অধ্যাপক ডা. মুজিবুল হক

অধ্যাপক ডা. মুজিবুল হক

স্কিন অ্যান্ড সেক্সুয়াল মেডিসিন স্পেশালিস্ট

এফসিপিএস, এফআরসিপি (যুক্তরাজ্য), ডিডিভি (অস্ট্রিয়া)

 


০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৮:০১ পিএম

৫০ বছরের পুরনো মেডিকেল শিক্ষা, যুগোপযোগী না হওয়ার নেপথ্যে কারা?

৫০ বছরের পুরনো মেডিকেল শিক্ষা, যুগোপযোগী না হওয়ার নেপথ্যে কারা?

মেডিকেল ছাত্রদের একটা বড় অনুযোগ হলো, তাদের আন্ডার গ্রাজুয়েট ডাক্তার হবার জন্য মোটেই জরুরি নয় এমন চাপানো শিক্ষা তাদের ৫ বছরের পড়াশোনার ৩ বছরই দখলে নিয়ে নিয়েছে। এবং অপ্রয়োজনীয় চরম কঠোরতার সঙ্গে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে।

আর এতে একজন এমবিবিএস ছাত্রের সকল সুকুমার বৃত্তি, আনন্দ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভালো ডাক্তার হওয়া পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশি-বিদেশি বহু ছাত্র ছাত্র/ছাত্রীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আন্ডার গ্রাজুয়েটে অত‍্যাচারের মতো কড়াকড়ি পৃথিবীতে সম্ভবত বাংলাদেশেই হয়।

বিদেশে এ স্তরের পড়াশোনা খুবই সংক্ষিপ্ত। সেখানে দুটি পদ্ধতিতে পাঠদান প্রদান করা হয়। ১. অভিও ও ভিডিও, ২. পাওয়ার প্রেজেন্টেশন। এ সবের মাধ‍্যমে আনন্দময় করে পড়ানো হয়ে থাকে। 

আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রদের অ্যানাটমি এত বিশদভাবে পড়াবার প্রশ্নই আসে না। কারণ তৃতীয় বর্ষে উঠতে উঠতে সকল শিক্ষার্থী প্রায় সব ভুলেই যায়।

যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইন্ডিয়া, পাকিস্তানসহ আমি সারা দুনিয়ায় দেখেছি সেমিস্টার পদ্ধতিতে পড়ানো এবং যা সংক্ষিপ্ত। আন্ডার গ্রাজুয়েটে সাধারণত তিন মাসেই অ্যানাটমি পড়ানো চিরতরে শেষ হয়ে যায়।  

মজার বিষয় হলো, সেসব দেশের শিক্ষকরা আটকাবার চেয়ে পাস করাতেই বেশি আগ্রহী।  

দেশ ভেদে এক বা অর্ধেক বছরে সকল আন্ডার গ্রাজুয়েট বেসিক শেষ হয়ে যায়। এর পরের ৬ মাস মেডিকেল ছাত্র/ছাত্রীরা নানা চিত্ত বিনোদনের কাজ, বিতর্ক সভায় অংশ নেন, যা বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছে।

সর্বত্র দুই বছরের মধ্যে মূল ডাক্তার হবার দুনিয়ায় ঢোকেন তারা, বাংলাদেশে যা অসম্ভব। আর মূল ডাক্তারিতে বতর্মানে প্রচলিত সময়সীমা দেখলে অবাক লাগে। নিঃসন্দেহে এটা মানুষের কল‍্যাণবিরোধী। 

মেডিসিনে হাজার ভাগ। এটাই তো মূল চিকিৎসা সেবা। এটার জন্যে তো ডাক্তারি পড়া। অথচ সেখানে জেনারেল মেডিসিন, কার্ডিওলোজি, নিওরো, প্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল, এন্ডোক্রাইন  (ডায়বেটিস), রেস্পিরেটরি, সাইকিয়াট্রি, ডার্মাটলোজি, পিজিক্যাল মেডিসিন—সব মিলিয়ে ৫০০ ঘণ্টা রাখা হয়েছে। 

সার্জারি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। জেনারেল সার্জারি, অর্থোপেডিক্স, শিশু সার্জারি, ইএনটি—এখানেও সময় ৫০০ ঘণ্টা মাত্র।

আর আন্ডারগ্রাজুয়েটে অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় এনাটমির জন্য ৭০০ ঘণ্টা; বায়োকেমিস্ট্রি, কমিউনিটি মেডিসিনের আলাদা করে ৪০০ ঘণ্টা রাখা হয়েছে। ফরেস্ট মেডিসিনের (প্রকৃত কাজে লাগে না) জন্য ৪০০ ঘণ্টা অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ফেলের পর ফেল করিয়ে পড়ানো হচ্ছে। 

এই বিষয়গুলো বিদেশে বড় ডাক্তার হবার সময় বেসিকের অধ‍্যাপকদেরই কাছে আবার পড়তে হয় এবং তা তখনই কঠোর করে পড়ানোর শর্ত যুক্ত থাকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আন্ডারগ্রাজুয়েটে সীমাহীন কঠোরভাবে পড়ানো ও ফেল করানো সময়ের অসম্ভব অপচয়, নিজের টাকা, জনগণের টাকার অন্যায় খরচ।

তার ওপর আবার পরীক্ষা নেয়া হয় প্রায় নির্যাতনের মতো করে। ফেল করিয়ে করিয়ে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়া হয়। এসব পড়াও জরুরি; কিন্তু তা একমাত্র পোস্ট গ্রাজুয়েশনের সময়। কিছুতেই আন্ডারগ্রাজুয়েটে নয়।

আমেরিকান হার্ভার্ড মেডিকেলে গ্রাজুয়েশন মাত্র ৪ বছরের কোর্স। যে মেডিকেলে পড়বে সে মেডিকেলে ঢোকার আগেই বায়োস্ট্যাটিস্টিকস, জেনেটিকসসহ মৌলিক সায়েন্সে ধারণা রাখে।  

মেডিকেলে ঢোকার পর আমাদের জন্য ভয়াবহ অ্যানাটমিসহ ফিজিওলজি, ফার্মাকোলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, প্যাথলজি, কমিউনিটি মেডিসিন, বায়োস্ট্যাটিস্টিকস, জেনেটিকস সব সংক্ষিপ্ত মাত্র দেড় বছরের মধ‍্যে শেষ। তা শেষ পর্ষন্ত কি তারা ভালো ডাক্তার হচ্ছে না?

তার পর হাসপাতালে হাতে-কলমে চিকিৎসা বিদ্যার কাজ। এবং জনগণের সরাসরি চিকিৎসা দেয়ার কাজ। এখানেও বেজায় ভুল।

আমাদের মেডিকেল পড়াশোনার কারিকুলাম পরো ৫০ বছরের পুরোনো। পশ্চিমেও আমাদের মতই ছিল। মাত্র কয়েক বছর হলো তা বদলেছে।

আমাদের এমবিবিএস কতটা পুঁথিগত বিদ্যার পড়াশোনা তা একটা scenario ভাবলে বোঝা যাবে। 

পঞ্চম বর্ষের এক ছাত্র গ্রমের বাড়ি গিয়েছে। রাতে মায়ের ডায়রিয়া হওয়ায় রগে স্যালাইন দিতে হবে। পুত্র ৫/৬ বছর মেডিকেলে অ্যানাটমি, কমিউনিটি মেডিসিন, ফরেনসিক মেডিসিন টিয়া পাখির মতো মুখস্ত করেছে। কিন্তু একটা ইনজেকশন কেমন করে রগে দিতে হয় তা জানে না। এতদিনের পড়াশোনার পদ্ধতিতে সেটা নাই। পুত্র বেরিয়েছে কম্পাউন্ডারের খোঁজে।  সে ভাবছে তার জীবন বারো আনাই মিছে।

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের দুই ছাত্র জাতীয় স্মৃতিসোধের নকশা তৈরি করেছেন। অষুত মানুষ প্রশংসায় আপ্লুত হয়ে দেখছেন। অথচ দুই ডিসিপ্লিনের ছাত্রই সমান মেধার।

তাই মেডিকেল আন্ডার গ্রাজুয়েটে এ বড় ধরনের অদল বদল সময়ের দাবি। ভালো ডাক্তার পেতে হলে সারা দুনিয়ায় আদৃত সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করতে হবে। আর ভীতিকর শিক্ষক না হয়ে আনন্দময় শিক্ষক হন।

আন্ডার গ্রাজুয়েটে শুধু লাগসই বেসিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। পোস্ট গ্রাজুয়েটে কঠোর হন। সকল বেসিক, প্যারাক্লিনিক্যাল বিষয় দেড় বছরের সমাপ্ত করুন। 

সময় না থাকায় বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষাক্রমে ৫ বছরের পড়াশোনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসিজি পড়ার জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র এক ঘণ্টা। 

উপজেলায় এক মাইয়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের লক্ষণ নিয়ে আসা রোগীকে তখন কোন ৭০০ ঘণ্টা পড়া অ্যানাটমি আর ৫ বছরের মধ‍্যে প্রদত্ত কারিকুলামে পড়া মাত্র ১টি ঘণ্টা পড়া ইসিজি কিভাবে সাহায্য করবে তাকে। ৬টি বছর ধরে কি তাদের পড়ানো হয়েছে?

আমি মনি করি, মেডিকেল পড়াশোনা বাংলাদেশে যুগোপযোগী না করা ভয়াবহ অন্যায়। জনগণ ও অনেক কষ্টে জোগাড় করা পিতার টাকার অপচয়। এর অন্তরালের হৃদয়হীন মানুষ কারা?

Add
মেডিভয়েসকে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিপসম পরিচালক

মেধাবীরা পাবলিক হেলথে আসলে স্বাস্থ্যসেবায় গুণগত পরিবর্তন আসবে   

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত