অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী

একুশে পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক 


১৭ জানুয়ারী, ২০২০ ০৫:৪১ পিএম

আক্কেল দাঁতের বেআক্কেল অবস্থা

আক্কেল দাঁতের বেআক্কেল অবস্থা

দিনটি আমার সঠিক মনে নেই৷ তবে খুব সম্ভবত ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসের কোনো একদিন, যখন আমি মিটফোর্ড হাসপাতালে চাকরি করি৷ একজন রোগী তাঁর ডান দিকের গাল ও মুখ ফোলা নিয়ে আমার কাছে আসেন৷ আমি নিয়ম মাফিক তাকে পরীক্ষা করে বললাম, ‘ঘাবড়াবার কিছু নেই, আপনার আক্কেল আসছে’৷

লোকটি তখন অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আক্কেল আসছে! তারে মানে?’ আমি বললাম, বুঝতে পারলেন না? মানে আপনার আক্কেল দাঁতটি এতদিনে উঠতে শুরু করেছে৷ আপনার আক্কেল হয়েছে৷ লোকটি আরো বিস্মিত হলো৷ বুঝতে পারলেন না? মানে আপনার আক্কেল দাঁতটি এতদিনে উঠতে শুরু করেছে৷

এবার তিনি সবিস্ময়ে বললেন, তাহলে এতদিন কি আমি বেআক্কেল ছিলাম? আমি মুখ থেকে মাস্ক খুলতে খুলতে স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলাম, সেটা আপনিই জানেন৷ দাঁড়িয়ে থাকা নার্সের মিটিমিটি হাসি দেখে লোকটি হয়ত আমার রসিকতা বুঝতে পারলেন৷ 

শেষ পর্যন্ত লোকটির আক্কেল দাঁত অর্থাৎ ইমপেকটেড মেন্ডিবুলার থার্ড মোলার দুটি দাঁত এক্সরে ও বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তুলে দেয়ার পর সে সুস্থ হয়ে ওঠে৷ 

এই হচ্ছে আক্কেল দাঁতের একটি গল্প৷ অবশ্য এই দাঁতটিকে নিয়ে আরও সব মজার মজার গল্প রয়েছে৷ কেউ কেউ এই দাঁতটিকে বুদ্ধিদাঁত বা Wisdom দাঁত বলে থাকেন৷

‘আক্কেল দাঁত’ নামের তাৎপর্য 

কে বা কখন এই দাঁতটির নাম আক্কেল দাঁত রেখেছেন তা বহু গবেষণা করেও আমি এখনও বের করতে পারিনি৷ তবে এই ‘আক্কেল দাঁত' নামটি দেয়ার পেছনে যে যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কতকগুলো কারণ রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ বিজ্ঞানসম্মত মতে এই দাঁতটি মানুষের মুখে ১৮ বছর বয়স থেকে যে কোনো সময় উঠতে পারে৷ তাহলে সহজেই অনুমান করুন, ওই সব বয়সের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো৷ শিশু বা কৈশোরে সবকিছু বুঝবার ক্ষমতা থাকে না৷ তবে কৈশোরে থেকে যৌবনে পৌঁছে একজন পুরুষ বা নারীর বুদ্ধি বিবেচনার ব্যাপ্তি ঘটে এবং এটাই স্বাভাবিকভাবে স্বীকৃত৷

একথা সবাই জানেন, একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তির মুখে সর্বমোট ৩২টি দাঁত গজায় এবং এই ৩২টি দাঁতই হঠাৎ করে গজায় না৷ প্রাথমিকভাবে একটি শিশুর ৬ মাস বয়স থেকে তার মুখে দুধ-দাঁত উঠতে শুরু করে, যাকে বলা হয় অস্থায়ী দাঁত বা ডেসিডুয়াস টিথ৷ কারণ এই সকল দাঁত অস্থায়ী৷ একটি নির্দিষ্ট সময়ে উঠে আবার একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই দাঁতগুলো পড়ে যায় এবং ওই স্থানে যে দাঁতটি পুনরায় আবির্ভূত হয়, তাকেই বলা হয় স্থায়ী দাঁত বা পারমানেন্ট টিথ৷ 

আক্কেল দাঁতের বিভিন্ন অবস্থানসমূহ সাধারণত আক্কেল দাঁত বা উইজডম টিথ পর্যাপ্ত স্থান না পেয়ে চোয়ালের ভিতরে বা নিচের দিকে থাকতে পারে৷ আক্কেল দাঁতের এই অবস্থানগুলোকে চারভাগে ভাগ করা যায়৷

শৈল্য চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্ত আক্কেল দাঁত তুলে ফেলবার আগে অবশ্যই X-Ray (OPG) এর সাহায্যে সঠিক অবস্থান জেনে নেয়া প্রয়োজন। চোয়ালের আক্কেল দাঁতগুলো স্বাভাবিক বেরিয়ে আসতে না পারলে নিম্নলিখিত উপসর্গ দেখা দিতে পারে—

১. ব্যথা: আক্কেল দাঁত উঠবার কারণে দাঁতে ব্যথা হলে পাশ্ববর্তী স্থানে ডেন্টাল ক্যারিজ আক্রান্ত দাঁতের উপস্থিতি নির্ণয় করা প্রয়োজন৷অনেক ক্ষেত্রে পাশের দাঁতে ধাক্কা বা চাপ সৃষ্টি, মাড়ির প্রদাহের কারণে ব্যথা হতে পারে৷

২. প্রদাহ: যখন আক্কেল দাঁত সম্পূর্ণভাবে উঠতে পারে না, তখন দাঁতের ক্রাউন বা মুকুট অংশটিকে ঢেকে রাখে উপরিভাগের মাংস বা মাড়ি৷ এই মাড়ির ও দাঁতের মুকুটের মধ্যবর্তী স্থানে জমা হয় খাদ্যকণা৷ ধীরে ধীরে জন্ম নেয় অসংখ্য জীবাণু৷ এই অবস্থায় মাড়িতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যার বৈজ্ঞানিক নাম পেরিকরোনাইটিস৷ এই প্রদাহের কারণে মাড়ি ফুলে যায়, তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় এবং উপরের দাঁতের সঙ্গে মাড়ির ক্রমাগত ঘর্ষণ বা কামড়ে ঘা ক্ষত সৃষ্টি হয়৷

পেরিকরোনাইটিস: অসম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসা আক্কেল দাঁতটির উপরিভাগ যে নরম টিস্যুর দ্বারা আবৃত থাকে তার ভিতরে খাদ্যকণা জমে থাকার কারণে অসংখ্য জীবাণুর জন্ম হয় এবং প্রদাহ বা ইনফেকশন সৃষ্টি হয়৷ এই অবস্থাকে বলা হয় পেরিকরোনাইটিস৷

কৃত্রিম দাঁতের নিচে অবস্থান: চোয়ালের ভিতরে অবস্থানকারী একটি আক্কেল দাঁত অন্য সবকটি দাঁত পড়ে যাবার পর বেরিয়ে আসতে পারে৷ ফলে নিচের পাটির দাঁতের মধ্যে ব্যথা বা প্রদাহ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে৷

৩. ডেন্টাল ক্যারিজ: আক্কেল দাঁতের অসমান অবস্থানের কারণে দাঁত ব্রাশে পরিষ্কার হয় না৷ ফলে খাদ্যকণা জমা হয়ে ডেন্টাল ক্যারিজ সৃষ্টি হয়৷ দাঁত সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে না আসলে এই ক্যারিজ দাঁতকে ফিলিং করাটা অর্থহীন৷ সুতরাং মুকুট বা ক্রাউন ভয়ানকভাবে ভেঙে যাওয়ার আগেই দাঁতটি তুলে ফেলা ভালো৷

৪. পার্শ্ববর্তী সামনের দ্বিতীয় মোলার বা আক্কেল দাঁত আক্রান্ত মাড়ির দ্বিতীয় দাঁতটি ক্রমাগত ধাক্কা খেতে খেতে একদিকে হেলে পড়তে পারে৷ তাছাড়া দুই দাঁতের সংযোগ স্থলটিতে খাদ্যকণা জমা থাকার সুযোগে একটি পেরিওপকেট বা প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে৷ 

৫. সিস্ট: তৃতীয় মোলার বা আক্কেল দাঁতটির ক্রাউন বা মুকুট একটি ডেন্টিজেরাস সিস্ট দ্বারা ঢাকা থাকতে পারে এবং দাঁতটি চোয়ালের নিচের বা পিছনের দিকে অবস্থান করতে পারে৷

আক্কেল দাঁতের কারণে সৃষ্ট বিপদসমূহ: 

আক্কেল দাঁত সমূহের অসমান ও ভিতরে অবস্থানের কারণে সামনের স্বাভাবিক দাঁতে ক্রমাগত ধাক্কা বা চাপ সৃষ্টি করে৷ ফলে স্বাভাবিক দাঁতসমূহে সামনের দিকে হেলে পড়ে চোয়ালের সম্মুখভাগের দাঁতগুলোকে বিচ্ছিন্ন বা আঁকাবাঁকা করে দিতে পারে৷ যে সমস্ত উপসর্গ দেখা দিতে পারে সেগুলো হচ্ছে— 
ক. মাড়ির প্রদাহ বা ইনফেকশন, 
খ. হাড়ের প্রদাহ, 
গ. দাঁতের অংশের ধীরে ধীরে ক্ষয়, 
ঘ. নার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি। 

প্রতিরোধ ও চিকিৎসা: 

মুখ গহ্বর নিয়মিত পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন, যাতে আক্কেল দাঁতটিও নরম টিস্যুর মাংসখণ্ডটির মাঝখানে কোনো খাদ্যকণা জমে থাকতে না পারে৷ একটি এক্সরের মাধ্যমে দাঁতের সঠিক অবস্থান ও সেইসাথে পার্শ্ববর্তী দাঁতের সাথে এর সম্পর্কটাও জেনে নেয়া প্রয়োজন৷ প্রতিবার আহারের পর বা খাদ্য গ্রহণের পর নিয়মিত অল্প গরম লবণ পানিতে কুলি করলে প্রদাহ বা ব্যথা হবার সম্ভাবনা থাকে৷

তবে এর জন্য স্বাভাবিকভাবে দাঁত বের হয়ে না আসা পর্যন্ত স্থায়ীভাবে নিরাময় সম্ভব নয়৷ এক্ষেত্রে যদি এক্সরের মাধ্যমে লক্ষ করা যায়, যে আক্কেল দাঁতটির অবস্থান খুবই অস্বাভাবিক যা কখনই স্বাভাবিকভাবে বের বের হবার সম্ভাবন নেই অথবা পাশের দাঁতটি ডেন্টাল ক্যারিজে আক্রান্ত তবে স্থানীয় প্রদাহ নিরাময়ের পর তুলে ফেলা প্রয়োজন৷ যদি উপরের পাটির দাঁতটি আক্কেল দাঁতের মাংসখণ্ডের উপর ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে এবং নিচের আক্কেল দাঁতটি ফেলে দেবার মতো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে তবে তা তুলে ফেলাই ভালো৷ 

তবে উপরের দাঁতটির কারণে নিচের মাংসে ক্রমাগত ঘর্ষণে ক্ষত বা ঘা সৃষ্টি হলে উপরের পাটির দাঁতের ধারালো অংশ সমূহ ঘষে মসৃণ করা প্রয়োজন৷ এই সমস্ত আক্কেল দাঁত উঠবার সময় নিরাময় পাওয়ার অন্যান্য অসুবিধা ছাড়া যদি আক্কেল দাঁতটির আশপাশে অল্প প্রদাহ থাকে, তবে নিয়মিত আহারের পর ব্রাশ, ডেন্টাল ফ্লস করা এবং অল্প গরম লবণ পানিতে কুলকুচি করাই উত্তম ব্যবস্থা৷

জটিল অবস্থা

যদি আক্কেল দাঁত উঠবার সময় অতিরিক্ত প্রদাহ সৃষ্টির ফলে মুখ হা করতে অসুবিধা হয়৷ মুখের একটি অংশ ফুলে যায় এবং গাল ও চোয়ালের অংশসহ গ্লান্ড আক্রান্ত হয়। তবে মেট্রোনিডাজল ও পেনিসিলিন জাতীয় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা নিরাপদ৷ স্থানীয়ভাবে প্রদাহ ও গালের ফুলা কমে এলে আক্কেল দাঁতটি সঠিক অবস্থান ও রক্তের অবস্থা অন্যান্য ঔষধ গ্রহণের ইতিহাস জেনে নেয়ার পর তুলে ফেলাই শ্রেয়। 

Add
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে