০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৫:৫২ পিএম
বিশেষ সাক্ষাৎকার

চিকিৎসা পেশা আরও অনিরাপদ হয়ে উঠবে: ডা. তুষার

চিকিৎসা পেশা আরও অনিরাপদ হয়ে উঠবে: ডা. তুষার

ডা. আব্দুন নূর তুষার। একজন সফল বিতার্কিক, উদ্যোক্তা, উপস্থাপক, লেখকসহ নানা গুণের অধিকারী জনপ্রিয় এ চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। চাকরিসূত্রে যুক্ত হয়েছিলেন হাইপারটেনশন সেন্টার, ইউএসএইডের বেসিকস প্রকল্পসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে। সরকারি চাকরিও করেছেন কিছুদিন। বর্তমানে তিনি নাগরিক টেলিভিশনের চিফ অপারেটিং অফিসার, সিইও পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৯১ সালে গড়ে তোলা বিতার্কিকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন (বিডিএফ)-এর সভাপতি ছিলেন তিনি। সমাজসেবার স্বীকৃতি স্বরূপ নির্বাচিত হন রোটারি ইন্টারন্যাশনালের পল হ্যারিস ফেলো হিসেবে। ১৯৮৪ সাল থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করেন ডা. আব্দুন নূর তুষার। শীতের এক সকালে মেডিভয়েস মুখোমুখি হয়েছিল প্রখ্যাত এ চিকিৎসক ও মিডিয়া-ব্যক্তিত্বের। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার কর্মজীবন, ব্যক্তিজীবন, তরুণ চিকিৎসকদের প্রতি পরামর্শসহ নানা দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানভীর সিদ্দিকী।

মেডিভয়েসের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন, স্যার কেমন আছেন?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: ভালো আছি। ধন্যবাদ।

মেডিভয়েস: আপনার শৈশব, কৈশোর ও শিক্ষা জীবনের গল্প জানতে চাই।
ডা. আব্দুন নূর তুষার: আমার শৈশব, কৈশোর এবং শিক্ষা জীবন ঢাকায় কেটেছে। পড়াশোনা করেছি ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে, যা বর্তমানে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ নামে পরিচিত। সেখানে একটানা ১২ বছর পড়াশোনা করেছি। আমি খুব বেশি স্কুল বদলাইনি। আমার একটাই স্কুল, একটাই মেডিকেল কলেজ ও একটাই ইউনিভার্সিটি। আমি ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র ছিলাম, এরপর স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছি।

মেডিভয়েস: আপনার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন সম্পর্কে জানতে চাই।
ডা. আব্দুন নূর তুষার: আমি প্রথম কাজ করেছি হাইপারটেনশান সেন্টারে, তারপর সেখান থেকে আমি ইউএসএআইডিতে কাজ করি। আমি কিছুদিন সরকারি চাকরি করেছি, কিন্তু সেখানে মতের মিল না হওয়ায় এবং পরিবেশের অত্যন্ত দূরাবস্থা থাকায় সেটা ছেড়ে দিয়েছি। তবে সেটা নিয়ে একটা ভূল তথ্য প্রচলিত আছে যে, আমি ইচ্ছা করে সেখানে যেতাম না, কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। আমি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েই যাইনি এবং চিঠিতে আমি না যাওয়ার কারণসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছি। আমি কখনই কোন কাজে না গিয়ে বেতন নেইনি।

মেডিভয়েস: চিকিৎসক জীবনের বিশেষ কোন স্মৃতি যা আপনাকে কষ্ট দেয় বা আনন্দিত করে?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: আমার কোন কষ্ট নেই। আমি মনে করি জীবন নিয়ে কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। এই কারণে যে, জীবনে যা ঘটে -তা ঘটেই। তাই এটা নিয়ে কষ্ট পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে, কখনও কখনও কোন স্মৃতি আমাদেরকে স্মৃতিকাতর করে। কাউকে কাউকে অনেক মনে পড়ে কিংবা কোন কোন মানুষকে আমাদের জীবনে পাইনি বা রাখতে পারিনি বা কোন কারণে হারিয়েছি -এরকম যদি হয়, তাহলে তাদের কথা মনে পড়লে অবশ্যই মন খারাপ হয়, কিন্তু সেটা নিয়ে দুঃখ পাওয়া ঠিক না। আমার আসলে মনে হয় জীবনটাই এরকম এবং জীবন আমাদেরকে যেখানে নিয়ে যাবে, সেখানেই আমাদেরকে যেতে হবে। আমাদের শুধু চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে যে, যেখানেই আমি পৌঁছাই, ভালোভাবে যেন পৌঁছাই।

মেডিভয়েস: একজন চিকিৎসক, উপস্থাপক-বিতার্কিক-মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং একজন মিডিয়া উদ্যোক্তা বা পরিচালক কোন পরিচয়টা বেশি আপন মনে হয় এবং কেনো?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: শুরুতেই আমি একজন ডাক্তার, আমি নিয়মিত রোগী দেখি। তবে, ডাক্তারি করে আমি কখনই সাধারণ মানুষের থেকে ভিজিট নেইনি। পেশাজনিত কারণে বেতন পেয়েছি, কিন্তু মানুষের থেকে ভিজিট নেয়াটা কেন জানি আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনি। যে কারণে আমার রোগীদের সাথে আমার সম্পর্ক একটু অন্যরকম, অন্যসব ডাক্তারের মতো না। কারণ, কোন রোগীই আমাকে এসে বলতে পারে না ডাক্তারকে পয়সা দিয়েছি। আমি যাদেরকেই দেখেছি, সকলকেই পয়সা ছাড়াই দেখেছি। যে কারণে আমার কিছু রোগী আছে যারা, আমার কাছে ছাড়া অন্য কোথাও পরামর্শ নিতে চান না। এমনকি, প্রফেসর সাহেবদেরকে দেখিয়ে এসেও আমাকে দিয়ে প্রেসক্রিপশন পরীক্ষা করায়। এই ব্যপারটা আমার কাছে অন্যরকম লাগে।

আমি ব্যবসা করেছি, আমি বহুদিন ধরে টেলিভিশনের জন্য অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছি। সেই সময়টা হলো ৩২ বছর প্রায়। আমি উপস্থাপনা করেছি, বিতর্ক করেছি। সবমিলিয়ে এখন আমি নিজেকে একজন গণমাধ্যম কর্মী ভাবি। আমি মনে করি যে, আমি মানুষের জন্য কাজ করেছি।

আমি নানা ধরনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন করেছি, তবে আমি অর্থ নিয়ে বা বেতন নিয়ে কোন সংগঠনে যুক্ত হইনি। আমি বিতর্কের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছি। আমি বাংলাদেশ হাইপারটেনশানের একটানা ২০ বছর সেক্রেটারি জেনারেল ছিলাম। সেখানে আমি প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। খানিকটা সফলও হয়েছি। আমি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে একদম ছোটবেলা থেকে যাই এবং আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের সাথে কাজ করি। তারপর আমি রোটারি একটা সংগঠন করেছি। এছাড়াও আমি একসময় ছাত্র রাজনীতি করেছি এবং সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছি। আমি সেই সময়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করেছি, ছাত্রদের ভোটে জিতেছি এবং হেরেছিও।

আমার জীবন আসলে বহু কাজের জীবন। মানুষ যদিও বলে আমাকে শুধু একটাই কাজ করতে হবে, একটা কিছু নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। তবে আমার সব সময় মনে হয়েছে যে, শুধু একটা কাজ করতে গেলে হয়তো সে কাজের জন্য বিখ্যাত হওয়া যায়, কিন্তু জীবন কী আমাদের শুধু একটা কাজের জন্যই জন্ম দিয়েছে? কিংবা শুধু একরকম মানুষ হওয়ার জন্যই বলেছে? জীবন আসলে আমাদেরকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। আমরা মানুষেরা আমাদের প্রয়োজনে আমাদের কাজের ক্ষেত্রকে সীমিত করে সেখানে বড় হওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার এখনও মনে হয় মানুষের উচিত যে, একটা পাখির মতো জীবন বেছে নেওয়া, যেখানে সে যে কাজই করুক না কেন তা আনন্দ, সততা ও নিষ্ঠার সাথে করবে। যে কাজেই করুক না কেন, সেটা ভালো করে করার চেষ্টা করবে।

মেডিভয়েস: চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মস্থলের বিষয়ে দীর্ঘ দিন যাবৎ আলোচিত হয়ে আসছে, কেন চিকিৎসকদের কর্মস্থল নিরাপদ নয়?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: চিকিৎসকদের কর্মস্থল নিরাপদ নয়, এই সমস্যাটি বহুদিনের না। গত দুই দশক ধরে দেখতে পাচ্ছি যে, চিকিৎসকদের কর্মস্থল প্রতিনিয়ত অনিরাপদ হয়ে উঠছে এবং চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। কেন এমনটা হচ্ছে সেটা যদি জিজ্ঞেস করা হয়, এই প্রশ্নের জবাব এতো ছোট পরিসরে দেয়া সম্ভব নয়। তবে চাইলে এটাকে প্রতিরোধ করা যেত এবং এখনও প্রতিরোধ করা যায়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, তাদের যে সাধারণ লক্ষ্য -সেই লক্ষ্যে তারা কাজ করেন না। তারা নানা দল মত এবং নানান বিষয়ে বিভক্ত এবং তারা চাকরিকে জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

চিকিৎসা পেশায় চাকরি আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আপনি যে কাজটি শিখেছেন, সে কাজটি সকলে মিলে করতে পারছি কিনা সেটা নিশ্চিত করা। এখন পর্যন্ত কখনও কোন চিকিৎসক কী কর্তৃপক্ষকে একটা চিঠি দিয়েছেন? একটা সমন্বিত প্রতিবাদ করেছেন? কিংবা এখনও যে চিকিৎসকরা বিভিন্ন জায়গাতে নিগৃহীত হচ্ছেন, সে ব্যাপারে কোন প্রতিবাদ করেছেন? উল্টো দেখা যায় যে, তারা একটা মামলা করতে ভয় পান, আইনের শরণাপন্ন হতে ভয় পান, এরকম নানা ভয়-ভীতি তাদের মধ্যে কাজ করে। এমনকি তারা অনেক সময় একটি কারণ দর্শানোর নোটিশের ভয়ে কারণ থাকলেও কোন প্রতিবাদ করেন না। এরকমটা যদি চিকিৎসকরা করেন, তাহলে তো চিকিৎসা পেশা আরও অনিরাপদ হয়ে উঠবে।

আপনি দেখবেন যে, যারা বাস-ট্রাক চালান, তারা যৌক্তিক আইনেরও প্রতিবাদ করেন। কারণ তারা মনে করে, তাদের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়েছে। আর সেখানে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নানা অযৌক্তিক আইন করার পরেও চিকিৎসকরা বসে থাকেন যে, তাদের নেতৃবৃন্দ তাদের হয়ে কথা বলবেন। এটা আমার কাছে মনে হয় যে, ঠিক নয় এবং চিকিৎসকদের আসলে নিজের পেশা এবং নিজের সম্মান নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। চাকরি করা, প্রেক্টিস করা আর আয় করাই কেবল একজন চিকিৎসকের লক্ষ্য হতে পারে না। একজন চিকিৎসককে তার সম্মান, নিরাপত্তাসহ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আর সেটি যদি তিনি না পান, তাহলে কেন তিনি তার দায়িত্ব পালন করবেন বা কিভাবে পালন করবেন? এই বিষয়গুলো নিয়ে মনে চিকিৎসকরা নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন।

আমি লক্ষ্য করেছি যে, এই গভীর বিষয়গুলো নিয়ে চিকিৎসকদের মাথা ব্যাথা কম। তারা মনে করেন যে, তারা যেকোন মূল্যে তাদের প্রেক্টিসকে অব্যাহত রাখবেন, তাদের চাকরিটাকে অব্যাহত রাখবেন। এই পরিস্থিতি কিন্তু সামনে থাকবে না। কারণ, সামনে সরকার এতো চিকিৎসককে চাকরি দিতে পারবেন না। এটা কারও পক্ষে সম্ভব না। প্রচুর পরিমান চিকিৎসক এখন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে বের হয়ে আসছেন, এদেরকে স্বাধীন পেশায় নিয়োজিত হতে হবে অথবা বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হবে। ফলে চিকিৎসকরা যদি তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত না হন, তাহলে ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের আরও দুরাবস্থার মুখে পতিত হতে হবে।

মেডিভয়েস: চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ পেশাগত পরিবেশ তৈরিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: একজন চিকিৎসকের জন্য পেশাগত নিরাপত্তা আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দুটাই খুব জরুরী। পেশাগত নিরাপত্তা হলো- আমরা যারা চিকিৎসক আছি বা যারা চিকিৎসা করেন, তাদের চিকিৎসা স্বাধীনভাবে করার পরিবেশ দিতে হবে। একটা বাড়ি বানিয়ে সেখানে বিছানা দিয়ে কোন যন্ত্রপাতি ছাড়া, সাহায্যকারী কর্মী ছাড়া (নার্স, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার), ভালো অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া, এমনকি নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া যখন একটা হাসপাতালে একজন ডাক্তারকে শুধু চাকরিটা দিয়ে বলা হয় চিকিৎসা করতে, এটা আসলে অযৌক্তিক। এটা হচ্ছে পেশাগত নিরাপত্তার জায়গা। আপনার কাছে যন্ত্রপাতি নাই, কিন্তু আমি বললাম যে- একটা পাহাড় কেটে দেন বা পাহাড় কেটে রাস্তা বানান, আপনি কি পারবেন? এটা যেমন কারও পক্ষে সম্ভব না, ঠিক একইভাবে একজন চিকিৎসককে শুধু একটা চাকরি দিয়ে কোন একটা জায়গায় পাঠিয়ে দিয়ে বলে দিলেন -এবার চিকিৎসা করেন, সেটাও তার পক্ষে সম্ভব না। ফলে, এই নিরাপত্তার জায়গাটি চিকিৎসকদের অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ, আমার যে কাজ, সে কাজের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, সেটি চাইতে হবে।

দ্বিতীয়ত হচ্ছে, এই কাজ করতে গেলে, নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি আমাদের পড়তেই হবে। এর মধ্যে প্রথম সমস্যাটি হচ্ছে- স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা। আসলে কোন রোগীই তো অমর না। সকল চেষ্টা সত্বেও রোগীর মৃত্যু বা অঙ্গহানি হতে পারে। কারণ, রোগ অনেক সময়ে এতো প্রবল হয় যে, সে রোগের প্রকোপ থেকে রোগীকে রক্ষা করা খুব কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু আমরা একটা বিষয় লক্ষ্য করছি যে- সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, অশিক্ষা বা আইন শৃঙ্খলার অবনতির কারণে সাধারণ মানুষ মনে করে রোগী জ্যান্ত ফেরৎ আসবে। এটা তো আসলে সবসময় সম্ভব না।

সাধারণত হাসপাতালে কোন রোগী যায়? যে রোগীর পক্ষে আর বাসায় থাকা সম্ভব না, যে রোগীর পক্ষে সাধারণ চিকিৎসা নেয়া সম্ভব না বা যে রোগীর পক্ষে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে নেয়া সম্ভব না। রোগী কেবল জটিল হলেই হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন। ফলে যে রোগী জটিল অবস্থায় হাসপাতালে যায়, সেই রোগীর যদি কোন কারণে মৃত্যু ঘটে, তবে তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তা কোন সময় কাম্য নয়। তারা যে শুধু চিকিৎসকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তাই না, তারা চিকিৎসা স্থাপনা, হাসপাতাল, ডায়গনিস্ট সেন্টারসহ এগুলো ভাঙচুর করেন। ডাক্তার, নার্সসহ ওখানে উপস্থিত সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর যেভাবে হামলা করেন, সেটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য না। ফলে এই নিরাপত্তাও চিকিৎসকের খুবই প্রয়োজন।

যদি রাষ্ট্র তার স্থাপনাগুলোকে নিরাপত্তা দেন, তাহলে আমি মনে করি হাসপাতালও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। তাই সকল হাসপাতালকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসাবে ঘোষণা দিয়ে সেখানে প্রকৃত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা কর্তপক্ষের দায়িত্ব। আমাদের দেশের সিস্টেম ডাক্তারের চাকরিকে আবশ্যিক কর্ম হিসাবে মনে করে, কিন্তু হাসপাতালকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসাবে ঘোষণা দিয়ে সেটা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে না। এটা আমি মনে করি যে স্ব-বিরোধী এবং এটি হচ্ছে মেডিকেল ব্যবস্থাপনার ত্রুটি।

আমি মনে করি, বাংলাদেশের মেডিকেল ব্যবস্থাপনা বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অনেক পুরোনো আমলের। এটি কোনভাবেই বৈজ্ঞানিক নয় এবং এটি কোভাবেই আজকের যুগের জন্য উপযোগী নয়। এটাকে আমুল বদলানো খুবই জরুরী। এক্ষেত্রে এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। তবে পদক্ষেপগুলোর মূল লক্ষ্য হবে রোগীর জন্য সুচিকিৎসা এবং চিকিৎসকের জন্য চিকিৎসার পরিবেশ। এই দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। রোগী যেন সঠিক খরচে চিকিৎসা পায় এবং ডাক্তার যেন চিকিৎসা দিয়ে তার সংসারের ব্যায় নির্বাহ ও সুস্থ্য-স্বাভাবিক একটি জীবনের নিরাপত্তা পান। এটি খুবই জরুরী। এ জন্য আমরা কাজ করছি। এফডিএসআর নামের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটি সংগঠন চিকিৎসকরা তৈরি করেছেন। আমি সেই সংগঠনের উপদেষ্ঠা হিসাবে আছি।

আমি মনে করি, চিকিৎসকদের সকল দলমত ও রাজনীতির উর্দ্ধে উঠে নিজেদের জন্য কাজ করা খুবই জরুরী। কেননা, পেশা শুধুমাত্র আয় করার জন্য নয়, পেশা মানুষের উপকার করার জন্যও। তবে, মানুষের উপকারে যদি আপনাকে নিয়োজিত হতে হয়, তাহলে নিজের সুরক্ষাটাও নিশ্চিত হতে হবে। আপনি যদি প্রতিদিন উপকার করতে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন বা মারা যান, তাহলে তো আপনার পক্ষে মানুষের উপকার করা সম্ভব নয়।

এ জন্য সরকারের উচিত হবে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাকে আধুনিকভাবে সাজানো। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের কর্ম পদ্ধতিতে পরিবর্তন বা সংস্কার আনা খুবই জরুরি।

মেডিভয়েস: চিকিৎসকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে আসছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। সম্প্রতি এর বিপরীতে বেশ কয়েকটি সংগঠন গড়ে উঠছে। বিষয়টি কিভাবে দেখেন?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) হলো বাংলাদেশের সকল চিকিৎসকদের সংগঠন। এই সংগঠনের কিছু করণীয় দায়িত্ব রয়েছে, যারা এই সংগঠনকে পরিচালনা করেন, তারা নিশ্চই এগুলোর ব্যাপারে জানেন। আমি নিজে এই সংগঠনের আজীবন সদস্য এবং আমি চিকিৎসাবিদ্যার লাইসেন্স পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিএমএর একজন গর্বিত সদস্য হিসাবে আমার চিকিৎসা জীবন শুরু করেছিলাম। ফলে আমি মনে করি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন চিকিৎসকদের একটি গর্বের সংগঠন। কিন্তু এই সংগঠনের কাছ থেকে চিকিৎসকদের যে প্রত্যাশা, নানা কারণে পূর্ণ হচ্ছে না। এর কারণ হিসাবে আমার কাছে মনে হয়, গত ২০ বছরের ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করেন, তাহলে দেখবেন চিকিৎসকদের সাধারণ দাবি-দাওয়া নিয়ে সংগঠনটি অনেকদিন ধরেই সোচ্চার নয়।

চিকিৎসকদের মধ্যে যারা সরকারি চাকরি করেন, তাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে সংগঠনটি প্রায়ই কথা বলেছে। কিন্তু এটা তো বুঝতে হবে যে, শুধু তো সরকারি চাকরিজীবীরাই এদেশে চিকিৎসক না। সরকারি চাকরির বাইরেও প্রচুর চিকিৎসক রয়েছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, এদেশে অসংখ্য ভুয়া চিকিৎসক রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই চিকিৎসা বিদ্যায় পড়াশোনা না করেও নিজেকে চিকিৎসক হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন, আবার অনেকেই এলোপ্যাথি শিখে, নানা বিষয়ে ডিগ্রী নিয়ে নিজেদের চিকিৎসক পরিচয় দিচ্ছেন। নানা ধরনের ডিগ্রী নামের পাশে যুক্ত করে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা দিচ্ছেন। ফলে রোগী নিশ্চিত না কে আসলে চিকিৎসক। রোগী অনেক সময় এমন চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছে, যে চিকিৎসকের ওই রোগের চিকিৎসা করার দক্ষতা বা যোগ্যতা কোনটাই নাই। যেমন ধরেন- পীত্ততলীতে পাথরের, ক্যান্সারের, ফিস্টুলা, পাইলস -এসবের চিকিৎসা করছেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। ল্যাম্পপোষ্টের গায়ে, গাছের গায়ে সাইনবোর্ড লাগিয়ে বলছেন- অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসা করা হয়! তারমানে অপারেশন খুবই ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার, অপারেশন করা উচিত না।

তারা বলছে- অপারেশন ছাড়াই আমি পারি, ডাক্তাররা তোমার অপারেশন করে। -এসবের মানে কী? এভাবে তো ডাক্তারদেরকে হেয় করা হচ্ছে। অথচ সেই লোকই কিন্তু নিজের চিকিৎসার জন্য এসে সার্জারি। এগুলো নিয়ে কথা কে বলবে? এগুলো নিয়ে সংগঠনকে কথা বলবে হবে। এসব বিষয়ে কী বিএমএ কথা বলছে?

এই যে চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি ক্ষয় হচ্ছে, কেন হচ্ছে? কারণ, চিকিৎসকদের পক্ষে পজেটিভ কোন প্রচারণা নাই। উল্টো নেগেটিভ প্রচারণায় ভরে গেছে। কিছুই জানে না এমন একজন লোক লিখে দিচ্ছে- চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু! অথচ যাকে সে চিকিৎসক লিখছে, সে যে চিকিৎসক না, এটাও তারা নিশ্চিত না হয়ে লিখে দিচ্ছে যে চিকিৎসকের হাতে রোগীর মৃত্যু। এই যে একটা অব্যবস্থাপনার মধ্যে চিকিৎসকরা কাজ করছে, এটার বিরুদ্ধে কথা কে বলবে? জায়গায় জায়গায় চিকিৎসকরা মার খাচ্ছে, বিনা কারণে চিকিৎসকদের মারাত্বক বিপদের মুখে পড়তে হচ্ছে, এই নিরাপত্তার প্রশ্নে কারা কথা বলবে? কারা আন্দোলন করবে? এই প্রশ্নগুলো কিন্তু চিকিৎসকরা করছেন এবং কারা তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করছে, এগুলোও দেখছে।

এটা কিন্তু কারও ব্যক্তিগত কোন দাবি না। আমি নিজে প্রেক্টিস করি না, সুতরাং আমার নিরাপত্তার দরকার নাই। তবু আমি কেন কথা বলছি? বলছি এই কারণে যে, একজন চিকিৎসক যদি নিরাপদ না থাকে, কালকে আমার সন্তানেরা যখন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাবেন, তারাও কিন্তু সুচিকিৎসা পাবেন না। আমরা যদি ভালো চিকিৎসকদেরকে সমাজের সামনে তুলে না ধরি, আর এই সুযোগে কোন ভুয়া লোক যদি নিজের নামের আগে ডাক্তার লিখে দিতে থাকে, তাহলে আমারই কোন আত্মীই কিন্তু ভূল চিকিৎসার শিকার হবে। ফলে নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্যই আমাদের উচিত চিকিৎসকদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন চাইলে বিরাট দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে তাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, তারা সকল প্রকার রাজনীতির উর্ধ্বে। বাংলাদেশে যারা রেজিস্টার্ড ফিজিশিয়ান, এমন ফিজিশিয়ানদের সংগঠন হচ্ছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন। এক্ষেত্রে তাদেরকে আরও গভীরভাবে প্রোঅ্যাক্টিভ হতে হবে। কিন্তু আমার মনে হয় যে, তারা অনেক বেশি রিঅ্যাক্টিভ। অর্থাৎ, কিছু একটা ঘটে গেলে পরে তারা বিবৃতি দেন, সেটা নিয়ে মন্তব্য করেন। কিন্তু আগে থেকে কোন কিছু পরিকল্পনা করা, উদ্যোগ নেয়া বা নতুন কিছু শুরু করা -এগুলো তারা করছেন না। হতে পারে তারা চিকিৎসকরা অনেক ব্যস্ত, তাদের এতো সময় নাই। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনকে চিন্তা করা উচিত যে, সাংগঠনিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং চিকিৎসকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সচেতন এমন মানুষদেরকে দায়িত্ব দিয়ে বিএমএর সাথে যুক্ত করা।

বিএমএর জন্য কাজ করতে একেবারে নির্বাচনের মাধ্যমে জিতে আসতে হবে -এমন তো কোন কথা নেই। বিএমএ চাইলে যেকোন চিকিৎসককে বিএমএর জন্য কাজ করার দায়িত্ব দিতে পারে। শুধুমাত্র যারা নির্বাচনের মাধ্যমে বিএমএর ভোটে জিতেছে, তারাই শুধু বিএমএর জন্য কাজ করবে, অন্যরা করতে পারবে না- ব্যাপারটা তো এমন নয়। এক্ষেত্রে বিএমএর উচিত, সকল চিকিৎসকদের মধ্যে যে যেখানে উপযুক্ত, এমন লোকদেরকে একজায়গায় করে তাদেরকে নানা ধরনের দায়িত্ব দিয়ে বিএমএর জন্য কাজ করতে বলা। ২০/২৫ জন বা ১০০ জন নির্বাচনে জিতেছে, তারাই শুধু বিএমএর জন্য কাজ করবে, ব্যাপারটা তো এরকম না। আমিও মনে করি এটা বিএমএর উচিত না। বিএমএর লক্ষ্য হওয়া উচিত, সাধারণ চিকিৎসকদেরকে বিএমএর কার্যক্রমের সাথে সংযুক্ত করা। তাহলেই এই সংগঠন গতিশীল হবে। আমি মনে করি এসব ব্যাপারে বিএমএ আধুনিক নয়। এটা অনেক পুরোনো পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।

মেডিভয়েস: বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশে থেকে অবাধে চিকিৎসকরা আসছেন এবং বাংলাদেশ থেকেও অবাধে রোগীরা বিদেশ যাচ্ছেন—এ বিষয়টা আপনি কিভাবে দেখেন? এটাকে কীভাবে নিয়মের মধ্যে আনা যায় এবং সরকারের এ ব্যাপারে করণীয় কী?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: কে কোথায় চিকিৎসা নিবেন, এটা তো আসলে আজকের মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে আমরা বন্ধ করতে পারি না। ফলে রোগীর যদি টাকা পয়সা থাকে এবং তার যদি মনে হয় তিনি বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিবেন, তাহলে তিনি যেতে পারেন। সেটা যদি অ্যান্টার্কটিকাও হয়, তাহলেও রোগী যেতে পারেন। কে কোথায় চিকিৎসা নিবে, এটা তো আসলে আইন করে বন্ধ করার উপায় নাই। তবে আমরা যেটা করতে পারি, তা হলো- আমাদের দেশে অবাধে কোন ধরনের নিয়ম কানুন ছাড়া যত্রতত্র বিদেশী চিকিৎসক ঢুকে চিকিৎসা দিচ্ছেন, এই বিষয়টিতে নিয়ন্ত্রনে আনতে পারি।

যারা তাদের নিজ দেশ থেকে অন্য দেশে চিকিৎসা দিতে চলে আসেন, তারা কী নিজ দেশে খুব ভালো ডাক্তার? সে দেশে অনেক প্রেক্টিস, রমরমা ব্যাবসা ফেলে কী তারা এদেশে চলে এসেছেন? মোটেও না। আপনারা একটা প্রশ্ন প্রায়ই করেন যে, প্রফেসর সাহেবরা রোগী দেখে পয়সা কামাতে গ্রামে চলে যান। এটা যদি ঠিক হয়,  তাহলে এটাও সত্য যে, বিদেশ থেকে চিকিৎসকরা এদেশে আসেন, কারণ তারা জানে এদেশে আসলে খুব সহজেই পয়সা কামানো যায়।

দ্বিতীয়ত হলো- আমাদের আইন আছে। এই দেশে বিদেশী চিকিৎসক আসতে গেলে বিএমডিসির অনুমতি লাগে, তার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমান দিতে হয়, পরীক্ষা দিতে হয়, একটা রেজিস্ট্রেশন নিতে হয়, একটা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেদন করে আসতে হয়। তার সঙ্গে অন্ততপক্ষে দুইজন দেশি চিকিৎসককে রাখতে হয়- যাতে তার যে উন্নত চিকিৎসার জ্ঞান সেটা যেন আমরা পাই। শুধু তাই নয়, তিনি এই দেশে এসে আয় করলে সেটা কর দিতে হয়। এরকম হাজারো আইন থাকলেও বাস্তবিক অর্থে এই আইনগুলো ঠিকমতো প্রয়োগ হয় না। ইচ্ছা মতো বিদেশ থেকে ডাক্তার এসে ঢাকা ক্লাবে, অফিসার্স ক্লাবে, এমনকি পুলিশের সরকারি হাসপাতালে বিনা অনুমতিতে আইন লঙ্ঘন করে চিকিৎসা দিতে থাকেন। এটা আমাদের আইনের প্রতি ও একটা রাষ্ট্রের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। একটা স্বাধীন, সার্বভৌম এবং যোগ্য একটি প্রশাসনের জন্য, একটি দেশের জন্য লজ্জার ব্যাপার।

তারা বলছে, আমরা ফ্রি হেলথ ক্যাম্প করছি। তবে আমার প্রশ্ন হলো- আপনারা ফ্রি চিকিৎসা দিবেন ভালো কথা, তাহলে এমন জায়গায় কেন যেখানে শুধু ধনী ব্যক্তিরা যান? ঢাকা ক্লাবে, অফিসার্স ক্লাবে কেন ফ্রি হেলথ ক্যাম্প? কী কারণে পুলিশের সরকারি হাসপাতালে ফ্রি হেলথ ক্যাম্প? আপনি ফ্রি হেলথ ক্যাম্প দিবেন টেকনাফে যান। আপনি পঞ্চগড়ে যেতে পারেন, বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় যেতে পারেন। মফস্বল এলাকায় গরীব এলাকায় গিয়ে ফ্রি হেলথ ক্যাম্প করেন। অথচ সব ফ্রি হেলথ ক্যাম্পগুলো হয় ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে। ফ্রি হেলথ ক্যাম্প হয় ক্লাবে, বড় বড় হোটেল ভাড়া করে। এটা কি ধরনের ফ্রি হেলথ ক্যাম্প? মানুষ কি এতটাই বোকা? মানুষ কি বুঝে না ফ্রি হেলথ ক্যাম্পের পিছনের উদ্দেশ্যগুলো কি? মানুষ বুঝে, তারপরও কেউ বাধা দেয় না, আইন প্রয়োগ করে না। আমি মনে করি এটা খুবই অন্যায়।

এখানে উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিষয় হলো, যারা এদেশে চিকিৎসা দিতে আসেন, তারা অস্থায়ীভাবে আসেন। একটা নির্দিষ্ট সময়ে তাদের চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু তারা ঠিক সময়ে যাচ্ছেন কিনা, এটা নিশ্চিত কে করবে? এটা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী যে কর্তৃপক্ষ আছে, তাদের দায়িত্ব। যারা এখানে আসছেন, তারা ঠিকমত কর দিয়ে সময় মতো যাচ্ছে কিনা এটা দেখতে হবে।

আরেকটি ব্যাপার হলো, আমাদের ডাক্তারদের নামের পিছনে নানা ধরনের ডিগ্রী লিখতে মহামান্য আদালতের নির্দেশনা আছে। কোনরকম উল্টাপাল্টা বা ডিগ্রীর সংক্ষিপ্ত রূপ পেছনে লেখা যাবে না। কিন্তু বিদেশ থেকে যারা আসছেন, তাদের নামের শেষে তারা যে সেদেশের মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার, সেটিও লিখেছেন! এটা কি ধরনের হাস্যকর এবং নির্লজ্জ ব্যাপার, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের ডাক্তাররা কি নামের পাশে এমবিএম (মেম্বার অব বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন) লিখতে পারবেন? আমার দেশের ডাক্তাররা আইন মেনে এগুলো লিখতে পারবে না, কিন্তু অন্য দেশে থেকে আসা ডাক্তাররা লিখতে পারবেন -এটা কেমন নিয়ম? আমাদের আইনে পরিষ্কার লেখা আছে যে, ডিপ্লোমা পাওয়া ডাক্তারকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক লেখা যাবে না, যদিও সে বিদেশ থেকে আসেন। কিন্তু বাংলাদেশে যারা আসছেন, তারা সবাই ৬মাসের বা ১বছরের ডিপ্লোমা করা চিকিৎসক।

এছাড়াও দেখা যায় যে, পড়াশোনা করেছেন এক বিষয়ে, ডিপ্লোমা করেছেন আরেক বিষয়ে, তারাও নিজেদের বিশেষজ্ঞ দাবি করে এদেশে চলে আসছেন। গুলশান বনানীতে একটা ফ্লাট ভাড়া করে রোগী দেখা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের আইনে পরিষ্কার বলা আছে যে, চিকিৎসকরা কোন বিজ্ঞাপন করতে পারবেন না, কোন ধরনের মাইকিং করতে পারবেন না। অথচ একজন বিদেশী ডাক্তার বাংলাদেশে এসে মাইকিং করিয়ে, ফেসবুকে বিজ্ঞাপন করিয়ে রোগী দেখেন। তারা রোগীদের ডেকে ডেকে এনে বলছেন, আপনার তো সন্তান নাই, সীমন্তটা পার হলেই আপনার সন্তান হবে। এভাবে অনেক বাংলাদেশী দম্পতিকে ভাগিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। এগুলো কী? এগুলো কে দেখবে?

যে কোন ডাক্তার তার যোগ্যতা প্রমাণ করে বাংলাদেশে এসে চিকিৎসা দিতে পারেন, কিন্তু যখন আমরা বিনা বাধায়, বিনা আইন মেনে লোকজনকে এখানে ডাক্তারি করতে দেই, তখন আসলে রোগীদেরকেই বিপন্ন করি। কারণ, যে কেউ যখন এসে যদি এখানে চিকিৎসা দিতে পারেন, তখন বিদেশ থেকেও ভুয়া ডাক্তার আসে। কিছুদিন আগেও এমন একজন ধরা পড়েছে, যিনি দাবি করেছেন তিনি ভারতীয় চিকিৎসক। আসলে তিনি ভুয়া চিকিৎসক।

মেডিভয়েস: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে কোন কোন পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিরাট অর্জন রয়েছে। আমরা বিশাল সংখ্যক শিশুকে টিকা দিয়েছি। প্রিভেন্টিভ মেডিসিনে বাংলাদেশ সারা পৃথিবীর কাছে একটি অনুসরণীয় নাম। জনস্বাস্থ্যে বাংলাদেশ বিরাট অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমরা ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া, যক্ষা, কালাজ্বর, এইসব রোগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে পৃথিবীর বহু দেশের তুলনায় সফল হয়েছি। আমাদের এখানে আমরা শিশুমৃত্যু-মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়েছি, আমাদের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নানা প্রতিকূলতা ও নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যেও অর্জন করছে, তারমানে এই ব্যবস্থপনা যদি আরও আধুনিক হয়ে যায়, বাংলাদেশের মানুষ একটি অসাধারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পেতে পারে। আমাদের সরকার এবং রাষ্ট্র এসব বিষয়ে অত্যন্ত মনযোগী। তারা দেশের মানুষকে ভালো চিকিৎসা, ভালো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দিতে চান। কিন্তু যে জায়গাটিতে সরকার বা রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা দুর্বলতা আছে তা হলো- তারা মনে করেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যারা কাজ করেন তারা কর্মচারি। প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যারা কাজ করেন, তারা কেউই কর্মচারী নয়। আমি মনে করি পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একটা টিম ওয়ার্ক। মন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্লিনার পর্যন্ত পুরো একটি দল। এই দল একসঙ্গে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। আমাদের একটি বড় ত্রুটি হচ্ছে, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা মনে করি যে একদল লোক চাকরি দেয়, আরেকদল চাকরি করে। এই মানসিকতা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।

আমাদের কর্তৃপক্ষের যে দায়িত্বগুলো থাকে, তার প্রথমটি হচ্ছে- স্বাস্থ্য খাতের সম্পদগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং সেগুলোর মানোন্নয়ন করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে- নতুন পরিকল্পনা হাতে নেয়া, উন্নয়নমূলক কাজ করা। আর তৃতীয়তটি হলো- মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় যারা আছে, তারা যেন তৃপ্তির সাথে কাজ করতে পারেন এবং কাজ করে সন্তুষ্ট থাকেন, এরকম একটা ব্যবস্থা তৈরি করা। আমি বলবো যে, আমাদের দেশে এই তৃতীয় জায়গাটা অত্যন্ত দূর্বল।

আমরা তিন বছর পরে একজন ডাক্তারকে ট্রান্সফার দিয়ে দেই। কিন্তু যদি এমনটা হয় যে, বাংলাদেশে ওই রোগের ডাক্তার কম বা নাই অথবা ওই জায়গায় তিনিই একমাত্র ডাক্তার, তাহলে কী তিন বছর পের তাকে ট্রান্সফার করা যুক্তিযুক্ত? আমি বলবো যে, মোটেও না। তাহলে কী কাজ ছিলো? এই তিন বছরের মধ্যে ওই বিষয়ে আরও ডাক্তার তৈরি করা দরকার ছিলো। কিন্তু আমাদের দেশে একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যে পরিমানে কার্ডিওলোজিস্ট, গাইনোকলিজিস্ট, হেপাটোলজিস্ট তৈরি হচ্ছে, সে পরিমাণে ফিজিওলোজি আর এনাটমি বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছেন না। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে? বেসিক মেডিকেল সাইন্স শিখাবেন যারা সেরকম বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছে না। সকলে এপলাইড মেডিকেল সাইন্সে দিকে যাচ্ছে। যদি সকলেই কার্ডিওলজিস্ট, হেপাটোলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট হয়ে যায়- তাহলে এনাটমি, ফিজিওলোজি কে পড়াবে? ফলে এইসব জায়গাতে প্রণোদনা দিয়ে শিক্ষক তৈরি করতে হবে,  ভালো ল্যাবরেটরি তৈরি করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- দেশে এতো অপরাধ হচ্ছে, অথচ ফরেনসিক মেডিসিনে বড় কোন প্রকল্প নাই। ৬৪ জেলায় ৬৩টি আধুনিক মর্গ নাই, পোস্ট মর্টেম করার জায়গা নাই। আমি মনে করি শুধু ৬৪ জেলায় নয়, প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক মর্গ থাকা উচিত। একটা হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হলে যেসব মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন আছে, সেগুলো যদি হয়, তাহলে সেটা কোথায় হবে? এখনও ভিসেরা পাঠাতে হয় মহাখালীতে। এটা কি যুক্তিযুক্ত?

একটা দেশে যেখানে আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আছে, সেখানে অটোপসি (ময়নাতদন্ত) নিয়ে কোন আইন নাই। যদি এমন কোন রোগী যদি মারা যান, যার কোন ডায়াগনোসিস হয়নি, তাহলে রোগীর আত্মীয়-স্বজনের অনুমতিতে বা শিক্ষার প্রয়োজনে অটোপসির প্রয়োজন হয়। জানার চেষ্টা করা হয় যে এই রোগী কেন মারা গেল? এটা কি নতুন কোন রোগ? কিন্তু এই ব্যবস্থাটা আমাদের বাংলাদেশে নাই। আমাদের অটোপসি বিষয়ক কোন আইন নাই এবং অটোপসির কোন ব্যবস্থা নাই। একটা আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, একটা শিক্ষামূলক হাসপাতালে (ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) অটোপসি হয় না। এটা পৃথিবীতে কেউ বিশ্বাস করার মতো? এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। আমাদের মানুষকে প্রয়োজনে সচেতন করতে হবে। একটা সময় তো সাধারণ মানুষ টিকা দিতে বাধা দিতেন, নানা রকম জ্বীন ভূতের উদাহরণ দিতেন -সেগুলো আমরা দূর করেছি। সুতরাং অটোপসি নিয়েও সাধারণ মানুষকে বুঝাতে হবে। সবমিলিয়ে আমার কথা হলো- স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় করার মতো অনেক কাজ আছে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ণ করা খুবই জরুরী।

মেডিভয়েস: বর্তমান সরকার প্রতিটি বিভাগে একটি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন এবং স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে এর ভূমিকা নিয়ে কিছু বলুন।
ডা. আব্দুন নূর তুষার: আমাদের এখানে একটা ভূল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। আমরা ধরে নিয়েছি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চিকিৎসা সেবা দেয়ার প্রতিষ্ঠান, আসলে এগুলো চিকিৎসা সেবা দেয়ার প্রতিষ্ঠান না, বরং চিকিৎসা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আউটডোর খুলে এই যে বিরাট সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দেন, এটা আসলে যৌক্তিক না। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে থাকবে শুধুমাত্র রেফার্ড পেশেন্ট, যারা সারা বাংলাদেশ থেকে যেসব রোগী অত্যন্ত জটিল, যেসব রোগের চিকিৎসা খুবই কঠিন, যার জন্য উন্নত ব্যবস্থা ও অনেক ভালো ডাক্তার দরকার -এই ধরণের রোগীদের তারা ভর্তি করবেন এবং চিকিৎসা দিবেন। অথবা রাষ্ট্র যাকে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য দরকার মনে করবে, এমন রোগীদেরকে চিকিৎসা দিবেন। কিন্তু আমাদের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মেডিকেল কলেজের মতোই। এটা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক।

একটু ভাবুন তো, ৬৪টা মেডিকেল কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় করলেই কি দেশের শিক্ষা আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হবে? মোটেও না। বরং ডাক্তারি পেশার কিছু লোকজনকে নিয়ে প্রশাসনিক কিছু কাজে নিয়োজিত করা হবে। আর এটা আসলে আমাদের পেশার জন্য ক্ষতিকর। যেসব ডাক্তার এডমিনিস্ট্রেটর হতে চান, তাদেরকে আগেই থেকে আলাদা সিস্টেমে নিয়ে এডমিনিস্ট্রেটিভ প্লেনিং করানো উচিত। তারা সেখানে চিকিৎসা করবেন না, তারা শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পরিচালনা করবেন -এই সিস্টেমে যাওয়া উচিত। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে, দেশের শ্রেষ্ট নিউরোলজিস্ট, নিউরোসার্জনকে প্রতিষ্ঠানের ভিসি বানিয়ে ক্লিনারের চাকরি, সুইপারের চাকরি, নার্সের চাকরি -এসব নিয়ে তাকে ব্যস্ত করে দেয়া হয়। তখন তিনি কোথায় থেকে বিছানা কিনবেন, অক্সিজেন সাপ্লাই কোথায় থেকে হবে, হাসপাতালের ফ্যান-লাইট বেশি দামে কেনা হচ্ছে কিনা, টেন্ডার দেখাশোনা করা -এসব হয়ে যায় তার কাজ। এটা কি একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ক্ষমতার ভূল ব্যবহার মনে হয় না? সুতরাং আমার মনে হয় যে, দেশে এতো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় না করে বরং প্রত্যেক জেলার জনসংখ্যা ও অন্যান্য তথ্যের বিবেচনায় আরও আরো টার্শিয়ারি লেভেলের হাসপাতাল তৈরি করা উচিত। এতো ডাক্তার তৈরি করার তো কোন প্রয়োজনীয়তা নাই।

এখন বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি ডাক্তার তৈরি হচ্ছে এবং এর সঙ্গে বিশেষজ্ঞও তৈরি হচ্ছে। আমি মনে করি, বিশেষজ্ঞ তৈরি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নাই, মেডিকেল কলেজগুলোতে এমডি, এমএস রেসিডেন্সি কোর্স চালু করে মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থাকে চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে আলাদা করে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে এই বিষয়গুলোকে সমাধান করা যায়।

মেডিভয়েস: দেশে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এসব মেডিকেলের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: মেডিকেল শিক্ষা ব্যাবস্থার মান নিয়ন্ত্রণে যাদের দায়িত্ব, তারা যদি সে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন বা করতেন, তাহেল তো এই প্রশ্নগুলো উঠতো না। মান নিয়ন্ত্রণের তো আইন আছে, মান নিয়ন্ত্রণ কিভাবে হবে সেটা সবাই জানেন। সেটাকে সঠিকভাবে প্রযুক্ত করলেই এই সমস্যা সমাধান করা যাবে। আর উপযুক্ত শিক্ষক তৈরির যে প্রক্রিয়া, সেটা তৈরি করাও খুবই জরুরী। আমাদের দেশে মেডিকেল শিক্ষা যারা দেন, তারা কিন্তু শিক্ষায় কোন ডিগ্রি নেন না।

আপনি দেখবেন যে, স্কুলে-কলেজে শিক্ষা দিতে গেলে বিএড/এমএড করতে হয়। আপনি দেখবেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়েও কোন কাউকে শিক্ষকতা করতে হয়, তাহলে তাকেও নানা ধরনের শিক্ষকতা শেখার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেতে হয়। আর মেডিকেল কলেজের শিক্ষক হতে গেলে আপনাকে মেডিকেল কলেজে পোস্টিং হতে হবে, তাহলেই আপনি লেখাপড়া করাতে শুরু করে দিবেন। আর যারা পড়াতে আসেন, তাদের পড়ানোর উপরও কোন ট্রেনিং হয় না। আমার মনে হয় মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থায় যারা যুক্ত, তাদেরকে শিক্ষক হিসাবেও ট্রেনিং দেওয়া জরুরি। কারণ, তারা তো ভাইভা নিবেন, পরীক্ষা নিবেন। কী করে পরীক্ষা নিতে হয়, কী করে পরীক্ষার খাতা দেখতে হয়, ছাত্রদের প্রতি তার দায়িত্ব কী, পড়াবেন কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে -এই বিষয়গুলো তাদের শেখানো খুব জরুরী। কিন্তু সেটা না করে ধরে নেওয়া হয় যে, আপনি হেপাটলোজিতে ডিগ্রি করেছেন বলেই আপনি হেপাটোলজির ভালো টিচার। ব্যপারটাতো আসলে এরকম না। যিনি উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, তিনি যে ভালো গানের শিক্ষক হবেন, এটা তো নাও হতে পারে।

মেডিভয়েস: উচ্চতর শিক্ষাকালীন সময়ে জটিলতার কারণে অনেক চিকিৎসক সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, এটা একজন চিকিৎসকের জীবনে কতটুকু নেগেটিভ প্রভাব তৈরি করে?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: একজন সরকারি চাকরিজীবীর উচ্চতর শিক্ষায় আমাদের যে সিস্টেমটা রয়েছে, সেটা খুবই অবৈজ্ঞানিক। একজন মেধাবী চিকিৎসক, তিনি কিন্তু যৌক্তিকভাবেই দ্রুত উচ্চশিক্ষা পাওয়ার জন্য যোগ্য। কারণ সে অন্যান্যদের থেকে বেশি মেধাবী এবং অন্যান্যদের থেকে মেধা ও যোগ্যতায় বেশি এগিয়ে আছেন। কিন্তু যখনই তিনি সরকারি চাকরি পান, তার জন্য সরকারের একটি ঢালাও নিয়ম হলো- এতো বছর গ্রামে বা শহরের বাইরে চিকিৎসা দিতে হবে, তারপর তিনি উচ্চশিক্ষা নিতে পারবেন। তারমানে আপনি একজন উপযুক্ত লোককে দুই/তিন বছর উচ্চশিক্ষা নিতে দিলেন না। অর্থাৎ একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তিন বছর পরে সিস্টেমে আসবে। আমার মনে হয় এটা একটা ভূল নিয়ম। নিয়মের সংস্কার করে এমন হওয়া উচিত যে, আপনার এমবিবিএস লেভেলের শিক্ষায় আপনার যে রেজাল্ট, সেটাকে আমলে নিয়ে যাদের রেজাল্ট ভালো তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল করা উচিত। এবং শুরুতেই বিসিএস চাকরি দিয়ে যারা সরকারি চাকরিতে যোগ দেন, তাদের বেলায় বিসিএসের রেজাল্ট এবং তার মেডিকেল কলেজের রেজাল্টের সকল নম্বরকে একত্র করে অধিকতর নম্বর যারা পেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে এই নিয়ম শিথিল করে দ্রুত উচ্চশিক্ষায় পাঠানো উচিত। তাহলে দেশ দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাবে।

দ্বিতীয়ত হলো- বাংলাদেশের সকলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হয়ে যাচ্ছেন, ফলে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় উল্টো একটা পিরামিড তৈরি হচ্ছে। নিচের দিকে চিকিৎসক নাই, এমবিবিএস কমে যাচ্ছে আর উচ্চশিক্ষার লোক বেড়ে যাচ্ছে। সরকারি চাকরিতেও এমনটা হচ্ছে। কিন্তু সে পরিমান পদ নাই, ফলে দেখা যাচ্ছে, নিন্ম পদ থেকে অর্থের সংস্থান হচ্ছে আর কিন্তু উচ্চ পদে তারা প্রমোশন পেয়ে যাচ্ছেন। এতে করে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং চাকরি ব্যবস্থা দুই জায়গাতেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। তাই আমার মনে হয় এই জায়ংগাতেও সংস্কার আনা উচিত।

তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে, উচ্চশিক্ষায় কাউকে বাধা দেয়ার অর্থ হচ্ছে- আপনি তাকে তার উন্নয়নে বাধা দিচ্ছেন। কেউ সরকারি চাকরি পাবে, কিন্তু এখানে তার উন্নয়নকে তিন বছরের জন্য স্থগিত করে রাখা হচ্ছে। এটা এখনও সরকার পারছেন, কারণ দেশে সরকারি চাকরি অনেক লোভনীয়। কিন্তু এখন থেকে ৪/৫ বছর পরে দেখা যাবে যে, চিকিৎসকরা শুধু তাদের এই নিয়মের কারণে চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন না।

এই যে চিকিৎসকরা হতাশ হয়ে যান, তার একটি বড় কারণ হচ্ছে- তারা যে দুই বা তিন বছর বাইরে কাজ করবেন, এই বাইরের কাজটিকে তার ট্রেনিং হিসাবে কাউন্ট করা হয় না। এছাড়া তার ভবিষ্যত চাকরি জীবনে এটার কোন মূল্য নাই। এক কথায় ভ্যালুল্যাস। কিন্তু একই সময়ে যদি কেউ সরকারি চাকরি না পান, তাহলে কিন্তু তিনি সরাসরি কোথাও ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, বিদেশে গিয়ে কোথাও পড়াশোনা করতে পারেন অথবা আর কিছু না হোক, সে ট্রেনিং নিয়ে নিজেকে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করে নিতে পারেন। আর যারা কিনা বেশি যোগ্যতা থাকার কারণে বিসিএসে কোয়ালিফাই করলেন, বেশি যোগ্যতা থাকার কারণে তারা পড়াশোনায়ও ভালো করেছেন, তারা দেখা গেলো যে পিছিয়ে পড়েছেন। আর যে বিসিএসে চাকরি পেলো না, কিন্তু দেখা গেলো যে সে ভর্তি পরীক্ষায় কোথাও ঠিকে গেলো, সে বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে গেলো অথবা কোন একটা ট্রেনিং করলো -এক্ষেত্রে সে কিন্তু ক্যারিয়ারে তার থেকে এগিয়ে গেলো। এই বিশৃংঙ্খলা কেন তৈরি হবে?

আমি মনে করি যে, যোগ্য মানুষকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী দ্রুত উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। এটা যদি না করা হয়, তাহলে কিন্তু সেই চিকিৎসক হতাশ হয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি এই নিয়মটা দ্রুতই সংস্কার করা জরুরি। আরেকটা ব্যাপার হলো- দেখা যায় যে, যারা বিএসএমএমইউতে পড়াশোনা করছেন, রেসিডেন্সিতে আছেন, তাদের জন্য উপযুক্ত ডরমেটরি নাই, যেগুলো আছে খালি থাকে না। যেহেতু অনেকেই সময় মতো পাস করেন না, ডরমেটরিতে যারা আছেন, তাদেরকে দীর্ঘদিন থেকে যেতে হয়। এছাড়াও অনেককে আজিজ মার্কেটে, শাহবাগে, পরীবাগেসহ বিভিন্ন জায়গাতে মেস করে থাকতে হয় অথবা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়। এটা তো আসলে চিকিৎসকদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ হচ্ছে না। তাই আমার মনে হয় যে, চিকিৎসকদের জন্য অনেক জায়গায় কাজ করার আছে। সমস্যাগুলোকে চিহিৃত করে আলাদা আলাদা এই সমস্যাগুলোকে এড্রেস করা উচিত।

মেডিভয়েস: স্যার, হেলথ জার্নালিজম নিয়ে কিছু বলুন। বাংলাদেশে হেলথ জার্নালিজম নিয়ে কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়ায়ায় কিনা?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বিষয়ক সাংবাদিকতা খুব আধুনিক না। এর বড় কারণ হলো- আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতা বিভাগে এই বিষয়টিকে আলাদাভাবে কোন এড্রেস করা হয় না। কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে যারা রিপোর্ট করবেন বা যারা কাজ করবেন, তাদেরকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে সম্মুখ ধারণা রাখা প্রয়োজন। শুধু তাই না, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গেলে যে রোগটি নিয়ে কথা হচ্ছে, যে রোগী কমপ্লেইন করছেন অথবা অব্যবস্থাপনা নিয়ে নিয়ে আপনি কথা বলছেন -এই বিষয়ে গভীরভাবে জানাও দরকার। তাই হেলথ জার্নালিজম বা হেলথ কমিউনিকেশন নিয়ে আলাদা কোন ডিগ্রি বা আলাদা কোন ডিপ্লোমা অথবা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি।

সরকারি চাকরিতে যারা যোগ দেন, তারা সাংবাদিকদের কিভাবে হ্যান্ডেল করবেন, তারা মিডিয়াতে এসে কিভাবে কথা বলবেন -এটাও নির্ধারণ করা খুবই জরুরি।  আমি মনে করি যে, এই পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কোন মুখপত্র নাই। আইইডিসিআর, যারা সংক্রামক ব্যাধি ও নানান ধরনের জনস্বাস্থ্যমূলক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঘোষণা দিবেন, আপনি দেখবেন যে তাদের নোটিশে নানা ধরনের ভূল থাকে। এটাতো আসলে গ্রহণযোগ্য না। আমার মনে হয় যে, সেখানেও একজন ভালো মুখপাত্র নাই, যিনি মিডিয়ার সামনে এসে সুন্দর করে, বুঝিয়ে কথা বলতে পারবেন। পদে থাকলেই তিনি কথা বলার যোগ্য, এটা ভাবার একটা অদ্ভুত ধারণা বাংলাদেশে প্রচলিত আছে। অর্থাৎ ওনি বস, ওনিই কথা বলবেন -এটাতো ঠিক না। কথা বলার লোক আলাদা হবেন, বস বলে দিবেন যে, আপনি এই বিষয়টা ভালো করে বুঝিয়ে বলবেন আর ওনি সেটা করবেন। কিন্তু এখানে দেখা যায় যে, যিনি পাদাধিকারে আছেন, তিনিই পদাধিকার বলে সব কথা বলেন। এই অনাধুনিক ও অনগ্রসর চিন্তা থেকেও বের হয়ে আসা উচিত।

আমাদের এখানে যারা জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন, তাদের কি রেগুলার মিডিয়া কমিউনিকেশনের বিষয় আছে? তারা কি নিয় হেলথ জার্নালিস্টদের জন্য কোন প্রকার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করছেন? শুধু মিডিয়াকে দোষ দিলেই হবে? গালিগালাজ করলেই হবে? এটা তো ঠিক না। মিডিয়াকে দোষ দেয়ার আগে আমরা নিজের দায়িত্ব নিজে পালন করছি কিনা সেটাও তো দেখতে হবে।

মেডিভয়েস: আপনি নিজেই একজন ডাক্তার, সেইসাথে একজন সাংবাদিক। ডাক্তাররা সাংবাদিকতায় আসতে পারে কিনা বা তাদেরকে গনমাধ্যমের সাথে সংযুক্ত করা যায় কিনা -এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: ডাক্তাররা সাংবাদিকতায় আসবে কি আসবে কিনা এই প্রশ্নটা বহুদিনের। আমি মনে করি, কোন ডাক্তার যদি সাংবাদিকতা করতে বেশি পছন্দ করেন, তাহলে তিনি আসতেই পারেন। তবে, একজন ডাক্তার যে পেশাতেই আসুক না কেন, তাকে ভালো করে জেনে আসতে হবে। নয়তো ভূল করার সম্ভবনা বেড়ে যায়, ফলে তখন উপকারের তুলনায় ক্ষতির পরিমান বাড়ে। তাই কোন ডাক্তার যদি মনে করেন তিনি সাংবাদিক হবেন বা অন্য কোন ক্যারিয়ার বেছে নিবেন, তাহলে তাকে সেই ক্যারিয়ার সম্পর্কে ভালো করে জেনে আসা উচিত। যাতে এমন না হয়, যা হওয়ার কথা ছিলো সেটাও হারালেন আবার যেটা হতে আসলেন সেটা খুব বেশি ভালো করলেন না।

মেডিভয়েস: ঢাকার দুই সিটিতেই নতুন নগর পিতা এসেছেন, তাদের প্রতি একজন চিকিৎসক ও নাগরিক হিসাবে আপনার চাওয়া বা পরামর্শ কী?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: নতুন কিংবা পুরাতন নয়, সকল নগর পিতার প্রতি একজন নাগরিক হিসাবে আমার একটা পরামর্শ আছে। তা হলো- নাগরিক স্বাস্থ্য এবং নগরের স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের নগরগুলো যেটা করেন, শুধুমাত্র মশা মেরে কিংবা ড্রেন পরিস্কার করেই করেই ভাবে যে, নগরের জনস্বাস্থ্যের যা কাজ করার তা হয়ে গেলো। নগর স্বাস্থ্য নিয়ে আলাদা চিন্তা করতে হবে। নগরের স্বাস্থ্য শুধুমাত্র ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া নয়, এই যে আজকে করোনা ভাইরাস চলে আসছে, কালকে যে আরেকটা ভাইরাস আসবে না -এমনটার তো কনো নিশ্চয়তা নাই। প্রতিনিয়ত নগরের মানুষের স্বাস্থ্যকে ভালো রাখার জন্য নগরকে দুষণমুক্ত রাখা এবং এর একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা থাকা জরুরি। এই নগরের পরিকল্পনা নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা নগরের বাসস্থান, রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, ড্রেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিকল্পনা করেন এবং এগুলো নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হয়। কিন্তু নগরের স্বাস্থ্য নিয়ে তেমন কথাবার্তা হয় না এবং স্বাস্থ্য নিয়ে বড় কোন পরিকল্পনা বা বাজেটও নাই।

একটা খুব সাধারণ বিষয় আছে, তা হলো- যেকোন সিটি কর্পোরেশন কিন্তু ঐ নগরের স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা। আমরা গত ত্রিশ বছরে এই ধরণের কোন স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখিনি। আর মাঝেমধ্যে দুই/একটা যা হয়, সেটা তারা বস্তির স্কুলে গিয়ে করতে শুরু করেন। যেন বস্তির স্কুলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং ঐখানকার ছাত্রছাত্রীদেরকে এক/দুই দিন ডাক্তার বা কেউ গিয়ে দেখলেই কাজ হেয়ে গেলো। এটা তো ঠিক না। নগরের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা নিয়ে প্রকৃত অর্থেই গুরুত্বের সাথে কাজ করতে হবে। নাগরিকের স্বাস্থ্য যদি খারাপ হয়, তাহলে সেই নাগরিক কাজ করতে পারবে না। সেই নাগরিক মানসিক ও শারিরীকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং তখন এই কারণে অধিকতর উত্তেজিত হবে। সে কর দিতে পারবে না, কারণ সে আয় করতে পারবে না। সে নগরের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমার মনে হয়, নগর পিতাদের গুরুত্বের সাথে নাগরিকের স্বাস্থ্য এবং নগর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা উচিত।

মেডিভয়েস: দূষণে শীর্ষে বাংলাদেশ, বিশেষ করে ঢাকা নগরী। এটা জনস্বাস্থ্যে কতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে এবং এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের উপায় কী?
ডা. আব্দুন নূর তুষার: আমরা যখন দূষণ নিয়ে কাজ করি, তখন প্রবণতা হচ্ছে- গাছ লাগান দূষণ কমে যাবে। পরিষ্কার করেন, দূষণ কমে যাবে। আসলেই কথা ঠিক। কিন্তু এর পাশাপাশি অভ্যাস পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু এই বিষয়ে নগরগুলো কোন কাজ করে না।

একটু ভাবুন তো, দূষণ তৈরি করে কে? আমরা যদি দুষণ পরিষ্কার করি, গাছ লাগাই তাহলে গাছ কাটলো কে? ময়লা করলো কে? দূষণকে তার সোর্স থেকে কমাতে হয়। একদিকে দূষণ পরিষ্কার করতে থাকবেন, আরেকদিকে দূষণ তৈরি করতে থাকবেন -এটা তো ভূল পরিকল্পনা। অর্থাৎ শুধু গাছ লাগিয়ে বা শুধু পরিষ্কার করে দূষণ রোধ করা যাবে না। এক্ষেত্রে নতুন দূষণ যাতে তৈরি না হয়, সেটা বন্ধ করতে হবে এবং পুরাতন দূষণ কমিয়ে আনতে হবে। এটা করতে গেলে একই কথা, দূষণ নিয়ন্ত্রণে আধুনিক পরিকল্পনা খুবই জরুরি।

এছাড়াও নগর জীবনের দূষণের কারণে সারা বাংলাদেশই যে আজকে দূষিত হয়ে উঠছে, এর কারণ হচ্ছে- আমাদের আচরণের পরিবর্তন নাই। আমাদের নাগরিকদের আচরণের পরিবর্তন আনতে পারলেই কেবল কার্যকরিভাবে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর পাশাপাশি আমি একটা সাধারণ প্রশ্ন করবো। তা হলো- নগরের বর্জ্য পরিষ্কার করতে যে ট্রাক্টগুলো প্রতিদিন চলে, সেগুলো একদম খোলামেলাভাবে একস্থান থেকে অন্যস্থানে বর্জ্য নিয়ে যায়। সে ট্রাকগুলো যে প্রতিদিন ধোঁয়া ছাড়ে, সেগুলো কী দূষণ করে না? নগরীর বিভিন্ন খোলা জায়গাতে যে ময়লা ফেলা হয়, এটা কী দূষণ তৈরি করে না? ধরেন আপনি ময়লা ফেললেন ডাস্টবিনে, কিন্তু সেখান থেকে বর্জ্য যখন ডাম্প করতে নিয়ে যাচ্ছে, তখন যে খোলা ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন -সেটা দূষণ তৈরি করে না? প্রায়ই দেখা যায় বেলা ১০/১১টায়, দুপুর ২টা বা ৪টায় যে সময়ে রাস্তায় সবচেয়ে বেশি জনগন, তখন ময়লার ট্রাক ময়লা ফেলতে ফেলতে যাচ্ছেন -তখন কী দূষণ তৈরি করে না? ফলে আচরণ পরিবর্তন করতে না পারলে কোনভাবেই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব না। আমাদেরকে সবার আগে আমাদের আচরণ বদলাতে হবে, তাহলেই অবস্থা ও পরিবেশের পরিবর্তন আসবে।

মেডিভয়েস: দীর্ঘদিন যাবৎ চিকিৎসকদের অধিকারসহ নানা দাবিদাওয়া নিয়ে কাজ করছে মেডিভয়েস, এক্ষেত্রে আপনার কোন পরামর্শ আছে কিনা? থাকলে বলুন।
ডা. আব্দুন নূর তুষার: মেডিভয়েসকে অনেক শুভেচ্ছা। মেডিভয়েস দীর্ঘদিন যাবৎ চিকিৎসকদের এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যারা কাজ করেন, তাদের জন্য সঠিক সংবাদ এবং তথ্য পরিবেশন করনে। শুধু তাই না, বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসকদের নানা দাবি দাওয়াসহ প্রয়োজনীয় নানা তথ্য তুলে ধরেন। তাই আমি মাঝেমাঝেই মেডিভয়েস ফলো করি।

শুধু চিকিৎসকদের অধিকারই তো আসলে অধিকার না। সাধারণ মানুষের অধিকার এবং চিকিৎসকদের অধিকারকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। একজন চিকিৎসক যখন রোগী, তারও তো সুচিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। চিকিৎসক তো আর নিজের চিকিৎসা নিজে করতে পারেন না। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে কথা বলা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল দায়িত্ব কী? এর মূল দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। সেটা করতে গেলে যা যা কিছু দরকার, মেডিভয়েসকে সব বিষয়েই কথা বলা জরুরি। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন থেকে শুরু করে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতের জন্য এমন একটা পরিকল্পনা করা -যে পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের যে ক্রমবর্ধমান চাহিদা, সেই চাহিদাকে পূর্ণ করার লক্ষ্যে আমাদের যা যা করা দরকার, তা করতে হবে।

আজতে আমরা খুবই বলছি বাংলাদেশের বিরাট তরুণ সম্প্রদায় এবং তারা কাজ করে আমাদেরকে বিশাল উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই কথা যেমন সত্য, তেমনি এটা তো সত্য যে- এই বিরাট জনসংখ্যা আগামী ৩০/৩৫ বছর পর বৃদ্ধ জন সংখ্যায় পরিণত হবে। ফলে আমাদের দেশে বিরাট সংখ্যক একটা বয়স্ক জনগোষ্টি তৈরি হবে। সেই বয়স্ক জনগোষ্ঠির জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা কী বাংলাদেশ তৈরি করছে? মনে রাখতে হবে যে, বয়স্কদের রোগ আর তরুণদের রোগ এক কথা নয়। বয়স্কদের প্রচুর পরিমানে অসংক্রামক রোগ হয়, বিশেষ করে- কিডনীর রোগ, ফুসফুসের রোগ, হার্টের রোগ, ব্রেইনের রোগ হবে। ক্যান্সারসহ এই জাতীয় রোগ বাড়বে। কারণ, বয়স বাড়লে মানুষের এই জাতীয় রোগগুলোবেশি হয়। এর জন্য সঠিক ও সুচিকিৎসা কী বাংলাদেশ প্রস্তুত করছে? এই বিষয়গুলো মেডিভয়েসকে তুলে ধরতে হবে। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত যারা আছেন, তাদের প্রত্যেকের অধিকার নিয়ে কথা বলা উচিত। আমি মনে করি এই কাজটি শুধু মেডিভয়েস না, এফডিএসআরসহ আরও যেকয়টি সংগঠন আছে, তাদের প্রত্যেকের প্রধানতম কাজ হওয়া উচিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সাহায্য করা। অর্থাৎ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পরামর্শ দিয়ে, অধিকারজনিত দাবি জানিয়ে, কর্মসূচি পালনসহ নানা উপায়ে মানুষের সুস্বাস্থ্য-সুচিকিৎসা ও মানুষের বাচাঁর অধিকারকে নিশ্চিত করা। সেটা যদি আমরা করতে পারি, তাহলেই কেবল এই উন্নয়নের সুফল আমরা ভোগ করতে পারি। এতো রাস্তাঘাট, এতো ফ্লাইওভার, এতো উন্নয়ন সবই নিরর্থক হবে যদি না এর সুফল পাওয়ার জন্য আমরা বেচেঁ না থাকি। অথবা আমরা এমন অসুস্থ জীবনযাপন করি, যে অসুস্থতার মধ্যে এর কোন আনন্দই আর পেলাম না।

তাই নাগরিকের স্বাস্থ্য যদি নিশ্চিত না হয়, তবে এসব কিছুই ব্যর্থ হবে। কারণ, একদল অসুস্থ লোকের জন্য ফ্লাইওভারই কী? আর ২০ তলা দালনই কী? আর কবরস্থানই কী? তাদের কাছে সবই এক। এই জন্য আমাদেরকে কথা বলা খুবই জরুরি। আমাদেরকে বলতে হবে, দাবিদাওয়া জানাতে হবে এবং আমাদের সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

যা কিছু প্রিয়:

প্রিয় রঙ: সব রঙই আমার প্রিয়। মানুষ তো রং দেখতে পায় বলেই পৃথিবীকে এতো সুন্দর দেখে।

প্রিয় পোশাক: যা কিছু পড়লে আরাম লাগে, সেসব পোষাকই আমার প্রিয়।

প্রিয় গান: প্রিয় গান অনেক। তাই আলাদা করে বলা কঠিন।

প্রিয় শিল্পী: প্রিয় শিল্পীও অনেক। ছোটবেলায় প্রিয় শিল্পীর নাম বলতে পারতাম। কিন্তু এখন তা বলা কঠিন।

প্রিয় খেলা: ফুটবল, ক্রিকেট। আমি একসময় ফুটবল, ক্রিকেট দুটাই খেলতাম।

প্রিয় লেখক: প্রিয় লেখক অনেকেই। আমি বই পড়তে খুব পছন্দ করি। বহু লেখকের লেখা আমার ভালো লাগে। ভালো লেখকদের প্রায় সব লেখাই আমি পড়ে ফেলার চেষ্টা করি।

প্রিয় বই: এতো বেশি বই আমি পড়েছি, এখান থেকে প্রিয় বই খুঁজে বের করাটা খুবই কঠিন। আমি আসলে জীবনের প্রায় সকল অর্থই বইয়ের পিছনে ব্যায় করেছি। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে প্রায় ১৫ হাজার বই আছে।

অবসরে যা করেন: বই পড়ি, গান শুনি, ছবি দেখি, সৃষ্টিশীল কাজ করার চেষ্টা করি। মাঝেমধ্যে লিখি। আমার অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে, আবার অনেক বই অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এছাড়াও বিতর্কের সংগঠন করি, সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলি।

 

Add
মেডিভয়েসকে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিপসম পরিচালক

মেধাবীরা পাবলিক হেলথে আসলে স্বাস্থ্যসেবায় গুণগত পরিবর্তন আসবে   

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি