ডা. মনির হোসেন শিমুল

ডা. মনির হোসেন শিমুল

ইন্টার্ন চিকিৎসক,

গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ। 


০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৯:১৯ পিএম

সন্ধানী এবং ৪৩ বছরের একটি আন্দোলন

সন্ধানী এবং ৪৩ বছরের একটি আন্দোলন
স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি

মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের পরিচালিত স্বেচ্ছাসেবী জাতীয় প্রতিষ্ঠান ‘সন্ধানীর’ ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপদান করা স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত একমাত্র ছাত্রসংগঠন ‘সন্ধানী’। দেশব্যাপী সন্ধানীর ২৫টি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ ইউনিট ও ৯টি ডোনার ক্লাব নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে হাসপাতালের চাহিদামাফিক রক্ত সরবরাহ করার মাধ্যমে। ৪৩ বছরের পথচলার গল্প তুরে ধরা হলো।

স্বেচ্ছায় রক্তদান-একটি সামাজিক আন্দোলন 

৪৪ বছর ধরে দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় রক্তের চাহিদা পূরণ ও অন্ধের চোখে আলো ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপদান করেছে মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সন্ধানী। ১৯৭৭ সালে হঠাৎ একদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক বন্ধু সন্ধানীর সদস্যদের কাছে ছুটে এসে বললেন, ‘বাবার অপারেশন করতে হবে, জরুরি ভিত্তিতে রক্ত প্রয়োজন।’ পেশাদার রক্তদাতাদের অনিরাপদ রক্ত গ্রহণের ভয়ে শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেরাই রক্ত দেবেন। যার ফলশ্রুতিতে ২ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের অধ্যাপক ডা. আবদুল কাদেরের সহায়তায় বাংলাদেশের প্রথম ‘স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির’ আয়োজন করে সন্ধানী। সন্ধানীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইদ্রিস আলী মঞ্জু সবার আগে রক্তদান করেন। মেয়েদের রক্তদান কার্যক্রমে যুক্ত করতে প্রথম রক্ত দিলেন তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী হোসনে আরা লাকী। সবার সহযোগিতায় ঐতিহাসিক ঐদিনে ২৭ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ হলো। এই মহতী উদ্যোগের স্বীকৃতি স্বরূপ এবং স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান কর্মসূচিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপদানের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে দিনটিকেই ‘জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস’ হিসেবে প্রতিবছর সরকারিভাবে পালন করার ঘোষণা দেয় সরকার।

এদিকে অন্যান্য মেডিকেল কলেজের আড্ডায়, বন্ধুদের চায়ের দোকানের আলাপে সন্ধানীর কার্যক্রমের গল্প ছড়িয়ে পড়ল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে রক্তদান কর্মসূচিকে ছড়িয়ে দিতে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় ১৯৭৯ সালের ১৭ জানুয়ারি অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দ্বিতীয় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ঢাকা মেডিকেলের চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ কর্মসূচিতে স্বেচ্ছায় অংশ নিয়ে রক্তদানে কোনো ভয় নেই—এই বিশ্বাসটি প্রতিষ্ঠা করলেন। আরো অনেকের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদও রক্ত দিলেন সেদিন। শহীদ মিনার, বইমেলা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গণজমায়েতে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও উন্মুক্ত রক্তদান কর্মসূচির মাধ্যমে প্রথম বছরে সন্ধানী ২০৭ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করেছিল। বর্তমানে সন্ধানীর ২৫টি মেডিকেল কলেজ ইউনিট ও ৯টি ডোনার ক্লাবের মাধ্যমে বছরে ১,৫০,০০০ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয়।

সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি রোগী কল্যাণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ জানান, কিভাবে রক্ত সংগ্রহ করে সন্ধানী। 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মেডিকেল কলেজগুলো ও বিভিন্ন দিবসে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়মিত রক্তদান ও রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির আয়োজন করি। রোগীর কোনো সুস্থ আত্মীয় অন্যের প্রয়োজনে সন্ধানীতে রক্তে দেবেন—এই বিনিময় পদ্ধতিতে আমরা রক্ত সরবরাহ করি। তবে জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো সময়, যেকোনো হাসপাতালে গরিব ও অসহায় রোগীদের জন্য আমরা রক্ত সংগ্রহ করে দিই। গরিব রোগীদের জন্য সন্ধানী বছরে গড়ে ২০ হাজার ব্যাগ রক্ত বিনাশর্তে সরবরাহ করে।’

রক্তদানের মাধ্যমে শরীরে এইডস, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, হেপাটাইটিস বি ও সি-সহ সংক্রামক ও ঘাতক ব্যাধি রয়েছে কি না, তা বিনা খরচে জানা যায়।

কিভাবে রোগীর কাছে রক্ত পৌঁছে—সে সম্পর্কে কেন্দ্রীয় পরিষদের সহ সভাপতি-২ নুরুল নবী আরাফাত বলেন, ‘আমাদের ইউনিটগুলোর মাধ্যমে প্রতিটি হাসপাতালে জরুরি রক্তের প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বরের তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়, এমনকি ওয়ার্ডগুলোতেও রক্তের প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা থাকে। তা ছাড়া প্রতিটি মেডিক্যালের প্রতিটি ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সম্ভাব্য রক্তদাতার নাম, রক্তের গ্রুপ ও ফোন নম্বরের তালিকা করা হয়। হঠাৎ রক্তের প্রয়োজনে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।’

তিনি আরো বলেন, “যেকোনো সুস্থ মানুষ চার মাস পর পর রক্ত দিতে পারেন। সন্ধানীর কোনো কর্মসূচিতে কেউ রক্ত দিলেই তাঁকে ‘ডোনার কার্ড’ দেওয়া হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে তিনি সন্ধানীর যেকোনো ইউনিট থেকে যেকোনো সময়, স্বজনের জীবন বাঁচাতে যতবার প্রয়োজন রক্ত সংগ্রহ করতে পারেন।”

সম্প্রতি জাতীয়ভাবে যাত্রা শুরু করা সন্ধানী কেন্দ্রীয় রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র সম্পর্কে সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের উপদেষ্টা ডা. শাহপরান ইসলাম প্রবাল বলেন, “মানবতার সাহায্যার্থে প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটা কেন্দ্রীয় রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র স্থাপনের তাগিদ অনুভব করে আসছিল সন্ধানীয়ানরা। ১৯৯৬ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ধানীকে ব্লাড ব্যাংক ও চক্ষুব্যাংক স্থাপনের জন্য নীলক্ষেতে জমিদান করেন। বিভিন্ন প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে অবশেষে কেন্দ্রীয় পরিষদের চারটি সেশনের সন্ধানীয়ানদের পরিশ্রমের মাধ্যমে ১৬ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দীপু মনি উদ্ভোধন করেন সন্ধানী কেন্দ্রীয় রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র। একই দিনে সন্ধানী কেন্দ্রীয় রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের লাইসেন্সের কাগজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় পরিষদ, সেশন ২০১৭-১৮ এর হাতে তুলে দেয়া হয়। বর্তমানে নীলক্ষেত বাবুপুরা রোডের সন্ধানী ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে ঢাকাব্যাপী রক্ত সংগ্রহ, রক্ত সরবারহ এবং স্বেচ্ছায় রক্তদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে সন্ধানী কেন্দ্রীয় রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র।”

সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি

মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলনের প্রাণপুরুষ শ্রীলঙ্কার ডা. হাডসন ডি সিলভা ১৯৮৪ সালের ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশে এসেছিলেন এক জোড়া কর্নিয়া নিয়ে। রংপুরের অন্ধ কিশোরী টুনটুনির দুই চোখে সেগুলো স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব দূরীকরণ লক্ষ্যে জন্ম হয়েছিলো ‘সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি’র।

সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, “১৯৮৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমরা সাড়ে চার হাজারের অধিক কর্নিয়া সংগ্রহ করে তিন হাজার ৮০০ জনের অধীক মানুষের চোখে আলো ফিরিয়ে দিয়েছি।’ সমিতির মহাসচিব ডা. মো. জয়নাল ইসলাম বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে দেশে বছরে গড়ে ১৪ লাখের বেশি মানুষ কর্নিয়া অস্বচ্ছ হয়ে অন্ধ হয়ে যায়। অন্ধত্বের হার কমাতে ও নানা দেশে মরণোত্তর চক্ষুদানে উদ্বুদ্ধ করতে সরকার, সন্ধানী ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে।”

তিনি আরো জানালেন, ১৯৮৪ সাল থেকে মরণোত্তর চক্ষুদানে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে তাঁরা ‘অঙ্গীকারপত্র’ সংগ্রহ করছেন। সন্ধানীর এ পর্যন্ত পাওয়া কর্নিয়ার মধ্যে ১২০ জোড়া মরণোত্তর অঙ্গীকারে এবং ৫০টি অনুরোধের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে।

সমিতির কোষাধ্যক্ষ ডা. নীহার রঞ্জন রায় বললেন, “আমাদের কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী ও সন্ধানীর সাবেক কর্মী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক, সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, অভিনেত্রী সারা যাকের, সুবর্ণা মুস্তাফা, গায়িকা মেহরীন, কৃষ্ণকলিসহ ৩৭ হাজারের অধীক ব্যক্তিত্ব মৃত্যুর পর চক্ষুদান করতে সম্মত হয়ে লিখিত অঙ্গীকার করেছেন। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার নীলক্ষেত বাবুপুরা রোডে সন্ধানী ভবন উদ্বোধন করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাঁর মৃত্যুর পর কর্নিয়া কোনো অন্ধ ব্যক্তির চোখে প্রতিস্থাপনের জন্য সন্ধানীকে দান করা হবে বলে অঙ্গীকার করেছেন।"

মরণোত্তর চক্ষুদান পদ্ধতি সম্পর্কে সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. তোসাদ্দেক হোসেন সিদ্দিকী জামাল জানালেন, ‘সংক্রামক রোগ নেই এমন যেকোনো সুস্থ মানুষই মৃত্যুর পর চোখ দান করতে পারেন। সে জন্য তাঁকে সমিতির অঙ্গীকারপত্র পূরণ করলেই হবে। সন্ধানীর সব মেডিকেল ইউনিট, ডোনার ক্লাব ও সমিতির ১১টি আঞ্চলিক কেন্দ্রে অঙ্গীকারপত্র পাওয়া যায়। সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির ওয়েবসাইট (www.snedsbd.org)  থেকে অনলাইনে অঙ্গীকারপত্র পূরণ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও চোখ দান করতে পারেন। তবে পরে যেন কোনো অসুবিধা না হয়, সে জন্য অঙ্গীকারপত্রে তাঁর পরিবারের দুই সদস্যের ও পরিচিত দুই সাক্ষীর স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষের মৃত্যুর ছয় ঘণ্টার মধ্যে সন্ধানীর চিকিত্সক ও শিক্ষার্থী সদস্যরা কর্নিয়া সংগ্রহ করেন। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব আই ব্যাংকসের সহায়তায় প্রতিবছর বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ১৫০০ শিক্ষার্থী, চিকিত্সক, রোটারিয়ান ও স্বেচ্ছাসেবককে কর্ণিয়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’

বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা প্রদান

কেন্দ্রীয় পরিষদের ড্রাগ ব্যাংক সম্পাদক আনিকা ইবনাত জানান, হাসপাতালে আগত যেসব রোগী টাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারেন না, তাঁদের পাশে দাঁড়ায় সন্ধানী ড্রাগ ব্যাংক। মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক, সাধারণ চিকিত্সক, ইন্টার্ন ডাক্তার, ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার, সিভিল সার্জনের ‘দুর্যোগ ফান্ড’ ও মেডিক্যালের অধ্যক্ষের কাছে ‘ওষুধ চাহিদাপত্র’ শিরোনামে আবেদনের মাধ্যমে, হেলথ ক্যাম্পের জন্য পাওয়া বাড়তি ওষুধ সংরক্ষণ করে গড়ে তোলা হয় ড্রাগ ব্যাংক। জরুরি প্রয়োজনে সন্ধানীর টাকায়ও ওষুধ কেনা হয়। গত বছর ২৪টি মেডিকেল ইউনিটের মাধ্যমে ড্রাগ ব্যাংক সারা দেশে ১৫ হাজার ৯৫০ জন রোগীকে ২১ লাখ ১৮ হাজার টাকার জীবনরক্ষাকারী ও সাধারণ ওষুধ প্রদান করেছে।

জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভয়াবহ রোগের প্রাদুর্ভাব—যেকোনো দুর্যোগে সন্ধানীর সব ইউনিট ও অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আতিকুর রহমান বলেন, “বিভিন্ন উদ্যোগ ও কার্যক্রমের ফলে ১৯৯৫ সালে যুবসমাজকে মানবকল্যাণে সম্পৃক্ত করার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এশিয়ার একমাত্র সংগঠন সন্ধানী ‘কমনওয়েলথ ইয়ুথ সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক সংগঠন রয়েছে যাদের বয়স বাড়লেও যোগ্য কাজের অভাবে সরকারী অনুমোদন পায়নি। অপরদিকে সন্ধানীকে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকার ১৯৯৩ সালেই স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৫ সালে পেয়েছে বাংলাদেশ সমাজ কল্যাণ পরিষদ ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অনুমোদন। ২০০৪ সালে সমাজসেবায় বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র সংগঠন হিসাবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ পেয়েছে সন্ধানী।”

সন্ধানীর অন্যান্য কার্যক্রম

রক্তদান, ড্রাগ ব্যাংক, মরণোত্তর চক্ষুদান, হেলথ ক্যাম্পের পাশাপাশি দেশজুড়ে বছরব্যাপী বহু কাজে সন্ধানী জড়িয়ে আছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—মেধাবৃত্তি প্রদান, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, রোজায় ইফতারি বিতরণ, ঈদসামগ্রী ও ঈদের পোশাক, শীতবস্ত্র বিতরণ ইত্যাদি।

সন্ধানী শিক্ষা বৃত্তি প্রসঙ্গে সন্ধানী কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাকিব মাহমুদ জানান, “বর্তমানে সন্ধানীর ইউনিট সমূহে গরীব অসহায় শিক্ষার্থীদের জন্যে মোট ৩০টি শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। বছরে গড়ে দুই শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়ার এই সহায়তা পাচ্ছেন।”

কেন্দ্রীয় পরিষদের ডোনার ক্লাব ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সালমা হুসাইন বলেন, ‘প্রতি শীতে সন্ধানী ইউনিটগুলোর মাধ্যমে পাঁচ হাজারের বেশি শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়।’ এই সাহায্য তহবিল গঠন সম্পর্কে তানভীর হাসান ইকবাল জানালেন, শীতের শুরুতে সন্ধানী মেডিকেল ও ডেন্টাল ইউনিটের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের কাছে শীতবস্ত্র দানের জন্য আবেদন করা হয়। পরে সেই ইউনিট ও কাছাকাছি আরো কয়েকটি ইউনিট মিলে দেশের প্রত্যন্ত শীতার্ত এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ করে। ’

গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক রাকিব আহমেদ জানান, ‘গত দুই বছর তাঁদের ইউনিট দুই রমজানে ১৫০টি বস্তির পরিবারে ইফতারি ও ঈদসামগ্রী উপহার দিয়েছে এবং ২৫০টি এতিম শিশুকে কিনে দিয়েছে ঈদের পোশাক।’ 

‘রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচি’ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় পরিষদের শিক্ষা, গবেষণা ও পরিসংখ্যান সম্পাদক রাকিব হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা গড়ে ১৫০টি স্কুল-কলেজে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে শিক্ষার্থীদের সুস্থ থাকার জন্য উত্সাহিত করি, রক্তদানে আগ্রহী করি। এ ছাড়া সারা বছর ধরে শহীদ মিনারসহ ঐতিহাসিক স্থানে, জাতীয় দিবসে গণজমায়েত স্থলে গড়ে ১০০টি রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কার্যক্রম করি। তা ছাড়া স্কুল-কলেজে যোগাযোগ করে বা কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে সপ্তাহব্যাপী হেপাটাইটিস ‘বি’, জরায়ুমুখে ক্যান্সারের মতো ঘাতকব্যাধি প্রতিরোধে টিকাদান ও সচেতনতা কার্যক্রম করি।’

৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী 

যথাযথ মর্যাদায় সন্ধানীর ৪৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিভিন্ন ইউনিটের কার্যক্রম তুলে ধরে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মির্জা মিনহাজুল ইসলাম বলেন, “সন্ধানীর ৪৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের পাশাপাশি দেশব্যাপী অবস্থিত ২৫টি ইউনিট বিভিন্ন কার্যক্রন হাতে নিয়েছে। বর্ণাঢ্য র‍্যালি, আলোচনা সভা, কেক কাটা, সর্বোচ্চ রক্তদাতাদের সম্মাননা প্রদান, দিনব্যাপী স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ ও রক্তদান কর্মসূচী, ভ্যাক্সিনেশন কর্মসূচী, বিনামূল্যের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় অনুষ্ঠান, বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিনামূল্যে হেলথ ক্যাম্প, দেয়ালিকা প্রকাশ, শুভেচ্ছা কার্ড বিতরণ, মরণোত্তর চক্ষুদান ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক লিফলেট বিতরণ এবং বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচীর আয়োজন করবে সন্ধানীর সকল ইউনিট।”

সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি তানভীর হাসান ইকবাল বলেন, ‘প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সন্ধানী এদেশের অসহায় বঞ্চিত মানুষের সহায়তা করার নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। যখন সন্ধানীর দেওয়া এক ব্যাগ রক্তে কোন জীবন পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখে অথবা কোন জীবন মৃত্যুর থাবা থেকে ফিরে আসে, তখন সেই ভালোলাগার মূহুর্ত কোন কিছুর সাথেই তুলনীয় নয়। এই ভালোবাসার ভাগীদার প্রতিজন সন্ধানীয়ান। আমাদের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রতিজন সন্ধানীয়ানের নিরলস প্রচেষ্টা এবং আন্তরিক আত্মত্যাগ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সন্ধানীর কর্মপরিধি আরো বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্তমানবতার সেবাধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলনকে সমুন্নত রেখে 'রক্ত দিন, জীবন বাঁচান' স্লোগান এগিয়ে নেওয়ার শপথ থাকবে প্রতিজন সন্ধানীয়ানের।’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত