১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৮:১৯ পিএম
মেডিভয়েসকে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিপসম পরিচালক

মেধাবীরা পাবলিক হেলথে আসলে স্বাস্থ্যসেবায় গুণগত পরিবর্তন আসবে   

মেধাবীরা পাবলিক হেলথে আসলে স্বাস্থ্যসেবায় গুণগত পরিবর্তন আসবে   
অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ

মেডিভয়েস রিপোর্ট: মেধাবীরা পাবলিক হেলথে আসলে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় গুণগত পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) পরিচালক অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ। 

সম্প্রতি মেডিভয়েসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি। 

চিকিৎসকদের একটি অংশের পাবলিক হেলথে আগ্রহী হয়ে উঠার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন নিপসম পরিচালক। 

তিনি বলেন, ‘পাবলিক হেল্থ মেডিকেল সায়েন্সের একটি শাখা। আরেকটি শাখা প্রতিকারমূলক চিকিৎসা। প্রতিকারমূলক চিকিৎসায় যা হচ্ছে…মনে করুন, একজন বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হলো, তখন একজন কিউরেটিভ মেডিসিন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের মাথায় চিন্তা আসে কেন এই লোকটি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছে। সেটা নির্ণয় করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন। কিন্তু একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের চিন্তা হবে এই মানুষটির বয়স মাত্র ৩৫ বছর। তার মাথায় প্রশ্ন আসবে কেন সম্প্রতি অধিক সংখ্যক মানুষ এমনকি তরুণ বয়সেও মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থাৎ একজনের চিন্তা ব্যক্তিকেন্দ্রীক আরেকজনের চিন্তা সামষ্টিক। তার মানে সমাজে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে, যার ইদানিং তরুণ বয়সেও অনেক মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কাজেই বৃহত্তর অর্থে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসায় কাজ করছেন তারা বৃহত্তর সেবা প্রদানের সুযোগ পাচ্ছেন। তারা একজন ব্যক্তিকে সুস্থ করে তুলছেন না, বরং তারা পুরো সমাজের মানুষের সুস্থতার জন্য কাজ করছেন।’

এখানে মেধাবী শ্রেণীর প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ বলেন, ‘এ রকম বৃহত্তর দায়িত্ব যারা পালন করবেন, তাদের সেখানে প্রয়োজন রয়েছে। পাবলিক হেলথের দিকে আজকে যেসব চিকিৎসক আগ্রহ বোধ করছেন, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক। তারা যদি অধিক সংখ্যক আসেন, তাহলে আমি আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় আরও গুণগত পরিবর্তন ঘটবে।’

পাবলিক হেলথে যারা ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের বিভিন্ন পরার্মশ দিয়ে নিপসম পরিচালক বলেন, “তাদেরকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ভূবনে স্বাগত জানাই। তাদের আইন স্টাইনের বিখ্যাত একটি উক্তি মনে করিয়ে দিতে চাই। তিনি বলেছিলেন, ‘ইন্টেলেকচুয়াল সলভ প্রবলেমস, বাট জিনিয়াসিস প্রিভেন্ট দেম। যারা বুদ্ধিমান তারা সমস্যার সমাধান করে, কিন্তু যারা প্রতিভাবান তারা সমস্যা প্রতিরোধ করে। ’সুতরাং যারা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে নিজেদের ক্যারিয়ার হিসেবে নিচ্ছেন তাদের জন্য পরামর্শ হচ্ছে, এখানের চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে জ্ঞান রয়েছে, সেটি প্রয়োগের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনা আপনি কাজে লাগাবেন। অচিকিৎসক যারা আছেন, তারাও বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন। কিন্তু চিকিৎসকরা এক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে। যেহেতু তার কাছে মানবদেহ, শরীরবৃত্ত, রোগ গঠনের প্রক্রিয়া, সব কিছুর জ্ঞান তার মধ্যে রয়েছে। এর ফলে সে যখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাটা গড়ে তুলতে চায়, চিকিৎসা বিজ্ঞানে তার প্রতিকারমূলক মেডিসিনের জ্ঞান নেপথ্যে তাকে দারুণভাবে সাহায্য করবে।’

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ বলেন, ‘অচিকিৎসক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের চেয়ে একজন চিকিৎসক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এজন্য আমরা পরমার্শ হলো, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তারা এই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থায় আত্মনিয়োগ করবে। এবং তারা তৃপ্ত বোধ করবে, একজন বা দুইজন ব্যক্তিকে সুস্থ করার ভেতরে যেমন আনন্দ আছে, তেমনি তার চেয়েও বেশি আনন্দ রয়েছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে যদি স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা যায়। তাদেরকে যদি রোগ-শোক থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। যদি তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারি। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত জীবন গড়ায় আমি অবদান রাখতে পারি।’

পাবলিক হেলথের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন নিপসম পরিচালক বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানোর সুযোগটা এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। একটি দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি সহজ হবে। যেমন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পদ কোথায় কোথায় রয়েছে? বেশিরভাগ পদ রয়েছে নিপসমে। এর সংখ্যাও অপ্রতুল। বাইরে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগে শিক্ষকতায় পদ রয়েছে। এর সবই শিক্ষকতার। এসব পদ ছাড়াও পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞদের কাজ করার সুযোগ আছে। সুতরাং পদের যে সংকট রয়েছে এ পদ বৃদ্ধি করতে হবে। এটি শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সীমাবদ্ধ না রেখে যেখানে প্রতিকারমূলক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হচ্ছে, সেখানেও সেসব পদ সৃজন করতে হবে। এবং সেটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা থেকে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার যেসব কেন্দ্র রয়েছে এর মধ্যে সর্বনিম্নে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। তার উপরে রয়েছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, তার উপরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, তার উপরে জেলা সদর হাসপাতাল। এসব কেন্দ্র থেকেই স্বাস্থ্য সেবা প্রাথমিক স্বাস্থ্য প্রদান করা হয়ে থাকে। সুতরাং উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স থেকে উপরের দিকে প্রতিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাজ করতে দিতে হবে। এজন্য যা করা যেতে পারে তাহলো: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেমন কনসালটেন্ট গাইনি আছেন, কনসালটেন্ট মেডিসিন আছেন, কনসালটেন্ট সার্জারি আছেন। সেখানে কনসালটেন্ট পাবলিক হেল্থ একজন থাকবেন। যিনি এই জনস্বাস্থ্য বিষয়গুলো দেখভাল করবেন। সেখানে হায়ার কি যে রোগ রয়েছে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এবং জেলা সদর হাসপাতালে যদি জুনিয়র কনসালটেন্ট, সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং কিছু জায়গায় চিফ কনসালটেন্ট—এই হায়ার কি এ সোপানগুলো যদি থাকে তাহলে পাবলিক হেলথের জন্য এ ধরনের হায়ারার কি তৈরি করতে হবে। যিনি মেডিকেল অফিসার পাবলিক হেলথ আছেন তিনি পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে কনসালটেন্ট পাবলিক হেলথ হবেন। তার তিনি সিনিয়র কনসালটেন্ট হবেন তারপর চিফ কনসালটেন্ট হবেন। এ ঊর্ধ্বমুখী সোপানগুলো যদি আমরা করে দিতে পারি তাহলে আমরা আশা করতে পারি আরও বেশি সংখ্যক মেধাবী চিকিৎসক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য আগ্রহ বোধ করবেন।’

অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ বলেন, ‘হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপক হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেন পরিচালক অথবা উপজেলা হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি প্লানিং কর্মকর্তা হিসেবে বা সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে এই পদগুলো শুধুমাত্র পাবলিক হেলথের বিশেষজ্ঞের জন্য নির্ধারণ করা উচিত। যাতে তারা ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে উঠেন। যদি এমনটি যদি করা যায়, সরকার যখন সিভিল সার্জন পদায়ন করবে, একজন ইউএইচএফপিও পদায়ন করবে, হাসপাতালের পরিচালক পদায়ন করবে—জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার এমপিএইচ ডিগ্রি থাকা অপরিহার্য করা হয় তাহলে সরকার আরও দক্ষ ব্যবস্থাপক পাবে। সুফলটা আরও বেশি আসবে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে অভিযোগগুলো জনগণের ভেতরে রয়েছে তা প্রশমনে আরও বেশি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।’

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি