১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০৩:১১ পিএম
আপডেট: ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০৩:৩৭ পিএম

পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনে চবির মেডিকেলগুলোর শিক্ষায় এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন: চমেকের সাবেক অধ্যক্ষ

পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনে চবির মেডিকেলগুলোর শিক্ষায় এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন: চমেকের সাবেক অধ্যক্ষ

অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সদ্য সাবেক অধ্যক্ষ। গত ১০ বছর ধরে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে নিজের অসামান্য দক্ষতায় এ কলেজে শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগে বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করেন। দেশের একমাত্র মেডিকেল হিসেবে ছাত্র সংস চলমান থাকার পেছনেও ছিল তাঁর ভূমিকা। এছাড়া ডিনের দয়িত্ব প্রাপ্তির সুবাদে চবি অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজগুলোর পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন করে শিক্ষায় ঘটিয়েছেন অভাবনীয় পরিবর্তন। সম্প্রতি মেডিভয়েস মুখোমুখি হয়েছিল খ্যাতিমান এ অধ্যাপকের। স্মৃতিচারণে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল দিনগুলোর কথা। আলোচনা হয় তাঁর শিক্ষা ও পেশাগত জীবনের নানা দিক নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. মনির উদ্দিন।

মেডিভয়েস: মেডিভয়েসের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন, কেমন আছেন?
অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। আপনাকেও শুভেচ্ছা।

মেডিভয়েস: আপনার শিক্ষাজীবন সমন্ধে কিছু বলুন। 
অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে চট্টগ্রাম শহরে মুসলিম হাইস্কুলে ভর্তি হই। সেখান থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করি। এরপর চিটাগং কলেজ থেকে ১৯৭৮ সালে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করি। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। ১৯৮৪ সালে আমি এমবিবিএস পাস করি। আমার ব্যাচ ছিল ২১তম। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চে (আইপিজিএমআর) অর্থাৎ বর্তমান বিএসএমএমইউতে ফার্মাকোলজি (ওষুধবিজ্ঞান) বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করি।  

মেডিভয়েস: আপনি দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ সমন্ধে কিছু বলুন।  

অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র হতে পেরে আমি গর্বিত। কারণ এ কলেজের গৌরবোজ্জ¦ল ইতিহাস আছে। এখানকার বেশ কয়েকজন চিকিৎসক যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন কয়েকজন ছাত্রও। বাংলাদেশে ডাক্তারদের মধ্যে নৌ-কমান্ডো বীর উত্তম শাহ আলম এ মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ক্যান্সারে মারা যান তিনি। মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কেন্দ্র ছিল। এজন্য আমরা গর্বিত। এখানে একটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। আরেকটি বড় ইতিহাস হলো—জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই মেডিকেল কলেজ উদ্বোধন করেছিলেন। 

মেডিভয়েস: অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন নিজের ভূমিকাকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন? এই সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের সফলতার দিকগুলো কী কী?

অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: সফলতা অনেক আছে। তবে আমি মনে করি না, আমার একক প্রচেষ্টায় তা হয়েছে। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করেছি। সফলতার একটি দিক আমাদের একাডেমিক কেন্দ্রীক। সেখানে আমাদের শিক্ষকদেরকে অ্যাকাডেমিক্যালি দক্ষ করে তোলা চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে কারিকুলাম, জাতীয় ইন্টারেস্টে কিভাবে অ্যাকাডেমিকেলি করতে হয়—সেটা আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করেছি। এজন্য কিছু পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। এখানে বিকেন্দ্রীকরণের ধারণাটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রত্যেকটা বিভাগকে বিকেন্দ্রীকরণ করে দিয়েছি। অধ্যক্ষের রুটিন ও স্ট্র্যাটেজিক কিছু ক্ষমতা ছাড়া বাকি সব বিষয়ে বিভাগীয় প্রধানরা যেভাবে রিকমেন্ড করেন সেভাবেই বাস্তবায়ন করা হয়। বিভাগীয় প্রধানরা আবার তাঁদের অধীনস্তদের মতামত নিয়ে কাজ করেন। অ্যাকাডেমিক, প্রশাসনিক, স্বাস্থ্য সেবা সবই নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া আমাদের এখানে ‘কোয়ালিটি অ্যাশিউরেন্স বডি’ নামে একটি বডি আছে, তারা প্রতিনিয়ত বৈঠকে বসেন। আমরা কারিকুলামসহ অন্যান্য বিষয়ে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার জন্য চেষ্টা করছি। এর সুবাদে চট্টগ্রাম মেডিকেলের ২৪ জন শিক্ষার্থী অক্সফোর্ডে দুই মাস করে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছে। এটি বাংলাদেশের আর কোনো মেডিকেল থেকে হয়নি। এ বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলে যারা প্রথম ও দ্বিতীয় হয় তারা এ সুযোগটি পায়। আরও চারজন শিক্ষার্থীকে বাছাই করা হয়েছে। এছাড়া কোবে ইউনিভার্সিটিতেও পাঁচজন করে দশজনকে এক মাসের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে হলি আর্টিজানের পর এটি আপাতত স্থগিত আছে। খুশির কথা হলো: দেশের মেডিকেল কলেজগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেলের লেখাপড়ার মান ভালো ছিল, এটি এখন আরও উন্নত হয়েছে। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ডিনের দায়িত্ব পাওয়ার পর পুরো পরীক্ষা পদ্ধতিটা পরিবর্তন করা হয়েছে।  এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি-বেসরকারি মেডিকেলগুলোর পরীক্ষায় একটি কোডিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে। ফলে কোন মেডিকেলের কোন ছাত্র পরীক্ষা দিচ্ছে তা কেউ জানে না। কোন শিক্ষক পরীক্ষা নেবেন তাও জানে না। কোন শিক্ষক পরীক্ষার খাতা কাটবেন তাও জানে না। এমনকি মূল্যায়নের জন্য প্রত্যেকটি খাতাকে ন্যূনতম ২/৩ জন শিক্ষক রাউন্ড টেবিলে বসে সবার উপস্থিতিতে খাতা কাটেন। এই খাতা কাউকে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া হয় না। এতে নম্বরের বেলায় চমৎকার মান নিশ্চিত হয়েছে। কোডিং সিস্টেম করার কারণে শিক্ষার্থীরা বই পড়তে, লেখাপড়া করতে বাধ্য হয়েছে। এ পদ্ধতির ফলে শিক্ষায় নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। চবি অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের মান বেড়ে গেছে। 

মেডিভয়েস: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে দীর্ঘদিন ধারাবাহিকভাবে ছাত্র সংসদ গঠিত হয়ে আসছে। এবং ছাত্র সংসদের নানা রকম ইতিবাচক কার্যক্রম নিয়ে মাঝে মাঝে আলোচনা হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রসংসদ নিয়ে কিছু বলুন। 

অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: এটি আমাদের সবার প্রচেষ্টার আরেকটি অর্জন। আমি এখানে দশ বছর ধরে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সম্ভবত বাংলাদেশে এটি দীর্ঘতম সময়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের মনে হয়েছে, ছাত্র সংসদ শুধুমাত্র সংসদ নয়, একটি শিক্ষকদের সমপর্যায়ের। অ্যাকাডেমিক ইকুইভ্যালেন্ট। তাদের ভিপি ও জিএস আমাদের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সম্মানিত সদস্য। এতে একটি সুবিধা আছে। তাহলো: অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে কোনো সিদ্ধান্ত হলে তারা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন না। সংসদ থেকে যখন এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়, তখন বাকিদেরও এ বিষয়ে আর ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকে না। পাশাপাশি কলেজের শৃঙ্খলাও নিশ্চিত হয়েছে। ছাত্রদের মধ্যে অনেক সময় রাজনীতি ছাড়াও অর্থ বা ক্ষমতার স্বার্থে সংঘাত হয়। বিগত ১০ বছর এখানে সংসদ চলছে, ১০ মিনিটের জন্যও কোনো সংঘর্ষ হয়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বর্তমান যে সম্পর্ক তা একেবারে ভাই-বোনের মতো। আমি অবাক হয়ে যাই, তারা কিভাবে এ ভ্রাতৃত্ব ও চেইন অব কমান্ড নিশ্চিত করছে। তাছাড়া ছাত্রদের জন্য সরকার যে টাকা দেয়, এটা অন্য কাউকে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত না। কিন্তু আমি যখন সংসদকে দেবো, তারা সরকারের হিসাবের মধ্যেই। অথবা ভর্তির সময় সংসদের জন্য যে টাকা সংগ্রহ করি, এটা সংসদকে দেওয়া হয়। সংসদ না থাকলে কলেজের টাকা কাকে দেও হবে?

মেডিভয়েস: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের নাম এক সময় বলা হতো ‘কালচারাল মেডিকেল কলেজ’। কলেজের বর্তমান সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে কিছু বলুন। 

অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: এখানে কয়েকটি পর্যায়ে কাজ হয়। একটা হচ্ছে, সংসদের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় বছরব্যাপী। পাশাপাশি শিক্ষকরা অনুষ্ঠান করেন সমন্বিতভাবে। ছাত্ররা আন্তঃমেডিকেল বিতর্ক প্রতিযোগিতা করে, অন্য মেডিকেলেও অংশগ্রহণ করে। এছাড়া তারা বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এভাবে এক্সট্রা কারিকুলার কার্যক্রমগুলো তারা একেবারে রুটিন মাফিক করছে, যা সংসদের মাধ্যমে অব্যাহতভাবেই চলছে।

মেডিভয়েস: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নে দেশের সব বিভাগে পর্যায়ক্রমে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে কিছু বলুন।

অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: এ রকম একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ। সাতটি বিভাগে সাতটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার যে পরিকল্পনা, তার তিনটি এরই মধ্যে হয়ে গেছে। এর মাধ্যমে তিনি অ্যাকাডেমিকেলি বিকেন্দ্রীকরণের সূচনা করে দিলেন। আমরা আগে ছিলাম, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। যেখানে অনেকগুলো ডিসিপ্লিন থাকে। এর মধ্যে মেডিকেল সাইন্সকে ওখানকার সঙ্গে সমতা করে, মান নিশ্চিত করা খুবই দুরুহ বিষয়। শুধু মেডিকেল সাইন্সের জন্য যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়, তাহলে সম্পূর্ণ বিষয়টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করবে, যেমন:  অ্যাকাডেমিক, গবেষণা ও স্নাতক-স্নাতকোত্তর। এছাড়া দেশের বাইরের সঙ্গে অ্যাফিলিয়েশন, উন্নত দেশের সঙ্গে অ্যাকাডেমিক বিষয়ে বোঝাপড়া, মতবিনিময় এসবই নিশ্চিত করে একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা হচ্ছে, কিন্তু মৌলিক গবেষণার জন্য আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। বড় বড় ল্যাব লাগবে। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হলেই গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি আনা সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এরই মধ্যে দুটি ইয়ার ভর্তি হয়ে গেছে। সব সেক্টর যখন এখানে যুক্ত হবে, তখন সামগ্রিক কাজগুলো দ্রুত এগিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত বিষয়ের কাজ শিগগিরই শুরু হবে। আশা করি দ্রুতই স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের ভর্তি, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও গবেষণাগুলো পরিচালিত হবে।

মেডিভয়েস: আমাদের দেশে দিনদিন মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এসব মেডিকেলের মান নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। আসলেই কী মানে ঘাটতি রয়েছে? এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী? 

অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: আমাদের মেডিকেল শিক্ষায় নিঃসন্দেহে একটি মান আছে। এটিকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হবে। সমস্ত মেডিকেল কলেজগুলো মনিটরিং করার জন্য ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড হচ্ছে। শিক্ষার মান নির্ণয়ে সেখানে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিনটি ক্যাটাগরি করা হবে। যদি আমরা খারাপের দিকে চলে যাই, তাহলে আমাদের ছাত্ররা ওখানে গিয়ে পরীক্ষাও দিতে পারবে না। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ আসছে। তবে বাংলাদেশে মানের প্রশ্নে সব মেডিকেল কলেজ নিঃসন্দেহে এক রকম না। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে একেবারে শীর্ষ মেধাবীরা ভর্তি হয়, তারপরে বেসরকারি মেডিকেল; সেখানেও মেধাবীরা আছে। কিন্তু স্কোরের পার্থক্য আছে। বেসরকারি অনেক মেডিকেল কলেজ হয় তো মানের দিক থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। কিন্তু এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয়কেই নিতে হবে। মান নিয়ন্ত্রণের জন্য যা যা প্রয়োজন সেটা করতে হবে। যেমন: কোনো কোনো মেডিকেলে শিক্ষক ঘাটতি আছে। মেডিকেল শিক্ষার ফাউন্ডেশন হচ্ছে, অনাটমি, ফিজিওলজি, বায়োলজি। এসব বিষয়ের শিক্ষক সংখ্যায়ও বেশি হতে হবে। মেধা তালিকায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হওয়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায়। মেডিকেলেও প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হওয়া ছাত্ররা হবে অনাটমি, ফিজিওলজি ও বায়োলজির শিক্ষক। যেদিন এটি নিশ্চিত হবে সেদিন আমাদের মেডিকেল শিক্ষার ফাউন্ডেশন হবে খুবই মজবুত। তখন স্বয়ক্রিয়ভাবেই শিক্ষার মান  বেড়ে যাবে। ক্লিনিশিয়ানদের প্রাইভেট প্রাকটিসের একটি বিশাল সুযোগ থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি ও ফার্মাকোলজির শিক্ষকদের সে সুযোগ নাই। তারা ডাক্তার থেকে শিক্ষক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে। ফলে তাদের আয়-রোজ অনেক কমে যায়। এ কারণে এসব বিষয়ে অধিকতর মেধাবীরা আসতে চায় না। এ অবস্থায় প্রণোদনা দিয়ে হলেও এসব বিষয়ে মেধাবীদের নিয়ে আসতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এসব বিষয়ের শিক্ষকদের যদি আলাদাভাবে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়, তাহলে মেডিসিন সার্জারি ও গাইনির মতো এখানেও মেধারী আসতে আগ্রহী হবেন। মৌলিক বিষয়ে শিক্ষক কম হওয়ায় বর্তমান মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিটা দুর্বল হয়ে আছে।

মেডিভয়েস: বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসকদের চাকরির সমস্যার সমাধান কিভাবে হতে পারে?

অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: বাংলাদেশে ১১০টি মেডিকেল কলেজ আছে। সেখান থেকে প্রতি বছর আনুমানিক ১০ হাজার চিকিৎসক বের হচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের বিষয়টি আসলে একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল ও মানের কিছুটা ঘাটতি আছে। সারা পৃথিবী এখন প্রতিযোগিতামূল হয়ে গেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) কাছে আমরা দিন দিন হেরে যাচ্ছি। আগে যেখানে ১০ জন ডাক্তার দরকার ছিল, সেখানে একটি মেশিন দিয়ে ডায়াগনোসিস হয়ে যাচ্ছে। আগে সার্জনরা অপারেশন করতেন এখন রোবটিক সার্জারি হয়ে যাচ্ছে। ইমেজিং, আল্ট্রাসাউন্ড ও এমআরআই উন্নত মেশিনে হচ্ছে। এতে যন্ত্রের কাছে আমরা হেরে যাচ্ছি। এ থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের ভিন্ন চিন্তা করতে হবে। শুধু নিজেদের চাকরিটা রাখলেই হবে না। সারা পৃথিবীর জন্য আমাদেরকে দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করতে হবে। যে রকম অন্য দেশ করছে। নর্থ-অ্যামেরিকা, সাউথ অ্যামেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়ার উন্নত যেসব দেশ দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করে তাদের লাইসেন্সিং পরীক্ষায় যেন আমাদের শিক্ষার্থীরা পাস করে, সেখানেও যেন তারা যোগ্যতার পরিচয় দেয়, সেদিকে মনোযোগী হতে হবে। পাশাপাশি পেশাটা সুরক্ষিত রাখতে হবে, অর্থাৎ যেহেতু চাকরির সংকট আছে, তাই দেখতে হবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বছরে কয়টা পদ খালি থাকে, তা বিবেচনায় নিয়ে কলেজগুলোতে ছাত্র ভর্তি কমানো বা বাড়ানো যেতে পারে। ছাত্র সংখ্যা বাড়িয়ে দিলে যদি পদ না থাকে তাহলে চিকিৎসক হওয়ার পর সে কোথায় চাকরি করবে। এ ধারণাটি মনে হয়, ভাবা যেতে পারে।

মেডিভয়েস: মেডিভয়েসের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

অধ্যাপক ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর: মেডিভয়েস কর্তৃপক্ষকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। স্বাস্থ্য খাতের ইতিবাচক ভাবনাগুলো প্রিন্ট এবং অনলাইনে প্রচার করছেন। এতে পাঠকরা জানতে পারবেন চিকিৎসকদের সুখ-দুঃখগুলো। সব চিকিৎসক তো আর ধনী না, তারাও কষ্ট করছেন। তাদের সেবাটা যে কত কঠিন! রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে খুব কম পেশার মানুষকেই সেবা দিতে যেতে হয়। এসব বিষয় তারা তুলে ধরছে। এ প্রয়াসের মাধ্যমে দেশের চিকিৎসা খাত আরও এগিয়ে যাবে। চিকিৎসক ও ছাত্র-ছাত্রীরা আশাবাদী হবেন। চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মেলবন্ধনে কাজ করে যাচ্ছে মেডিভয়েস। সেবাসহ স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক বিষয়গুলো মেডিকেল শিক্ষার্থী থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহল পর্যন্ত তুলে ধরছে। এজন্য মেডিভয়েসকে ধন্যবাদ, এর পাঠকদেরও ধন্যবাদ। পত্রিকাটি আরও এগিয়ে যাক।

যা কিছু প্রিয়

প্রিয় রঙ: নীল। 
প্রিয় পোশাক: বাংলাদেশি সুতি কাপড়ের জামা। 
প্রিয় গান: রবীন্দ্র সংগীত। 
প্রিয় শিল্পী: অদিতি মহসিন, শ্রীকান্ত আচার্য। 
প্রিয় খেলা: ক্রিকেট। 
প্রিয় চলচ্চিত্র: সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী।  
প্রিয় লেখক: হুমায়ুন আহমেদ। 
প্রিয় বই: রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের বই। 
প্রিয় ব্যক্তিত্ব: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 
অবসরে যা করেন: গান শুনি, জীবন সম্পর্কে চিন্তা করি।

(সাক্ষাৎকারটি মেডিভয়েসের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৯ প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত)

 

Add
একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত