০১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৮:১৪ পিএম
আপডেট: ০১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৮:৩৪ পিএম

‘আমাকে চিকিৎসার জন্য সমস্ত কিছু বিক্রি করতে হয়েছে’

‘আমাকে চিকিৎসার জন্য সমস্ত কিছু বিক্রি করতে হয়েছে’

ক্যান্সারের চিকিৎসা সত্যিই ব্যয়বহুল। আমি আমার সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে ক্যান্সারের চিকিৎসা করেছি। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটিই বলেছেন ক্যান্সার আক্রান্ত আভা ফ্লোরেন্স।

তিনি বলেন,‘‘আমার আর সম্পদ বলতে কিছুই নেই। আমি একজন বিধবা মহিলা এবং আমার কাছে চিকিৎসার জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’’

সেনেগালের রাজধানী ডাকারের একটি স্কুলের প্রশাসনিক এই কর্মকর্তা গত বছর জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

ক্যান্সার আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান একটি সমস্যা এবং সরকারী হাসপাতালগুলোতে কেমোথেরাপি দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার সর্বশেষ দেশ সেনেগাল।

সেনেগাল সরকার বলেছেন, সে দেশে স্তন বা জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত মহিলাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হয়। অন্যান্য ক্যান্সারের ক্ষেত্রে শতকরা ৬০ ভাগ কম মূল্যে চিকিৎসা দেয়া হয়।

সরকারী হাসপাতালের পরিচালক খাদি এমবায়ে সিলা বিবিসিকে জানান,কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধও রোগীকে বিনামূল্যে দেওয়া হবে।

 

‘নতুন টায়ারের মতো’

ক্যান্সারে প্রায়শই কেমোথেরাপির চেয়ে আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় এবং এর জন্য রোগীর প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়।

ব্রেস্ট হেল্থ গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের পরিচালক ডা. বেন অ্যান্ডারসন বলেছেন, ‘‘এটি নতুন টায়ার পাওয়ার মতো। আপনার গাড়ি চালানোর জন্য গ্যাস কিনতে হবে, রাস্তা লাগবে এবং রাস্তায় চালাতে গেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগবে।’’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)অনুযায়ী, আফ্রিকার উপকূলীয় নারীদের ক্যান্সারে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ জরায়ুমুখ ক্যান্সার এবং স্তন ক্যান্সার। সাম্প্রতিক এই রোগগুলো প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিচ্ছে জনস্বাস্থ্য বিভাগ।

২০১১ সালে ডব্লিউএইচও বলেছিল, অ-সংক্রামক রোগগুলো কয়েকটি দেশের জন্য "আসন্ন বিপর্যয়" হিসেবে দেখা দিয়েছে। যা মানুষকে দারিদ্রতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সুতরাং, সেনেগালের এ পদক্ষেপকে "একটি চমৎকার পদক্ষেপ" হিসেবে প্রশংসা করা উচিত বলে মনে করেন ড. অ্যান্ডারসন।

 

সেনেগালে ক্যান্সার:

সাধারণ ক্যান্সারসমূহ: জরায়ুমুখ ক্যান্সার শতকরা ১৭.৮, স্তন ক্যান্সার ১৬.৭, লিভার ক্যান্সার ১০.২, প্রোস্টেট ক্যান্সার ৯.১, পাকস্থলী ক্যান্সার ৫.২ ভাগ।

নতুন নিবন্ধিত ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সংখ্যা (২০১৮): ১ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১০ হাজার ৫৪৯ জন।

নিবন্ধিত ক্যান্সারের মৃত্যুর সংখ্যা (২০১৮): ৭ হাজার ৫৭১ জন।

সূত্র:ডব্লিউএইচও

 

সম্প্রতি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ প্রাথমিকভাবে আফ্রিকার মহিলাদের তীব্র সংক্রামক রোগসমূহ এবং গর্ভকালীন জটিলতার উপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

তবে জীবনমান উন্নতির সাথে সাথে ডাক্তাররা কি "ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্য আচরণ" সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করছেন? যেমন-ডায়েট, ব্যায়ামের অভাব, অ্যালকোহল এবং তামাকের ব্যবহার ইত্যাদি। এগুলো এই মহাদেশে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ডাকারে কর্তব্যরত একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিবিসিকে বলেন,আমাদের ক্যান্সারে মৃত্যুর হার কার্যকরভাবে কমাতে আরও অনেক কিছু করা আবশ্যক।

ডা.মামাদউ দিওপ বলেন,‘‘প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার সনাক্তকরণ থেকে শুরু করে নিরাময় পর্যন্ত চিকিৎসাব্যয় কমানো উচিৎ।

ক্যান্সার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি ছাড়াও রোগীদের প্রায়শই সার্জারির প্রয়োজন হয়। অনেকের আবার হরমোনথেরাপি বা রেডিওথেরাপিরও প্রয়োজন।

সেনেগালে রেডিওথেরাপির একটি কোর্সের জন্য প্রায় ২৫০ ডলার এবং অস্ত্রোপচারের জন্য ৩৩০ ডলার খরচ হয়। রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা শেষ করা পর্যন্ত খরচ ১ হাজার ৬০০ ডলার লাগতে পারে।

এম এস ফ্লোরেন্সের মতো যেসব মহিলা প্রতিমাসে ৮০ ডলার উপার্জন করে, এটি তাদের জন্য খুবই ব্যয়বহুল।

মিসেস ফ্লোরেন্স আশাবাদী যে, এই নতুন পদক্ষেপটি তার মতো মহিলাদের সহায়তা করবে। তবে এটা নিয়ে কিছু কথা রয়েছে।

তাঁরা বলে এটা বিনামূল্যে কিন্তু আমরা জানি না যে, আমাদের বিভিন্ন কাগজপত্র পূরণ করার দরকার কিনা কিংবা জরুরিভাবে ওষুধ কেনার প্রয়োজন কিনা...তিনি বলেন।

‘‘সরকার কী রেডিওথেরাপির জন্য ২৫০ বা স্ক্যানের জন্য ১৩০ ডলার দেবে? যদি সরকার এই অর্থ প্রদান করে, তবে হ্যাঁ -এটি একটি ভাল জিনিস।’’

 

তথ্যের অভাব:

এরই মধ্যে তিনি অন্যত্র তার মেডিকেল বিলের জন্য সহায়তা চেয়েছেন।

‘‘ আমি যখন প্রথম বিল দেখলাম তখন আমি কাঁদতে শুরু করেছিলাম। আমি ডাক্তারকে বলেছিলাম, আমি এটি পরিশোধ করতে পারব না। তিনি আমাকে অ্যান্টি-ক্যান্সার লীগের সাথে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। তারা আমাকে সাহায্য করেছিল।’’

মিসেস ফ্লোরেন্স বলেন, ‘‘ আমার খুব শীঘ্রই রেডিওথেরাপির জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট রয়েছে এবং আমি ফলাফলটি সেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। যিনি আমাকে পরবর্তী কাজের বিষয়ে পরামর্শ দিবেন।’’

‘‘কেমোথেরাপি সত্যিই কঠিন। আমি ডাক্তারকে বলেছিলাম, এটি আর আমার দরকার নেই... এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বেদনাদায়ক। চিকিৎসক আমাকে স্বাস্থ্যকর খাবার, ফল খাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সামর্থ্য না থাকলে তা সত্যিই কঠিন।’’

সেনেগাল সরকারের ঘোষণা সত্ত্বেও ডা.দিপ বিশ্বাস করেন যে, সারা দেশে এখনও অনেক ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী রয়েছেন যারা মোটেও চিকিৎসা নিচ্ছেন না, অনেকেরই জানা নেই তাদের ক্যান্সার হয়েছে।

ডা.প্রেবো বেরাঙ্গো বলেন যে, ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগেরও কম। তবে সমৃদ্ধ দেশগুলোতে এটির হার শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ।

 

ক্যান্সার বিস্তৃতির কারণসমূহ:

ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে জানার অভাব।

দেরিতে রোগ নির্ণয় বা ভুল রোগ নির্ণয়।

দুর্বল রেফারাল সিস্টেম।

ভৌগলিক দূরত্ব।

চিকিৎসা এবং ওষুধের লাগামহীন খরচ।

দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা সিস্টেম।

(সূত্র: ডব্লিউএইচও)

 

আফ্রিকার অনেক দেশের মূল চ্যালেঞ্জ হলো ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে তথ্যের তীব্র অভাব। এটি নীতি নির্ধারকদের পক্ষে মূল্যায়ন এবং তা নিয়ে কাজ করা আরও কঠিন করে তুলেছে।

ডা. বেরেঙ্গো বলেছেন,‘‘ঝুঁকির কারণগুলো এড়িয়ে ক্যান্সারের সমস্ত ক্ষেত্রে প্রায় এক তৃতীয়াংশ প্রতিরোধ করা যেতে পারে।’’

তিনি বলেন, ‘‘বেশিরভাগ আফ্রিকান দেশ ক্যান্সারের ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলো রোধ করতে উদ্যোগী হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন।’’

ডা.বেরেঙ্গো আরও বলেন, ‘‘জরায়ুর ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং ক্যান্সারের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যয় বহনের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্র প্রশস্ত করার চেষ্টা চলছে।’’

ডাব্লিউএইচও অনুসারে, সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার আফ্রিকায় সবচেয়ে কমন। তবে এখনও টিকা এবং স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই রোগ প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

এদের মধ্যে বোটসওয়ানা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, সেনেগাল, ইথিওপিয়া এবং মালাউই -তাদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য এইচপিভি ভ্যাকসিন চালু করেছে।

আফ্রিকায় বেশিরভাগ ক্যান্সার নির্ণয় দেরিতে হওয়ায় ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও এমনটা হয় বলে মনে করেন ডব্লিউএইচওর আফ্রিকার আঞ্চলিক পরিচালক ডা.মাতিসিদো মোতি।

ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে যদি আরও বেশি বিনিয়োগ করা হয় এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়-বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে আরও অনেক জীবন বাঁচানো যাবে।

 

মূল: লুইস দেওয়াস্ট, বিবিসি প্রতিনিধি, ডাকার

ভাষান্তর: আহসান হাবিব

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত