২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০৪:৪০ পিএম

ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বাস্থ্যসেবার টাকা ব্যয় হয় না

ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বাস্থ্যসেবার টাকা ব্যয় হয় না

গত পাঁচ বছরে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য বরাদ্দ করা অর্থের মাত্র ১৩ শতাংশ খরচ হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলার বাইরের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য কোনো অর্থ খরচ করা হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদান (ইএসডি) শাখা ‘ট্রাইবাল হেলথ প্রোগ্রাম’ নামে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায়। এ বছরের ডিসেম্বরে এ কর্মসূচি শেষ হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত পাঁচ অর্থবছরে খরচ হওয়া অর্থের বড় অংশটি হয়েছে বিদেশ সফর, সেমিনার ও প্রশিক্ষণে। স্যাটেলাইট ক্লিনিক স্থাপন ও আসবাব কেনায় কিছু খরচ হয়েছে। কোন খাতে কত খরচ হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের নজরদারি করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তা করেনি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

বৃহত্তর সিলেট এলাকার চা-বাগানের শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ। সমতল এলাকায় সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য এই কর্মসূচির কোনো কাজ না হওয়া এই জনগোষ্ঠীর প্রতি সরকারের উদাসীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
ইএসডির লাইন ডিরেক্টর এ এম মুজিবুল হক বলেন, তিনি দায়িত্বে নতুন বলে এ বিষয়ে কিছু জানেন না। তিনি উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক (ডিপিএম) এ আর এম রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

কর্মসূচির দলিলে বলা আছে, দেশে ৪৫টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বাস। সংখ্যায় তারা ২৫ লাখ, যার ৪২ শতাংশ বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে বসবাস করে। বাকিদের বাস দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি জেলায়। কর্মসূচি শেষে ২৫ লাখ মানুষের কাছেই সেবা পৌঁছাবে বলে দলিলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

খরচ মাত্র ১৩ শতাংশ: গত পাঁচ বছরে (২০১১-১৬) তিন পার্বত্য জেলার ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি টাকা। আর সমতলের জন্য বরাদ্দ ছিল ১১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২৬ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া হিসাবে দেখা যায়, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে পাঁচ অর্থবছরে ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৩২ হাজার ১২৬ টাকা খরচ হয়েছে। অর্থাৎ খরচ করা হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ১৩ শতাংশ।

এ ব্যাপারে রামভজন কৈরী বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের একটি অংশ আন্তরিক নয় বলেই তাঁরা খরচ করেননি।
কাজ কী হয়েছে: লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, পাঁচ বছরে তিন পার্বত্য জেলায় ২৭৫টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক পরিচালিত হয়েছে। স্যাটেলাইট ক্লিনিকে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতামূলক বার্তা দেওয়া হয়। একটি ক্লিনিকের জন্য সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা খরচ হয় বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।

রাঙামাটি জেলা সদরে তিনটি ও খাগড়াছড়ি জেলা সদরে একটি কর্মশালা হয় ২০১৩ সালে। ‘ট্রাইবাল হেলথ প্রোগ্রামে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণ ও ভূমিকা’ শীর্ষক এসব কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কত ছিল, তা জানাতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ইএসডি কার্যালয় থেকে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে ২৫৮ জনকে এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৬১ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোথায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।

একইভাবে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীর একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছরে ২ হাজার ২৩৮ জন বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নেন। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের কর্মশালার কিছুটা বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে ওই দপ্তর। রাঙামাটির ৪টি উপজেলায় ৮টি এবং বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় ১৪টি কর্মশালা হয়। এই ২২টি কর্মশালায় ৯০৭ জন অংশ নেন।
সর্বশেষ অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে খরচ হয়েছে ৮৭ লাখ ৬৩ হাজার ১৯০ টাকা। এই অর্থবছরে কাজ হয়েছে তিনটি—৯৪টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক স্থাপন, ৪০ জনকে নিয়ে কর্মশালা ও বিদেশ সফর।

উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে তিনিসহ ১৮ জন সাত দিনের জন্য শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই সফরে খরচ হয়েছিল ৩৫ লাখ টাকার বেশি।

বিশ্বব্যাংকের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা–বিষয়ক নীতিমালায় আছে, সদস্যদেশের কোনো কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থ বা সংশ্লিষ্টতা থাকলে সেই কর্মসূচির কারণে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না বা কীভাবে লাভবান হবে, তা তারা দেখবে। প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন বিভিন্ন পর্বে বিশ্বব্যাংক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বার্থ দেখবে, এমন কথাও নীতিমালায় আছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা জানতে চেয়ে এর ঢাকা কার্যালয়ে চিঠি দিলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি