ডা. জামান অ্যালেক্স

ডা. জামান অ্যালেক্স

বিসিএস মেডিকেল অফিসার


০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৫:০৩ পিএম

৩৯ এর নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের হাসিমুখগুলো থাকুক অমলিন 

৩৯ এর নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের হাসিমুখগুলো থাকুক অমলিন 
রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আয়োজিত ৩৯তম বিসিএস ব্যাচের চিকিৎসকদের কয়েকজন। ছবি: সংগৃহীত

চাকরির প্রথম দিককার কথা। এদেশের কোন এক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আউটডোরে বসে ভদ্রছেলের মতো রোগী দেখছি। এরই মধ্যে ৬০-৭০ জন রোগী দেখা শেষ হয়েছে। এরপরও রুমের বাইরে লম্বা লাইন। 

এমন সময় হুড়মুড় করে ৪-৫ জন লোক রুমে প্রবেশ করলেন। ভাবসাবে বেশ দাম্ভিব প্রকৃতির। এদের মাঝে একজন বলে উঠলেন, ‘এই যে ডাক্তার, আমাগো বসরে একটু তাড়াতাড়ি দেইখা দেন দেখি’। 

তাদের কথার মধ্যেই ওই বস আমার পাশে ডাক্তারদের জন্য রাখা চেয়ারে ধপ্ করে বসে পড়লেন। 

নতুন নতুন চাকরি করি, শরীরে তেলের পরিমাণ তখন অনেক বেশি, নীতি-নৈতিকতা তখন আমার শরীর থেকে বেয়ে বেয়ে পড়ে। লাইন ব্রেক করে কিছু উদ্ধত শ্রেণীর লোক আঙ্গুলের নির্দেশে কিছু করতে বলছে—এ রকম দৃশ্যের সঙ্গে আমি অভ্যস্ত নই। লাইন মেনটেইন করে আসতে বলেছিলাম। তারপর আমার সাথে যে আচরণ করা হয়েছিলো সেটা আমার এখনও মনে আছে। আচরণ ছিল অপ্রত্যাশিত, ভাষা ছিলো অশালীন, আমি ছিলাম কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমার হৃদয়টা সেদিন ভেঙেচুরে গিয়েছিল। 

সরকারি চাকরিতে বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেলো। অবস্থার বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন হয়নি। দিনকে দিন অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে, দিনকে দিন আরো খারাপ অবস্থার শিকার হতে হয়েছে, নিপীড়িত হতে হয়েছে, নিষ্পেষিত হতে হয়েছে। কেউ এগিয়ে আসেনি, সম্ভবত কেউ এগিয়ে আসবেও না। 

কথাগুলো হঠাৎ মনে হবার কারণটা বলি। ৩৯তম বিসিএসের নিয়োগ হয়ে গেলো। আমার ফেসবুকের দেয়ালে শত শত ছেলেমেয়ের সরকারি চাকরিতে জয়েন করার হাসিমুখের ছবি। আমি এদের হাসিমুখগুলো দেখি আর দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে স্ক্রল করে নীচে চলে যাই। 

আহ! এদের হাসিমুখগুলো যদি অমলিন থাকতো! এরা কি জানে, এই একটিমাত্র ক্যাডারে এদেরকে প্রতি পদেপদে নিষ্পেষিত হতে হবে? এরা কি জানে স্বাস্থ্য ক্যাডার একমাত্র একটি ক্যাডার, যেখানে অধিকাংশ সদস্য অসন্তুষ্ট? এরা কি জানে, মাত্র ৫ বছরে কিভাবে নিষ্পেষণ করতে করতে মানবিকতাবিহীন এক রোবটে আমাকে পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে?

নাহ, এরা সেটা জানে না। না জানাই ভালো, এরা কয়দিন আনন্দে থাকুক, অল্প কিছুদিন আনন্দে থাকার মূল্যও কিন্তু কম না। 

উপজেলা পর্যায়ে একজন চিকিৎসকের রুম এবং চিকিৎসকের সমমর্যাদাসম্পন্ন প্রশাসন ক্যাডার বা পুলিশ ক্যাডারের রুমে যাবার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কি আপনাদের কারো কখনও হয়েছে? কেমন দেখেছেন? কোন পার্থক্য কি চোখে পড়েছে? কে কতটুকু মর্যাদা নিয়ে কাজ করে—সেটা কি কখনও দেখেছেন?

আমি জানি, অনেক চিকিৎসক হয়তো আমাকে ভেঙচি দিয়ে বলবেন, ‘যে চেয়ারে বসে রোগী দেখি সে চেয়ার থাকে ভাঙা, আর আপনি আসছেন রুমের সুযোগসুবিধা আর মর্যাদা নিয়ে কথা বলতে’। 

আচ্ছা, সব বাদ দেই, একটা ইস্যুতে কথা বলি। কথায় বলে—If you chase two rabbits, you wont catch either one । নতুন যারা নিয়োগ পেলো তাদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত করা হয়েছে? আমি জানি, হয়নি, হবেও না। 

এক মহারথীর সঙ্গে দেখা হয়েছিলো। জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো হাসপাতালের নিরাপত্তা রক্ষায় ‘হেল্থ পুলিশিংয়ের’ ব্যপারে আপনার মতামত কি?

তিনি ব্যাঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘আপনাদের চিন্তাভাবনা এমন কেন? আপনারা ব্রিলিয়ান্ট লোক, ইনোভেটিভ আইডিয়া দেন’। 

মহারথীর সাথে আর কথা বলার ইচ্ছে হয়নি। নিজের জীবন যেখানে বিপন্ন, সেখানে ‘ইনোভেটিভ আইডিয়া’ টাইপের আতলামী কথাবার্তা চালানোর অর্থ হয় না। এসির বাতাসে বসে ইনোভেটিভ আইডিয়া নিয়ে কথা বলা যেতে পারে, কিন্তু আমরা চিকিৎসকরা যেখানে কাজ করি সেখানে ‘হেল্থ পুলিশিং’ আমাদের প্রধান চাহিদা। এ কথা কেউ শুনেও না, বুঝতেও চায় না। 

রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলো, ‘কাটা আঙ্গুল থেকে রক্তের মতো ঝ'রে ঝ'রে পড়ে ইচ্ছার নীল অক্ষমতা’, আমাদের নিরাপত্তার ইস্যুগুলো তেমনি নীল অক্ষমতা হয়ে হারিয়ে যায়। 

এদেশে যাদের নিরাপত্তা কখনও বিঘ্নিত হয় না, তারা ডজনখানেক পুলিশ নিয়ে ঘোরে। কিন্তু যারা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শত শত রোগীর চিকিৎসা দিয়ে চলছে, তাদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক ১ জন পুলিশও পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের মেধাবী এই গোত্রটির সাথে এহেন আচরণ কেন করা হয় সেটি আমার আসলে অজানা। আমরা বোধ হয় জাতিগতভাবে মেধাকে লালনে উৎসাহী নই। 

জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘যখন কোন নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। ওই জায়গার মানুষ কী খায় আর পড়ালেখা কী করে। কী খায় আর কী পড়ে এই দুইডা জিনিস না জানলে একটা জাতির কোন কিছু জানন যায় না’। 

জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক একটা জাতি চেনার উপায় বলেছেন, একটা জাতি যে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে সেটা বোঝার জন্য কোন ক্লু দিয়ে যান নাই। সেই ক্লু'টা আমি দেই। যদি দেখেন, কোন জাতির লেখাপড়া জানা মানুষগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত, তবে বুঝে নিবেন ওই জাতি নষ্টপ্রায়। এবার চোখ বন্ধ করুন। মনের আয়নায় কোন নষ্ট জাতি কি দেখতে পান?
 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কৈফিয়তনামা

ভুল কাজ করে, ভুল কথা বলে সরকারকে বিব্রত করবেন না

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কৈফিয়তনামা

ভুল কাজ করে, ভুল কথা বলে সরকারকে বিব্রত করবেন না

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না