১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০২:৩৪ পিএম
বিশেষ সাক্ষাৎকার

নিপসমের গবেষণাকর্ম আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে

নিপসমের গবেষণাকর্ম আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে
অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) পরিচালক অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ। ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক জীবন কোষ’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ লিখে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণোৎসর্গকারী স্বল্প পরিচিত চিকিৎসকদের নিয়ে এসেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতির সবুজাভ আঙিনায় করছেন সদর্প বিচরণ। নতুন নতুন সৃষ্টিতে ভরে তুলছেন তাঁর সোনার তরী। 

সম্প্রতি মেডিভয়েসের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে দেশের জনস্বাস্থ্যের নানা দিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এ বিশেষজ্ঞ। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিবেচনায় সাক্ষাৎকারটি হুবহু পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. মনির উদ্দিন। 

মেডিভয়েস: আপনার শৈশব, কৈশোর ও শিক্ষা জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন। 

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: জামালপুর শহরের আমলাপাড়ায় ১৯৬৮ সালে নানা বাড়ীতে আমার জন্ম। তবে আমার শৈশব-কৈশোর-যৌবন কেটেছে ঢাকা শহরে। আমি রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করেছি। ওখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। পরে জাপানের নাগুয়া ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছি। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। রেসিডেন্সিয়ালে পড়াশোনার সময় শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশে বেশ দীর্ঘ ছিল। ওই সময় গ্রামের বাড়িতে চলে যেতাম।

মেডিভয়েস: আপনার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বলুন।  

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: আমার স্ত্রী রুমান কাইয়ুম। সে গৃহিনী। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হোম ইকোনমিক্সে মাস্টার্স করেছে। আমার দুইজন কন্যা সন্তান রয়েছে। শহীদ বীরোত্তম আনোয়ার গার্ল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করছে। বড় মেয়ে এ বছর ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে আছে। ছোটজন ক্লাস ফাইভে উঠলো। বাবা মুহাম্মদ শফীউল্যাহ সরকারি চাকরি করতেন। তিনি প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান সংস্থায় ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালে বাবা মারা যান। আমার মা খোরশেদা পাহলোয়ান শিক্ষয়ীত্রি ছিলেন। তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কিশলয় উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ২৫ বছরেরও বেশি সময় শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে অবসরে আছেন। আমরা এক সঙ্গে আছি। 

মেডিভয়েস: আপনার কর্মজীবন সম্পর্কে বলুন।  

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নশিপ করার পর ঢাকা সিটি করপোরেশনের একটি হাসপাতালে কাজ করি। রাজধানীর নয়াবাজারে তাদের অধীনে একটি শ্রমজীবী হাসপাতাল ছিল। সেখানে মেডিকেল অফিসার হিসেবে আমি দুই বছর কাজ করি। পরে আমি ১৭তম বিসিএসে কোয়ালিফাই করি। এরপর নবাবগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাভার থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, মিরপুরে ইউনানী এবং আয়ুর্বেদিক কলেজ, জাতীয় বাতজ্বর ইনস্টিটিউট এবং কিছু দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছি। পরে দায়িত্ব পালন করেছি ঢাকা মেডিকেল কলেজ-টুর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে। 

মেডিভয়েস: সম্প্রতি আপনি অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন, এ ব্যাপারে আপনার অনুভূতি জানতে চাই। 

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: অসাধারণ সুখকর অনুভূতি। কারণ অধ্যাপক হওয়া শিক্ষকতা জীবনের সর্বোচ্চ ধাপ, স্বীকৃতি। সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক—এসব ধাপ অতিক্রম করে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়া যে কোনো ডিসিপ্লিনের শিক্ষকের জীবনে পরম প্রাপ্তির। পাশাপাশি এটা গৌরবেরও। 

মেডিভয়েস: ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক জীবন কোষ’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ লিখে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণোৎসর্গকারী স্বল্প পরিচিত চিকিৎসকদের পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছেন। এমন অনুসন্ধানীমূলক বই রচনায় উৎসাহ পেয়েছেন কোথা থেকে?

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সঙ্গে শাহাদাতবরণকারী পরিবারের সদস্যদের। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে যেসব শহীদ আত্মহুতি দিয়েছেন এবং দুই লক্ষ্য মা-বোন যারা সম্ভ্রম হারিয়েছেন, তাদেরকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি। এই সূত্র ধরে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক জীবন কোষ’ বিজয়ের মাসে ২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর এটির মোড়ক উন্মোচন হয়। দিনটিও তাৎপর্যপূর্ণ, এ দিনে বেগম রোকেয়া ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই বইটি লেখার বিবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধানত আমি একজন চিকিৎসক, তো চিকিৎসক হিসেবে আমার এক ধরনের আনুকূল্য ছিল। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক যারা, তাদের ব্যাপারে আমার জানার আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে আমি যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে প্রথম যাই, সেখানে নিচতলায় একটি মোডে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চারজন মেডিকেল ছাত্রের একটি তালিকা ছিল। তখন শ্রদ্ধার পাশাপাশি তাদের ব্যাপারে আমার জানার আগ্রহ হয়।

খোঁজ-খবর নিয়ে দেখি, তাদের ব্যাপারে জানার সুযোগটা খুবই সীমিত। অফিসেও কেউ বিস্তারিত কিছু বলতে পারছেন না। এরপরে যখন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে যাতায়াত শুরু হয়, সেখানেও দেখলাম মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসকদের একটা লম্বা তালিকা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ব্যাপারেও আমাদের জানার আগ্রহ হয়। আমি অনুভব করি, এখানে তথ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে। বুদ্ধিজীবী দিবস আসলে হাতেগোনা কয়েকজন চিকিৎসককেই আমরা স্মরণ করি। ডা. ফজলে রাব্বি, ডা. আলীম চৌধুরী—তাদেরকে অবশ্য স্মরণে রাখতে হবে। তারা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, পেশাজীবী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন, একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। এ সুবাদে তাদের আলোচনাই গণমাধ্যমে বারবার আসে এবং সাধারণ মানুষ তাদের সম্পর্কে জানে।

কিন্তু বিএমএ’র তালিকায় যাদের নাম রয়েছে—আমি বেদনা ও বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, তাদের সম্বন্ধে বিস্তারিত জানার সুযোগ নাই। এটা আমার ভেতরে এক ধরনের ক্ষুধা তৈরি করলো। …এই কাজটা তো সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন, তাদের মহান আত্মত্যাগ জাতির সামনে সেটি তুলে ধরা প্রয়োজন। তারা কোন প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ জীবন বিসর্জন দিলেন। এই আগ্রহ থেকেই প্রধানত এই কাজে ব্রতী হওয়া। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা থেকে আমার ভেতরে সঞ্চারিত হয়েছে। সেভাবেই আমি গড়ে উঠেছি। মুক্তিযুদ্ধ মনস্ক একটি পরিবার এবং স্কুলে সে ধরনের একটি আবহ ছিল। পরবর্তীতে যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছি, সেটাও ছিল মুক্তিযুদ্ধপন্থী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালি জাতির ইতিহাস। সেই সংগঠনে সক্রিয় থেকে আমি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছি। কাজেই সামগ্রিকভাবে আমার মন-মানসিকতায় মুক্তিযুদ্ধটা প্রাধান্য বিস্তার করেছে। সুতরাং এসব চিন্তা থেকেই ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক জীবন কোষ’ বইটি লেখা।

মেডিভয়েস: মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধাদের নামে তেমন কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম চোখে পড়ে না। বিষয়টি কিভাবে দেখেন? 

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: আমি বিষয়টিকে দেখি পরিতাপের সঙ্গে, দুঃখবোধের সঙ্গে। বৃহৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসকদের নামে এখনো পর্যন্ত হয়নি!২/১টি ক্ষেত্রে রয়েছে, যেমন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. চৌধুরী হল (ছাত্রী নিবাস) ও ডা. ফজলে রাব্বি হল (ছাত্রাবাস) রয়েছে। আরও ২/১টি জায়গায় রয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে জীবন দেওয়া আরও অনেক শহীদ চিকিৎসক আছেন এবং তারা দেশজুড়ে আছেন, সারাদেশে মেডিকেল কলেজও রয়েছে। সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৬টি, বেসরকারি মেডিকেল কলেজও রয়েছে অনেক। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেখানে অবস্থান করছে সেখানে খুঁজলে একজন শহীদ চিকিৎসক পাওয়া যাবে। কাজেই তাদের নামে এটার নামকরণ করাটা অত্যন্ত যৌক্তিক। জাতি সেটাই প্রত্যাশা করে। মুজিব বর্ষকে সামনে রেখে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নিজস্ব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় আমি প্রস্তাব করেছি, স্বাচিপের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আবেদন করা হোক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করা হোক—শহীদ মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসকদের নামে বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমূহের নামকরণের জন্য। এতে অন্যান্য সভ্যগণও সাড়া দিয়েছেন। আমরা আশা করি, একটি ইতিবাচক ফলাফল দেখতে পাবো।

মেডিভয়েস: মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক আর কোনো উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আছেন কিনা বা এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?  

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক জীবন কোষ’ বইটি বিশাল ক্যানভাসে করার চেষ্টা করেছি। বইটি নিয়ে প্রায় সাত বছর ধরে কাজ করেছি। এই কাজ করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সঙ্গে আমার একটি নৈকট্য হয়েছে। তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়ার চেষ্টা করেছি। তাদের পরিবারের নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। বইয়ে যেসব চিকিৎসকের নাম রয়েছে তাদের মধ্যে এজন আয়েশা বিধরা। এছাড়া বাকি সবাই পুরুষ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষই হচ্ছে প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার অনুপস্থিতিতে একটি পরিবার কী ধরনের আর্থিক-সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। বইটির কাজের সুবাদে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে আমি খেয়াল করেছি, তারা নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। এসব পরিবারের জন্য সংগঠিত উপায়ে কিছু করা যায় কিনা, সেটি নিয়ে আমার চেষ্টা আছে। 

আরেকটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চিকিৎসকরা সক্রিয়ভাবে শরিক হয়েছে। যোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন, বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন, স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করেছেন, সেসব নিয়ে একটি বই লেখার কাজ শুরু করেছিলাম। তবে নানা ব্যস্ততায় সেদিকে খুব বেশি দূর এগুতে পারিনি। এই কেন্দ্রিক আরেকটি বইয়ের কাজ অনেকখানি এগিয়েছে, এটি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সমৃক্ত না হলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক নৌকা নিয়ে।  নৌকা বিধান নামে এ বইটি নৌকা বিষয়ক একটি কোষ বা অভিধান। সেটিতে নৌকা কিভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক হয়ে উঠলো, তার ইতিহাস এবং যন্ত্রচালিত নৌকার আবির্ভাব ও জীবনের গতি বেড়ে যাওয়ায় আমাদের ঐতিহ্যবাহী নৌকা যে আজ হারাতে বসেছে। বইয়ে তা তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের ১২/১৩ হাজার নদীতে নানান রকমের নৌকা চলতো। একটি নয়নাভিরাম দৃশ্য ছিল। নানা রকম পাল তুলে তারা চলতো। সেগুলো আমাদের অর্থনীতিরও বিরাট চালিকাশক্তি ছিল, বিশেষ করে নৌপথ। কালের পরিক্রমায় এই নৌকা শিল্পটা হারিয়ে যেতে বসেছে। বইটির কাজ অনেকটা এগিয়ে আছে। দ্রুতই এটি শেষ করতে পারবো। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে আমার কাছে এখন প্রাধান্য পাচ্ছে গান। এর মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক যেসব গান রয়েছে, সেগুলো সরকারের বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এখনো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে পারিনি। ইচ্ছা আছে এবারের বইমেলায় প্রতিপাদ্য সংগীত শিরোনামে এই বই প্রকাশ করার। প্রথম খণ্ডটি হবে স্বাস্থ্য বিষয়ক।

মেডিভয়েস: আপনি একাধারে একজন চিকিৎসক, লেখক, গীতিকার, বিতার্তিক ও সংবাদ পাঠক—কোন পরিচয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: আসলে আমি সব পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমার বাবা-মা, আমার স্কুল-কলেজ, তাদের ঘিরে আমি বড় হয়েছি। সব জায়গাতেই বিষয়গুলোর চর্চা ছিল। রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে প্রতি বৃহস্পতিবার ক্লাস টিচার পিরিয়ড (সিটিপি) নামে এক্সটা কারিকুলার একটি ভিটি হতো। এখানে শিক্ষার্থীদের কিছু না কিছু পরিবেশন করতে হতো। কবিতা, আবৃত্তি, গান, শাস্ত্রীয় সংগীত, বিতর্ক, অভিনয়, মুখাভিনয়—এগুলো এখানে পরিবেশন করতে হতো। এটা সবার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। পাশাপাশি আমাদের বার্ষিক প্রতিযোগিতা ছিল, একটি সাংস্কৃতিক উৎসব হতো। চমৎকার একটি পরিবেশ সৃষ্টি হতো। আমাদের ক্যাম্পাস ছিল ঢাকা শহরের বিখ্যাত। আমাদের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন সুসাহিত্যিক লুৎফুল হায়দার চৌধুরী। তিনি আসার পর আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি গতি সঞ্চার হলো। স্কুলে বটগাছের নিচে একটি পাটাতন করে দিলেন মুক্ত মঞ্চের মতো। সেটাকে ঘিরে আমাদের শিক্ষক ও সকল ছাত্র-ছাত্রী বসে থাকতো। ওখানে সাতদিন ধরে বাৎসরিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হতো। তখন সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকতো। এর রকম একটা আবহের ভেতরে আমি বড় হয়েছি। যার ফলে আমাদের ভেতরে লেখালেখির আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আর আমার আব্বার একটি প্রবণতা ছিল, যখন কোনো কিছু লিখতে হতো, সেটা ইংরেজি কিংবা বাংলা। আমার আব্বা কখনোই নিজে লিখতেন না। তিনি আমাদের দিয়ে লেখাতেন। পরে তিনি এটাকে পরিবর্ধন, পরিামার্জন করতেন। অর্থাৎ তিনি আমার সৃজনশীলতা জাগিয়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আমার লেখক সত্তাটা বিকশিত হয়েছে। আপনারা যা উল্লেখ করেছেন এসবই সংস্কৃতিরই একেকটি অনুসঙ্গ। একটিকে যদি বলি পেশা, আরেকটি বলবো নেশা বা শখের জায়গা। আমার কাছে দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মেডিভয়েস: পেশাগত জীবনের পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির কাজে কিভাবে নিজেকে যুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন? 

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: প্রশ্নটার মধ্যেই উত্তর নিহিত। অর্থাৎ সমন্বয় করতে হয়। আমি মনে করি, আমার প্রতি এটি মহান রাব্বুল আলামীন সৃষ্টিকর্তার একটি বিশেষ অনুগ্রহ যে তিনি আমাকে এ কাজগুলো করার সামর্থ দিচ্ছেন। পবিত্র কুরআন শরীফে আছে, আল্লাহ পাক মানুষের সাধ্যাতীত কোনো দায়িত্ব অর্পণ করেন না। কাজেই আমাকেও তিনি সেই দায়িত্বগুলো দিয়েছেন, যেগুলো আমার সাধ্যের ভেতরে। এজন্য প্রধানত যেটা প্রয়োজন—আমার বাবা আমাকে ছোটবেলা থেকে বলেছেন। তাহলো: নিয়মানুবর্তিতা ও সময়নাবর্তিতা। এ দুটি বিষয় যে কোনো মানুষের জন্যই অনুসরণীয়। এগুলো মেনে চলতে পারলে আপনারা যে বৈচিত্রময় কাজের কথা বলছেন, সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন কঠিন নয়। বড় কথা হলো—যেই কাজটি আপনি করছেন, এর প্রতি যদি সত্যিকারের ভালোবাসা থাকে তাহলে সাধন করা দুরূহ নয়। আর এগুলো অনুসরণের জন্যই আমার পক্ষে এটি সম্ভব হচ্ছে।

মেডিভয়েস: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) পরিচালকের দায়িত্বে আছেন আপনি। প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে আমাদের বলুন। এখান পর্যন্ত এর অর্জন কী কী? সীমাবদ্ধতা কী কী?

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: ২০১৬ সাল থেকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) পরিচালকের দায়িত্বে আছি। যদি চিকিৎসা বিজ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করি, তাহলে একটি প্রতিকারমূলক চিকিৎসা আরেকটি হলো প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা। প্রতিকারমূলক চিকিৎসার সঙ্গে সাধারণ মানুষ সমধিক পরিচিত। রোগ হওয়ার পরে যে সেবাটা দেওয়া হচ্ছে, সেটা হাসপাতালে দেওয়া হচ্ছে। কাজেই হাসপাতালগুলো হলো প্রতিকারমূলক চিকিৎসা কেন্দ্র। বলা হয়ে থাকে Prevention is better than cure অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। চিকিৎসার যে বিজ্ঞানটা প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করে সেটিই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা (প্রিভেনটিভ হেলথ)। আধুনিক বিশ্বে এটাকে পাবলিক হেলথ বা জনস্বাস্থ্য বলা হয়ে থাকে। যদিও জনস্বাস্থ্য বলতে বৃহত্তর অর্থে Curetive medicine প্রতিকারমূল চিকিৎসাকেও বুঝতে পারি। কিন্তু পরিভাষা হিসেবে জনস্বাস্থ্য বলতে প্রিভেনটিভ হেলথকেই বা সোশাল মেডিসিনকেই বলা হয়ে থাকে।  

সুতরাং নিপসম হলো: প্রতিরোধমূলক এবং সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, যা সর্বোচ্চ জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন করেন। তিনি কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন, ১৯৭৪ সালে শাহাদাত বরণের মাত্র এক বছর আগে এবং মুক্তিযুদ্ধের মাত্র চার বছরে পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, ক্ষতিগ্রস্ত আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সেই সময় তিনি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। তখন এই উপমহাদেশের অনেক দেশে এই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যাপারে কোনো প্রতিষ্ঠানই ছিল না। এখন থাইল্যান্ডের মাহিদোল ইউনিভার্সিটির কথা শুনি, এমেরিকার জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির কথা শুনি। মাহিদোল ইউনিভার্সিটির নিয়ে এখন আলোচনা করি। ১৯৭৪ সালে পাবলিক হেলথে এর অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা সূচনা করেছিলেন। তিনি জানতেন, বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে এই ক্রমবর্ধমান প্রতিকারমূলক চিকিৎসার চাহিদা পূরণ করার সঙ্গতি বজায় রাখা সম্ভব না। কত হাসপাতাল আমরা তৈরি করতে পারি। বা কত অসুস্থ মানুষের জন্য ঔষধপথ্য, চিকিৎসক সরবরাহ করতে পারি? তার চেয়ে উত্তম যদি এই রোগগুলোকে প্রতিরোধ করতে পারি। এজন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক বিশেষজ্ঞও লাগবে। নিপসম হচ্ছে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ তৈরির কারখানা। বা স্নাতকোত্তর সর্বোচ্চ জাতীয় প্রতিষ্ঠান। 

নিপসমের যত অর্জন: 

এর অজর্ন বিস্তর। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছর এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছে। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে ক্রেডিস পদ্ধতিতে চলে গিয়েছি। এগুলোকে আমরা প্রোগ্রাম বলে থাকি। ৮টি প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমরা মাস্টারস ইন পাবলি হেলথ (এমপিএইচ) ডিগ্রি প্রদান করে থাকি। যেমন হাসপিটাল ম্যানেজমেন্ট, হেলথ্ সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পলিসি, ইপিডি ম্যালজি, কমিউনিটি মেডিসিন, মেটারনাল চাইল্ড হেলথ, হেলথ প্রমোশন, হেলথ এডুকেশন—এ রকম ৮টি ডিসিপ্লিনে আমরা এমপিএইচ ডিগ্রি প্রদান করে থাকি। এসব ডিগ্রিধারী জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগ পান। জনগণকে প্রতিরোধমূলক জীবন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। এটি হচ্ছে আমাদের অ্যাকাডেমিক অর্জন। 

এখান থেকে প্রতি বছর ১৭৫ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের গবেষণামূলক কাজ আমরা করে থাকি। অতি সম্প্রতি আমরা একটির ফলাফল প্রকাশ করেছি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে। সেটা অসংক্রামক রোগ (নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ) নিয়ে। বাংলাদেশের জনগণের মাঝে এটির যে ঝুঁকি শুরু হয়েছে, এর ব্যাপ্তি কেমন? সেটি আমরা নিরূপণ করেছি। বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস। সে কি পরিমাণ সবজি খাচ্ছে, পাতে লবন ব্যবহার করছে কিনা, করলে কি পরিমাণ, ধূমপানের প্রবণতা কতটুকু, অ্যালকোহলের প্রবণতা কতটুকু, রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কেমন, ব্লাড প্রেসার কতটুকু, কায়িক পরিশ্রম কতক্ষণ করতে পারে। স্থুলতা কোন পর্যায়ে রয়েছে। এসবের ব্যাপ্তিটা নিরূপণ করেছি। 

জাতীয় পর্যায়ে এ রকম অনেক গবেষণা হচ্ছে নিপসমে, যা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে থাকে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রেফারেন্স হিসেবে গ্রহণ করে। পাশাপাশি আমাদের রয়েছে প্রশিক্ষণ। আমরা সারা বছরই বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি। বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক্সদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে। আরেকটি আছে, অ্যাডভোকেসি বা কনসালটেন্সি। সরকারের নীতি নির্ধারণমূলক কার্যক্রমে আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকি। যেমন স্বাস্থ্যনীতি প্রণীত হচ্ছে, নিপসমের পক্ষ থেকে আমরা জানানোর চেষ্টা করি, স্বাস্থ্য কিভাবে প্রণীত হওয়া উচিত। সেখানে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।

সীমাবদ্ধতা: 

প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার গুরুত্বটা সম্মকভাবে উপলব্ধি করতে না পারা। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রতিকারমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে যতটা গুরুত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে, সেটিকে সফল করার জন্য যত আয়োজন রয়েছে, যত অবকাঠামো রয়েছে, যত বিনিয়োগ রয়েছে, সে তুলনায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ খুবই কম। অথচ আমরা যেসব সূচকে সাফল্য অর্জনের কথা বলে থাকি, তার বেশিরভাগই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থার। যেমন শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, মাতৃমৃত্যুর হার হৃাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু ধনুস্টকার নির্মূল। টিকাদানের সাফল্যের জন্য অতি সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভ্যাকসিন হিরু হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। এর সবই তো প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা। কারও ধারণা টিকা মানেই প্রতিকারমূলক চিকিৎসা। এটি একটি সংকীর্ণ চিন্তা। আসলে তা নয়। 

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যদি সাফল্য আনতে চাই, জনগণের সন্তুষ্টি যদি আমি অর্জন করতে চাই। ঔষধপত্রের যে প্রেসক্রিপশন, সেটার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এটি একটি সামগ্রিক সেবা, যার ভেতরে চিকিৎসক যেমন সম্পৃক্ত প্যারামেডিক সম্পৃক্ত। তাদের যেমন গুরুত্ব আছে, পাশাপাশি একজন ট্রলি বয়, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। যে মানুষটি অসন্তুষ্ট চিত্তে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসছে, তার সঙ্গে যদি একটু বিস্তারিত কথা বলেন দেখবেন তার অভিযোগ শুধু চিকিৎসা বিষয়ক নয়। তার অভিযোগ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে, পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। তাকে যেভাবে গ্রহণ করা হয়েছে, যে ওয়াশরুম ব্যবহার করেছে। এটার যে ব্যবস্থাপনা—সব কিছু নিয়ে তার অসন্তুষ্টি। এসবই ব্যবস্থাপনার ফলাফল। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় যদি পরিবর্তন আনতে না পারি, যদি মান বজায় রাখতে না পারি, তাহলে শুধু চিকিৎসা দিয়ে অর্থাৎ ওষুধ দিয়ে আমি স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারবো না। সব কিছু নিয়েই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য সমস্যায়ও ভিন্নতা আসছে। যেমন অসংক্রামক রোগ—ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, ক্যান্সার, ক্রনিক রিসপেরেটরি ডিজিজ এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে। একবার ডায়াবেটিস হলে সারাজীবন থাকবে। এই ওষুধ সরকারকেই বহন করতে হবে অথবা ব্যক্তিকে বাজার থেকে সংগ্রহ করতে হবে। এর ব্যয়ভার বিপুল ও দীর্ঘ মেয়াদি। কাজেই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে দীর্ঘ সময় কিভাবে এসব সরবরাহ করা সম্ভব। এজন্য প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া উপায় নাই।

মেডিভয়েস: আজকাল অনেক চিকিৎসক পাবলিক হেলথে ঝুঁকছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?  

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: আমি বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখি। পাবলিক হেল্থ মেডিকেল সায়েন্সের একটি শাখা। আরেকটি শাখা প্রতিকারমূলক চিকিৎসা। প্রতিকারমূলক চিকিৎসায় যা হচ্ছে। মনে করুন, একজন বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হলো, তখন একজন কিউরেটিভ মেডিসিন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের চিন্তা আসে কেন এই লোকটি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছে। সেটা নির্ণয় করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন। কিন্তু একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের চিন্তা হবে এই মানুষটির বয়স মাত্র ৩৫ বছর। তার মাথায় প্রশ্ন আসবে কেন সম্প্রতি অধিক সংখ্যক মানুষ এমনকি তরুণ বয়সেও মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থাৎ একজনের চিন্তা ব্যক্তিকেন্দ্রীক আরেকজনের চিন্তা সামষ্টিগত। তার মানে সমাজে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে যার কারণে ইদানিং তরুণ বয়সেও অনেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কাজেই যারা বৃহত্তর অর্থে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসায় কাজ করছেন তারা বৃহত্তর সেবা প্রদানের সুযোগ পাচ্ছেন। তারা একজন ব্যক্তিকে সুস্থ করে তুলছেন না, বরং তারা পুরো সমাজের মানুষের সুস্থতার জন্য কাজ করছেন। কাজেই সেখানে মেধাবী শ্রেণীর প্রয়োজন রয়েছে। এ রকম বৃহত্তর দায়িত্ব যারা পালন করবেন, তাদের সেখানে প্রয়োজন রয়েছে। পাবলিক হেলথের দিকে আজকে যেসব চিকিৎসক আগ্রহ বোধ করছেন, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক। তারা যদি অধিক সংখ্যক আসেন, তাহলে আমি আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় আরও গুণগত পরিবর্তন ঘটবে।  

মেডিভয়েস: পাবলিক হেলথে যারা ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের প্রতি আপনার পরার্মশ কী?  

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: আইন স্টাইনের বিখ্যাত একটি উক্তি মনে করিয়ে দিতে চাই। তিনি বলেছিলেন, ‘ইন্টেলেকচুয়াল সলভ প্রবলেমস, বাট জিনিয়াসিস প্রিভেন্ট দেম’। যারা বুদ্ধিমান তারা সমস্যার সমাধান করেন, কিন্তু যারা প্রতিভাবান তারা সমস্যা প্রতিরোধ করেন। কাজেই যারা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে নিজেদের ক্যারিয়ার হিসেবে নিচ্ছেন তাদেরকে আমি স্বাগত জানাই সেই প্রতিবাভানদের ভূবনে। তাদের জন্য পরামর্শ হচ্ছে, এখানের চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে জ্ঞান রয়েছে, সেটি প্রয়োগের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনা আপনি কাজে লাগাবেন। অচিকিৎসক যারা আছেন, তারাও বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন। কিন্তু চিকিৎসকরা এক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকেন। যেহেতু তার কাছে মানবদেহ, শরীরবৃত্ত, রোগ গঠনের প্রক্রিয়া, সব কিছুর জ্ঞান রয়েছে। এর ফলে সে যখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাটা গড়ে তুলতে চায়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিকারমূলক মেডিসিনের জ্ঞান নেপথ্যে তাকে দারুণভাবে সাহায্য করবে। কাজেই অচিকিৎসক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের চেয়ে একজন চিকিৎসক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এজন্য আমরা পরমার্শ হলো, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তারা এই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থায় আত্মনিয়োগ করবে। এবং তারা এই ভেবে তৃপ্ত বোধ করবেন, একজন বা দুইজন ব্যক্তিকে সুস্থ করার চেয়েও বেশি আনন্দ রয়েছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করার মধ্যে। তাদেরকে যদি রোগ-শোক থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। যদি তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারি। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত জীবন গড়ায় অবদান রাখতে পারি।

মেডিভয়েস: পাবলিক হেলথের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে আরও কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?  

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: এ ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানোর সুযোগটা এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। একটি দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি সহজ হবে। যেমন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পদ কোথায় কোথায় রয়েছে? বেশিরভাগ পদ রয়েছে নিপসমে। এর সংখ্যাও অপ্রতুল। বাইরে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগে শিক্ষকতায় পদ রয়েছে। এর সবই শিক্ষকতার। এসব ছাড়াও পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞদের কাজ করার সুযোগ আছে। সুতরাং পদের যে সংকট রয়েছে এ পদ বৃদ্ধি করতে হবে। এটি শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সীমাবদ্ধ না রেখে যেখানে প্রতিকারমূলক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হচ্ছে, সেখানেও সেসব পদ সৃজন করতে হবে। এবং সেটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা থেকে। আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার যেসব কেন্দ্র রয়েছে এর মধ্যে সর্বনিম্নে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। তার উপরে রয়েছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, তার উপরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, তার উপরে জেলা সদর হাসপাতাল। এসব কেন্দ্র থেকেই স্বাস্থ্য সেবা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য প্রদান করা হয়ে থাকে। সুতরাং উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স থেকে উপরের দিকে প্রতিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাজ করতে দিতে হবে। এজন্য যা করা যেতে পারে তাহলে: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেমন কনসালটেন্ট গাইনি আছেন, কনসালটেন্ট মেডিসিন আছেন, কনসালটেন্ট সার্জারি আছেন। সেখানে কনসালটেন্ট পাবলিক হেল্থ একজন থাকবেন, যিনি এই জনস্বাস্থ্য বিষয়গুলো দেখভাল করবেন। সেখানে হায়ার কি যে রোগ রয়েছে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এবং জেলা সদর হাসপাতালে যদি জুনিয়র কনসালটেন্ট, সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং কিছু জায়গায় চিফ কনসালটেন্ট এই হায়ার কি এ সোপানগুলো যদি থাকে তাহলে পাবলিক হেলথের জন্য এ ধরনের হায়ারার কি তৈরি করতে হবে। যিনি মেডিকেল অফিসার পাবলিক হেলথ আছেন তিনি পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে কনসালটেন্ট পাবলিক হেলথ হবেন। তার তিনি সিনিয়র কনসালটেন্ট হবেন তারপর তিনি চিফ কনসালটেন্ট হবেন। এ ঊর্ধ্বমুখী সোপানগুলো যদি আমরা করতে পারি তাহলে আরও বেশি সংখ্যক মেধাবী চিকিৎসক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য আগ্রহ বোধ করবেন। 

এছাড়া হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপক হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেন পরিচালক অথবা উপজেলা হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি প্লানিং কর্মকর্তা হিসেবে বা সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে এই পদগুলো শুধুমাত্র পাবলিক হেলথের বিশেষজ্ঞের জন্য নির্ধারণ করা উচিত। তারা ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে উঠেন। যদি এমনটি যদি করা যায়, সরকার যখন সিভিল সার্জন পদায়ন করবে, একজন ইউএইচএফপিও পদায়ন করবে হাসপাতালের পরিচালক পদায়ন করবে তখন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার এমপিএইচ ডিগ্রি থাকা অপরিহার্য করা হলে সরকার আরও দক্ষ ব্যবস্থাপক পাবে। সুফলটা আরও বেশি আসবে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে অভিযোগগুলো জনগণের ভেতরে রয়েছে তা প্রশমনে আরও বেশি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

মেডিভয়েস: তরুণ চিকিৎসকরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে নিগ্রহ, চাকরির অভাব, খুব কম বেতনে চাকরি করতে বাধ্য হওয়া—এর সমাধানে কি হতে পারে বলে মনে করেন?

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: তরুণ চিকিৎসকদের বয়সটাই তো সমস্যা মোকবেলার সময় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সময়। এখন যৌবন যার যুদ্ধে যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। কাজেই তরুণ বয়সেই তারা যুদ্ধে যাচ্ছে। (হাসি)। এত দিন তারা পড়াশোনা করেছে। এখন তারা কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ ক্রমাগত অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। এখানে কিছু সমস্যাও থাকতে পারে। এসব সমস্যা সমাধানে আমাদের তরুণ চিকিৎসকদের প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো রয়েছে এর মধ্যে বেতনের সমস্যাও আছে। তবে বর্তমান সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব উদ্যোগে যে বেতন কাঠামো তৈরি করেছে সেটি অত্যন্ত সন্তোষজনক। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী একজন চিকিৎসকের পক্ষে সম্মানের সঙ্গে সৎভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব। সরকারি চিকিৎসক হিসেবে যারা নিয়োগ পাচ্ছেন তাদের জন্য বেতন একেবারেই সমস্যা নয়। পাশাপাশি তারা তো প্রাইভেট প্রাকটিসের সযোগ পাচ্ছেন। কাজেই সেখানেও বাড়তি উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই। একেক প্রতিষ্ঠান একেক বেতন-কাঠামো নিয়ে কাজ করছে। সেখানে শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে। এটি নিয়ে সরকার কাজ করছে। প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক আইন আছে। আইনটি সেকেলে হয়ে গেছে। সরকার সেটির আধুনিকায়নে কাজ করছে। সেই আইনটি কার্যকর হলে প্রাইভেট সেক্টরে বেতন-বৈষম্য দূর হবে, সেখানে শৃঙ্খলা ফিরবে। এটি নিয়ে কাজ চলছে। আরও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কিছুটা সময় লাগবে। 

আর কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নিগৃহ হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। চিকিৎসক হিসেবে এ নিয়ে আমি অত্যন্ত অসম্মান বোধ করি। লজ্জিত বোধ করি, যখন চিকিৎসকরা সেবা প্রদান করতে গিয়ে নিগৃহীত হয়, লাঞ্ছিত হয়। এটি কখনোই হওয়া উচিত নয়। কোনো চিকিৎসকই জ্ঞাতসারে তাঁর রোগীর ক্ষতিসাধন করতে পারেন না। পদ্ধতিগত ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে চিকিৎসার মান হয় তো বজায় রাখা অসম্ভব হতে পারে। কিন্তু জ্ঞাতসারে কোনো চিকিৎসক একজন রোগীর ক্ষতি সাধন করতে পারেন না। কাজেই যে অভিযোগই থাক না কেন, চিকিৎসককে নিগৃহীত করা এমনকি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করারও উদাহরণ রয়েছে। এটি কখনোই কাম্য নয়। এজন্য বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খসড়া অনেক আগেই হয়ে গেছে। বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই হচ্ছে। পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মতামত নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি কমিটি রয়েছে। তারাও যাচাই-বাছাই করছে, তারা বিভিন্ন ধরনের মতামত দিচ্ছে। আইনটি একবার প্রণীত হয়ে গেলে চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এ আইনটি অত্যন্ত সক্রিয়। অন্যান্য উন্নত দেশে তো রয়েছেই, যার মাধ্যমে তারা সেবা প্রদানকারীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। আইনটি স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একটি বড় রক্ষাকবচ হতে যাচ্ছে।

মেডিভয়েস: ৩৯তম বিসিএসে নিয়োগ পেয়ে সদ্য যোগ দান করা চিকিৎসকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?  

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: তাদের আমার প্রধানত দুটি পরামর্শ। প্রথমত, তারা তরুণ চিকিৎসক। এটি হচ্ছে চ্যালেঞ্জ নেবার সময়। এ কারণে সরকার তাদেরকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পদায়ন করেছে। তারা সেখানে যোগদানও করেছে। ওখানে সেবা প্রার্থীর সংখ্যাও অনেক, গ্রামের সাধারণ মানুষ। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমাদের নৃগোষ্ঠী রয়েছে। তারাও সেবাপ্রার্থী। এসব মানুষের সেবায় তারা আত্মনিয়োগ করবে। তাদের বয়সের যে আনুকুল্য রয়েছে, বয়সের যে সুবিধা তারা পাচ্ছে, এর ফলে তারা অনেক কাজই করতে পারে। যেটি প্রতিকূল পরিবেশে তাদেরকে চেয়ে অপেক্ষাকৃত বয়স্করা সেটি করতে পারে না। আমাদের দেশে তরুণদের সংখ্যা অনেক বেশি। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক। কাজেই তরুণ চিকিৎসকরা যারা যোগদান করেছে, তারা তাদের তারুণ্য কাজে লাগিয়ে জনগণের চাহিদা পূরণ করতে পারে।  তারা গ্রামে থেকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে জনগণকে সন্তুষ্ট করবে সেটিই আমার প্রত্যাশা। 

দ্বিতীয়ত, এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা চিকিৎসা শিক্ষা জীবনে যে শপথটি করে এসেছে তা অবশ্যই স্মরণ রাখবে। 

শপথে বলা আছে, কিভাবে রোগীকে সম্মান করতে হবে। ওষুধ-পথ্য রোগীর সুস্থতার জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ রোগী চিকিৎসকের কাছ থেকে কী ধরনের ব্যবহার পাচ্ছে। কি ধরনের আতিথেয়তা পাচ্ছে সেবা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে। নিজের দুঃখ, বেদনা, কষ্ট বলার সুযোগ কতটা পাচ্ছে। সব কিছু মিলেই চিকিৎসা সেবা। এই বিষয়টা তারা মনে রাখবে। শুধুমাত্র ওষুধকেন্দ্রিক নয়, তার সামগ্রিক সেবাটি যেন সেবাগ্রহিতা সন্তুষ্ট করে। এ ব্যাপারে সচেতন থাকবে। পাশাপাশি রোগীর গোপনীয়তাগুলো রক্ষার ব্যাপারেও সচেতন থাকবে। মেডিকেল এথিকসগুলো তারা মেনে চলবে। তারা মনে রাখবে, প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার অভিপ্রায়ে তাদেরকে যে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে মানুষের জীবন রক্ষায়। এজন্য তারা কৃতজ্ঞ থাকবে। এইক সঙ্গে তারা সতর্ক থাকবে, তাদের সামান্য ভুলের কারণে একজন মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে!কাজেই এই দ্বৈত ক্ষমতা, একটি ইতিবাচক ক্ষমতা যার কারণে একটি মুমূর্ষু মানুষ জীবন ফিরে পেতে পারে। আবার তারই সামান্য অবহেলার কারণে একজন মানুষ মৃত্যুবরণ করতে পারে। সুতরাং এই দুই ধরনের ভূমিকার গুরুত্ব তারা সমানভাবে উপলব্ধি করবেন। পাশাপাশি তাদের অগ্রজ চিকিৎসকদের অনুসরণ করবেন এবং তাদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।  

মেডিভয়েস: মেডিভয়েস সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? পত্রিকাটির মানোন্নয়নে আপনার পরামর্শ কী? 

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: গঠনমূলক যে কোনো সমালোচনাকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু সেটি যখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাদের চিকিৎসকদের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করে সেটি অবশ্যই আপত্তিকর। ঢালাওভাবে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না করে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে কিভাবে সেবার মান উন্নত করা যায় সে ধরনের প্রতিবেদন সব সময় প্রশংসনীয়। এদিক থেকে মেডিভয়েস যে অবস্থান গ্রহণ করেছে চিকিৎসা সেবা, চিকিৎসকদের ইতিবাচক কাজগুলো জাতির সামনে তুলে ধরার তা অত্যন্ত প্রশসংনীয়। যদি নেতিবাচক প্রচারের মাধ্যমে চিকিৎসকদের বা অন্যান্য বিষয় বিতর্কিত করতে থাকি, তাহলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হবে তাহলো চিকিৎসা সেবার প্রতি জনগণের আস্থা বিনষ্ট হবে। যদি আস্থাহীনতা তৈরি হয়, এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর হতে পারে না। সুতরাং চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে আস্থার জায়গাটা অটুট রাখতে হবে। এক্ষেত্রে মেডিভয়েস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এজন্য তাদেরকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। 

পত্রিকাটির কাগজের মান মনোমুগ্ধকর, ঝকঝকে ছাপা, পরিবেশনাও সুন্দর। সব মিলিয়ে পত্রিকাটি যথেষ্ট মানসম্পন্ন। আরও মানোন্নয়নে চিকিৎসা বিজ্ঞানের যেসব গবেষণা কর্ম রয়েছে, সেগুলো বাংলায় সহজভাবে মেডিভয়েসে সংকুলান করা যেতে পারে। এ দেশের স্বাস্থ্য খাতের পথিকৃৎদের তুলে ধরার বিষয়টি সত্যিই প্রশংনীয়। পাশাপাশি যারা গবেষক হিসেবে কাজ করছেন তিনি চিকিৎসক হতে পারেন কিংবা অচিকিৎসকও হতে পারেন তাদের গবেষণা কর্মগুলো সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। এছাড়াও চিকিৎসকরা তাদের পেশার বাইরে সাহিত্য-সংস্কৃতি বা মানবহিতৈষী যেসব কাজ করছেন সেগুলোও এখানে তুলে ধরা যেতে পারে।  

যা কিছু প্রিয়

প্রিয় রঙ: আকাশী। 

প্রিয় পোশাক: যা পরে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। 

প্রিয় গান: অসংখ্য গান আমার প্রিয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের অনেক গান। 

প্রিয় শিল্পী: বাংলাদেশে রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, শাহনাজ রহমত উল্লাহ, সামিনা চৌধুরী, সৈয়দ আব্দুল হাদি, আব্বাস উদ্দিন, এন্ড্রু কিশোর। ভারতে লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভুশলে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। 

প্রিয় খেলা: ফুটবল, ক্রিকেট। 

প্রিয় চলচ্চিত্র: দেশি-বিদেশি অসংখ্য চলচ্চিত্র। 

প্রিয় লেখক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবন আনন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান ও সৈয়দ শামসুল হক। 

প্রিয় বই: প্রিয় লেখকদের অনেক বইই প্রিয়। 

প্রিয় ব্যক্তিত্ব: বাবা, মা। 

অবসরে যা করেন: পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাই, সাহিত্য চর্চা করি, খেলালেখি করি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স