২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:৩৭ এএম
আপডেট: ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ১২:০৭ পিএম

রোগী আর ডাক্তারের মধ্যে একটি দেনা-পাওনা আছে: অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন

রোগী আর ডাক্তারের মধ্যে একটি দেনা-পাওনা আছে: অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শিশু সার্জারি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান। কর্মজীনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে মেডিকেল শিক্ষার সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীটে স্বাস্থ্য সেবায় যুক্ত আছেন। জমজ শিশু হাসান-হোসেনকে অপারেশনে আলাদা করে দেশে নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন তিনি। সম্প্রতি মেডিভয়েস মুখোমুখি হয়েছিল প্রচারবিমুখ এ অধ্যাপকের। কথা হয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনসহ মেডিকেল শিক্ষার খুঁটিনাটি নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি হুবহু পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: মো. মনির উদ্দিন

মেডিভয়েস: স্যার কেমন আছেন? 

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। 

মেডিভয়েস: আপনার শৈশব-কৈশোর কোথায় কেটেছে?

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রায়দী ইউনিয়নে। যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আমরা একই গ্রামের লোক। 

মেডিভয়েস: পড়াশোনা কোথায় শুরু করেছেন?

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: আমি কাপাসিয়া পাইলট হাইস্কুল থেকে ১৯৭৬ সালে এসএসসি ও ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পাস করেছি। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেল্থ (শিশু হাসপাতাল) থেকে এমএস করেছি। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স (বিসিপিএস) থেকে আমি সার্জারিতে এমসিপিএস-এফসিপিএস পড়েছি। তার পরে অনারারি ফেলোশিপ পেয়েছি লন্ডনের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান অব সার্জন থেকে। 

মেডিভয়েস: আর কর্মজীবন সম্পর্কে বলুন। 

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: আমি মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে তথা আইপিজিএমআরে ১৯৮৯ সালে এসেছি প্রথম কোর্সে। তারপর এখানের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, প্রফেসর এবং ডিপার্টমেন্টাল চেয়ারম্যান হয়েছি। আমার কর্মজীবন আসলে এ বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরেই। এর বাইরে কোথাও কাজ করিনি। এখানে দীর্ঘদিন কাজ করেছি, শুধু পদ-পদবিগুলো পরিবর্তন হয়েছে। বাইরে প্র্যাকটিস জীবন কেটেছে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে, যেটার শুরু থেকেই ছিলাম। স্বল্প মূল্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বেসরকারি চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব—এ ধারণা নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। তখন আমাদের ওখানে ভিজিট ছিল দুইশত টাকা। এ ধারণা থেকে বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে অনেক হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। 

মেডিভয়েস: একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে একাধারে কাজ করা সুবিধাজনক বলে মনে হয়েছে? 

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: আমি মনে করি, চিকিৎসকরা যদি একটি জায়গায় একাধারে কাজ করার সুযোগ পায় তাহলে তার অনেকগুলো জিনিস ভালো হয়, যার উপকারিতা সেবা গ্রহিতা পান। পাশাপাশি সেবাদাতাও তার ভুলগুলো শোধরে নিয়ে সামনের দিকে যেতে পারেন। যেমন: একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করার সুযোগ পেলে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মায়া-মমতার পাশাপাশি দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। শুধু ব্যক্তির কথা না ভেবে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নিয়ে চিন্তা করেন। দূরদূরান্ত থেকে যেসব রোগী আসে, তারা একটি জায়গায় এসে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে পেয়ে যান। সব মিলিয়ে মেডিকেল পেশায় যারা আছেন, তারা যদি একই এলাকা বা কর্মক্ষেত্রে কাজ করেন তাহলে তার নিজের যোগ্যতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক মানোন্নয়ন ঘটে, রোগীরাও তুলনামূলকভাবে ভালো সেবা পান। প্রত্যেকটা উপজেলায় ২/১ জন ডাক্তার পাবেন—যারা দীর্ঘদিন সেখানে সময় দিয়েছেন, তাদের সুনাম-সুখ্যাতি সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের চেয়ে অন্য রকম। এবং বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা আছে।     

মেডিভয়েস: তরুণ শিক্ষার্থী যারা পেডিয়েট্রিক সার্জারিতে ক্যারিয়ার করতে চায়, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ?

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: তাদেরকে প্রথমেই শিশুদের পছন্দ ও ভালোবাসতে হবে। এ সাবজেক্টে পড়তে চাইলে সেবার মনোবৃত্তি নিয়ে এগুতে হবে, ব্যবসায়িক চিন্তা থাকলে এ বিষয়ে পড়াশোনা করা যাবে না। কারণ এখানের বেশিরভাগ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দরিদ্র মানুষ। যারা সেবাকে অগ্রাধিকার দেবে, তাদের জন্যই মূলত এ বিষয়। মনের রাখতে হবে, আজকে পাঁচ বছরের যে শিশুটির অস্ত্রোপচার করা হবে, সে কিন্তু আরও ৭৫ বছর বেঁচে থাকবে। এই দীর্ঘ সময় তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলো, এজন্য শিশুটির মনোজগতসহ সবকিছু এ সাবজেক্টের অন্তর্ভুক্ত। এর সুবিধা হচ্ছে, সযত্ন অপারেশনের পর অনেক দিন তার দোয়া পাবেন। অন্যথায় বদদোয়া পাবেন। অপারেশনের পর একজন বয়স্ক মানুষ তো বেশি দিন বাঁচে না। সুতরাং শিশু সার্জারি বিষয়টি এসব দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। 

মেডিভয়েস: চিকিৎসক জীবনের কোনো ঘটনা বা স্মৃতি যা আপনাকে কষ্ট দেয়।
অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: কোনো রোগী যখন আমাদের কাছে আসে, বিশেষ করে যাদের জন্মগত ত্রুটি থাকে। বিত্তবানরা আমাদের কাছে কম আসে, তাদের অনেকেই বাইরে চলে যায়। মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্যরা যখন আসে, তখন তারা দেখে ধনী মানুষগুলো বলে আমার কোনো সমস্যা নাই, যেটা ভালো সে ওষুধ লিখে দেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষটি তখন বলে আমি কিন্তু ওষুধ কিনতে পারবো না, যা আছে তাই দেন। তার আরেকটু সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য পারছে না!এই বৈষম্য যদি সমাজ থেকে দূর করা যেতো। এটা রোগীদের মর্মপীড়ারও কারণ। এই বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দেয়। ইচ্ছা থাকলেও আমি তাকে সেভাবে সহযোগিতা করতে পারি না।  

মেডিভয়েস: আপনার চিকিৎসা জীবনের স্মরণীয় কোনো ঘটনা যা আপনাকে খুবই আনন্দ দেয়।
অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: আমার চিকিৎসা জীবনে সবচেয়ে আনন্দদায়ক ঘটনা হলো, জমজ শিশু হাসান হোসেনকে অপারেশনের মাধ্যমে আলাদা করা। ২০০২ সালে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে এই অপারেশন হয়। বাংলাদেশে এটিই ছিল জমজ শিশুর প্রথম সফল অপারেশন। একটি বাচ্চা বেঁচে আছে। আরেকটি শিশু অপারেশনের ১৪ দিন পর মারা গিয়েছিল। এরপর আমরা আরও জমজ জোড়া বাচ্চা অপারেশনের মাধ্যমে আলাদা করেছি। আসলে ওই অপারেশন ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা। আমি তখন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। অপারেশেনের পর বিবিসির সাংবাদিকরা আমার কাছে জানতে চেয়েছেলিন, আপনি যে এ রকম বড় একটি অপারেশন করতে গেলেন, আপনার তো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই; কেন এ ঝুঁকি নিলেন? 

আমি তাদের বলেছিলাম, অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ক্ষেত্র লাগবে। এবং যিনি প্রথম কাজটা করবেন তার তো কেনো অভিজ্ঞতা থাকবে না। তারা আমার বক্তব্যে খুব খুশি হয়েছিলেন। আসলে কাউকে না কাউকে তো সাহস করে শুরু করতে হবে।

মেডিভয়েস: বাংলাদেশে স্বাস্থ্য আইন সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।
অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: আসলে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানই একটি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। যে আইনে সর্বাধিক মানুষের স্বার্থ সুরক্ষা পায়, সে আইনকে মানুষ সম্মান করে। সেটাই আইন। যদি এমন কোনো আইন করা হয়, যা বেশিরভাগ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করলো না—এটা তো আইন না। এটা বেশি দিন টিকবে না। প্রস্তাবিত আইনকে পরিপূর্ণ বলা যাবে না। আইনটা এমন হওয়া উচিত, যাতে চিকিৎসকদের স্বার্থ সুরক্ষা পায়, রোগীদের স্বার্থও রক্ষা হয়। একপক্ষীয় আইন করলে তো হবে না। এছাড়া আইন করলেই হবে না—যারা এটি প্রয়োগ করবে এবং যারা এর সুবিধা নেবে তাদের বোঝানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

মেডিভয়েস: আমাদের স্বাস্থখাতের দুর্বল দিক কোনটি বলে মনে করেন? সমাধানের উপায় কী? 
অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে এতো সুন্দর একটি পরিকাঠামো আছে, যা দুনিয়ার অনেক দেশে পাবেন না। প্রত্যেকটা ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য সরকারের একটি নেটওয়ার্ক আছে। তবে আমার দৃষ্টিতে রোগীদেরকে বিন্যাস করতে হবে। দেশে একটি যথাযথ রেফারাল সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে। দেখুন, কেয়ারের বিভিন্ন পর্যায় আছে—প্রাইমারি, সেকেন্ডারি, টারশিয়ারি ও স্পেশাল কেয়ার। দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো টারশিয়ারি পর্যায়ের। এগুলো রেফারেল হাসপাতালের পর্যায়ে আসা উচিত। এগুলো সার্ভিস হাসপাতাল হওয়া উচিত না। এখানে গবেষণা ও শিক্ষা নিশ্চিত হবে। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো সার্ভিস নিশ্চিত করতে হবে। 

বিএসএমএমইউতে ২৬ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাই, মুসলমানি ও হার্নিয়ার বাচ্চা, নরমাল ডেলিভারির একজন রোগী গ্রাম থেকে আসছে। সার্ভিস হাসপাতাল থেকে রেফার ছাড়াই এসব হাসপাতালে চলে আসতে পারছে। এটা যদি একটি পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসা যায় অর্থাৎ কোন রোগীগুলোর চিকিৎসা উপজেলা পর্যায়ে হবে, কোন রোগীগুলোর জেলা পর্যায়ে হবে এবং কোন রোগীগুলোর মেডিকেল কলেজে হবে, এগুলো চিহ্নিত হওয়া উচিত। এগুলো উন্নত দেশগুলো আছে। এটি করতে গেলে প্রাথমিকভাবে কিছু বিশৃঙ্খলা হবে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে চমৎকার একটি পদ্ধতি দাঁড়িয়ে যাবে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করতে চাই। যেমন ধরুন, প্রফেসর ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বাংলাদেশে নিউরো মেডিসিনের বিখ্যাত চিকিৎসক। উনার কাছে দেখবেন, সাধারণ মাথা ব্যথার রোগীরা বসে আছে। অথচ যে রোগীর দরকার সে তাঁর কাছে আসতে পারছে না। 

আমাদের এখানে পেডিয়াট্রিক সার্জারিতে যদি মুসলমানির জন্য ভিড় করে, লিভার বিভাগে জন্ডিসের রোগীরা ভিড় করে, তাহলে এখানে বিশেষায়িত সেবা কিভাবে দেবেন?

মেডিভয়েস: স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে আপনার কোনো পরামর্শ? 
অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: বিত্তবানদের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের একার পক্ষে সব সম্ভব না। তাদের সীমাবদ্ধতা আছে। সরকারের কাছে স্বাস্থ্য হচ্ছে একটি খাত। তাদের আরও অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে হয়। দেশে অনেক সম্পদশালী আছেন এ খাতের উন্নয়নে এগিয়ে এলে অনেক ভালো কিছু হবে। সারা পৃথিবীর হাসপাতালগুলো বিত্তবানদের দ্বারাই হয়েছে।

মেডিভয়েস: চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে; পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধও কমে যাচ্ছে অনেকটা। আপনি ব্যাপারটিকে কিভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: এখানে দুটি বিষয়। একটি হচ্ছে, আপনি এমন অঙ্গীকার করবেন না যা রক্ষা করতে পারবে না। এমনটি হলে বন্ধুত্ব নষ্ট হবে, আত্মীয়তা নষ্ট হবে। ব্যবসায়িক চুক্তি হলে তাও নষ্ট হবে। রোগী আর ডাক্তারের মধ্যে একটি দেনা-পাওনা আছে। দ্বিতীয়ত: একটি আশা নিয়ে রোগীরা ডাক্তারের কাছে আসে। এই আশাটা কেউ কেউ তার মনে জাগিয়ে দিয়েছে। গণমাধ্যম, সাধারণ মানুষ ও সংসদে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের চিকিৎসা ফ্রি। এটা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার হাসপাতাল থেকে নেবেন। দেবেন ডাক্তার। রোগীর অধিকারের মধ্যে আছে প্রেসক্রিপশন, ওষুধ, অপারেশন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রোগীরা জানেন, সব সরকার দেবে। আর এর এসবই হবে ডাক্তারের হাত দিয়ে। অথচ ডাক্তারের আছে শুধু প্রেসক্রিপশন দেওয়ার ক্ষমতা। বাকিগুলো হাসপাতাল ব্যবস্থানার সঙ্গে জড়িত। এই যে রোগীদের মনে ভুল ধারণা—এটা দূর করতে হবে। 

দূরত্ব সৃষ্টির আরেকটি কারণ হলো চিকিৎসকদের কমিউনিকেশন স্কিলের অভাব। রোগীরা তো হাসপাতালেই মারা যাবে, তারা কি বাড়িতে মারা যাবে? এখানে রোগীরা ভালোও হবে, মারাও যাবে। প্রতিটি জিনিসের একটি যৌক্তিকতা থাকতে হবে। যারা সেবাটা নিবে তাদেরকে বোঝাতে হবে কী সেবা দিচ্ছেন, তার ফলাফলটা কী? এখানে সমস্যা যে হয়, তার বেশিরভাগই আচরণগত। 

ডাক্তারদের বিরুদ্ধে রোগীদের অভিযোগ—চিকিৎসকরা আমাদের সময় দেয় না, গুরুত্ব দেয় না, অযথা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করায়। এই অভিযোগগুলো তো আপনাকে যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে খণ্ডন করতে হবে। এগুলো জানলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে না।

মেডিভয়েস: রোগীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত?
অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: চিকিৎসকদের মধ্যে দুটি জিনিস থাকতে হবে, তাহলো সহানুভূতি ও মায়া-মমতা। রোগীর প্রতি মায়া-মমতা না থাকলে আপনি কখনো ভালো ডাক্তার হতে পারবেন না। প্রতিটা রোগীকে দরদ দিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ অন্তরে তার জন্য একটি জায়গা রাখতে হবে।  

মেডিভয়েস: দেশের প্রচলিত মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে কি করণীয়?

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: আসলে মেডিকেল শিক্ষার উন্নয়নের জন্য সরকার অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হচ্ছে। এমবিবিএসের কোর্স কারিকুলামে প্রায়শ পরিবর্তন হচ্ছে। তবে এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের ওপর সীমাহীন চাপ দেওয়া হচ্ছে। এই শিক্ষার্থী কিন্তু একজন জেনারেলিস্ট, সে মেডিকেল সায়েন্সে একটি বেসিক ডিগ্রি নিচ্ছে। তাদের যদি প্রতিটি শাখা সম্পর্কে বিশদ জানার জন্য কারিকুলাম করেন, তাহলে তার পক্ষে সম্ভব হবে না।

এজন্য আমি মনে করি, এমবিবিএস কোর্সটাকে আরেকটু যুগোপযোগী করা উচিত। অর্থাৎ বিশেষায়িত যেসব শাখা আছে এগুলোর ওপর গুরুত্ব কমিয়ে সাধারণ শাখা যেমন: মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, ইএনটি—এগুলোর ওপর জোর দেওয়া উচিত।

কার্ডিয়াক সার্জারি, কার্ডিওলজি—এগুলো এমবিবিএস ডাক্তাররা জেনেই কী করবে। যেগুলো তার ব্যবহারিক জীবনে লাগবে না, সেগুলো তো নিষ্প্রয়োজন। দেখা যাচ্ছে, ডায়রিয়াটাকে গুরুত্ব না নিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্যান্সারকে। কিন্তু একজন এমবিবিএস ডাক্তার তো ক্যান্সারের বিষয়টি দেখাশোনা করবে না। এটি দেখবে ক্যান্সার স্পেশালিস্ট। এজন্য তার একটি ক্ষেত্র আছে। 

পাশাপাশি মেডিকেল শিক্ষাকে শহরমুখী না করে গ্রামমুখী করা উচিত, যাতে গ্রামের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা বৃদ্ধি করা যায়। তাদের সমস্যাগুলো বেশি বেশি সামনে আনা উচিত। 

মেডিভয়েস: দেশে শিশু সার্জারির ক্ষেত্রে কোনো অসঙ্গতি আছে কিনা, এ বিভাগের উন্নয়নের কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে? 

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: ১৮ বছরের নিচের মানব সন্তানকে আমরা শিশু বলি। এ শিশুরা একদিন সমাজের দায়িত্ব নেবে। শিশুদের কিছু জন্মগত ত্রুটি আছে যেগুলোকে আগে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কিছু কিছু মনস্তাত্বিক দিক যা আগে আমলে নেওয়া হতো না। তাদেরকে যদি ভালো করে লালন-পালন করেন, তাদের চাওয়া-পাওয়া গুরুত্বারোপ করা হয়। মানসিক, শারীরিক ও সামাজিকভাবে বেড়ে ওঠার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। তাহলে সুন্দর একটি সমাজ পাওয়া যাবে। বর্তমান সরকার শিশুদের দিকে খুবই গুরুত্বারোপ করছে। আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন পিজি হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতাল ছাড়া কোনো হাসপাতালে শিশু সার্জারি বলে কোনো বিষয় ছিল না। এসব বিষয় মানুষ জানতও না। 

মানুষ এখন সচেতন হচ্ছে, বাচ্চার অপারেশনের জন্য কার কাছে গেলে ভালো হবে, জিজ্ঞাসা করে। তাদের চিকিৎসা পদ্ধতি বড়দের মতো না। তাদের অনেক বিষয়ই আলাদা। একটি বাচ্চাকে অপারেশনের পর ব্যথামুক্ত না রাখতে পারলে, ভবিষ্যতে সমাজের ওপর তার প্রভাব পড়বে। কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হলে সমাজের সঙ্গে তার আচরণ অন্য রকম হবে।

অপারেশনের সময় বাজে আচরণের মুখোমুখি হলে সারাজীবন এটি তার মাথায় থাকবে, মানুষের সঙ্গে এ রকম আচরণ করবে। সুতরাং তার চিকিৎসার বিষয়টি আলাদাভাবে দেখতে হবে। 

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থায় শিশু সার্জারির দিকটি যথেষ্ট মানসম্মত আছে। এ নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা যায়। শিশু সার্জারির অবস্থা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের চেয়ে এগিয়ে আছে। এটি আরও সুন্দর করতে চাইলে শিশুদের জন্য ইনস্টিটিউট করা দরকার, যা রাজধানীর পূর্বাচলে হতে যাচ্ছে। 

মেডিভয়েস: বাংলাদেশ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে ভারতের কিছু চিকিৎসক সে দেশের মূল্যায়ন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হচ্ছে, এটা আমাদের মেডিকেলগুলোর মানহীনতা প্রমাণ করে? 

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: এমবিবিএস হচ্ছে কারিকুলাম ওরিয়েন্টেড কোর্স। বিভিন্ন ফেজে কারিকুলামটাকে সম্পন্ন করা হয়। তার মূল্যায়ন করা হয়, পরে ফলাফল দেওয়া হয়। বাংলাদেশের যেসব চিকিৎসক চীন বা অন্যান্য দেশে পড়াশোনা করে। দেশের মেইনস্ট্রিমে ঢুকতে তাদেরকেও বিএমডিসির মূল্যায়ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। মূল্যায়ন পরীক্ষা আর প্রফেশনাল পরীক্ষা এক না। এজন্য আবার প্রস্তুতি নিতে হয়। প্রতিটি পরীক্ষার পদ্ধতিই আলাদা। 

মূল্যায়ন পরীক্ষা দিয়ে বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করতে পারবেন না। ইংল্যান্ড থেকে পাস করে আসা একজন শিক্ষার্থী কখনো গ্যারান্টি দিতে পারবে না যে সে বিএমডিসির মূল্যায়ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে। তাকে আগে এ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে হবে।  

মেডিভয়েস: স্যার আপনার জীবনের কোনো স্মরণীয় স্মৃতি?

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: স্মরণীয় স্মৃতি তো অনেক থাকে না। আসলে মানুষ সবই ভুলে যায়। তবে কিছু কিছু ঘটনা ইচ্ছা করলেই ভোলা যায় না। আমি চিকিৎসক হওয়ার আগেই আমার আব্বা মারা গেছেন। তিনি সিএ স্টমাকে মারা গেছেন, স্টমাকে ক্যান্সার ছিল। আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাটি সেই বাবাকে ঘিরেই। আমি যখন কোনো রোগীকে চিকিৎসা করি, তখন বাবা-মারা যাওয়ার স্মৃতিগুলো খুব মনে হয়। ভাবি, আমি যদি তখন ডাক্তার হতে পারতাম, বা আমি যদি এ পর্যায়ে থাকতাম, তাহলে তাঁর চিকিৎসাটা হয়তো আরেকটু ভালো করতে পারতাম। এটি সব সময় আমাকে নাড়া দেয়, কষ্ট লাগে। 

মেডিভয়েস: স্যার, পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: আপনার যদি একটি সুন্দর স্বপ্ন থাকে তাহলে আপনি কর্মপ্রেরণা পাবেন। যার মনে কোনো স্বপ্ন নাই, তার মনে তো কোনো প্রেরণা নাই, সে কী করবে, তা জানে না। যে কোনো পেশায় বড় হতে হলে একটি আইকন ঠিক করতে হবে। কল্পনা করতে হবে আমি অমুকের মতো হবো। আপনার মনোজগতে এটি স্থান দিতে হবে। তাহলে আপনি বড় হতে পারবেন, ভালো হতে পারবেন। মনে স্থান দেওয়ার মানদণ্ড যদি সঠিক হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারবেন।

মেডিভয়েস: বাংলাদেশের মেডিকেল অঙ্গনের অন্যতম মুখপত্র হিসেবে মেডিভয়েসকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন: মেডিকেল বিষয়ক নিউজ তো প্রত্যেক পত্রিকা ও টেলিভিশন করে। তবে এক্ষেত্রে দুটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ, নিউজ আর ভিউজ। দুটি কিন্তু ভিন্ন জিনিস। আমি মনে করি, মেডিভয়েসের ভিউজ হচ্ছে ডাক্তার সমাজের মনোজগতের একটি পরির্তন করা। তাদের মনোজগতটা মমতা ও দরদের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়। এ পেশার মাধ্যমে যে ইহকাল ও পরকালের মুক্তি নিহিত এ ধারণাটি চিকিৎসকদের মাথায় ঢুকানো।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত