহযোগিতা পাই, এটা আমার জন্য বড় একটা সাপোর্ট। আর প্রতিবন্ধকতা বলতে, মেয়েদেরকে তো আসলে একই সাথে জব করতে হয়, ফ্যামিলি মেনটেইন করতে হয়, বাচ্চাকে দেখতে হয়। আবার আমি যেহেতু ডাক্তার, আমাকে আমার হায়ার-এডুকেশনের জন্য একটু পড়াশোনা করতে হয়। সবমিলিয়ে আমাকে আসলে অনেক কষ্ট করে সময় বের করতে হয়। লেখালেখি করতে অনেক ভালো লাগে, তাই এতো কষ্ট করেও লিখি।

মেডিভয়েস: লেখালেখি ও চিকিৎসা পেশা নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

ডা. ফারহানা মোবিন: চিকিৎসায় আমার আইডল হচ্ছেন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ স্যার, অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল স্যার, আনোয়ারা সৈয়দ হক মেডাম। ওনারা একইসাথে সফল চিকিৎসক এবং লেখক। আমি ওনাদের মতো হবার স্বপ্ন দেখি আর পাশাপাশি সামাজিক কাজ যতটুকু পারি করার চেষ্টা করি -যতোদিন আমার নিশ্বাসটা চলবে, ততোদিন আমি এই কাজগুলো চালিয়ে যাবো।

লেখালেখির বাইরে আমি আমি একজন ব্যতিক্রমধর্মী চিকিৎসক হবার স্বপ্ন দেখি। অর্থাৎ আমি একজন মানবিক চিকিৎসক হতে চাই। যেমন- প্রফেসর ডা. ইব্রাহীম স্যার, প্রফেসর ডা. এমআর খান স্যার -তাদের মতো আমি একজন মানবিক এবং বড় মাপের চিকিৎসক হবার স্বপ্ন দেখি।

মেডিভয়েস: ছোটবেলায় কী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন?

ডা. ফারহানা মোবিন: আমি ছোট্টবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম যে আমি ডাক্তার হবো। আমার খুব ইচ্ছা ছিলো যে, আমি এপ্রোন পড়বো, নামের আগে ডাক্তার যুক্ত হবে। আলহামদুলিল্লাহ, সে স্বপ্ন আমার সফল হয়েছে। এখন আমার স্বপ্ন হলো একজন বড় মাপের চিকিৎসক হবো। জানি না সেটা পাড়বো কিনা, সেটা হয়তো সময়ই বলে দিবে। 

মেডিভয়েস: তরুণ প্রজন্মের প্রতি আপনার কোন পরামর্শ কী?

ডা. ফারহানা মোবিন: তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার পরামর্শ হলো স্বপ্ন দেখতে হবে। খুব বেশি স্বপ্ন দেখতে হবে। স্বপ্নের গন্ডি ছোট হয়ে গেলে কাজের পরিধিও ছোট হয়ে যাবে। আমাদের চাওয়াটা যদি অনেক বেশি থাকে, তখন আমরা সেইভাবে পরিশ্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে পারবো। এইজন্য স্বপ্ন দেখতে হবে গগনচুম্বী। গগনচুম্বী স্বপ্ন হলে হয়তো বটগাছ পর্যন্ত উঠতে পারবো। কিন্তু আমার স্বপ্ন যদি দুর্বাঘাস পরিমাণ হয়, তাহলে তো হবে না। এ জন্য অনেক অনেক স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই স্বপ্ন অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

আরও পড়ুন

► গ্রন্থমেলায় চিকিৎসক ফারহানা মোবিনের দুইটি বই

► আলোকিত চিকিৎসক ডা. তাজুল ইসলামের আলো ছড়ানোর গল্প

► ডা. নাবিল মুহতাসিমের থ্রিলারধর্মী নতুন বই ‘জীয়নবিদ্যা’

► চিকিৎসকদের যৌথ প্রয়াস ‘গল্পগুলো এপ্রোনের’ বই মেলায় 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স