১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৩:৩৭ পিএম

সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমুজ্জ্বল তিন চিকিৎসক তারকার গল্প

সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমুজ্জ্বল তিন চিকিৎসক তারকার গল্প
(বাঁ থেকে) অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী, ডা. আব্দুন নূর তুষার, অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ

মো. মনির উদ্দিন: ছাত্রজীবনে প্রতিটি ক্লাসে রেখেছেন মেধার স্বাক্ষর। আর এ পথ ধরেই স্বাস্থ্যসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার আশৈশব লালিত স্বপ্ন থেকে ভর্তি হন এমবিবিএস কোর্সে। অন্যান্য অনেক পেশার চেয়ে বহুগুণ বেশি চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজেকে তৈরি করেন একজন চিকিৎসক হিসেবে। 

জাতির এ মেধাবী সন্তানদের অনেকেই নিজ পেশার পাশাপাশি আলো ছড়াচ্ছেন সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও। অনবদ্য সৃষ্টিশীলতায় সমুজ্জ্বল এসব চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিভয়েসের ধারাবাহিক প্রতিবেদন ‘চিকিৎসক হয়েও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমুজ্জ্বল তারা’।

প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে আজ তুলে ধরা হলো এর প্রথম পর্ব। ক্রমান্বয়ে তুলে ধরা হবে সাহিত্য-সংস্কৃতির রসে সিক্ত অন্যান্য চিকিৎসকদের কর্মময় জীবন। আজ তুলে ধরা হলো তিন তারকা চিকিৎসকের গল্প।    

অধ্যাপক অরূপরতন চৌধুরী একাধারে একজন চিকিৎসক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও মাদকবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। 

পেশার বাইরে সৃষ্টিশীল এসব কাজে রয়েছে তাঁর সরব পদচারণা। তবে স্বাস্থ্যসেবার মতো মহান পেশা নিয়েই গর্ববোধ করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক।

অধ্যাপক অরূপরতন চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘চিকিৎসক হওয়ার মতো সফলতা ও সৌভাগ্য কোনো পেশাতে নেই। কারণ একটি মানুষ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে অসহ্য বেদনা নিয়ে যখন চিকিৎসকের কাছে আসে, তখন যদি ছোঁয়াতে তার কষ্টটা মুহূর্তের মধ্যে লাঘব করা যায়, এবং তাঁর হাসিটা দেখা যায়, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর সাফল্য আর কোনো পেশায় আছে বলে মনে হয় না।

তিনি বলেন, এটা মহৎ পেশা, এক সময় বলা হতো, ডক্টরস আর নেক্সট টু গড। কারণ সৃষ্টিকর্তা অবশ্য আমাদের অফুরন্ত ভাণ্ডার দিয়েছেন। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আর শ্রেষ্ঠ জীব আরেকজন মানুষকে সুস্থ করে তুলবে। ভূপেন হাজারিকার ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটা আসলে অনন্য। মানুষ মানুষের জন্য কিছুটা হলেও দরদ সহানুভূতি দেখাতে পারে—চিকিৎসক হিসেবে এই সুযোগটাই গুরুত্বপূর্ণ। ডা. ইব্রাহিম বলতেন, সেবার সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আর আমি যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। ’

সংগীত চর্চার ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সঙ্গীত জগৎ শুরু হয় আমার বাসাতেই। আমার মা উনি নিজে গান করতেন। হারমোনিয়াম নিয়ে আমাদের সকলকে নিয়ে বসতেন, আমরা গান করতাম। এভাবে গানে মায়ের কাছে হাতেখড়ি। তার পরে সিলেটে সুরসাগর প্রাণেশ দাস, ঢাকায় বাফাতে এসে মরহুম আতিকুল ইসলাম এবং স্বর্গীয় শ্রী অজিত রায়ের কাছে আমি গান শিখেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে ভানু কীর্ত অরবিন্দ বিশ্বাসের কাছে গান শিখেছি। সব মিলিয়ে আমি রবীন্দ্র সংগীতে কোনো কোর্স সম্পন্ন না করলেও অনেকের সাহচর্যে গিয়ে আমি যতটুকু শিখেছি এটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট।’

একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা চিকিৎসক ডা. আব্দুন নূর তুষারের কণ্ঠে।  

একাধারে একজন উপস্থাপক, বিতার্কিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এ চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘শুরুতেই আমি একজন ডাক্তার, নিয়মিত রোগী দেখি। তবে আমি কখনই সাধারণ মানুষের থেকে ভিজিট নেইনি। পেশাজনিত কারণে বেতন পেয়েছি, কিন্তু মানুষের থেকে ভিজিট নেয়াটা কেন জানি হয়ে উঠেনি। যে কারণে রোগীদের সাথে আমার একটু অন্যরকম সম্পর্ক, অন্যসব ডাক্তারের মতো না। কারণ কোন রোগীই আমাকে এসে বলতে পারে না ডাক্তারকে পয়সা দিয়েছি। আমি যাদেরকেই দেখেছি, সকলকেই পয়সা ছাড়াই দেখেছি। যে কারণে আমার কিছু রোগী আছে, যারা আমার কাছে ছাড়া অন্য কোথাও পরামর্শ নিতে চান না। এমনকি প্রফেসর সাহেবদেরকে দেখিয়ে এসেও আমাকে দিয়ে প্রেসক্রিপশন পরীক্ষা করায়। এই ব্যপারটা আমার কাছে অন্যরকম লাগে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ব্যবসা করেছি, আমি বহুদিন ধরে টেলিভিশনের জন্য অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছি। সেই সময়টা হলো ৩২ বছর প্রায়। আমি উপস্থাপনা করেছি, বিতর্ক করেছি। সবমিলিয়ে এখন আমি নিজেকে একজন গণমাধ্যম কর্মী ভাবি। আমি মনে করি যে, আমি মানুষের জন্য কাজ করেছি।’

এ মিডিয়া উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমি নানা ধরনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন করেছি। তবে অর্থ নিয়ে বা বেতন নিয়ে কোন সংগঠনে যুক্ত হইনি। আমি বিতর্কের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছি। বাংলাদেশ হাইপারটেনশানের একটানা ২০ বছর সেক্রেটারি জেনারেল ছিলাম আমি। সেখানে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। খানিকটা সফলও হয়েছি। আমি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে একদম ছোটবেলা থেকে যাই এবং আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে কাজ করি। তারপর রোটারি একটা সংগঠন করেছি। এছাড়াও একসময় ছাত্র রাজনীতি করেছি এবং সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছি আমি। আমি সেই সময়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করেছি, ছাত্রদের ভোটে জিতেছি এবং হেরেছিও।’

তবে সকল পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন-নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ। 

তিনি বলেন, আসলে আমি সব পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমার বাবা-মা, আমার স্কুল-কলেজ, তাদের ঘিরে আমি বড় হয়েছি। সব জায়গাতেই বিষয়গুলোর চর্চা ছিল। রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে প্রতি বৃহস্পতিবার ক্লাস টিচার পিরিয়ড (সিটিপি) নামে এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটি হতো। এখানে শিক্ষার্থীদের কিছু না কিছু পরিবেশন করতে হতো। কবিতা, আবৃত্তি, গান, শাস্ত্রীয় সংগীত, বিতর্ক, অভিনয়, মুখাভিনয়—এগুলো এখানে পরিবেশন করতে হতো। এটা সবার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। আর আমার আব্বার একটি প্রবণতা ছিল, যখন কোনো কিছু লিখতে হতো, সেটা ইংরেজি কিংবা বাংলা। আমার আব্বা কখনোই নিজে লিখতেন না। তিনি আমাদের দিয়ে লেখাতেন। পরে তিনি এটাকে পরিবর্ধন, পরিামার্জন করতেন। অর্থাৎ তিনি আমার সৃজনশীলতা জাগিয়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আমার লেখক সত্তাটা বিকশিত হয়েছে। আপনারা যা উল্লেখ করেছেন এসবই সংস্কৃতিরই একেকটি অনুসঙ্গ। একটিকে যদি বলি পেশা, আরেকটি বলবো নেশা বা শখের জায়গা। আমার কাছে দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।’

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির কাজে যুক্ত রাখার কৌশলও তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্য খাতের এসব প্রাণভোমরা। 

অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, ‘আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন—আপনি ডাক্তারি করেন, গান করেন, সামাজিক কাজ করেন, লেখালেখিও করেন, চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন এত কিছু কিভাবে সম্ভব? আমি বলি, সারা দিনে মানুষের ২৪ ঘণ্টা সময়।  আপনি কিভাবে ২৪ ঘণ্টা সময় কাজে লাগাবেন, এটা আপনাকে ডায়েরিবদ্ধ করতে হবে। কোনো সময় অপচয় করবেন না। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর থেকে আমার জীবনকে এভাবে সাজিয়েছি। আমি যখন রেস্টরুমে যাই, তখনও ম্যাগাজিনটা হাতে নিই, পত্রিকা পড়ি। ওখানে আমার লেখালেখির ব্যবস্থা আছে। কিছ কিছু কাজ সেখানেই করি। চেম্বারের ফাঁকে ফাঁকে কাজ করি। ছুটির দিনগুলোতে আমি গান-বাজনা করি। আমি অলসতার মধ্যে সময় কাটাই না। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বাজে আড্ডায় সময় কাটাই না। প্রতিটি মুহূর্ত সাংস্কৃতিক, চিকিৎসাসহ সব জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি।’

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ বলেন, “সমন্বয় করতে হয়। আমি মনে করি, আমার প্রতি এটি মহান রাব্বুল আলামীন সৃষ্টিকর্তার একটি বিশেষ অনুগ্রহ যে তিনি আমাকে এ কাজগুলো করার সামর্থ দিচ্ছেন। পবিত্র কুরআন শরীফে আছে, ‘আল্লাহ পাক মানুষের সাধ্যাতীত কোনো দায়িত্ব অর্পণ করেন না’। কাজেই আমাকেও তিনি সেই দায়িত্বগুলো দিয়েছেন, যেগুলো আমার সাধ্যের ভেতরে। এজন্য প্রধানত যেটা প্রয়োজন—আমার বাবা আমাকে ছোটবেলা থেকে বলেছেন। তাহলো: নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতা। এ দুটি বিষয় যে কোনো মানুষের জন্যই অনুসরণীয়। এগুলো মেনে চলতে পারলে আপনারা যে বৈচিত্রময় কাজের কথা বলছেন, সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন কঠিন নয়। বড় কথা হলো—যেই কাজটি আপনি করছেন, এর প্রতি যদি সত্যিকারের ভালোবাসা থাকে তাহলে সাধন করা দুরূহ নয়। আর এগুলো অনুসরণের জন্যই আমার পক্ষে এটি সম্ভব হচ্ছে।”

ডা. আব্দুন নূর তুষার বলেন, ‘আমার জীবন আসলে বহু কাজের জীবন। মানুষ যদিও বলে আমাকে শুধু একটাই কাজ করতে হবে, একটা কিছু নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। তবে আমার সব সময় মনে হয়েছে, শুধু একটা কাজ করতে গেলে হয়তো সে কাজের জন্য বিখ্যাত হওয়া যায়। কিন্তু জীবন কী আমাদের শুধু একটা কাজের জন্যই জন্ম দিয়েছে? কিংবা শুধু এ করকম মানুষ হওয়ার জন্যই বলেছে? জীবন আসলে আমাদেরকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। আমরা মানুষেরা আমাদের প্রয়োজনে আমাদের কাজের ক্ষেত্রকে সীমিত করে সেখানে বড় হওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার এখনও মনে হয় মানুষের উচিত যে, একটা পাখির মতো জীবন বেছে নেওয়া, যেখানে সে যে কাজই করুক না কেন তা আনন্দ, সততা ও নিষ্ঠার সাথে করবে। যে কাজেই করুক না কেন, সেটা ভালো করে করার চেষ্টা করবে।’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
স্বাধীনতা পদক ২০১৭ প্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী
বাংলাদেশের গাইনী এবং অবসের জীবন্ত কিংবদন্তী

স্বাধীনতা পদক ২০১৭ প্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী