কামারুজ্জামান নাবিল

কামারুজ্জামান নাবিল

ছাত্র, ডক্টর অব মেডিসিন, ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান


২২ জানুয়ারী, ২০২০ ১২:২৯ পিএম

বিশ্বসেরার তালিকায় ইরানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়: সাফল্যের নেপথ্যে 

বিশ্বসেরার তালিকায় ইরানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়: সাফল্যের নেপথ্যে 

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে ইরানের ২২টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। নিবন্ধ ও সাইটেশন প্রকাশের সংখ্যার ভিত্তিতে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পশ্চিমাদের এতো অবরোধের মাঝেও ইরানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এগিয়ে চলা সত্যিই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। 

গৌরবময় পথচলা  

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিশ্বের সেরা তালিকায় আসা তেমন একটা সহজ কিছু নয়। সেরার তালিকায় নিয়ে আসতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণা, বিদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ইত্যাদি সব কিছুতেই এগিয়ে থাকতে হয়। সে লক্ষ্য নিয়েই ইরান এগিয়ে চলেছে। 

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে এ যাত্রা আরো গতি পায়। এমনকি সেসময় স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বাংলাদেশ থেকেও ডাক্তারদের আমন্ত্রণ জানায় ইরান।  

দেশটিতে বর্তমানে প্রায় প্রত্যেকটি বড় শহরেই একটি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মোট সংখ্যা প্রায় ৬০টি হবে। এছাড়াও কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। দ্য সেন্টার ফর ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে ২০১৯ সালের বিশ্বসেরার তালিকায় ৫৭৮ নম্বরে রয়েছে ১৯৩৪ সালে স্থাপিত তেহরান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। তারপরই রয়েছে তেহরানে অবস্থিত শহীদ বেহেশতি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, যার অবস্থান ৯৬৬ নম্বরে। শিরাজ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১০৭৭ নম্বরে।  ১২১০ এবং ১২৬৩ এ রয়েছে যথাক্রমে, ইস্পাহান এবং মাশহাদ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

সাফল্যের নেপথ্যে: 

ইরানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যের জন্য যে মানুষগুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি, তারা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর সেই সকল শিক্ষকগণ। ইরানের প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ সাপ্তাহিক ছুটি বাদে অন্যান্য সরকারি ছুটির কারণে যেসব ক্লাস নেয়া সম্ভব হয় না তা অন্য কোনো দিনে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেন, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতে অসংখ্য বিদেশি শিক্ষক নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে সম্ভবত হাতেগোনা কিছু বিদেশি শিক্ষক ছাড়া মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকই সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে সেখানেই চাকরিতে নিয়োজিত রয়েছেন, যার মাঝে অনেক শিক্ষকই বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে ইরানের মেডিকেল সায়েন্সকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।

আরেকটা বিষয় হলো, ইরানের সকল বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিমুক্ত। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই বাংলাদেশের মতো মিছিল, মিটিং, হরতাল, মারামারি ও গোলযোগ ইত্যাদি। মেডিসিন শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে দুটো টার্ম হয়ে থাকে। টার্মের ক্রেডিট নির্বাচন করার সাথে সাথে পুরো সেই বছরের ক্লাস ও পরীক্ষার সময়সূচির বড় একটা রুটিন সকল শিক্ষার্থীর হাতে দেয়া হয়। যেহেতু রাজনৈতিক কোনো সমস্যা নেই, তাই সেই রুটিন মাফিকই টার্মের সমাপ্তি ঘটে থাকে।

ইরানের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ১০০০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ইরান সরকারের স্কলারশিপে অধ্যয়নরত আছেন। এছাড়াও কয়েক হাজারের মতো শিক্ষার্থী টিউশন ফি দিয়ে ইরানে মেডিকেলে অধ্যয়নরত আছেন। সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, তুরস্ক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, বাহরাইন, তাজিকিস্তান, মিসর, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারত প্রভৃতি দেশের শিক্ষার্থীরা আছেন। সাথে বাংলাদেশী কয়েকজন শিক্ষার্থীও আছেন।

ইরানের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে শিক্ষার্থীদের গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এ নিয়ে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কেন্দ্রিক একটি কমিটি আছে, যাদের কাজ হচ্ছে গবেষণা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবন্ধ লেখা নিয়ে ওয়ার্কশপ করা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করা। প্রপোজাল টাইটেল লেখা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত এই কমিটিই শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সর্বাত্মক সাহায্য করে থাকে।

এছাড়াও ইরানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার ক্ষেত্রে শিক্ষকগণ প্রায় ক্লাসেই শিক্ষার্থীদের গবেষণা নিয়ে উৎসাহ দিয়ে থাকেন—এমন উৎসাহ প্রদান একজন শিক্ষার্থীকে শুধুমাত্র একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই না একজন গবেষক হিসেবেও গড়ে তুলতে সাহায্য করছে।   

বলাবাহুল্য, ইরানের বিজ্ঞান গবেষণা ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও গবেষণার জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা একটা অর্থনৈতিক বাজেট থাকে, যা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষণার ক্ষেত্রে সরবরাহ করে থাকে।   

ইরানি চিকিৎসকদের সাফল্য 

মেডিকেল জার্নাল ওয়েবসাইট পাবমেডের একটি আর্টিকেলের সূত্র মতে, ইরান ১৯৬৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মেডিকেল সায়েন্স সব বিভাগে ২ লক্ষ ৪৪ হাজার ২৯০টি প্রকাশনা বের করেছে। এর মাঝে শুধুমাত্র ক্লিনিকাল, বায়োমেডিকেল এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে ৭২ হজার ৬৮৬টি প্রকাশনা বের করেছে। এর মাঝে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে পেডিয়েট্রিক, ডেন্টাল বিভাগে। এর পরেই রয়েছে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং ফার্মেসি বিভাগ। এছাড়াও গবেষণায় উল্ল্যেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মাঝে রয়েছে প্লাস্টিক সার্জারির ক্ষেত্রে দেশটির গবেষকদের অবদান। 

তেহরানের শহীদ বেহেশতি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় প্লাস্টিক সার্জারির ক্ষেত্রে শক্তিশালী আঠালো টিস্যু তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া শরীরের ক্ষতস্থান লেজারের মাধ্যমে কৃত্রিম চামড়া উৎপাদনের মাধ্যমে তা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার মতো পদ্ধতি আবিষ্কারের কৃতিত্বও ইরানের চিকিৎসকদের। 

প্রায় ১০ বছর গবেষণা চালিয়ে কৃত্রিম শ্বাসনালী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন ইরানের মেডিকেল সায়েন্সের গবেষকগণ। ভ্যাকসিন উৎপাদনে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে ইরান। স্টেম সেল গবেষণার ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান প্রথম সারির ১০টি দেশের মাঝে। 

এমন সব আবিষ্কারে আন্তর্জাতিক প্রবন্ধ ডাটাবেজ গুগল স্কলার, স্কোপাস এবং ওয়েব অব সায়েন্স কোর কালেকশান ইত্যাদি সবখানেই ইরানি গবেষকদের উল্ল্যেখযোগ্য একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এক শতাংশ গবেষকদের মধ্যে ইরানের রয়েছে ৩৫৪ জন। এদের মধ্যে ৯০ জন মেডিকেল সায়েন্স খাতে গবেষণা পরিচালনা করছেন। ইরান নিবন্ধ সংখ্যায় একধাপ উন্নতি করেছে, বর্তমানে দেশটি ১৫তম অবস্থানে রয়েছে, যা মেডিকেল সায়েন্স গবেষণাকে উজ্জ্বল করেছে বা করছে।

Add
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত