১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০১:৩৬ এএম

আমরা শুধু একটা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকি না

আমরা শুধু একটা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকি না
যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়ার এক শিশু। ছবি: সংগৃহীত

আমার ছেলের বয়স দশ।

ঠিক এই বয়সে আমার ছোটবেলায় একটা জিনিসের খুব শখ ছিল। ভীষণ আবেগী ও ভালোলাগার শখ।

আমার একটা ছোট সাইকেল হবে, একান্ত নিজের সাইকেল। এটাই সেই শখ।

আমি স্বপ্ন দেখতাম সেই সাইকেল নিয়ে একদিন দূরে কোথায়ও চলে যাবো। আমাদের গ্রামের নদী ডাকাতিয়ার তীর ধরে সাইকেল চালাতে শুরু করবো, তারপর মেঘনা পার হয়ে দূরের কোনো অজানা গ্রামে হারিয়ে যাবো।

একটা সাইকেলের দোকানের সামনে আমি প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতাম। বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে ভিতরের ছোট সাইকেলগুলো চেয়ে চেয়ে দেখতাম। কি সুন্দর কালো-হলুদ ডোরা কাটা ফ্রেম দিয়ে বানানো একটা সাইকেল। সোনালী রডের কালো চাকার একটা সাইকেল ছিল সবচেয়ে দামি।

আমার পছন্দ ছিল নীল রঙের সাইকেলটি। আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে সেই সাইকেলটি কল্পনা করতে পারি। মসৃন চামড়ার মত সিটের কভারটি আমার স্পর্শ করে দেখতে ইচ্ছে করতো আর গোল কলিং বেলটা খুব বাজিয়ে দেখতে মন চাইতো।

নীল সাইকেলটার প্রতি আমার একটা মায়া জন্মে গিয়েছিল। প্রায়ই দোকানে গিয়ে দেখে আসতাম সেটি ঠিক জায়গা মত আছে কিনা। যাওয়ার আগে কেমন একটা ভয় -ভয় কাজ করতো।

মনে হতো- যদি গিয়ে দেখি সাইকেলটা কেউ একজন কিনে নিয়ে গেছে। ভয় হতো যদি গিয়ে দেখি সত্যিই সাইকেলটা আর নেই তাহলে আমার যে খুব মন খারাপ হবে। অনেকদিন সাইকেলটা নজরে-নজরে রেখেছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি, কেউ যেন কিনে নিয়ে না যায়। একদিন টাকা হলে আমি কিনবো। আমার বাড়ি নিয়ে আসবো। বারান্দায় যত্ন করে দাঁড় করিয়ে রাখবো।

কিন্তু না, সাইকেলটা আমার পাওয়া হয়নি। কেউ আমাকে সেটি কিনে দেয়নি।

আমার স্কুল শিক্ষক বাবাকে সাহস করে কখনো সেই কথা বলিনি। মনে হয়েছে বাবা যদি কিনে দিতে না পারেন তাহলে বাবারও মন খারাপ হবে,আমারও মন খারাপ হবে। কী প্রয়োজন এসবের? সময় আসবে। দিন বদলাবে। একদিন আমি ঠিকই কিনবো। কিন্তু সেই দিন আর আসেনি।

সেই সময় মনে হতো, আমার এই শখ যেন ফেরেস্তা জিব্রাঈলের মত। তিনি শুধু আকাশে উড়ে বেড়ান, তাঁকে শুধু কল্পনা করা যায়, গভীর ভাবে ভালোবাসা যায় কিন্তু উনার ডানা স্পর্শ করা যায় না।

তারপর একদিন বড় হয়ে গেলাম।

এখন আমার ছেলেটা লেগো দিয়ে খেলতে খুব পছন্দ করে। কিছুদিন পর পর বিশ-তিরিশ ডলার দিয়ে একটা লেগো কিনে আনবে তারপর গাড়ি -বাড়ি কিংবা রোবট বানাবে। একটা বানানো শেষ হলে আরেকটা কিনে নিয়ে আসে। এই তার খেলা।

সেদিন একটা বড় মার্কেটে গেলাম, হঠাৎ দেখি ছেলেটা আমার পাশে নেই, সে দাঁড়িয়ে আছে একটা বড় খেলনা দোকানের সামনে। বিশাল কাঁচে ঘেরা তাকে সাজানো বড় বড় লেগো দেখছে।

আমি পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর পর,আমার হাত ধরে বললো,

-বাবা ! ঐ লেগো গাড়িটা দেখছো,আমার খুব শখ ঐ গাড়িটা আমি একদিন কিনবো, লেগো দিয়ে বানানো ফেরারি কার,খুব সুন্দর তাইনা বাবা?

-হ্যাঁ,আসলেই সুন্দর।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কি ভিতরে গিয়ে একটু দেখতে চাও?"

ছেলেটা খুব খুশি হলো,বললো, "চলো বাবা একটু দেখে আসি"

আমরা দোকানটিতে ঢুকলাম। একটা অস্ট্রেলিয়ান মেয়ে খুব হাসি মুখে আমাদের দিকে এগিয়ে আসলো। সে খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদেরকে গাড়িটা দেখালো। এই প্রথম আমি জীবনে লেগো দিয়ে বানানো এতবড় গাড়ি দেখলাম। আমি জাস্ট জানার জন্য দাম জিজ্ঞেস করলাম।

মেয়েটা বললো দাম, পাঁচ শত ডলার,সে ডিসকাউন্ট দিয়ে চারশ আশি ডলার রাখতে পারবে।

দাম শুনে একটু অবাক হলাম, একটা লেগোর এতো দাম হতে পারে জানা ছিলোনা। সব সময় ছেলেকে বিশ-তিরিশ ডলার দিয়ে লেগো কিনে দিয়েছি। এত দাম দিয়ে এই খেলনা কিনবো কিনা মনস্থির করতে পারলাম না।

আমি আবার দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম কেন এতো দাম?

সে বললো এইটা ইউনিক পিস্, কোম্পানি একটাই বানিয়েছে।

প্রথমে ভাবলাম কিনে দেই কিন্তু পরে মত পরিবর্তন করলাম। ছেলেকে বললাম, ‘বাবা আজকে আমরা দেখে গেলাম,পরে একসময় না হয় দেখবো কিনা যায় কিনা’।

খুব সহজেই ছেলে বললো, ‘নো প্রব্লেম বাবা,লেটস গো হোম’।

সে কোন বায়না ধরেনি। আমরা বাসায় ফিরে আসলাম।

ঠিক কী কারণে জানি না, বাসায় ফিরে আমি ছেলেকে পাশে বসিয়ে, ইন্টারনেটে অস্ট্রেলিয়ার একটা রিফিউজি অর্গানাইজেশনের ওয়েবসাইটে ঢুকলাম, সেখানে কিছুদিন আগে একটা ছবি দেখেছিলাম,সেই ছবিটা ছেলেকে দেখালাম। সিরিয়ার একটা রিফিউজি ক্যাম্পে ছবিটা তোলা হয়েছে। দশ বছরের একটা ছেলে পাশে সাত বছরের তার ছোট বোনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের হাতে দুইটা খাওয়ার রুটি। ছবিটা দেখিয়ে আমার ছেলেকে বললাম, "তুমি জানো বাবা,তোমার বয়েসি এই ছেলেটা তার বোনকে সাথে নিয়ে রোজ প্রায় তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে এই রিফিউজি ক্যাম্পে আসে, তুমি কি জানো, কেন তারা এখানে আসে ?"

ছেলে অবাক হয়ে জানতে চাইলো,কেন বাবা ?

-কারণ এখানে আসলে ওরা খাওয়ার জন্য দুইটা রুটি পায়।

কথাটা শুনে ছেলেটা খুব মন খারাপ করলো,ছবিটার দিকে সে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকলো।
তারপর আমি বললাম,"তুমি জানো বাবা,আমি জানতে পেরেছি কিছু লোক সেখানে একটা নতুন বেকারি বানাতে চায়,সেখানে আরো বেশি পরিমানে রুটি বানানো যাবে, এখন তুমি চাইলে ঐ দামি লেগোটা কিনতে পারো অথবা সেই টাকাটা ওদেরকে দান করে দিতে পারো "।

ছেলেটা খুব আগ্রহ নিয়ে বললো, "তুমি ওদেরকে দিয়ে দাও বাবা"।

আমার তো অনেক লেগো আছে,এখন আর আপাতত লাগবে না।আমি তাকে একটু জড়িয়ে নিলাম,আদর দিয়ে দিলাম।

কিন্তু রাতে শোয়ার পর ঘুম আসছিল না। মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে। মনে হলো ছেলেটার সাথে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। একটা শখের লেগো কিনে দিলে কি এমন হতো !

অন্ধকারে চুপ করে বিছানায় শুয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর দেখি আমার ছেলে তার বিছানা ছেড়ে এসে আমার পাশে এসে বসলো। তারপর আমাকে একটু জড়িয়ে ধরে বললো-‘থ্যাংক ইউ বাবা, ঐ ছবিটা আমার সাথে শেয়ার করার জন্য’।

আমার মনটা আবার ভালো হয়ে গেলো, ছেলের মনে একটা সুন্দর স্মৃতি তৈরি করে দিলাম।

সে জানলো, আমরা শুধু একটা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকি না, জীবনে কিছু কিছু শখকেও বিসর্জন দিতে হয়।

এই জীবনে চলতে গিয়ে, পথ পিছলে পড়ে যেতে হয়, হাত ভেঙে গেলে সেই হাত জোড়া লাগার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। একটা ট্রেন মিস করতে হয়। প্রিয় কোন বই হারিয়ে ফেলতে হয়। কাউকে ভালোবেসে ব্যর্থ হতে হয়। আমাদের মাকে চিরদিনের জন্য বিদায় দিতে হয়।

জীবনে সবকিছু পেতে হবে এমন কিছু নেই,না পাওয়াও একটা জীবন,না পাওয়াও একটা সুন্দর স্মৃতি।

এই জীবনে আমি যা কিছু পাইনি, কেউ না কেউ তো সে জিনিস ঠিকই পেয়েছে।
তাই নয় কি?

লেখক: ডা. শামসুল আলম

অস্ট্রেলিয়ায় বসবারত বাংলাদেশি চিকিৎসক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না