১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৭:২৭ পিএম

বাংলাদেশে ক্যান্সারজয়ী শতাধিক শিশুর চোখে নতুন স্বপ্ন

বাংলাদেশে ক্যান্সারজয়ী শতাধিক শিশুর চোখে নতুন স্বপ্ন

বেলাল হোসেন রাজু: তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তৌকিদ আহমেদ প্রাপ্য। দীর্ঘ পাঁচ বছর ভোগার পর ক্যান্সার থেকে এখন সে সুস্থ। তার চোখেমুখে হাসির ঝলক। স্বপ্ন দেখে বহুদূর যাবার। অভিনেতা হতে আগ্রহী এ শিশুটির দৃঢ় প্রত্যাশা বড় হয়ে সে মানুষের সেবা করবে। ক্যান্সার থেকে সারিয়ে তোলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রাপ্য জানিয়েছে তাকে সুস্থ করতে চিকিৎসকরা অনেক কষ্ট করেছেন। 

তৌকিদের মা জানান, ‘যখন বাবুর ক্যান্সার নিশ্চিত হয়। ওই সময় মনের অবস্থা যে কেমন ছিল, তা বুঝাতে পারবো না। ভীষণ মন খারাপ হলেও ভেঙে পড়িনি। কোথায় চিকিৎসা হবে। খরচই বা কিভাবে ম্যানেজ হবে। এক রকম চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ি’। 

দুই বছর ব্লাড ক্যান্সারে ভোগা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মম বণিক এখন পুরোপুরি সুস্থ। মম বলেন, ‘এখানকার ডাক্তারদের আন্তরিকতায় আমি সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পেরেছি। এই হাসপাতাল ও চিকিৎসকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’ 

ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি থেকে প্রিয় সন্তানের সুস্থতায় উচ্ছ্বসিত মমের মা জানান, ‘ওই সময় মেয়েটা এমন অসুস্থ হয়েছে, বাঁচবে বলে মনে হয়নি। পরে এই হাসপাতালে নিয়ে আসার পর ভরসা পাই। চিকিৎসকদের আন্তরিকতায় আমার মেয়ে আজ সুস্থ হয়ে উঠেছে। আমি হাসপাতাল কৃর্তপক্ষের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ। 

১৫ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অডিটোরিয়ামে ক্যান্সারজয়ী শিশুদের নিয়ে আর্ট কম্পিটিশন ও আলোচনা সভার মাধ্যমে পালিত হয় বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ক্যান্সারজয়ী তৌকিদ, মম ও তাদের মায়েরা এ রকম অনুভূতি প্রকাশ করেন। 

বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস উদযাপন ও শিশু ক্যান্সার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে বিএসএমএমইউর হেমাটোলজি এবং অনকোলজি বিভাগ ও ওয়ার্ল্ড চাইল্ড ক্যান্সার বিষয়ক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। 

জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে ক্যান্সার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা শিশুর অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. শাহানা আক্তার রহমান উচ্চারণ করেন বিখ্যাত উক্তি ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভূ আশীবিষে, দংশেনি যারে’। 

তিনি বলেন, ‘ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থা আমরা পুরোটা বুঝি না। আমরা চেষ্টা করি মাত্র। এই মানুষগুলোর যুদ্ধ যে কত বড়, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না। ক্যান্সারের এই যুদ্ধে আপনারা বিজয়ী। আজকের এই আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বার্তা পৌঁছে যাবে অনেক বাবা-মায়ের কাছে। তারা সাহস পাবে।’

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন বিএসএমএমইউর শিশু অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. চৌধুরী ইয়াকুব জামাল। তিনি বলেন, ‘আজ বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস। এটি ছোঁয়াচে কোনও রোগ নয়। বিএসএমএমইউতে চিকিৎসা নিয়ে আজকে অনকেগুলো শিশু ক্যান্সার থেকে মুক্তি পেয়েছে। আমাদের জন্য আজকের দিনটি একটি মহৎ দিন। দিবসটির তাৎপর্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে শিশু ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা। সবাইকে জানানো যে, শিশু ক্যান্সার নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। নিয়মিত চিকিৎসা নিলে এ থেকে মুক্তি সম্ভব, যার প্রমাণ আজকের এই শিশুরা।’

বক্তব্য রাখেন, শিশু নিউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান, শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল করিম, অধ্যাপক আহমেদ মুরতুজা চৌধুরী, অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক এটিএম আতিকুর রহমান প্রমুখ।

দিবসটি উপলক্ষে শনিবার সকালে বিএসএমএমইউ হাসপাতাল চত্বরে র‌্যালি বের করা হয়। অনুষ্ঠানে ৭০ জন ক্যান্সারজয়ী শিশুকে নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া গান, গজল, হামদ-নাত ও নৃত্য পরিবেশন করে শিশুরা। পরে ক্যান্সারজয়ী শিশুদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

বিএসএমএমইউর হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যান্সার বিভাগ স্থাপিত হয়। এ পর্যন্ত অনেক ক্যান্সার রোগী চিকিৎসা নিয়ে আরোগ্য লাভ করেছেন। এছাড়া ২০১৮ সালে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৮ হাজার এবং আন্তঃবিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৯০ জন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী।

প্রসঙ্গত, ওয়ার্ল্ড চাইল্ড ক্যান্সারের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর ২ লাখ শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। আর এর মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই আক্রান্ত হয় শতকরা ৮০ ভাগ। এখানে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের বেঁচে থাকার হার মাত্র ৫ ভাগ। অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলোয় এই হার শতকরা ৮০ ভাগ।

সংস্থাটির তথ্য মতে, বর্তমানে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু রয়েছে। ২০০৫ সালেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর হার ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর সচেতন না হলে ২০৩০ সালে এ হার দাঁড়াবে ১৩ ভাগে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি