৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১১:১৪ এএম
আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১১:২৯ এএম
একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা

বড় হাসপাতালগুলোতে পেডিয়েট্রিক আইসিইউ শুরু করা দরকার

বড় হাসপাতালগুলোতে পেডিয়েট্রিক আইসিইউ শুরু করা দরকার
অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা। বাংলাদেশের শিশুরোগ চিকিৎসার জগতে এক সুপরিচিত নাম। কর্মজীবনের বিশাল একটি সময় তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নিজ সন্তানের মতো ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলেছেন নবজাতক বিভাগ। অজস্র মৃতপ্রায় নবজাতককে শুনিয়েছেন জীবনের গান। দুহাতে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিদিন। মেডিকেল জ্ঞান চর্চাকে উচ্চকিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতার জন্যও লিখে যাচ্ছেন অবিরত। হাজারো মেডিকেল শিক্ষার্থীকে দিয়ে যাচ্ছেন মানব সেবার দীক্ষা। এই প্রচণ্ড পরিশ্রমী, শিক্ষানুরাগী, মানবদরদী মানুষটির মুখোমুখি হয়েছিল মেডিভয়েস। 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. মনির উদ্দিন

মেডিভয়েস: স্যার, আপনার শৈশব-কৈশোর, শিক্ষা জীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: আমার শৈশব কেটেছে যশোর জেলার কেশবপুরে উপজেলার একটি গ্রামে। সেখানেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে দৌলতপুর বিএল কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত শহরের ছোঁয়া পাইনি। ১৯৮২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৯২ সালে বিসিপিএস থেকে শিশু রোগের ওপর এফসিপিএস সম্পন্ন করি। স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ডান্ডি থেকে ১৯৯৪ সালে ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল এডুকেশনের ওপর ডিগ্রি লাভ করি। ২০০৬ সালে আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ান থেকে এফসিপিএস এবং যুক্তরাজ্যের রয়াল কলেজ অব ফিজিশিয়ান থেকে এফআরসিপি ডিগ্রি দিয়ে আমাকে সম্মানিত করা হয়।

মেডিভয়েস: কর্মজীবনে কোথায় কোথায় কী কী পদে ছিলেন?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: আমাদের সময় এমবিবিএস পাস করার পর ইনসার্ভিস ট্রেনিং ছিল। অর্থাৎ পাস করার পরপরই চাকরিতে ঢোকার সুযোগ ছিল। পরে বিসিএস দিয়ে এটাকে শক্তিশালী করতে হতো। কর্মজীবনে প্রথম কাজ শুরু করি ১৯৮৪ সালে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায়। এখানে কিছুদিন কাজ করার পর আমি যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করি। তখন ইরানে যাওয়ার একটি হিড়িক ছিল। এ সময় সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ইরান চলে যাই। তখন লিয়েনের ব্যবস্থা ছিল না। ওখানে দুই বছর ছিলাম। এর মধ্যে মনে হলো, আমি বোধ হয় শেষ হয়ে যাচ্ছি। পরে ১৯৮৭ সালে আবার ফেরত আসি। তখন আমার বয়স ৩০ বছর পূর্ণ হতে ৩ মাস বাকি ছিল। তখন ৮ম বিসিএসের ফরম বিতরণ চলছিল। সরকারি চাকরিতে নতুন করে যোগদানের উদ্দেশ্যে পরীক্ষা দেওয়া শুরু করি। সেখানে শেষ পর্যন্ত উত্তীর্ণ হই।

১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়ন সাবসেন্টারে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করি। ইরান থেকে ফেরত আসার পর এবং নতুন চাকরিতে যোগদানের মাঝখানে পোস্টগ্রাজুয়েশনের জন্য আমি এফসিপিএস পার্ট-১ সম্পন্ন করি। পরে পার্ট-২ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তৎকালীন পিজি হাসপাতালের (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক ডা. এম আর খান এবং অধ্যাপক তাজুল ইসলাম স্যারের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শেষ করি। থিসিসের কাজ শেষ করি। সবই দুই বছরে হয়ে যায়। পরবর্তীতে সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আসি। এখানে সহকারী রেজিস্ট্রারের প্রশিক্ষণ শেষ করার পর আমি ১৯৯২ সালে এফসিপিএস পার্ট-২ পরীক্ষা দিই এবং আল্লাহর ইচ্ছায় একবারেই সফল হই। পরবর্তীতে আমি পেডিয়াট্রিক্সে রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ শুরু করি। পরে পাবলিক সার্ভিস কমিশন হওয়ায় ১৯৯৩ সালে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে যোগদান করি। পরে ১৯৯৬-৯৭ এর দিকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হই এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চলে আসি। এখানে একটা ইউনিটে রোগীদের দায়িত্ব পাই। সেটা তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া শেখানোর পাশাপাশি গবেষণায় মনোনিবেশ করি। একই সঙ্গে ছোট ছোট দুই/একটি বই লেখার কাজেও যুক্ত হই।

২০০৪ সালে আমি অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পাই। ২০০৮ সালে আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চলে যাই। ওখানে এক বছর বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করি। ২০০৯ এর শেষের দিকে আবারও ঢাকা মেডিকেলে ফিরে আসি। কারণ তখন নবজাতক স্বাস্থ্য সেবায় কিছু শূন্যতা বিরাজ করছিল। পদ সৃষ্টি হলো এবং সেই সুবাদে আমি নবজাতক ইউনিটের উন্নয়নকল্পে কাজ শুরু করি। এর ফলশ্রুতিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আলাদা বিভাগ করা হয়। সেখানেই মাগুরার মায়ের পেটে বুলেটবিদ্ধ শিশুর চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছিল। আরেকটি শিশুকে রাজধানীর পুরাতন এয়ারপোর্টের কাছে কামড়েছিল, তার চিকিৎসা দেওয়া হয়। এগুলো ছিল তখন গণমাধ্যমের প্রধান প্রধান খবর। ৮-৯ মাস পর আমি আবারও বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পাই। ২০১৬ সালের ৩০ জুন আমি সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাই।

মেডিভয়েস: আপনার পরিবার নিয়ে একটু বলুন।

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: আমার আব্বা শাহাদাত হোসেন মোল্লা ব্যবসা করতেন, মা আমেনা বেগম ছিলেন গৃহিনী। আমরা তিন ভাই, দুই বোন। এর মধ্যে আমি দুই নম্বর। বড় ভাই গ্রাজুয়েট ছিলেন। তিনিও ব্যবসা করতেন। ছোট ভাই আহসান হাবিব একটি স্কুলের হেড মাস্টার। দুই বোন, তারা গৃহিনী। আমার স্ত্রীও একজন গৃহিনী। তিনি ১৯৮৮ অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে মেডিকেল শিক্ষায় আসেনি। কমার্সে পড়াশোনা করেছে, বর্তমানে ব্যাংকার। মেয়ে ডাক্তার।

মেডিভয়েস: জীবনের বিশাল একটা সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগে পার করেছেন। আপনার কী মনে হয় দেশের সেরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবে এটি শিশু সেবায় পরিপূর্ণভাবে ভূমিকা পালন করতে পারছে? এর অর্জনগুলো কী কী আর সীমাবদ্ধতাগুলো কোথায়?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ দেশের প্রথম প্রথম মেডিকেল কলেজ। যদিও হাসপাতাল হিসেবে মিটফোর্ড আগে শুরু হয়েছিল। এখানে মেডিকেল শিক্ষা, গবেষণা এবং রোগীদের সেবা এক সাথে চলে। বর্তমানে এর ব্যাপ্তি ব্যাপক। এখানে বর্তমানে প্রায় ৪০টি সাবস্পেশালিটি ডিপার্টমেন্ট আছে। এখানে যত শিক্ষার্থী এমবিবিএসে ভর্তি হয়, প্রায় সমান সংখ্যক শিক্ষার্থী পোস্ট গ্রাজুয়েশনেও ভর্তি হয়। তাই সেবা প্রদান দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটের তুলনায় কম নয়। কিন্তু সারাদেশের মানুষ যে কোনো সমস্যা হলে এখানে এসে ভিড় জমায়। এটি দেশের মানুষের কাছে একটি আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এ কারণে রোগীর চাপ এতো বেশি যে, সামাল দেয়া কষ্টকর হয়ে গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ২ ভবনটি তৈরি করার পরেও দৈন্য দশা এড়ানো যায়নি। সিড়ি ঘরের নিচে থাকা, ওপরে থাকা, মেঝেতে থাকা, খাটের নিচে থাকা, এক বেডে দুইজন করে থাকা এগুলো থেকে পরিত্রাণ মেলেনি। অর্থাৎ যেভাবে সেবার ব্যাপ্তি বাড়ছে, রোগীদের আনাগোনাও বাড়ছে।

১৯৫২ সালে এখানে শিশু বিভাগ শুরু হয়৷ তখন জেনারেল পেডিয়াট্রিক্সের দুটি ইউনিট ছিল মাত্র। পরে আমরা যখন শিক্ষার্থী ছিলাম তখন অধ্যাপক ডা. নাজমুন নাহার ম্যাডামের তত্ত্বাবধানে ওয়ার্ডের ভেতরে একটি জায়গায় আলাদা করে নবজাতকদের সেবা দেওয়া শুরু হলো। সে জায়গা থেকে গত পয়ত্রিশ বছরে আস্তে আস্তে নবজাতক বিভাগ সমৃদ্ধ হয়েছে। অনেক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এসেছে। পেডিয়াট্রিক হেমাটো অনকোলজি, নেফ্রোলজি বিভাগ খোলা হয়েছে। নিউরোলজি, হার্ট, পালমনলজি বিভাগ খোলার চেষ্টা চলছে। আগের চেয়ে ব্যাপ্তি বেড়েছে, চিকিৎসার গণ্ডিও বেড়েছে; কিন্তু এখনও পরিপূর্ণ হয়নি। এ স্বল্প পরিসরেই আমার সাবেক সহকর্মীরা সম্প্রতি একটি পিআইসিইউ স্থাপন করেছেন এবং সীমিত পর্যায়ে কাজটা শুরু হয়েছে। এটি চালু রাখতে পারলে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জায়গার খুবই অভাব।

মেডিভয়েস: দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) নেই বললেই চলে। বেসরকারিভাবে খুব ভালো পিআইসিইউ তেমন নেই। এই বিশাল ঘাটতি কিভাবে দেখেন? এ ব্যাপারে কি কোন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: সরকারিভাবে এখনও পিআইসিইউর ধারণাটা এখনও সেভাবে আসেনি। একটি সময় গুরুত্ব পেতো প্রাইমারা হেল্থ কেয়ার। এর পাশাপাশি এখন টারশিয়ারি কেয়ারের দিকেও গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে। বড়দের যে রকম আইসিইউ কেয়ার, সিসিইউ কেয়ার লাগছে, বাচ্চাদেরও এমন কিছু রোগ আছে, যেসব রোগের জন্য ইনটেনসিভ কেয়ার জরুরি। সরকারিভাবে ঢামেকের ৪/৫টি শয্যা ছাড়া কোথাও পিআইসিইউ নেই। বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে এসেছে। এটাকে একটি বিশাল ঘাটতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটা পূরণের জন্য এরই মধ্যে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পেডিয়াট্রিক আইসিইউ থাকবে। আমরা ছিলাম, প্রাইমারি হেল্থ কেয়ারে। এখন এর গণ্ডি সার্বিক সেবার ব্যবস্থাপনার দিকে এগুচ্ছে। এখন বড় বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক আইসিইউ সেবা শুরু করা যায়।

মেডিভয়েস: দেশে আস্থা রাখা যায় এমন নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) হাতে গোণা কয়েকটি৷ অধিকাংশই নাম সর্বস্ব দালাল নির্ভর প্রতিষ্ঠান। এই গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরটি তত্ত্বাবধানের কি কি পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: আমি মনে করি, যদি নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) সেবাটা ইনস্টিটিউশনালাইজ করতে হবে। ক্লিনিকগুলোতে সেবা হচ্ছে, কিন্তু এগুলো হলো সার্ভিস ওরিয়েন্টেড। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণাও হয়। যেটা ক্লিনিকগুলোতে সম্ভব না। কারণ ক্রিটিকাল কেয়ারের সেবা দিতে গেলে আপডেটেড প্রোটোকল সম্পর্কে ভালো থাকাটা জরুরি। নিয়মিত গবেষণা হওয়া জরুরি, যা ক্লিনিকের ছোট পরিসরে সম্ভব না। মেডিকেল শিক্ষা, গবেষণা ও ছাড়া এনআইসিইউ বা পিআইসিইউ অচল।

মেডিভয়েস: সাধারণ মানুষ কিভাবে ভালো শিশু হাসপাতাল বা এনআইসিইউ/পিআইসিইউ চিনবে?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: এই মুহূর্তে আমাদের দেশে সরকারি পর্যায়ে কোনো শিশু হাসপাতাল নাই। ঢাকায় দুটি শিশু হাসপাতাল আছে, একটি শ্যামলীতে ঢাকা শিশু হাসপাতাল আর মিরপুরে এমআর খান শিশু হাসপাতাল। ঢাকার বাইরে খুলনায় একটি হাসপাতাল। বেসরকারি পর্যায়ে এ রকম হাতে গোনা কয়েকটি শিশু হাসপাতাল আছে। তাহলে অগণিত শিশুদের চিকিৎসা কোথায় হচ্ছে? তা হচ্ছে মেডিকেল কলেজগুলোর শিশু বিভাগে। তবে সরকারি পর্যায়ে শিশু চিকিৎসায় একটি ইনস্টিটিউটের কাজ চলছে রাজধানীর পূর্বাচলে। এই মুহূর্তে যে কয়টা শিশু হাসপাতাল আছে, তারা বেশ ভালোভাবেই সেবা কার্যক্রম চালাচ্ছে। কারণ সেখানে মেডিকেল শিক্ষা আছে, গবেষণা চলছে। শ্যামলী শিশু হাসপাতালে ছয় শতাধিক শয্যা আছে। সেখানে বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি আছে, পোস্ট গ্রাজুয়েশন শিক্ষা চলছে। এমডি-এফসিপিএস চলছে। মিরপুরে এমআর খান শিশু হাসাপাতালে একই চিত্র। ভালো শিশু হাসপাতাল বা এনআইসিইউ/পিআইসিইউর সন্ধান করলে ওই হাসপাতাল ও সেন্টারটা আপনি বেছে নিন, যেখানে মেডিকেল শিক্ষা হয়। সর্বোপরি যেখানে আবেগ আছে কিন্তু বেগ কম এমন ইনস্টিটিউটে যেতে হবে। তারা শিক্ষায় সমৃদ্ধ হওয়ায় ব্যবসার চেয়ে সেবায় বেশি গুরুত্বারোপ করেন।

মেডিভয়েস: এখন পর্যন্ত শিশু মৃত্যুর ক্ষেত্রে বেশির ভাগই হচ্ছে নবজাতকদের (০-২৮ দিন) মাঝে। এদের মৃত্যু কমাতে কোন কোন জায়গাতে বেশি নজর দেয়া দরকার?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: সেই একই কথা বলবো, মেডিকেল শিক্ষা। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত মানবসন্তানকে শিশু বলা হয়। এদেশের জনসংখ্যার কথা বিবেচনা করলে ৪৮ ভাগ শিশু। অথচ মেডিকেল কারিকুলামে শিশু বিভাগ বলে আলাদা কোনো বিষয় নাই। এটা ভাবাই যায় না। একটি ছাত্র মেডিসিনে গ্রাজুয়েট হচ্ছে, সে মেডিসিনে পাস করলেই হয়ে গেলো। পেডিয়াট্রিক্সকে এখানে ওইভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। একটি দেশের স্বাস্থ্যসূচিতে যে পরিসংখ্যান আমরা দিই, তা কিসের ওপর? বৃদ্ধ মানুষ কত মারা গেছেন সেটার ওপর? নাকি শিশু কতগুলো মারা গেছে সেটার ওপর? একজন শিক্ষার্থী ৪৮ ভাগ শিশুদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে লেকচার শোনে আর ১০ সপ্তাহ পড়াশেনার সুযোগ পায়। শিশুদের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নবজাতক। আমাদের যারা চিকিৎসক হচ্ছেন, তারা অনেক উপরে যাবেন। অথচ তাদের সূচনা খুবই দুর্বলভাবে হচ্ছে। এটি একটি বিশাল শূন্যতা। সঠিক পর্যালোচনা হলে নিওনেন্টাল মৃত্যু কমানো সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশুদের ওপর কোনো বিষয় নাই। এখনো মেডিসিনের পার্ট হিসেবেই আছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এটা হয়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য আরেকটি শূন্যতা।

মেডিভয়েস: স্যার, এখন অনেক ভূয়া চিকিৎসক/পল্লী চিকিৎসক/এলএমএএফ/ডিপ্লোমা চিকিৎসক নিজের আওতার বাইরে গিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ/স্বল্প রোগেই অনেক উচ্চমাত্রার এন্টিবায়োটিক প্রদান করছে বা ভুল চিকিৎসা দিচ্ছে। এটি প্রতিরোধ করতে কি আপনারা কোন কাজ করছেন?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: তাদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার তো একটি বডি আছে। তাদের দেখভাল করা সে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এটি ভালোভাবে তদারকি হওয়া উচিত। আরেকটি জিনিস প্রসঙ্গক্রমে আসে, এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। এর অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ২০৩০ সালের পর থেকে আমাদের বিনা চিকিৎসায় মরে যেতে হবে। কার্যকর কোনো এন্টিবায়োটিক পাওয়া যাবে না। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। ঢাকাসহ ঢাকার বাইরেও গুরুত্ব দিতে হবে।

মেডিভয়েস: যেহেতু মায়ের পেটে থাকতেই সুস্থভাবে প্রসব নিশ্চিত করতে একটি শিশুর শারীরিক অবস্থার তত্ত্বাবধান জরুরি। সেক্ষেত্রে কী গাইনোকোলজির সাথে মিলে জাতীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেয়া যায়?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: এগুলোকে সামনে রেখে আমাদের একটি অ্যাসোসিয়েশন আছে বাংলাদেশে পেরিনেটাল সোসাইটি নামে। পেরিনেটাল পিরিয়ড হলো জন্মের ২৮ সপ্তাহ আগে থেকে জন্মের পর সাতদিন পর্যন্ত। এর ভেতরে মায়ের স্বাস্থ্যও আসে, নবজাতকের স্বাস্থ্যও আসে। এ প্রশ্নের ধারণাকে সামনে রেখে আজ থেকে প্রায় ১২-১৩ বছর আগে এ সোসাইটির যাত্রা। আমরা যদি একটি সুস্থ শিশু চাই, তাহলে এর পূর্বশর্ত হলো মা যেন সুস্থ থাকে। অর্থাৎ মায়ের সুস্থতার সঙ্গে নবজাতকের সুস্বাস্থ্য নির্ভর করছে। সুতরাং মায়ের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে অবস্ট্রেটিশিয়ানরা আর নবজাতকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে শিশু বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি সমন্বিতভাবে চলছে। বিষয়টি ইনস্টিটিউনলাইজ করার জন্য আমরা সমন্বিত মিটিং করছি। বারডেম হাসপাতালে প্রতি মাসে একবার মিটিং করি। মৃত্যুগুলো অডিট করি, কেন মারা গেলো? এখানে মায়ের কী ত্রুটি ছিল, বাচ্চার চিকিৎসায় কোনো ভুল হয়েছে কিনা? সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে গাইনোকোলজিস্টরা এবং পেডিট্রিশিনরা যদি একসঙ্গে বসে নবজাতকের মৃত্যু ও মায়ের স্বাস্থ্য নিয়ে আলাপ করা যায়, তাহলে এ সেক্টর অনেক উপরে চলে যাবে।

মেডিভয়েস: দেশে সরকারিভাবে একটি শিশু ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কথা শোনা যাচ্ছে বেশ কয়েকমাস ধরেই। এ ব্যাপারে অগ্রগতির কতদূর? আপনার মতে প্রতিষ্ঠানটির গঠন কেমন হওয়া দরকার?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: ‘ন্যাশনাল চিলড্রেন হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ’ নামে বিশেষায়িত এই শিশু হাসপাতালের প্রস্তাব হয়ে গেছে। অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো অবকাঠামো আমরা দেখিনি। সময়ের ব্যবধানে এটা হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। এর প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল হানিফ টাবলু যেভাবে লেগে থাকেন, এটা নিয়ে আশঙ্কা করার কোনো কারণ নাই। একটি কাজ করার পর অনেক সময় মনে হয়, হায় এখানে একটু ভুল হয়ে গেছে! সুতরাং এমনটি যাতে না হয়, সেজন্য দরকার সামগ্রিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করে ভালো প্রস্তাবনা তৈরি করা। তাহলেই প্রকল্পের কাজ ৭০ ভাগ প্রায় সম্পন্ন বলা যাবে। এই শিশু হাসপাতাল আমার মতো অনেকের প্রাণের দাবি। এখানে চারটি জিনিস থাকবে; দক্ষ প্রশাসন, মেডিকেল শিক্ষা, গবেষণা ও রোগীর সেবা। এখানে সার্জারি, মেডিসিনসহ সমস্ত সাবস্পেশালিটি থাকা উচিত। যেখানে একটি শিশু হার্টের সমস্যা নিয়ে এসে কিডনির চিকিৎসাও করাতে পারে।

মেডিভয়েস: সারা দেশে শিশু চিকিৎসকদের নিয়ে বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এ বিষয়ক বেশ কিছু সোসাইটি গড়ে উঠেছে। আপনার কি মনে হয় সোসাইটিগুলো চিকিৎসকদের মানোন্নয়ন, গবেষণার ক্ষেত্র বৃদ্ধি ও চিকিৎসকদের অধিকার রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে? কোন জায়গাগুলোতে তাদের আরও গুরুত্ব দেয়া দরকার?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) এ দেশের একটি পুরনো সংগঠন। ১৯৭৩ সালে অধ্যাপক ডা. এম আর খান ছিলেন প্রথম প্রেসিডেন্ট। ৪০ বছর ধরে তারা কাজ করছে। এ প্রতিষ্ঠানটি অনেক কিছুই করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১৩শ’ সহকারী অধ্যাপকের পদোন্নতি হলো। শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ে যারা যোগদান করেছেন তাদের পদ সৃষ্টির প্রস্তাবনাটি ছিল বিপিএর। কাজটা করেছে বাংলাদেশ সরকার, এতে বিপিএর সক্রিয় ভূমিকা ছিলো। আজ শিশু বিভাগের যতগুলো সাবস্পেশালিটি আছে—বিপিএ এদের বটগাছ। যেমন কার্ডিয়াক সোসাইটি, পালমোলজি সোসাইটি, নিওনেন্টাল সোসাইটি—তারা কেউই স্বাধীন না। তাদের কোনো কিছু করতে হলে বিপিএর সম্মতি নিয়েই করতে হয়। ডাক্তারদের অধিকার আদায়, তাদের জন্য পদ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন জায়গায় অধিষ্ঠিত করার জন্য তারা যথেষ্ট কাজ করছে।

আমাদের ভালো একটি জার্নাল আছে ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব চাইল্ড হেল্থ’ নামে। এখানে গবেষণায় বেশ কিছু দুর্বলতা ছিল, ওই জায়গাটায় অনেকটা অগ্রগতি এসেছে। এখানকার সদস্যের প্রায় সবাই বিভিন্ন ইনস্টিটিউশনের প্রতিনিধি। গবেষণায় শূন্যতা পূরণে আমাদের অনেক সদস্য এগিয়ে এসেছেন। আমার জ্যেষ্ঠ বন্ধু অধ্যাপক লুৎফুল কবির তার পেনশনের পুরো টাকা গবেষণার জন্য এখানে দিয়ে দিয়েছেন। যাতে বিপিএর তত্ত্বাধানে পোস্ট গ্রাজুয়েট করা একজন শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল পায়। অনেক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অ্যাসোসিয়েশন এগিয়ে যাচ্ছে।

মেডিভয়েস: বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিতই কথা ওঠে চিকিৎসকরা বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি, ক্লিনিক থেকে দামী উপঢৌকন ও মাসোহারা পান বা বিদেশ গমন বা কনফারেন্সগুলোতে অনেক বড় অংকের স্পন্সর যোগার করেন। যার ফলে ক্ষেত্র বিশেষে ওষুধের দাম বাড়ছে। চিকিৎসকদের নৈতিক মান কমছে। সার্বিকভাবে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। এসব অভিযোগের ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? 

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: কনফারেন্সের জন্য আমরা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর কাছে আমরা যাই। এটা শুধু এই দেশেই না, পৃথিবীর অনেক দেশেই হয়। উদ্দেশ্য হলো, এ সম্মেলনের মাধ্যমে আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানে যারা কাজ করছেন তাদেরকে সর্বশেষ উন্নয়ন সম্পর্কে সচেতন করা। এ প্রোগ্রামে অ্যাসোসিয়েশন সংগঠনের নামে সহযোগিতা নেন, কোনো ব্যক্তির নামে নয়। আমাকে যদি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি বলে—স্যার, আমি আপনাকে এটি দেবো। আমি নৈতিকভাবে কোনোদিনও এটা গ্রহণ করবো না, কোনো দিন করিওনি। আমি যদি বলি, আপনি যদি সাপোর্ট করতে চান তাহলে অ্যাসোসিয়েশনকে করুন, তাহলে তার ফল ভালো হবে।
এজন্য যদি ওষুধের দাম বেড়ে যায়, তাহলে চিকিৎসকদেরই হয় তো স্বাস্থ্যখাতে সাবসিডিয়ারি দিতে হবে। এ নিয়ে কোনো একটি উপায় বের করার জন্য অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে একটি সংলাপে যাওয়া যেতে পারে। এ নিয়ে কিছু বলা আমার জন্য কঠিন। এ নিয়ে একটি মুক্ত আলোচনা হতে পারে। এর মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত হলে এটা জনস্বার্থেই যাবে।

মেডিভয়েস: আপনি মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের পেডিয়াট্রিক মেডিসিনের উপর চমৎকার একটি বই লিখেছেন। এছাড়াও সাধারণ পাঠকদের জন্য বাংলায় বেশ কিছু বই লিখেছেন। এ সম্পর্কে কিছু বলুন। 

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য অধ্যাপক নাজমুন নাহার ম্যাডামের সঙ্গে যৌথভাবে বই আছে। বইটি ঢাকার নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হয়। বিষয়গুলো আমি পর্যবেক্ষণ করতে পারি না। যখন দরকার তখন ওরা প্রেস থেকে নিয়ে বিক্রি করে। তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি থাকে যে তারা এর চেয়ে বেশি দাম বাড়াবে না। একটি বই ‘ATLAS ON CLINICAL PEDIATRICS’. অন্যটি হলো: ‘Step on to PAEDIATRICS’. বইগুলোতে ছবি দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমানে আমি আর এক বন্ধু মিলে পেডিয়াট্রিক রেডিওলজির ওপর বই লিখছি। দুই তৃতীয়াংশ কাজ শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া প্রথম আলোর ‘ভালো থাকুন’ একটি কলামে লিখি, কিন্তু সময় তেমন বের করতে পারি না। রেডিওলজির বইটা শেষ করাই আমার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

মেডিভয়েস: তরুণ চিকিৎকেরা বর্তমানে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ ও নানা অপ্রাপ্তিতে অনেকেই হতাশ হয়ে যাচ্ছে। অভিভাবক হিসেবে সিনিয়রদের সাহায্য ও দেখভাল ঠিকভাবে পাচ্ছে না এই অভিযোগ অনেকেরই। একজন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে এ নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: আজকে যারা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করছে তারা তো আমাদের ছেলে-মেয়ের মতোই। তাদের দেখভাল করার দায়িত্ব আমাদের ওপরেও পড়ে। অনেক মেডিকেল শিক্ষার্থী আসে একেবারে গরিব ঘর থেকে। তারা মেডিকেল শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতে পারে না। আমাদের একটি ছোট সংগঠন আছে, আমরা কিছু কিছু ছেলেমেয়েকে শিক্ষার খরচটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এটা একেবারেই বিচ্ছিন্নভাবে। আমার স্ত্রীর ভাই এভাবে ৫/৬ জন শিক্ষার্থীকে দেন। সমস্যা হলো, একটি ছেলে এমবিবিএস পাস করার পর তাকে আবার উচ্চশিক্ষার জন্য বিশাল প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। প্রতিযোগিতা বিএসএমএমইউভিত্তিক, সিটও খুবই কম। প্রস্তাবিত আরও বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়ে গেলে উচ্চতর ডিগ্রি তথা পোস্ট গ্রাজুয়েট করার সুযোগ-সুবিধা বিএসএমএমইউর মতো বিস্তৃতি লাভ করে তাহলে প্রতিযোগিতা একটু কমবে। আঞ্চলিক পর্যায়ে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হলে অনেক লোকবলের পদও সৃষ্টি হয়। শিক্ষক ও বিভিন্ন বিষয়ে চিকিৎসকের পদ তৈরি হয়। বিশাল জনবহুল এই দেশে প্রায় সবাই শিক্ষিত, কিন্তু চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে না। কোন একটি মেডিকেল কলেজের ঝাড়ুদার নিয়োগের জন্য আবেদনকারীরা দেখা গেলো সবাই গ্রাজুয়েট। সুতরাং নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হলে প্রতিযোগিতা কিছুটা কমবে এবং হতাশা দূর হবে।

মেডিভয়েস: ব্যক্তিগতভাবে আপনি আমেনা শাহাদাত ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর সম্পর্কে কিছু বলুন। 

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: আমেনা শাহাদাত ফাউন্ডেশন আমার মা-বাবার নামে গড়া প্রতিষ্ঠান। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমার জন্ম। ইন্টারমেডিয়েটের আগে আমি শহরে কোনোদিন যাইনি। সেখান থেকে লেখাপড়া করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর ইচ্ছায় একটি পর্যায়ে চলে এসেছি। গত বিশ বছর ধরে আমি অন্য কোথাও ছুটি কাটাতে যাই না। গ্রামে চলে যাই। ডাক্তার হওয়ার পর থেকেই এ সেবাটা আমি দিয়ে যাচ্ছি। আমি অনেক টিম নিয়ে গেছি, মেডিকেল ক্যাম্প করেছি। শিশুদের তালু কাটা, ঠোঁট কাটার চিকিৎসা করেছি। ঢাকার কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কনসালটেন্টরা গেছেন। ২০০৯ সালে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে আমেনা সাহাদাত ফাউন্ডেশনের রেজিস্ট্রেশন করি। এখানে আমরা মূলত তিনটি বিষয়ে দৃষ্টি দিয়েছি। একটি হলো শিক্ষা। গ্রামের অনেক ছেলে-মেয়ে আছে যারা মেধাবী। অর্থাভাবে পড়তে পারে না। অনেকে ক্লাস ফাইভ, সিক্স পর্যন্ত পড়ে আর পড়তে পারে না। আমাদের সীমিত সামর্থের মধ্যে আমরা তাদেরকে বৃত্তি দিয়ে থাকি। বৃত্তিপ্রাপ্ত অনেক ছেলে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ও বুয়েটে পড়াশোনা করে। আমরা স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকি। আমি রোগী দেখেছি, এক সময় ওষুধও সরবরাহ করতাম। কিন্তু সব সময়ে ওষুধ দিয়ে পারা যায় না। এখনও মাসে ১/২ বার গ্রামে চলে যাই। আমি গেলে অনেক জায়গা থেকে অনেক রোগী আসে। চিকিৎসা করি, প্রেসক্রাইব করি। 

প্যারামেডিকেলভিত্তিক আরেকটি কাজ করছি। বাংলাদেশে একটি এনজিও আছে ‘সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট’ নামে। তারা বাংলাদেশের ৬০টি জায়গায় মেডিকেল সার্ভিস, শিক্ষা সহযোগিতা, সামাজিক উন্নয়ন, ট্যালেন্ট হান্টসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। আমি তাদের সহযোগিতায় আমেনা-সাহাদাত ফাউন্ডেশনের নামে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এখানে দুইজন প্যারামেডিক্স থাকেন। তারা আমার ইউনিয়নে থেকে ৫শ’ পরিবারকে রিক্রুটমেন্ট করেছে। তারা ইউনিয়নটাকে ১৭টি জোনে ভাগ করে সেখানে স্বাস্থ্য শিক্ষা, প্রাইমারি স্বাস্থ্যশিক্ষা, ডায়াবেটিকস, হাইপারটেনশন চেক করাসহ বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। আমার বাড়িতে আউটডোর সুবিধার মতো একটি সেন্টার আছে, সেখানে সোম ও বুধবার ডাক্তার গিয়ে মা ও শিশুদের রোগের চিকিৎসা দেন। সামর্থ্য অনুযায়ী তাদেরকে ওষুধপত্র সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কিছু সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালিত হয়ে আসছে।

মেডিভয়েস: আর কোন উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত আছেন কীনা। থাকলে সেগুলো কী কী।

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: এখন আমি একটি বিষয় নিয়েই আছি। সেটা হলো: গ্রামে আমার বাড়িতে সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটু জায়গা আছে। সেখানে একটি স্কুল, একটি হেল্থ সেন্টার ও একটি ভোকেশনাল সেন্টার করার চেষ্টা চালাচ্ছি। পাশাপাশি মেডিকেল শিক্ষায় কিভাবে অবদান রাখা যায় তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। আর ‘পেডিয়াট্রিক্স পালমোলজি সোসাইটি’ নিয়ে কাজ করছি। এ নিয়ে ঢাকার বাইরেও সিএমই করেছি। পেডিয়াট্রিক্স পালমোলজি বিষয়ে সরকারি মেডিকেল কলেজে কোনো পদ নেই। এটি থাকলে অনেক বিশেষজ্ঞ বেরিয়ে আসতে পারতো। এসব বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। আগামী মার্চ মাসে আমাদের কনভেনশন হবে। এ বিষয়ে পদ সৃষ্টির জন্য আমরা কাগজ-পত্র জমা দিয়েছি। পুরনো মেডিকেল কলেজে যদি অন্তত পাঁচটা করেও পদ হয়, তাহলে কমন এ সমস্যাটা হাইলাইট করার জন্য আমরা কয়েকজন লোক পাবো।

মেডিভয়েস: ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী কী? দেশ নিয়ে। মেডিকেল সেক্টর নিয়ে। পরিবার নিয়ে।

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা: দেশ নিয়ে আমাদের সবাইকে চিন্তা করতেই হবে। সব কিছু ছেড়ে দিয়ে শুধু পরিবার নিয়ে থাকলে চলবে না। সব কিছু একসঙ্গে নিয়েই চলতে হবে। আমার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রীকে নিয়ে আমার পরিবার। তাদেরকে আমি ফেলতে পারবো না। আবার দেশকে নিয়েও ভাবতে হবে। এ জন্যই আল্লাহ গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। সামগ্রিকভাবে আমাকে এমনভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে, যাতে আমি দেশের সেবা করে যেতে পারি। এম আর খান স্যার আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, অবশ্য তিনি যে কাকে স্নেহ করতেন না সেটা বলা মুশকিল। আমাদের যেহেতু একই দিকে বাড়ি, আমি তাকে বলেছিলাম, স্যার চলেন একটু আমার ওখানে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, কি করেছো সেটা দেখাও তার পরে যাবো। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন, ‘যে মাটি তোমাকে করেছে বড়, দুনিয়া থেকে যাওয়ার আগে সে মাটির ঋণ শোধ করে যাবে’। এটা আমার ওপর একটি বিশাল চাপ। আমি বলেছি, স্যার আপনি দোয়া করবেন। সুতরাং সামগ্রিকভাবে আমাকে একটু চিন্তা-ভাবনা করতেই হচ্ছে।

আমি একজন শিক্ষক, শিশু চিকিৎসক, একজন গবেষক। তিনটি জায়গাতেই আমার অবদান আছে। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জার্নালে এ পর্যন্ত প্রকাশনার সংখ্যা শতাধিক। আগামী প্রজন্ম যারা আসবে মেডিকেল সেক্টরে আমি তাদের শিক্ষিত মেডিকেল স্পেশালিস্ট হিসেবে চাই। মেডিকেল গবেষক হিসেবে চাই। ভালো চিকিৎসক হিসেবে চাই। এ তিনটি জিনিসের জন্য একজন শিক্ষকের যে ভূমিকা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি সেই ভূমিকা রাখতে চাই। আমি এখানে কাজ করি, ক্লাস করি তা না আমাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার ইচ্ছা আমার নাই। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানের অভাব নাই। এখানে লক্ষ্যণীয়ভাবে অভাব শিক্ষা ও গবেষণার। এই জায়গাটায় আমি অবদান রাখতে চাই।

আমার ছেলে ডাক্তার হয়নি, কিন্তু তার স্ত্রী ডাক্তার। মেয়ে শিশু বিভাগে কাজ করছে। জামাই সার্জন। তাদেরকে আমি আমার জীবনের দর্শন জানানোর চেষ্টা করছি। তারা কতোটুকু নিবে সেটা পরের ব্যাপার। তাদেরকে নৈতিকতার কথা সব সময় বলি। তাদের বলি, ওপরওয়ালা যখন তোমাকে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন, নিশ্চয় তোমাকে না খেয়ে মরতে হবে না। সুতরাং নৈতিকতার বিষয়ে কখনো আপোস করবে না।

যা কিছু প্রিয়

প্রিয় উক্তি: মানুষের সেবা করো। এটা ইবাদাত।
প্রিয় রঙ: নীল, আকাশী।
প্রিয় পোশাক: শার্ট-প্যান্ট।
প্রিয় বই: মেডিকেলের যে কোনো বই। তবে আমরা যে বইটা লিখছি, সেটা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
প্রিয় শিল্পী: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
প্রিয় ব্যক্তিত্ব: অধ্যাপক ডা. এম আর খান।
অবসরে কী করেন: গান শুনি। 
স্বপ্ন: শিশু মৃত্যুর হার একদিন উন্নত দেশের মতো কমে আসবে। 

Add
একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

চীনে রহস্যজনক ‘করোনা ভাইরাসে’ দ্বিতীয় মৃত্যু

একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

চীনে রহস্যজনক ‘করোনা ভাইরাসে’ দ্বিতীয় মৃত্যু

একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স