১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০১:১১ পিএম

আলোকিত চিকিৎসক ডা. তাজুল ইসলামের আলো ছড়ানোর গল্প

আলোকিত চিকিৎসক ডা. তাজুল ইসলামের আলো ছড়ানোর গল্প
ছবি তুলেছেন: মো. সাহিদ

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও লেখক। প্রায় ত্রিশবছর ধরে মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় দৈনিক ও স্বাস্থ্য সাময়িকীগুলোতে নিয়মিত লেখালেখি করছেন। ‘মনের সুখ মনের অসুখ’, ‘মন ও মানুষ’, ‘শিশু বিকাশ ও শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যা’, ‘মাদকাসক্তি’ ইত্যাদি সহ তার মোট বইয়ের সংখ্যা ১৭টি। প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবছরও বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে স্বাস্থ্য খাতের জনপ্রিয় এই লেখকের ‘পজিটিভ সাইকোলজি’ নামের একটি বই।

সম্প্রতি বই মেলায় মেডিভয়েস মুখোমুখি হয়েছিল এ চিকিৎসকের। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তার লেখক ও ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন দিক। পাঠকদের কাছে তা তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহফুজ উল্লাহ হিমু।

মেডিভয়েস: স্যার, কেমন আছেন?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: ভালো আছি। মেডিভয়েসকে ধন্যবাদ।

মেডিভয়েস: এ বছর আপনার কী কী বই প্রকাশিত হয়েছে?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: এ বছর আমার একটি বই এসেছে, বইটির নাম ‘পজিটিভ সাইকোলজি’। বিষয়টি একদম নতুন ধারণা। ইতিপূর্বে আইকিউ বা বুদ্ধিমত্তার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, কিন্তু এখন ইকিউ বা আবেগী বুদ্ধিমত্তার উপর গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করছি। পজিটিভ সাইকোলজি আগের প্রথাগত সাইকোলজির ধারণা থেকে উন্নত এবং অধিক কার্যকরী। এ বিষয়টি নিয়েই আমার ‘পজিটিভ সাইকোলজি’ বই।

মেডিভয়েস: বইটির কী বিশেষত্ব রয়েছে?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমরা সাইকোলজির ব্যাপারে এতোদিন জানি যে, সাইক্রিয়াটিকরা নানাবিধ মানসিক রোগের চিকিৎসা করে। মানুষের যখন মানসিক অবনতি হয় বা মস্তিষ্কে সমস্যা দেখা দেয়, তখন আমরা তার চিকিৎসার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করি। পজিটিভ সাইকোলজির ধারণাটি সম্পূর্ণ বিপরীত। পজিটিভ সাইকোলজি বলছে, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে সহযোগিতা করা এবং তাকে আরও বেশি আত্ম-মর্যাদা সম্পন্ন করে গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে। পজিটিভ সাইকোলজির ধারণাটি সারা বিশ্বে বিস্তৃতি লাভ করেছে কিন্তু বাংলাদেশে এর চর্চা খুবই কম। আমি এই বইয়ে মাধ্যমে মানুষের কাছে পজেটিভ সাইকোলজির ধারণা তুলে ধরেছি। ‘পজিটিভ সাইকোলজি’ বইয়ের মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করা, উন্নততর করা এবং মানসিক তথা সামগ্রিক সত্তাকে আরো বেশি সবল করে যেন সে তার সুপ্ত শক্তিকে পূর্ণ বিকাশ করতে পারে।

মেডিভয়েস: আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমার লেখালেখি শুরু একদম বাল্য কাল থেকে। আমি যখন মাধ্যমিক লেভেলের একজন শিক্ষার্থী তখন আধুনিক গদ্য কবিতার বিষয়টি তেমন প্রচলন ছিল না, কবিতা মানেই ছিল ছন্দ কবিতা। তখন আমি প্রায়ই রেডিওতে গদ্য কবিতা শুনতাম। তখন ১৯৭২-৭৩ সালে আমি একটি গদ্য কবিতা লিখে তা স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেছিলাম। একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন দিবস কেন্দ্রীক কবিতা লিখতাম। পরবর্তী সময়ে মেডিকেল কলেজে এসেও লেখালেখি অব্যাহত ছিল। এরপর বিভিন্ন পত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে লেখালেখি করতাম। একজন সাইক্রিয়াটিস্ট হিসেবে আমিই প্রথম ১৯৯০-৯১ সালে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দৈনিক পত্রিকা গুলিতে লেখালেখি শুরু করেছি।

মেডিভয়েস: আপনার প্রথম বই কবে প্রকাশিত হয় এবং বইটির নাম কি ছিল?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমার প্রথম বই ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়। বইটির নাম ছিল  ‘মনের সুখ মনের অসুখ’। এটি আমার জাতীয় দৈনিকগুলোতে লেখার সংকলন ছিল। আমার দ্বিতীয় বইটিও একইভাবে সংকলন ছিল।

মেডিভয়েস: এ পর্যন্ত আপনার লেখা কী কী বই প্রকাশিত হল?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমার লেখা ১৭টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে একটা ভ্রমণ কাহিনী ছাড়া বাকি সবগুলোই স্বাস্থ্য বিষয়ক। এর আগে শিশু স্বাস্থ্য বিকাশে ৩টা বই আমি লিখেছি, যা সিরিজ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যেমন ব্যক্তিত্বের উন্নয়ন, আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি, আত্ম নির্মাণসহ এ জাতীয় বই-ই বেশি লেখা হয়েছে।

মেডিভয়েস: আপনার লেখালেখির অনুপ্রেরণা কী?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমার মতে একজন রোগীকে প্রেসক্রিপশন, ওষুধ বা ইনজেকশন দেয়াই সেবা নয়, এটা পেশাগত দায়িত্ব পালন। ডাক্তারি সেবা হচ্ছে রোগীকে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি তার পারিবারিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও লক্ষ্য রাখা। আমার লেখালেখি থেকে মানুষ উপকৃত হচ্ছে, স্বাস্থ্য সচেতন হচ্ছে অর্থাৎ আমি তাদের সেবা দান করতে পারছি। এই সেবা দান করতে পারাই আমার অনুপ্রেরণা।

মেডিভয়েস: লেখক হিসেবে কখনো প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: লেখক হিসেবে যে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছি তা নিতান্তই ব্যাক্তিগত প্রতিকূলতা। আমার প্রতিকূলতা হচ্ছে অলসতা। এছাড়া কখনো কোন প্রতিকূলতার সম্মুখিন হইনি। আমি বই লিখা ছাড়াও ‘বি-পজেটিভ, বি-হ্যাপী’ নামে একটি ফেইসবুক গ্রুপ ও পেজ পরিচালনা করি। আমি সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানা ধরণের পরামর্শ প্রদান করা ছাড়াও নানাবিধ সামাজিক  ও রাজনৈতিক সমস্যা ও অসঙ্গতি নিয়ে লেখালেখি করি। এক্ষেত্রে পরিচিত অনেকেই বিভিন্ন সময় সতর্ক করেছে যে, সব বিষয়ে মন্তব্য করা উচিৎ হবেনা। কিন্তু আমি যেহেতু কারো পক্ষে বা বিপক্ষে লেখি না শুধুমাত্র নানা অসঙ্গতি ও অন্যয়ের বিরুদ্ধে কথা বলি তাই আমি কখনো কোন বাধার সম্মুখীন হইনি বরং বিভিন্ন মহল থেকে সমর্থন পেয়েছি। কারণ নৈতিকভাবে সব মানুষই এক, সবাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

মেডিভয়েস: পেশাগত দায়িত্ব ও লেখালেখি দুটুকে কীভাবে সমন্বয় করেন?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমি মনে করি একজন মানুষ যদি সৃজনশীল মানুষ হয়, সে যদি জীবনকে উপভোগ করতে চায় তাহলে সে শত ব্যস্ততার মাঝেও সৌখিন কাজ করার জন্য সময় বের করে নেয়। যে শুধুমাত্র তার পেশাগত কাজ করে জীবন কাটালো সে জীবনের অন্য অংশ থেকে জ্ঞান ও আনন্দ কোনটাই গ্রহণ করতে পারবেনা। মানুষের জীবনের প্রতিটা মূহুর্ত থেকে শিক্ষা গ্রহণ, উপভোগ করার উপাদান রয়েছে। কেউ যদি সক্রিয় ও সৃজনশীলভাবে চিন্তা করে তাহলে পেশাগত কাজের পাশাপাশি শুধু লেখালেখি না যেকোন সখের কাজ করার সময় বের করে নিতে পারবে। তাছাড়া আমি আসলে পেশাগত জীবন থেকে লিখি। আমি তো আর উপন্যাস বা গল্প কবিতা লিখি না। এখন যা লিখছি, এটা আমার পেশারই অংশ।

মেডিভয়েস: নতুন যে চিকিৎসকরা লেখক হিসেবে আবির্ভূত হতে চান, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: ডাক্তারদের নিয়ে রোগীদের পক্ষ থেকে এবং নানা মাধ্যম থেকে বদনাম রয়েছে। এটা নিয়ে আমিসহ অনেকেই লেখালেখি করেছি। ডাক্তাররা শুধুমাত্র পড়াশুনা আর রোগী নিয়ে ব্যস্ত থাকে না, বরং অনেক ডাক্তারই ভাল লেখালেখি করে। ডাক্তাররা মেধাবি শ্রেণীর অংশ, সুতরাং তাদের উচিত হবে তাদের মেধার সঠিক ও সৃজনশীল ব্যবহার করা। ডাক্তারদের নিজেদের অধিকার ও ডাক্তারদের ব্যাপারে মানুষের ভুল ধারণা দূর করতে লেখালেখি করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে।

মেডিভয়েস: আপনার জন্ম, শৈশব, পড়ালেখা?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমার জন্ম হলো চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলায়। আমরা ৫ ভাই, ১ বোন। আমার বাবা মারা গেছেন। মা খুবই অসুস্থ অবস্থায় আছেন। আমি মতলব হাই-স্কুলে পড়েছি। এরপর ঢাকা কলেজে। আমি সরাসরি আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের ছাত্র। তারপর আমি বুয়েটে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। তারপর আমি চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি হই। সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে আমি এমবিবিএস করি। তারপর ১৯৯২ সালে এফসিপিএস পাস করেছি। ২৬ বছর হয়েছে আমি সাইক্রিয়াটিস্ট হয়েছি।

মেডিভয়েস: পছন্দ করেন কী কী?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: আমি পড়তে এবং লিখতে খুবই পছন্দ করি।

মেডিভয়েস: আপনার জীবনে স্বপ্ন?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: এখন আর স্বপ্ন দেখি না। আল্লাহর রহমতে আমার সব স্বপ্নই পূরণ হয়েছে।

মেডিভয়েস: স্যার, মেডিভয়েস সম্পর্কে কোনো পরামর্শ?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: মেডিভয়েস অনেক ইতিবাচক কাজ করে যাচ্ছে। শত প্রতিবাদী স্বরকে একতাবদ্ধ করে একই সুরে গাইতে মেডিভয়েস কাজ করে যাবে বলেই আমি আশাবাদী। চিকিৎসক সমাজের ন্যায়সঙ্গত বিষয়গুলোতে সবসময় পাশে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে।

Add
মেডিভয়েসকে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিপসম পরিচালক

মেধাবীরা পাবলিক হেলথে আসলে স্বাস্থ্যসেবায় গুণগত পরিবর্তন আসবে   

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
স্ফিগমোম্যানোমিটার
ইন্সট্রুমেন্ট রিভিউ

স্ফিগমোম্যানোমিটার

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ
বেসরকারিখাতে দেশের অন্যতম শীর্ষ মেডিকেল কলেজ

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ