ডা. শামছুল আলম 

ডা. শামছুল আলম 

ফ্যামিলি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

 


০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ১১:৫২ এএম

‘শুধু মানুষকে বাঁচালেই হবে না, নিজেকেও বাঁচাতে হবে’

‘শুধু মানুষকে বাঁচালেই হবে না, নিজেকেও বাঁচাতে হবে’

একজন ডাক্তারকে সপ্তাহে একদিন শুধুমাত্র নিজেকে সময় দেয়া উচিত। অনেক জুনিয়র ডাক্তার মনে করেন, যেদিন তিনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়ে যাবেন, তখন অনেক অনেক রোগী আসবেন সেবা নিতে। সেদিন টাকা আর সব সুখ তার ঘরে চলে আসবে। কথা কিছুটা সত্য। আমরা যারা এইসব পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি, তারা এখন কিছুটা সুখ অবশ্যই অনুভব করছি। সবচেয়ে বড় সুখ হলো সামনে কোন পরীক্ষা নেই।  তবে এখানে একটা কিন্তু আছে। সেই কিন্তুটা নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

মনে করুন, আপনি একটা ক্লিনিকে চাকরি করেন। আপনার বেতন মাসিক বিশ হাজার টাকা। আজকে আপনার একটা ইভনিং ডিউটি আছে কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছে না। ক্লান্তি ভর করছে। একটু বাইরে কোথাও বেড়াতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তারপরও আপনাকে কাজে যেতে হবে।  এটার বড় কারন হলো, ‘টাকা’।  ডিউটিটা না করতে পারলে, এক হাজার টাকা মিস হয়ে যাবে।

এইবার মনে করুন, দশ বছর পর আপনি একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হলেন।  কিন্তু আজকে বিকালে চেম্বারে যেতে মন চাইছে না।  ফ্যামিলিকে একটু সময় দিতে ইচ্ছে করছে।  কিন্তু আপনি পারবেন না। জানতে চান কেন? কারন আবারো টাকা।  বিশ হাজার টাকা লস। একসময় যে টাকা আপনি মাসে ইনকাম করতেন। ওই পরিমান টাকা আপনি একদিনেই ইনকাম করতে পারবেন। টাকা প্রতি এমন আগ্রহের পিছনে একটা বড় কারন, আমাদের চাহিদা বৃদ্ধি।  আপনার আয় বাড়বে বিশ গুণ। একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়বে আপনার চাহিদা। আপনার গাড়ি- বাড়ি, বাচ্চা-কাচ্চা, বিদেশ ভ্রমন, আত্মীয় -স্বজনের আবদার। এর সাথে আবার রোগী চলে যাবে। প্র্যাক্টিস কমে যাবে। এইসব ছাড়াও আরও অনেক কারন তখন যোগ হবে।

তাহলে কি বুজলেন? একজন ডাক্তারের জীবন এমনই।  আমাদের মৃত্যু পর্যন্ত কাজ করতে হবে। আয় করতে হবে। চাহিদা মিটাতে হবে। তবে এখানে হতাশার কিছু নেই। সব পেশাতেই জীবনের রঙ ঠিক এমনই। সুতরাং যে কোন কাজেই আমাদেরকে আনন্দ খুঁজে নিতে হবে। কাজকে ভালোবাসার মধ্যেই তৃপ্তি।

কিন্তু একটা দিন।  সপ্তাহে একটা দিন, শুধু মাত্র নিজের জন্য।  কোন কাজ নয়। পড়াশুনা নয়।  কি করবেন এই দিনে ? খুব ভোর বেলায় উঠে, হাত মুখ ধুঁয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্বরণ করতে বসে পড়ুন।  ভালোবেসে মন থেকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন।  যে মানুষের মনে কোন কৃতজ্ঞতা নেই, তার মনে কখনো ভালোবাসা ও শান্তি জন্ম নিবে না। সুতরাং কৃতজ্ঞতা হলো শান্তির প্রথম ধাপ। এরপর সূর্য উঠার আগেই বাইরে একটু হাঁটতে বের হবেন।  ভোর বেলায় সব প্রকৃতিকে দারুণ সজীব আর প্রাণবন্ত দেখা যায়।  কাকের কা কা শব্দও তখন জীবন্ত লাগবে।  এই সময় খেটে খাওয়া মানুষেরা দু’বেলা খাবারের জন্য বেরিয়ে পড়ে।  তাঁদেরকে দেখলে নিজেকেও কেমন মানুষ মনে হয়।  হেঁটে আসুন ঘন্টা খানেক।  তারপর বাসায় ফিরে নাস্তা বানাতে শুরু করুন।  নিজ হাতে রুটি বানাবেন।  আলু ভাজি করুন।  নিজের সঙ্গী থাকলে তার জন্যও নাস্তা রেডি করতে পারেন।  নাস্তা শেষে এক কাপ গরম চা নিয়ে বসুন।  সাথে কেউ থাকলে তাঁর সাথে গল্প জুড়ে দিন।  আর কেউ না থাকলে ইউ টিউবে ছেড়ে দিন। ফরাসি মিউজিসিয়ান আরমান্দ আমারের সুন্দর কোন মিউজিক কিংবা দীপক চোপড়ার কণ্ঠে রুমির কবিতা।  সাবধান এই দিন আপনি কোন পত্রিকা পড়বেন না। 

কয়েকটা খুন, হত্যা, ধর্ষন আর মুলা মন্ত্রীর বাঁশের সেতুর উদ্বোধনের খবর আপনার আজকে না জানলেও কোন সমস্যা নেই।  আপনার একটা মাত্র দিন।  এই দিন ভুলেও ফেসবুক লগ ইন করবেন না।  আজ আপনি কাউকে চিনেন না।  কে কয়টা লাইক পেলো, সেই হিসাব না হয় অন্য কোন দিন করবেন।  আজ আপনার চোখে শুধু আপনার সঙ্গী, যাকে আপনি রোজ ভুলে থাকেন।  ফেসবুকে অনেক বিপ্লব হয় কিন্তু একদিনেই সেটা শেষ হয়ে যায় না।  সুতরাং কালকেও ফেসবুকের আমেজ পাওয়া যাবে। 

এরপর কি করবেন ? ব্যাগ নিয়ে বাজারে যাবেন। একটু পুঁই শাক কিংবা ছোট মাছ যেটা অনেকদিন খাওয়া হয়নি সেটা কিনে আনবেন।  তারপর নিজে রান্নাঘরে গিয়ে রেডি করবেন।  কোনো রাঁধুনি থাকলে ভালো। না হয় নিজেই চেষ্টা করবেন।  কিছু না থাকলে আলু ভর্তা আর ডাল।  এরপর বিকেলে দূরে কোথাও বেড়াতে যাবেন। নদী পাগাড় অথবা বৃক্ষতলে।  তবে নদী হলে ভালো। নদীর একটা ভাষা আছে, সে শুধু সমুদ্রের টানে সামনে এগিয়ে যায়।  আমরাও তাই।  অদভূত এক মায়া আমাদেরকেও তাড়া করে ফিরে।  পাশের থাকা সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করুন, জীবনটা কেমন? সে আপনার সাথে সুখী কিনা? কতদিন জিজ্ঞেস করা হয়নি তাইনা ? রোজ আমরা রোগীদের জিজ্ঞেস করি, "আজ কেমন আছেন?" কিন্তু যার সাথে রোজ ঘুমাই, তাকেই জিজ্ঞেস করা হয়না সে কেমন আছে ? আজ সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে নিজ হাতে বাতি জ্বালান।  আলোর প্রয়োজনীয়তা নিজে না ছড়ালে বুঝা যায়না?

রাতে না হয় হালকা করে খেলেন।  একটা ভালো গল্পের বই নিয়ে বিছানায় যাবেন।  ঘুম না আসলে, সুন্দর কোন মুভি দেখতে পারেন।  সবচেয়ে ভালো হবে, পাশের মানুষটির সাথে গল্প করুন।  আজকের দিনটি নিয়েই গল্প করা যেতে পারে।  গল্প শেষে আরো কিছুটা সময় যদি দেয়া যায় তবে মন্দ হবে না।  একটা সত্যি কথা বলি, বিশ বছর পর আপনি আসলে আর কিছু মিস করবেন না। শুধু মিস করবেন আজকের এই দিনগুলি।  আমরা যারা সব সময় মানুষকে নিয়ে থাকি, আমাদের জন্য এই দিনটি অনেক বেশি প্রয়োজন।  না হয় হয়তো একদিন আমরাই হারিয়ে যাবো।  শুধু মানুষকে বাঁচালেই হবে না, নিজেকেও বাঁচাতে হবে। 

প্রিয় চিকিৎসক, আপনিও মেডিভয়েস অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নে আপনার সুচিন্তিত মতামত, দেশ-বিদেশে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সাফল্য, পুরস্কার, মেডিকেল ক্যাম্পাস, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শসহ লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-[email protected]-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।
Add
মেডিভয়েসকে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিপসম পরিচালক

মেধাবীরা পাবলিক হেলথে আসলে স্বাস্থ্যসেবায় গুণগত পরিবর্তন আসবে   

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না