ডা. মো. আজিজুর রহমান

ডা. মো. আজিজুর রহমান

কনসালট্যান্ট, 
শিশু কিডনি বিভাগ,
কিডনি ফাউন্ডেশন হসপিটাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ঢাকা।


০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ১২:৩৩ পিএম

সোনামণিদের একিউট কিডনি ইনজুরি: কারণ ও করণীয়

সোনামণিদের একিউট কিডনি ইনজুরি: কারণ ও করণীয়

দৈনন্দিন জীবনে অনেক সময় হঠাৎ করেই নানা অসুবিধা কিংবা অসুখ-বিসুখে পড়ে আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারি না। তেমনি আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ঠিক একইভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। 

এমনিভাবে আমাদের কিডনি যদি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে কাজ করতে না পারে, তাহলে আমরা ডাক্তারি ভাষায় তাকে একিউট কিডনি ইনজুরি বলে থাকি। আগে এটাকেই একিউট রেনাল ফেইলিউর বলা হত। 

কিডনি আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর অন্যতম। আমরা যা কিছু খাই তা খাদ্য হোক কিংবা ওষুধ; সেটা থেকে যে বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয় তার বেশিরভাগ অংশই প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে নির্গত হয়। এ কারণেই কি কি করলে আমাদের কিডনি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তা জেনে সে গুলো থেকে দূরে থাকাই ভালো। কিডনি একবার ক্ষতিগ্রস্থ হলে ধীরে ধীরে তার কার্যক্ষমতা কমে বিকল হয়ে যেতে পারে। 

কারণ: 

যেসব কারণে একিউট কিডনি ইনজুরি হয়ে থাকে সেগুলোকে ৩ ভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা: 
১. প্রি-রেনাল (Pre-Renal), 
২. রেনাল (Renal) এবং 
৩. পোস্ট-রেনাল (Post-Renal).

প্রি-রেনাল কারণের মধ্যে ডায়রিয়া, রক্তপাত, শক, নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম, লিভার ও হার্ট ফেইলিউর গুরুত্বপূর্ণ ।

রেনাল কারণের মধ্যে রয়েছে Renal Vessel Obstruction, AGN Vasculitis, Acute Tubular Necrosis etc.

পোস্ট-রেনাল কারণের মধ্যে আছে Posterior Urethral valve, PUJ Obstruction, UVJ Obstruction, Tumour Stone, Neurogenic Bladder etc.
এর মধ্যে যেগুলো আমাদের সাধারণ মানুষের জানা দরকার, সেগুলো সম্মন্ধে কিছুটা আলোচনা করবো।

ডায়রিয়া ও বমি: 

ডায়রিয়া ও বমি হলে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ পানি ও লবন বের হয়ে যায়। কিডনি প্রস্রাব তৈরির জন্য পর্যাপ্ত পানি পা য়না ফলে কিডনি ইনজুরি হয়।

রক্তপাত: অতিরিক্ত রক্তপাত হলেও একইভাবে একিউট কিডনি ইনজুরি হয়।

নেপ্রোটক্সিক অ্যাজেন্ট (Nephrotoxic Agent):অর্থাৎ কিডনির জন্য ক্ষতিকর পদার্থ গ্রহণ। এই পদার্থ কিংবা ওষুধগুলো আমাদের জানার দরকার। যেমন: ব্যথানাশক ওষুধ ডাইক্লোফেন আমরা হরহামেশাই খাই। এটা নেপ্রোটক্সিক ড্রাগ (Nephrotoxic drug).আমরা যেসব ওষুধ খাই বা ইনজেকশন হিসেবে গ্রহণ করি, সেগুলোর একটি নির্দিষ্ট ডোজের চেয়ে বেশি ডোজ ব্যবহার করলেও কিডনি ইনজুরি হতে পারে।

আমাদের দেশে ইচ্ছেমতো দোকান থেকে ওষুধ কেনা যায়, যার কারণে কত মানুষ যে না জেনে নিজের ক্ষতি করছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। 

শিশু চিকিৎসার অন্যতম কঠিন দিক হচ্ছে ওষুধের ডোজ মুখস্থ করা। এ কারণে অনেক ডাক্তার আছেন, যারা শিশু বিশেষজ্ঞ হতে চেয়েও ডোজ মুখস্থ করার ভয়ে তা আর হতে পারেননি। যেসব ডাক্তার এ ব্যাপারে সচেতন তারা সাধারণত শিশুবিষেশজ্ঞের কাছে রেফার করেন। কিন্তু আমাদের দেশে সর্বরোগের চিকিৎসক আছেন কোয়াক এবং গ্রাম্যডাক্তার, যারা কোনো দিন ডাক্তারি পেশায় লেখাপড়া না করেই এক দিনের শিশু থেকে ১০০ বছরের বুড়োদের হরদম চিকিৎসা করে যাচ্ছেন। সেই চিকিৎসার ফলে কত মানুষ ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সে জন্য কারো চিন্তাও নেই জবাবদিহিতাও নেই।

ভুল ওষুধ প্রয়োগের একটা উদাহরণ না দিয়ে পারছি না। এক বিষেশজ্ঞ ডাক্তার এক শিশুকে ডায়রিয়ার চিকিৎসা হিসেবে ম্যাপ্রোসিন (Maprocin) নামের সিপ্রোফ্লক্সাসিন (Ciprofloxacin) গ্রুপের ওষুধ লিখেছেন আর দোকানদার সেটা পরিবর্তন করে রোগীকে দিয়েছেন ন্যাপ্রোসিন (Naprosyn), যা একটি শক্তিশালী ব্যথানাশক Naproxen গ্রুপের। ফলাফল যা হওয়ার তাই। একে তো শিশুর ডায়রিয়া, তার ওপর ব্যথানাশক ভুল ওষুধ। শিশুর প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে অনবরত রক্ত বের হচ্ছিল একদিন পর থেকেই।
প্রায়ই দেখি জ্বর কমানোর জন্য Diclofen Suppository দেওয়া হয়। জ্বরের সময় এমনিতেই কিডনি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তার ওপর Diclofen ব্যবহার করলে সেটার আশঙ্কা অনেক গুন বেড়ে যায়। 

এছাড়া কীটনাশক, খাদ্যবস্তুতে ক্ষতিকর পদার্থ মেশানো, ম্যালেরিয়া, সাপের কামড়, মৌমাছির কামড়, Septicemia থেকেও একিউট কিডনি ইনজুরি হতে পারে ।

লক্ষণ: 

• যদি হঠাৎ করে প্রস্রাবের পরিমাণ ০.৫ মিলি/কেজি/ঘণ্টার চেয়ে কম হয় ১২ ঘণ্টা ধরে অর্থাৎ ১০ কেজি ওজনের শিশু যদি ১২ ঘণ্টায় ৬০ মিলির কম প্রস্রাব করে। অনেক সময় প্রস্রাব বেশি হলেও একিউট কিডনি ইনজুরি হতে পারে ।
• শরীর ফুলে যাওয়া, 
• রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া বা খুব কমে যাওয়া, 
• ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, 
• শ্বাসকষ্ট হওয়া, 
• খিঁচুনি হওয়া, 
• শরীরের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেড়ে যাওয়া বা অত্যন্ত কমে যাওয়া, 
• বমি বমি ভাব। 

করণীয়: 

• প্রথমত যেসব কারণে একিউট কিডনি ইনজুরি হয় সেগুলো থেকে দূরে থাকা;
• ডায়রিয়া বা বমি হলে তরল পানীয় এবং ওরস্যালাইন খাওয়ানো।
• জ্বর হলে তরল খাবার বেশি বেশি খাওয়ানো, 
• অনেক রক্তপাত হলে দ্রুত ভালো হাসপাতালে যোগাযোগ করা, 
• কিডনির জন্য ক্ষতিকর এমন খাবার পরিত্যাগ করা, 
• শিশুদের বয়স ও ওজন অনুযায়ী ওষুধ দেয়া, 
• বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসা পত্র হুবহু মেনে চলা, অর্থাৎ ফার্মেসি/কোয়াক থেকে ওষূধ পরিবর্তন না করা, 
• রক্ত আমাশয়ের পর প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত শিশু কিডনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে দেখা করা, 
• অনেক সময় প্রস্রাব হচ্ছে না দেখে ছোট ক্লিনিকগুলো অনেক স্যালাইন শিরায় পুশ করে হার্ট ফেইলিউর করে ফেলে। এজন্য আমাদের ডাক্তারের বিশেষ তত্ত্বাবধানে শিরায় স্যালাইন দেয়া উচিত।
• মৌমাছি, সাপ বা বিষাক্ত কীটপতঙ্গ কামড় দিলে দ্রুত ভালো মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসা নেয়া।
• সর্বোপরি রোগীর অবস্থা মরণাপন্ন হওয়ার আগেই BSMMU, DMC, NIKDU কিংবা শিশু হাসপাতালে রেফার করা ।

চিকিৎসা: 

• কী কারণে কিডনি ইনজুরি হলো, সেটি বের করে সেই রোগের চিকিৎসা দিতে হবে।
• কিডনি ইনজুরি হলে শিরায় স্যালাইন দেয়া, ক্ষণে ক্ষণে রোগীর রক্ত পরীক্ষা করে রোগীর অবস্থা যাচাই করা।
• রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, 
• যেসব ওষুধ কিডনির জন্য ক্ষতিকর তা একই সাথে প্রয়োগ না করা বা করতে হলে ডোজ সমন্বয় করে দেয়া।
• প্রয়োজন হলে ডায়ালাইসিস করা, সেটা পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস হোক অথবা হিমোডায়ালাইসিস হোক।

উপসংহার: 

পরিশেষে আসুন আমরা সবাই সচেতন হই। আমাদের দুটি কিডনির যত্ন নিই। কারণ একবার কিডনি ইনজুরি হলে প্রাথমিকভাবে ভালো হয়ে গেলেও পরবর্তী কালে ধীরে ধীরে তা বিকল হতে পারে। আমরা যারা শিশুদের ডাক্তার, তারা ওষুধ প্রেসক্রাইব করার সময় ওষুধের ডোজে কিডনির ওপর কতটুকু প্রভাব পড়বে তা চিন্তা করে ওষুধ লিখবো।

সবার কিডনি সুস্থ থাকুক, বিশেষ করে আমাদের সোনামণিদের—এই কামনা রইলো।

প্রধানমন্ত্রীকে অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহর ধন্যবাদ

‘প্রণোদনার ঘোষণায় চিকিৎসকরা উৎসাহিত হবেন’

প্রধানমন্ত্রীকে অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহর ধন্যবাদ

‘প্রণোদনার ঘোষণায় চিকিৎসকরা উৎসাহিত হবেন’

কুর্মিটোলায় করোনা বেড পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

চিকিৎসা না দিলে বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে