০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ১১:৪৭ এএম

ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে চাই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা

ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে চাই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা

বিশ্ব ক্যান্সার দিবস আজ। প্রতি বছর এই দিনটি সুযোগ করে দেয় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সারা বিশ্বের মানুষকে একত্রিত হতে। এর লক্ষ্য লাখ লাখ প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু রোধ করা। এই রোগ সম্পর্কে ধারণা ও সচেতনতা বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী ব্যক্তি ও সরকারগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যমে এটা সম্ভব। 

বিশ্ব ক্যান্সার দিবস সুযোগ করে দেয় গণমাধ্যম ও মানুষের অন্তরে ক্যান্সারের এই চিত্র গেঁথে দিতে। ২০১৯-২০২১ এই তিন বছরের জন্য এই দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আমি আছি, আমি থাকবো, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে’।

বাংলাদেশের বর্তমান ক্যান্সার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও উত্তরণে করণীয় সম্পর্কে সংক্ষেপে বুলেট আকারে একটি চিত্র তুলে ধরতে চাই।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) অনুমিত হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশে ১৫০,০০০ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, মারা যায় ১০৮,০০০।

যে কোনো দেশে ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য দরকার আক্রান্তের হার, মৃত্যুর হার, কারা কোন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে সেই সম্পর্কে সঠিক পরিসংখ্যান। এর জন্য প্রয়োজন জনসংখ্যা ভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন।

২০০৫ সালে দেশে প্রথম হাসপাতাল ভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন চালু হয়, যার প্রতিবেদন থেকে আমরা ক্যান্সারের ব্যাপ্তি সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করছি। কিন্তু উপরে উল্লেখিত তথ্যসমূহের জন্য হাসপাতালভিত্তিক নিবন্ধন যথেষ্ট নয়, এর কিছু পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে। 

আমাদের দুর্ভাগ্য, সরকারের সেক্টর কর্মসূচিতে আমরা এই জনসংখ্যাভিত্তিক নিবন্ধন অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। চলমান ৫ বছর মেয়াদি মাল্টি সেক্টোরাল এনসিডি কন্ত্রোল প্ল্যানে ২০২২ সালের মধ্যে ১৯টি পুরনো সরকারি মেডিকেল কলেজে হাসপাতালভিত্তিক নিবন্ধন চালু করার উদ্যোগ নেয়ার পরেও তা থেমে গেছে। 
২০০৯ সালে জাতীয় ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি প্রণীত হয়েছিল ৫ বছর মেয়াদি। ২০১৪ এর মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু এর অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন কার্যক্রমের সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে এর আলোকে। প্রয়োজনীয় আপডেট এখনও করা হয়নি।

ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তদারকির জন্য গঠিত উচ্চ পর্যায়ের ‘জাতীয় ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল’ প্রায় অকার্যকর। দীর্ঘ দিন এই পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই পরিষদের সভাপতি, ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদাধিকার বলে এর সম্পাদক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর প্রধান উপদেষ্টা। এই পরিষদ কার্যকর হলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। প্রাথমিক প্রতিরোধ, সূচনায় ক্যান্সার নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রশমন সেবা বা পেলিয়েটিভ চিকিৎসা।

আমাদের দেশে ক্যান্সারের জন্য বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় হয় অবকাঠামো ও অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের পিছনে। ক্যান্সার নির্ণয় ও স্ক্রিনিং খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত।

প্রাথমিক প্রতিরোধের প্রধান উপাদান ক্যান্সারের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা ও টিকাসহ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। এ ক্ষেত্রটি সবচেয়ে অবহেলিত। সরকারের কিছু উদ্যোগ আছে বিভিন্ন প্রোগ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে, সমন্বয়ের অভাবে তা দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারছে না।

বেসরকারি কিছু সংগঠন সচেতনতা কার্যক্রমকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ক্যান্সারের চিকিৎসা ব্যবস্থা

অনুমিত বিপুলসংখ্যক রোগীর চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। দেশের একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটিতে সারা দেশের রোগী, যাদের প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার সামর্থ্য নেই, তারা ভীড় জমাচ্ছে। 

অপারেশনের জন্য গড়ে একমাস, কেমোথেরাপির জন্য ২-৩ সপ্তাহ, বিকিরণ চিকিৎসার জন্য ৪ মাস পর্যন্ত অনেককে অপেক্ষমান থাকতে হচ্ছে। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী ও স্বজনদের কাছে এই দীর্ঘসূত্রিতা গ্রহণযোগ্য হয় না। 

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য এসে রোগী হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ না পেলে স্বজনসহ অবর্ণনীয় পরিস্থিতির শিকার হন। এই অবস্থায় অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ে আরও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন।

ক্রমবর্ধমান চিকিৎসাপ্রার্থীর চাপ সামলানো একটিমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়, শুধু শয্যা সংখ্যা বা যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে।

১৯টি সরকারি মেডিকেল কলেজে রেডিওথেরাপি বিভাগ চালু আছে। এর মধ্যে ৯টিতে বিকিরণ চিকিৎসার যন্ত্র আছে। কিন্তু সব কয়টি মেশিন একসাথে চালু থাকে খুব কম সময়ই কারিগরি কারণে। সহায়ক চিকিৎসক যেমন শল্যবিদ, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও আন্তঃবিভাগ সমন্বয় ও রোগীদের আস্থার অভাবে ক্যান্সার রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না এই পর্যায়ের হাসপাতালগুলো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকা ও কর্মস্থলে অনুপস্থিতি সেবা প্রদানে বিঘ্নের কারণ। তাই সবাই ছুটছে ঢাকার ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে।

বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি রেডিওথেরাপিসহ ক্যান্সার ইউনিট চালু হয়েছে। কিন্তু সেখানে চিকিৎসার অত্যাধিক ব্য মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে।

বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা অতি কেন্দ্রীভূত। একটিমাত্র বেসরকারি ক্যান্সার ইউনিট রয়েছে ঢাকার বাইরে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যান্সার নির্ণয়ের এক বছরের মধ্যে শতকরা প্রায় পচাত্তর ভাগ রোগী হয় মারা যাচ্ছে, না হলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে। নিম্ন আয়ের এবং অগ্রসর ক্যান্সার রোগীরা বেশি ভোগান্তির শিকার হয়। আমাদের দেশের চিত্র এর থেকে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম।

উত্তরণে করণীয়

ক্যান্সার ইন্সটিটিউট- কেন্দ্রিক সরকারি চিকিৎসা, কিংবা কয়েকটি ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক হাসপাতাল এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় নয়। এর জন্য চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে।

উন্নত ব্যবস্থাও অগ্রসর পর্যায়ের ক্যান্সার রোগীদের পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে পারে কম ক্ষেত্রে। তাই প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার নির্নয়ের মধ্যে উত্তর খুঁজতে হবে।

ক্যান্সারের লক্ষণগুলো বিশেষ করে সাতটি সতর্ক সঙ্কেত ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচার করতে হবে। তাঁদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে লক্ষণ দেখা দিলে ও দুই সপ্তাহের সাধারণ চিকিৎসায় সেরে না উঠলে হাসপাতাল কিংবা পাশ করা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য।

লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেও ক্যান্সার নির্ণয় করা যায় স্ক্রিনিং পরীক্ষার মাধ্যমে। স্তন, জরায়ুমুখ ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার স্ক্রিনিং ব্যাপকহারে করা সম্ভব আমাদের মত স্বল্প আয়ের দেশেও, এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অভিমত। 

মোট কথা, ক্যান্সার নির্ণয়ের সুবিধা যতটা সম্ভব মানুষের দোরগোড়ায় নিতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং বা শনাক্তকরণের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৪০০টি ভায়া সেন্টার চালু করেছে। এটা বড় একটা অগ্রগতি। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এগুলো অ-সংগঠিত, হাসপাতালভিত্তিক (Unorganized, oppurtunistic)। সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও সহজ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করার উপাদান এই প্রকল্পে না থাকায় তা কাঙ্ক্ষিত সাড়া জাগাতে পারছে না। 

জোর দেয়া দরকার প্রাথমিক প্রতিরোধের উপর। ক্যান্সার যাতে না হয়, তাঁর জন্যই প্রাথমিক প্রতিরোধ। এ জন্য প্রয়োজন ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়িয়ে চলা ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। এখানেও সামনে আসে সুপরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ ও সফল বাস্তবায়ন।

শুধু সরকারের পক্ষে এই কাজটি করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যাদের এ ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সমাজের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে যার যার জায়গা থেকে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখার।

নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন ও একটি সাহসী সিদ্ধান্ত জরুরি। চিকিৎসার পাশাপাশি ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও প্রাথমিক প্রতিরোধে জনসচেতনতার জন্য আনুপাতিক হারে সুনির্দিষ্ট লোকবল ও অর্থবরাদ্দ। এক-তৃতীয়াংশ ক্যান্সার প্রাথমিক প্রতিরোধ করা সম্ভব জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। এক-তৃতীয়াংশ ক্যান্সার রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব, প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় ও সঠিক পরিপূর্ণ চিকিৎসা দিতে পারলে। 

সরকারের একটি সাহসী যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত 

উল্লেখিত সকল প্রয়োজনীয় কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য ঢাকাসহ আটটি বিভাগে আটটি আঞ্চলিক/বিভাগীয় ক্যান্সার কেন্দ্র (আরসিসি) গড়ে তোলার জন্য আমরা বিগত বছরগুলোতে প্রস্তাব করে আসছিলাম। অত্যন্ত সুখের কথা, সরকার ইতোমধ্যে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। একনেকে ২৩০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাস হয়েছে। ১০০ বেডের ইনডোর, বিকিরণ  চিকিৎসার জন্য একাধিক সর্বাধুনিক টেলিথেরাপি ও একটি ব্রাকিথেরাপি মেশিন, ক্যান্সারের অপারেশনের ব্যবস্থা, ইনডোর ও ডে-কেয়ারে কেমোথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে। মেডিকেল কলেজের মতো শুধু ক্যান্সার চিকিতসার একটি বিভাগ রেডিওথেরাপি নয়, চিকিৎসার অন্যান্য ৫টি বিশেষায়িত বিভাগের সাথে ক্যান্সার প্রতিরোধ ও গবেষণা সংশ্লিষ্ট ক্যান্সার ইপিডেমিওলোজির পূর্ণাঙ্গ বিভাগ চালু হবে। পরবর্তীতে অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিভাগ যুক্ত হবে। আমরা এই যুগান্তকারী সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।  

এই আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোকে সমাজভিত্তিক রূপ দেয়া সম্ভব। এগুলো থেকে ওই অঞ্চলের জেলা- উপজেলায় সনাক্তকরণ ক্যাম্প নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে একেবারে শুরুতেই নির্ণয় হলে হাসপাতাল শয্যার ব্যবহার, আর্থিক ও শারীরিক কষ্ট কম হবে, কর্মঘণ্টার অপচয় কম হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, ওই এলাকায় অবস্তিত সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এবং আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজভিত্তিক আদর্শ সমন্বিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করলে দেশের ক্যান্সার পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি সম্ভব।

ঢাকার জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট অসহনীয় চাপমুক্ত হয়ে সারাদেশের জন্য বিশেষজ্ঞ তৈরি, মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে কর্মরত প্যাথলজিস্ট, সার্জন, গাইনাকোলজিস্ট, নার্স ও সহায়ক জনবলের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ ও গবেষণাকাজে মনোনিবেশ করে আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের রেফারেল সেন্টার হিসেবে উন্নতমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারবে।

তবে ইনস্টিটিউটে সকল বিভাগকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে, সমানভাবে বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের সার্বিক ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে হবে।  

চিকিৎসার পাশপাশি ক্যান্সার নিবন্ধন, স্ক্রিনিং, গবেষণা কাজে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দিতে হবে।

সরকার, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গণমাধ্যম, সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে ক্যান্সার সচেতনতায় এবং কার্যকর ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ প্রতিটি পরিবার এখন কোনো না কোনোভাবে ক্যান্সারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্যান্সার এখন আর শুধু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের বিষয় নয়। প্রতিটি নাগরিকের ভাবনার বিষয়। আসুন সবাই মিলে দেশের ক্যান্সার পরিস্থিতি উন্নয়নে ভুমিকা রাখি।

বিশ্ব ক্যান্সার দিবস ২০২০ এর প্রাক্কালে সরকার, নীতিনির্ধারক মহল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আকুল আহবান জানাচ্ছি।

১. জাতীয় ক্যান্সার নিয়ন্ত্রন কাউন্সিল পুনর্গঠন ও কার্যকর করা।
২. জাতীয় ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কৌশলপত্র প্রণয়ন/হালনাগাদ ও এর আলোকে কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
৩. ক্যান্সারের সঠিক পরিসংখ্যাণ পেতে জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি গ্রহণ করা। 
ক. এর আওতায় জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটে চলমান হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনকে ডাটাবেজ ও নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে শক্তিশালী করা। 
খ. প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি সরকারি মেডিকেল কলেজে হাসপাতালভিত্তিক নিবন্ধন সম্প্রসারিত করা।
গ. প্রথমে একটি, পর্যায়ক্রমে প্রতি বিভাগে একটি উপজেলায় পপুলেশন বেজড বা জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন চালু করা। কেবল এ থেকেই আমরা ক্যান্সারের নিজস্ব ও সঠিক পরিসংখ্যান বের করতে পারবো।
৪. প্রাথমিক প্রতিরোধ: অনুমোদিত বিভাগীয় ক্যান্সার কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের শুরু থেকেই ক্যান্সারের প্রাথমিক প্রতিরোধ তথা জনসচেতনতা ও প্রয়োজনীয় (হেপাটাইটিস বি ও এইচপিভি) টিকা প্রদান কর্মসূচি চালু করা। মোবাইল ক্যান্সার সচেতনতা ও স্কৃনিং ইউনিট চালু করা।
৫. ক্যান্সার স্ক্রিনিং: চলমান অসংগঠিত ও অসম্পূর্ণ জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে স্তন, জরায়ুমুখ ও মুখগহ্বরের সমাজভিত্তিক সংগঠিত ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ণ ও বাস্তবায়ন করা। সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির উদার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা। বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলিকে মানসম্মত সেবা প্রদানের শর্তে সম্পৃক্ত করা। 
৬. ক্যান্সার চিকিতসা: ক্যান্সার চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সকল বিশেষায়িত বিভাগগুলিকে সমান গুরুত্ব ও সুযোগ দিয়ে সমন্বিত ক্যান্সার চিকিৎসার সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে সরকারি সকল মেডিকেল কলেজে ‘পূণাঙ্গ ক্যান্সার বিভাগ’ চালু করা।
৭.  পেলিয়েটিভ বা প্রশমন সেবা: প্রতিরোধ, চিকিৎসার মতই গুরুতবপূর্ণ এই সেবা। আমাদের দেশে এই ধারণাটি বেশি দিনের নয়। ইতোমধ্যে বি এসএমএমইউতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ চালু হয়েছে। সকল সরকারি-বেসরকারি ক্যান্সার কেন্দ্রে এই সেবা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
৮. কারিকুলাম সংশোধন: অনকোলজির সকল বিশেষায়িত কোর্স কারিকুলামের সংশোধন প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্যান্সার রোগতত্ব, প্রতিরোধ ও গবেষণা পুনরায় যুক্ত করা সংযুক্ত করা সময়ের দাবি। এর অভাবে ক্যান্সার প্রতিরোধ কার্যক্রমে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনক কম। এমবিবিএস কোর্সের কারিকুলামেও এর সংযুক্তি প্রয়োজন।
৯. প্রশিক্ষণণ বিচ্ছিন্নভাবে এবং সংশ্লিষ্টতাবিহীন চিকিৎসক ও সহায়ক জনবলের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ নিরুৎসাহিত করে দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুসংগঠিত প্রশিক্ষণের আয়োজন অধিকতর কার্যকর হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সুপার স্পেশালিটি বিশেষজ্ঞ তৈরির পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের (যেমন জেনারেল সার্জারি, গাইনাকোলজি, ইএনটি, প্যাথলজি) প্রশিক্ষণ আয়োজন করা।
১০. চিকিৎসা নয় স্বাস্থ্য, সবার জন্য: সকল পর্যায়ের নীতি প্রণয়ণে রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা নয়, জনগণকে ক্যান্সার থেকে সুরক্ষার ধারণা গ্রহণ করতে হবে। ক্যান্সার সেবার শুরু হোক ক্যান্সার প্রতিরোধ দিয়ে।

কমিউনিটি অনকোলজি ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
বাংলাদেশ স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ফোরাম

মার্চ ফর মাদার-এর পক্ষে

ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন (মার্চ ফর মাদার)
প্রফেসর সাবেরা খাতুন (কমিউনিটি অনকোলজি সেন্টার)
প্রফেসর মোজাহেরুল হক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)
মোসাররত জাহান সৌরভ (সিসিইপিআর,বি)
তাহমিনা গাফফার (অপরাজিতা সোসাইটি এগেইন্সট ক্যান্সার)
মেরি মার্গারেট রোজারিও (বাংলাদেশ ওয়াইডাব্লিওসিএ) 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি