২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৪:২০ পিএম
আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৪:৪১ পিএম

প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতায় ৬৪ জেলা ভ্রমণকারী ডা. বাবর আলীর গল্প

প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতায় ৬৪ জেলা ভ্রমণকারী ডা. বাবর আলীর গল্প

প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো ও এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ৬৪ জেলায় পায়ে হেঁটে প্রচারণা চালানোর মিশনের নেমেছেন বাবর আলী নামে এক চিকিৎসক। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৫১তম ব্যাচের এ শিক্ষার্থী ‘প্লাস্টিককে না বলো’ শ্লোগানকে সামনে রেখে ৬৩ জেলা ভ্রমণ করে বর্তমানে চট্টগ্রামের লোহাগড়া উপজেলায় অবস্থান করছেন। আগামী শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) কক্সবাজারে পৌঁছানোর মধ্যে দিয়ে মিশন শেষ করার কথা রয়েছে তার।

বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) মেডিভয়েসের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে বাবর আলীর পায়ে হেঁটে সারাদেশ ঘুরার অভিজ্ঞতাসহ নানা স্মরণীয় ঘটনা আর ভবিষ্যতের নানা স্বপ্নের আঙ্গিক।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানভীর সিদ্দিকী

মেডিভয়েস: কেমন আছেন?

ডা. বাবর আলী: ভালো আছি।

মেডিভয়েস: পায়ে হেঁটে দেশের সব জেলা ঘুরেছেন, আপনার অনুভূতি কী?

ডা. বাবর আলী: গত ২৫ অক্টোবর পঞ্চগড়ের জিরো পয়েন্ট থেকে আমার ৬৪ জেলা পায়ে হাঁটা শুরু করা। ৬৩ জেলা অতিক্রম করে আমার এ যাত্রা প্রায় শেষ।প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে ‘মিশন স্ট্রলিং ৬৪’ এর যাত্রটা খুবই উপভোগ্য ছিলো। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। তবে মিশনের শেষ মুহূর্তে এসে খুবই খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে শেষ হয়ে গেলে খুব মিস করবো দিনগুলাকে।

মেডিভয়েস: ‘মিশন স্ট্রলিং ৬৪’ (Mission Strolling 64) এর মতো ব্যতিক্রমী এ ভ্রমণের মূল লক্ষ্য কী? 

ডা. বাবর আলী: আপনারা জানেন, ব্যবহারিক জীবনে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন টাইপের স্ট্র, প্লাস্টিকের ওয়ান টাইম প্লেট, প্লাস্টিকের চা-কফির কাপ, কফি কাপের ঢাকনা, পানি-কোল্ড ড্রিংকসের বোতল উল্লেখযোগ্য। 

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলেন, প্লাস্টিকে তৈরি জিনিস অপচনশীল হওয়ায় এসব পরিবেশে থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। দুনিয়াজুড়ে যত প্লাস্টিক পণ্য আছে তার মাত্র ১০-১২ ভাগ রিসাইকেল করা যায়। ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’—এর ক্ষেত্রে একবার ব্যবহারের পরই এদের জায়গা হচ্ছে ময়লার ভাগাড় কিংবা খাল-নালা তারপর নদীপথ হয়ে চূড়ান্তভাবে যাচ্ছে সাগরে।

সাগরের প্রাণিরা প্লাস্টিকের এই ক্ষুদ্র অংশগুলো গ্রহণ করলে সেটা পরবর্তীতে আবার জায়গা করে নিচ্ছে মানুষের খাদ্য শৃঙ্খলে। ডিসকভারি, অ্যানিমেল প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন ডকুমেন্টরিতে দেখা যায়, প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্য খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে বন্যপ্রাণি মারা যায়। আমার ‘মিশন স্ট্রলিং ৬৪’ এর প্রধান কারণ হচ্ছে এটি।

এছাড়াও ব্যক্তিগত জীবনে আমি ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। ছোটবেলায় যখন সামাজিক বিজ্ঞানের ভূগোল অংশে বিভিন্ন জায়গার ছবি, বিভিন্ন খনিজ সম্পদের ছবি দেখতাম, তখন থেকেই আগ্রহ ছিলো, যদি কখনো সুযোগ হতো, দেখতাম দেশটা। পরে আরেকটু বড় হয়ে আমি সাইকেলে ক্রস কান্ট্রি শুরু করি। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, আখাউড়া থেকে মুজিবনগর এরকম কয়েকটি রাইড আমি করেছি। তারপর ভাবলাম যে, পায়ে হেঁটে ঘুরলে মনে হয় আমি আরও বেশি কিছু দেখতে পারবো। এসব কিছু মিলেই আমার ‘মিশন স্ট্রলিং ৬৪’ (Mission Strolling 64).

মেডিভয়েস: হেঁটে দেশ ঘুরার বিষয়টি সংক্ষেপে বলুন।

ডা. বাবর আলী: গত ২৫ অক্টোবর এ যাত্রা আমি একাই শুরু করেছি। পথিমধ্যে আমার সাথে অনেকেই যুক্ত হয়েছেন আবার ছিটকেও গেছেন, এখনও আমি একাই আছি। এমনও হইছে আমার বন্ধুবান্ধব, বড় ভাইরা আমার সাথে ২/৩ দিন এসে হেটে গেছে। এমনিতে আসলে পুরো জার্নিতে আমি একা ছিলাম।

মেডিভয়েস: বিশাল এ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন।

ডা. বাবর আলী: আসলে ৬৪ জেলায় ভ্রমণটা বেশ দুষ্কর হলেও আমাকে তেমন কোন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়নি। সব জায়গাতেই আমার বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি রয়েছে। এছাড়াও অনেক ডাক্তাররা আমাকে সহযোগিতা করেছে, রাতে তাদের বাড়িতে থেকেছি। এমনকি, উপজেলা হেলথ সেন্টারের কোয়ার্টারে থেকেছি, জামালপুরে মেডিকেল কলেজের হোস্টেলেও থেকেছি। ফলে একদিনও আমাকে হোটেলে থাকতে হয়নি। এটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় ব্যাপার।

তবে এ জার্নিতে বেশ কয়েকবার মানুষের মুখে আমাকে ‘পাগল’ বলতে শুনেছি। তাদের ধারণা পাঁয়ে হেটে সারাদেশ ভ্রমণ পাগলেই করতে পারে। এ বিষয়গুলোতে আমি অনেক মজা পেয়েছি। 

রংপুরে যাওয়ার পথে আমি হেঁটে যাচ্ছি, তখন এক লোক এসে বলছে যে, আমি আমাজন যাচ্ছি কিনা! আমি বললাম যে, এটা তো ভাই রংপুরের রাস্তা, আমাজনের নয়। আরেকটা মজার ঘটনা হলো, নীলফামারীর সৈয়দপুরে এক বড়ভাইয়ের (বড় ভাইয়ের ফ্রেন্ড) বাসায় ছিলাম, তারপর পরদিন সকালে আমাকে আমার হাঁটার রাস্তায় দিয়ে আসলেন।

তারপর আমি ১ কিলোমিটার যেতে যেতে তিনি পিছন থেকে আবার মটরসাইকেলে আমার কাছে ফেরৎ আসলেন। এসেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছেন, আমার সময় আর সামর্থ্য থাকলে আমিও আপনার সাথে বেড়িয়ে যেতাম। আপনি যে উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আমি আপনাকে কথা দিলাম, এখন থেকে আমি আর সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ব্যবহার করবো না।

এরকম অনেককেই আমি আগে থেকে চিনতাম না, কিন্তু বাসায় থাকার কারণে যতই দিন যাচ্ছে সবাই আমার খোঁজ নিচ্ছে, কোথায় আছি, আর কয়দিন লাগবে -এসব খোঁজখবর নিচ্ছে। এরকম বেশ কয়েকটি মজার ঘটনা ঘটেছে।

মেডিভয়েস: ৬৪ জেলা ঘুরা তো প্রায় শেষ, পরবর্তী মিশন কী?

ডা. বাবর আলী: এখন পর্যন্ত কোন টার্গেট নেই। এটা শেষ হলে নিশ্চই নতুন কোন এডভেঞ্চার করবো। আমার তো এমনিতে পাহাড়ে মাউন্টেনে যাওয়া হয়, আর মাউন্টেন নিয়ে অনেকগুলো প্ল্যান আছে, হয়তো সেগুলোই নিয়েই কাজ শুরু করবো।

মেডিভয়েস: মাউন্টেনের শুরুটা কিভাবে?

ডা. বাবর আলী: ছোটবেলায় সমরেশ মজুমদারের গর্ভধারিণী পড়ে জয়িতাদের সাথে কল্পনায় হারিয়ে যেতাম ভারত-নেপাল সীমান্তের সেই সুবিশাল পাহাড়ের রাজ্যে। মানসপটে হিমালয়ের সেইসব পাহাড়ের ছবি আঁকতে আঁকতেই বান্দরবান দিয়ে ২০১০ সাল থেকে শুরু পাহাড়ে যাওয়া। ২০১৪ সাল থেকে যাত্রা শুরু হিমালয়ের বিভিন্ন পর্বতে। সাফল্য আসা শুরু প্রথম বছর থেকেই। এই বছর তিনটি ৬ হাজার মিটার পর্বত অভিযান শেষ করেছি সফলতার সাথে।

এখন আমি পর্বতারোহণ, ভ্রমণ, সাইক্লিং, কায়াকিংসহ বিভিন্ন কাজের সাথে সম্পৃক্ত। ২০১৬ সালে আখাউড়া-মুজিবনগর এবং ২০১৭ সালে টেকনাফ-তেঁতুলিয়া রুটে সাইকেলে ক্রস কান্ট্রি রাইড সম্পন্ন করেছি। ২০১৭ সালে বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স সফলতার সাথে শেষ করেছি ভারতের উত্তরকাশীর স্বনামধন্য নেহরু ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং থেকে। ভারতের বিভিন্ন রক ক্লাইম্বিং কোর্সে প্রশিক্ষক এবং প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছি।

মেডিভয়েস: আপনি প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে লড়ছেন, সারাদেশ ভ্রমণ করছেন, আপনার কী মনে হয় এভাবে প্লাস্টিক রোধ সম্ভব?

ডা. বাবর আলী: আমি একজন ক্ষুদ্র মানুষ। আমার গন্ডিও ক্ষুদ্র। যাত্রা পথে অনেকেই আমাকেই এ কথা জিজ্ঞেস করেছে যে, আমি ব্যবহার না করলে কমবে কিনা? আমি এভাবে একা হেঁটে হেঁটে প্রচারণা চালালে মানুষ শুনবে কিনা বা বড় কোন প্রভাব ফেলবে কিনা? কিন্তু আমি ক্রমান্বয়ে ৬৩ জেলা হাঁটার পর আমার মতো এরকম অনেকগুলো মানুষ পেয়েছি, যারা প্লাস্টিক ব্যবহার করেন না, আবার অনেকেই কথা দিয়েছেন করবেন না। এভাবে আমি আমিরা মিলে যদি আমরা হয়ে যেতে পারি, তাহলেই বোধয় বড় ধরণের একটা পরিবর্তন আসবে।

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা নিজের জায়গা থেকে সচেতন, কিন্তু এই আলাদা আমিগুলো যখন মিলে একসাথে হয়ে যাবো, তখনই প্লাস্টিক রোধ সম্ভব হবে। তাছাড়া আমার মনে হয় যে, একজনও যদি আমার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে একটা প্লাস্টিক কম ব্যবহার করে, একটা প্লাস্টিকের কাপ সমুদ্রে কম যাচ্ছে বা একটা বোতল কম যাচ্ছে, সবাই মিলে যদি চেষ্টা করি, তাহলে বিশাল কিছু হবে বলে আশা করি। আর এ জন্য শুরুটা এক/দুই জনকেই করতে হবে। তাই আমি আমার অবস্থান থেকে চেষ্টা করে চালাচ্ছি।

মেডিভয়েস: আপনার শিক্ষা ও কর্মজীবন নিয়ে কিছু বলুন।

ডা. বাবর আলী: আমি চট্টগ্রামের মুসলিম হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসএসসি সম্পন্ন করেছি। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে থেকে ৫১তম ব্যাচে এমবিবিএস পাস করেছি। তারপর জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থায় চাকরি নিয়েছিলাম, তারপর ভারতে মাউন্টেনিয়ারিংয়ের একটা প্রশিক্ষক কোর্স থাকায় কিছুদিন পরেই চাকরি ছেড়ে দেই। আমার যেহেতু পর্বতারোহণ, ভ্রমণ করি, তাই পরে আর কোথাও জয়েন করা হয়ে উঠেনি।

মেডিভয়েস: আপনার গ্রামের বাড়ি কোথায়, কে কে আছেন সেখানে? 

ডা. বাবর আলী: আমার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মধ্যম বুড়িশ্বর। ফ্যামিলিতে বাবা মা আছে। আর তিন ভাই এক বোন। বাবা নাম লিকায়ত আলী, প্রবাসী ছিলেন, এখন দেশেই আছেন। আর মায়ের নাম লুৎফন্নাহার বেগম, একজন খাঁটি গৃহিনী। চার ভাইবোনের মধ্যে আমি মেঝো।

মেডিভয়েস: আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ডা. বাবর আলী: আপনাকেসহ মেডিভয়েসকেও ধন্যবাদ।

Add
একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

চীনে রহস্যজনক ‘করোনা ভাইরাসে’ দ্বিতীয় মৃত্যু

একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

চীনে রহস্যজনক ‘করোনা ভাইরাসে’ দ্বিতীয় মৃত্যু

একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি