০৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১১:২৮ এএম

এক অর্ডারে ২৪ ঘণ্টায় পিজি থেকে বারডেমে চলে আসি 

এক অর্ডারে ২৪ ঘণ্টায় পিজি থেকে বারডেমে চলে আসি 

অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী একাধারে একজন চিকিৎসক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও মাদকবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি মাদকবিরোধী আন্দোলনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন সবেমাত্র ডেন্টালে ভর্তি হওয়া এ শিক্ষার্থী। বাবা-মাকে না জানিয়ে রাতের অন্ধকারে একাকি পাড়ি জমান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উদ্দেশে। সম্প্রতি মেডিভয়েস মুখোমুখি হয়েছিল বহুগুণে ঋদ্ধ এ চিকিৎসকের। সযত্নে তুলে আনা হয় তাঁর অভাবনীয় অর্জনের আসল রহস্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. মনির উদ্দিন। 

মেডিভয়েসের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন, কেমন আছেন?
অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: ভালো আছি, ধন্যবাদ। 

মেডিভয়েস: আপনার শৈশব, কৈশোর ও শিক্ষা জীবনের গল্প জানতে চাই।

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: আমাদের বাড়ি সিলেটে। সেখানে আমার জন্ম হয়। আমার শৈশবও কেটেছে সেখানেই। আমার মা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডা. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী ছিলেন সিলেট গার্লস স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। মায়ের স্কুলে শিশু স্কুল বলে একটি শাখা ছিল, সেখানেই আমার শিক্ষাজীবন শুরু। এরপর সিলেট গভমেন্ট বয়েজ স্কুলে ভর্তি হই। ক্লাস থ্রি থেকে আমার পাঠ্যসূচির কাজ শুরু হয়। মা সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় তার বদলি হলে আমরা মার সঙ্গে চলে যাই খুলনায়। ভর্তি হই সেন্ট যোসেফ স্কুলে। সেখানে কয়েকদিন ক্লাস করি। এরপর মা আবার ময়মনসিংহে টিচার ট্রেনিং কলেজে বদলি হন। তখন ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে ভর্তি হই। সেখান থেকে ১৯৬৮ সালে মেট্রিক পাস করি। পরীক্ষা চলাকালীন মা ঢাকায় বদলি হওয়ায় হোস্টেলে থেকে পরীক্ষা দিই। সৃষ্টিকর্তার আশির্বাদে ভালো রেজাল্টও করেছি। এখনতো একজন পরীক্ষার্থীকে ঘিরে স্বজনরা উদ্বিগ্ন থাকেন। আমাদের সময় এমন ছিল না। যেহেতু আমাদের পারিবারিক বন্ধনটা সুদৃঢ় ছিল। বাবা-মায়ের অনুশাসনে আমরা চলতাম। ফলে আমাদের আমাদের জীবন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ছিল। পড়াশোনা-খেলাধূলার বাইরে কিছু না। সুতরাং বাবা-মাকে স্কুলের সামনে বসে থাকতে হবে—এমন অবস্থা ছিল না। আমাদের পরিবারে এ ধরনের কোনো রীতি-নীতি দেখিনি। 

পরবর্তীতে ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হই। সেখান থেকে ১৯৭০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। পরে ১৯৭১ সালে ঢাকা ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হই। ১৯৭৫ সালে বিডিএস সম্পন্ন করি। 

মেডিভয়েস: ডেন্টাল থেকে পাসের পর তরুণ চিকিৎসকদের বিভিন্ন স্যারদের চেম্বারে ইন্টার্নশিপের মতো করে কাজ শিখতে হয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায় নিজেও চেম্বার দিতে পারে না। তাদের জন্য কোনো করণীয় আছে কিনা?

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: আমার জন্য বিরাট সৌভাগ্য, আমি ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ডা. মো. ইব্রাহিমের মুখ ও দাঁতের সেবা দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আমি তৎকালীন আইপিজিএমআরে (পিজি হাসপাতাল) সহকারী অধ্যাপক হিসেবে আমি যোগদান করি। ওই সময় দাঁতের চিকিৎসার জন্য পিজিতে যান ডা. মো. ইব্রাহিম। সেদিন আমাদের বিভাগে কোনো অধ্যাপক না থাকায় ডা. মো. ইব্রাহিমকে আমি দাঁতের চিকিৎসা দিই। এতে তিনি এতই মুগ্ধ হোন যে, বারডেমে ফিরে এসে সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মতিনকে ফোন করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চান তিনি আমাকে চেনেন কিনা। মন্ত্রী বলেন, হ্যা চিনি। তিনি অনেক ভালো, গান করেন, সমাজসেবা করেন। ডা. ইব্রাহিম বললেন, তাঁকে আমার বারডেমে দিয়ে দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন, কিভাবে দেবো? তিনি তো সরকারি চাকরি করেন। তিনি বললেন, ডেপুটেশনে দিয়ে দেন। তখন অর্ডার হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমি পিজি থেকে বারডেমে চলে আসি। এটি একটি অলৌকিক ঘটনা, এমনটি কারও জীবনে হয়েছে কিনা, আমি জানি না। এটা আমার জন্য সৌভাগ্য। 

এ সুবাদে ১৯৮৬ সালে বারডেম হাসপাতালে ডেন্টাল বিভাগ শুরু করি। তখন এখানে ডেন্টালের কিছুই ছিল না। আমি আমার চেম্বার থেকে চেয়ার নিয়ে আসি, যন্ত্রপাতিগুলো পকেটে করে নিয়ে আসি এবং রোগী দেখা শুরু করি। পরের বছর ডা. মো. ইব্রাহিম বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সিটিস্ক্যান মেশিন আনালেন। জাপান-বাংলাদেশ যৌথ উগ্যোগে। এখানে ডেন্টাল চেয়ার ঢুকিয়ে দিলেন তিনি। এর পর বারডেম হাসপাতালে আমি নিয়মিতভাবে রোগী দেখা শুরু করি। আরও ডাক্তার নিই। এখন তো আমার বিরাট বিভাগ হয়েছে। এখানে আউটডোরে প্রায় ১০-১২ চিকিৎসক কাজ করেন। ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজে ডেন্টাল ইউনিটে প্রতি বছর ২৫ জন করে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন সাবজেক্ট ওয়াইজ বিভিন্ন টিচার নিয়োগ করা হয়েছে। বিভিন্ন স্পেশালিটি, যেমন: অর্দডন্টিস্ট, প্যারডন্টিস্ট, প্যারডনশিয়া, পাবলিক হেল্থ, চিলড্রেন ডেন্টিস্ট্রি, কনজারভেটিভ ডেন্টিস্ট্রি—সব বিভাগে আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছি। যে সূচনা করেছিলাম, ধীরে ধীরে তা এখন অনেক সমৃদ্ধ এবং সব ধরনের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্বারা হচ্ছে। 

এখন ডেন্টিস্ট্রির একটি বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হলো। নতুন নতুন ডেন্টিস্টরা এখানে কাজের সুযোগ পাবেন। আমরা তাদের এ সুযোগ তৈরি করে দিলাম। তারা এখানে পড়াশোনা করবে তারপর এখানে এবং বিভিন্ন হাসপাতালের চাকরি পাবেন। যেভাবে আমরা শুরু করেছিলাম, সেভাবে যদি প্রতিটি কলেজ ও হাসপাতাল ভূমিকা রাখতে পারে—তাহলে কোনো ডেন্টিস্ট বা ডাক্তার বেকার থাকবে না।

মেডিভয়েস: আপনি দীর্ঘদিন ধরে মাদক নিয়ে কাজ করছেন, বর্তমানে কোন মাদকদ্রব্যে যুবসমাজ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে? কী কী পদক্ষেপ নিলে মাদকের ছোবল থেকে তাদের রক্ষা করা সম্ভব হবে?

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: বিগত প্রায় ৩৪ বছর যাবৎ এ মাদক ও ধূমপান নিয়ে কাজ করছি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমি ৩০ বছর আগে ধূমপান নিয়ে অনুষ্ঠান করি। সেটা এতো জনপ্রিয় হয়, বিশ মিনিটের অনুষ্ঠানটি এক মিনিটের ফিলার বানিয়ে প্রতিদিন রাতে চালানো হতো সংবাদ শিরোনামের আগে। এভাবে জনগণ সচেতন হয়। এর পর ১৯৮৭ সালে মাদক দ্রব্য নেশা নিরোধ- মানস সংস্থা প্রতিষ্ঠা করি। এখন পর্যন্ত আমি এটা নিয়ে কাজ করছি। 

তামাক দুই ধরনের। এক ধূয়াযুক্ত, যেমন: সিগারেট; দুই ধূয়াহীন, যেমন: জর্দা, গুল, দক্তা, খৈনি। ধূয়াহীন এসব তামাকও মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে মুখের ক্যান্সার হয়। 

আর সিগারেট হচ্ছে মাদকের নাটের গুরু। এটা দিয়েই একজন ব্যক্তির নেশা শুরু হয়। প্রথমে সিগারেট, তারপরে গাজা, ফেন্সিডিল, ইয়াবা, কোকেন, হিরোইন সব কিছু। এর শুরুটা হয় সিগারেট দিয়ে। এজন্য আমরা সিগারেট নিয়ে আন্দোলন শুরু করি। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই, এ সরকারের আমলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সঠিক বাস্তবায়ন হয়েছে। বাংলাদেশে এখন পাবলিক প্লেসে ধূমপান করলে ৩০০ টাকা জরিমানা। কোনো গণমাধ্যমে প্রচার নাই, স্পন্সর নাই। এগুলো আমাদের সাফল্য। কিন্তু এখন মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসছে, এবং ভারত থেকে ফেন্সিডিল দেদারসে আসতো, এখন কিছুটা বন্ধ হয়েছে। বর্তমান মাদকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ইয়াবা। তরুণ-যুব সমাজকে খেয়ে ফেলেছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন চলছে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা যাচ্ছি। তাদেরকে সচেতন করছি। অভিভাবকদের সচেতন করছি। আর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রতি সপ্তাহে মাদক সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছি। এর মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বোঝাতে চেষ্টা করছি, মাদককে কেন না বলা দরকার। সরকারও সচেষ্ট, তারা মাদকের বিরুদ্ধে সারাদেশে অভিযান পরিচালনা করছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্সে আসা সম্ভব হবে। 

মেডিভয়েস: পেশাগত জীবনের পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির মতো সৃষ্টিশীল অঙ্গনে কিভাবে নিজেকে যুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন? আপনি একাধারে একজন চিকিৎসক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও মাদবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব—কোন পরিচয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন?

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: চিকিৎসক হওয়ার মতো সফলতা ও সৌভাগ্য কোনো পেশাতে নেই। কারণ একটি মানুষ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে অসহ্য বেদনা নিয়ে যখন চিকিৎসকের কাছে আসে, তখন যদি ছোঁয়াতে তার কষ্টটা মুহূর্তের মধ্যে লাঘব করা যায়, এবং তাঁর হাসিটা দেখা যায়, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর সাফল্য আর কোনো পেশায় আছে বলে মনে হয় না। এটা মহৎ পেশা, এক সময় বলা হতো, ডক্টরস আর নেক্সট টু গড। কারণ সৃষ্টিকর্তা অবশ্য আমাদের অফরন্ত ভাণ্ডার দিয়েছেন। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আর শ্রেষ্ঠ জীব আরেকজন মানুষকে সুস্থ করে তুলবে। ভূপেন হাজারিকার ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটা আসলে অনন্য। মানুষ মানুষের জন্য কিছুটা হলেও দরদ সহানুভূতি দেখাতে পারে—চিকিৎসক হিসেবে এই সুযোগটাই গুরুত্বপূর্ণ। ডা. ইব্রাহিম বলতেন, সেবার সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আর আমি যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। 

আর সঙ্গীত জগৎ শুরু হয় আমার বাসাতেই। আমার মা উনি নিজে গান করতেন। হারমোনিয়াম নিয়ে আমাদের সকলকে নিয়ে বসতেন, আমরা গান করতাম। এভাবে গানে মায়ের কাছে হাতেখড়ি। তার পরে সিলেটে সুরসাগর প্রাণেশ দাস, ঢাকায় বাফাতে এসে মরহুম আতিকুল ইসলাম এবং স্বর্গীয় শ্রী অজিত রায়ের কাছে আমি গান শিখেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে ভানু কীর্ত অরবিন্দ বিশ্বাসের কাছে গান শিখেছি। সব মিলিয়ে আমি রবীন্দ্র সংগীতে কোনো কোর্স সম্পন্ন না করলেও অনেকের সাহচর্যে গিয়ে আমি যতটুকু শিখেছি এটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট। 

আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন—আপনি ডাক্তারি করেন, গান করেন, সামাজিক কাজ করেন, লেখালেখিও করেন, চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন এত কিছু কিভাবে সম্ভব? আমি বলি, সারা দিনে মানুষের ২৪ ঘণ্টা সময়।  আপনি কিভাবে ২৪ ঘণ্টা সময় কাজে লাগাবেন, এটা আপনাকে ডায়েরিবদ্ধ করতে হবে। কোনো সময় অপচয় করবেন না। মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের পর থেকে আমার জীবনকে এভাবে সাজিয়েছি। আমি যখন রেস্টরুমে যাই, তখনও ম্যাগাজিনটা হাতে নিই, পত্রিকা পড়ি। ওখানে আমার লেখালেখির ব্যবস্থা আছে। কিছ কিছু কাজ সেখানেই করি। চেম্বারের ফাঁকে ফাঁকে কাজ করি। ছুটির দিনগুলোতে আমি গান-বাজনা করি। আমি অলসতার মধ্যে সময় কাটাই না। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বাজে আড্ডায় সময় কাটাই না। প্রতিটি মুহূর্ত সাংস্কৃতিক, চিকিৎসাসহ সব জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি।

মেডিভয়েস: মাদকবিরোধী আন্দোলনের কারণে আপনি একুশে পদক পেয়েছেন। এ আন্দোলনে যুক্ত থাকার সুবাদে আপনার আর কী কী অর্জন রয়েছে? মাদক নিয়ন্ত্রণে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো বলুন। 

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: মাদকবিরোধী আন্দোলনের জন্য ২০১৫ সালে একুশে পদক পেয়েছি। এছাড়া আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে। তারা আমাকে ১৯৮৯ সালে এবং আমার সংস্থা মানসকে ১৯৯৫ সালে ‘টোবাকো হেল্থ মেডেল’ দিয়েছে। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে জাতীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য করেছেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে প্রতিটি মানুষকে সুস্থ রাখা আমাদের দায়িত্ব। একজন ডেন্টিস্ট হিসেবে শুধু দাঁতের যত্নের কথা বলবো, আর দাঁতের ব্যথা দূর করবো—সেটা কিন্তু না। আমাদের কাজই হচ্ছে মানুষের সেবা। এখন যে ইয়াবা, মাদক গোটা সমাজকে গ্রাস করছে। সেখানেও একজন চিকিৎসকের ভূমিকা থাকা উচিত। অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন, একজন ডেন্টিস্ট হয়ে আপনি মাদকবিরোধী আন্দোলন করেন কেন? এই প্রশ্নটাই অবান্তর। এই আন্দোলন তো প্রত্যেকের করা উচিত ছিল। কেউই করছে না। কিন্তু উল্টো প্রশ্ন করছে, আপনি কেন করছেন? সমাজের মানুষের এই মানসিকতা আমাকে পীড়া দেয়। আমার কষ্ট লাগে, মানুষ বুঝতে চায় না—সমাজের বিভিন্ন দুর্গতি, অসঙ্গতি ও অবক্ষয় দূরীকরণে সবারই দায়িত্ব আছে। আমরা নিজেদেরকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দাবি করি, অথচ কেউই দায়িত্ব পালন করছি না। মাদকের বিরুদ্ধে সবারই সোচ্চার হওয়া উচিত। প্রতিটি পরিবারের পিতা-মাতা, প্রতিটি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী, ওয়ার্ড কমিশনার, সংসদ সদস্যরা এ দায়িত্ব নিলে আজকে সমাজের এ অবক্ষয় হতো না। একা প্রধানমন্ত্রীকে কেন বলতে হচ্ছে? চিকিৎসকরা এ কাজে এগিয়ে আসলে সমাজের দুর্গতি কমবে।

মেডিভয়েস: আপনি একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে আপনার স্মরণীয় কোনো একটি ঘটনা বলুন, যা আপনাকে আজও নাড়া দেয়।

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: তখন খুব গান-বাজনা করতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। তখন সমস্ত গণআন্দোলন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে হতো। সংগ্রাম কমিটি, সাংস্কৃতিক সংস্থা ছিল। সাংস্কৃতিকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন করতো, সেগুলোতে জড়িত ছিলাম। ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনে ২৫ মার্চের কালো রাত্রির পরে যখন শুনলাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হয়েছে। এবং বিভিন্ন শিল্পীরা সেখানে চলে গেছেন। তখনই আমি ঘরে থেকে বেরিয়ে যাই, জুন মাসের প্রথম দিকে যখন বের হই; বাবা-মাকে বলিনি। ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বিছানায় মশারি টানানো ছিল, এ অবস্থায় আমি বেরিয়ে গেছি। একটি ব্যাগে ছিল একটি জোড়া স্যান্ডেল ও জুতা, একটি শার্ট, একটি প্যান্ট। ঢাকার নীলক্ষেত মোড় থেকে একটি বাস যেতো, সরাসরি দাউদকান্দি হয়ে কুমিল্লা। সেখান থেকে আমি একা আড়িখোলা গ্রাম হয়ে আগরতলা ঢুকে যাই। এখনো শিহড়িত হই, কিভাবে যেতে পারলাম। তখন মিলিশিয়া, পাকিস্তানি আর্মসরা এবং সমস্ত রাজাকাররা দাউদকান্দিতে রাস্তায় রাস্তায় পয়েন্টে পয়েন্টে ব্রাশ ফায়ার করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখ বেঁধে নিয়ে এসে মারছে। এসবের মধ্যে চলে যাই।

তখন একটি ভয়াবহ অবস্থা ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা আসছে, বোমা মারছে, পুল-ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছে, পাকিস্তানিদের হত্যা করছে। আগরতলার কলেজটিলাতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ছিলাম এক মাস। সেখানে একটি সাংস্কৃতি দল ছিল, বিখ্যাত পল্লীগীতি শিল্পী সরকার আলাউদ্দিনকে পাই। আমরা একসঙ্গে আগরতলা থেকে কলকাতা চলে যাই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতগুলো গান হয়েছে, সবগুলোতে আমাদের কণ্ঠ আছে। বর্তমানে ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রো ভাইস-চেন্সেলর অধ্যাপক নাসরিন আহমদ আর আমি তখন একটি ডুয়েট গান করি। শহীদুল ইসলামের কথা ও হরলাল রায়ের সুরে ‘জ্বলছে জ্বলছে জ্বলছে প্রাণ আমার, দেশ আমার’।  এ গানটি খুব সম্ভবত নভেম্বরের দিকে প্রচার হয়। সেদিন আমার নাম ঘোষণা হয়। তখনই আমার বাবা-মা জানতে পারেন, আমি জীবিত আছি। এটি আমার জীবনের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বাংলাদেশের সবাই স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতো। এটাই ছিল একমাত্র উৎসাহদাতা। মুক্তিযুদ্ধের বার্তাগুলো পৌঁছে দেওয়া, মানুষকে উৎসাহিত করা, মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে কালভার্ট উড়িয়ে দিচ্ছে, ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছে, রাজাকারদের মারছে—সব তথ্য এর মাধ্যমে পেতো। উদ্দীপনামূলক গানগুলো শুনতো, এসব গানেই আমরা কণ্ঠ দিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে যে আমি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি, আমার জীবনের একটি মাইলফলক।

মেডিভয়েস: অনলাইন পোর্টালসহ বর্তমানে স্বাস্থ্য বিষয়ক বেশি কিছু গণমাধ্যম এসেছে। কোনো চিকিৎসক নিগ্রহের শিকার হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিবাদ করছেন, বিষয়গুলো কিভাবে দেখেন?

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: এই জিনিসগুলো আমাদের সমাজে খুবই খারাপ। একজন চিকিৎসক কখনোই একজন রোগীকে মারেন না। তিনি মারবেন কেন, তিনি কি হত্যা মামলার আসামি নাকি, কিংবা তার শত্রু? প্রতিটি চিকিৎসকই চান, রোগীটা সুস্থ হোক। হ্যা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগী মারা যেতেও পারে। সব রোগী কি সুস্থ হয়? তাহলে কি কারণে মারা গেল, তার একটি তদন্ত হওয়া উচিত। সেটা না জেনে, না বুঝে সংবাদ হয়ে যায়, ‘ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু’। এখন অবহেলাটা কখন হলো, কিভাবে প্রমাণ হলো, কখন তদন্ত হলো। সেটার কোনো আলোচনা নাই। আমরা সেটার অবসান চাই। রোগীদের সঙ্গে ডাক্তারের যে সম্পর্ক সেটা হবে অত্যন্ত মধুর, বন্ধুত্বসুলভ, অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ, হৃদয়গ্রাহী। তখনই রোগী আরও সুস্থ হবেন এবং ডাক্তারও মাথা ঠাণ্ডা রেখে ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন। 

কোনো ডাক্তার যদি এ নিগ্রহের শিকার হন, তাকে চিকিৎসক সমাজের পক্ষ আইনিসহ সব রকমের সহযোগিতা থেকে করা উচিত। এটি ভালো উদ্যোগ। 

মেডিভয়েসের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: মেডিভয়েস ভালো কাজ করছে। আগে এ ধরনের কাজে কেউ এগিয়ে আসেনি। এ কাজে প্রত্যেক চিকিৎসকের সহায়তা করা উচিত। তাহলে সমাজে যে দ্বন্দ্বগুলো আছে; ভুল ধারণা, ভুল বোঝাবুঝি আছে, সেগুলো দূর হবে। মেডিভয়েস যে কাজ করছে আমার মনে হয়, তা ডাক্তার এবং রোগীর সম্পর্কোন্নয়নে একটি বিরাট ভূমিকা রাখবে। আমরা সেটাই চাই, আমরা ডাক্তাররা যেন রোগীদেরকে যথাযথভাবে সেবা দিতে পারি। রোগীরা যেন ডাক্তারদের ওপর আস্থা রাখতে পারে। সেই প্রচেষ্টাই মেডিভয়েস চালাচ্ছে। 

(বিস্তারিত আসছে প্রিন্ট সংখ্যায়)

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স