১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০৫:৫০ পিএম

রোগীদের এপয়েন্টমেন্ট ও ওষুধ খাওয়ার সময় মনে করে দিবে ‘প্লেক্সাসডি’

রোগীদের এপয়েন্টমেন্ট ও ওষুধ খাওয়ার সময় মনে করে দিবে ‘প্লেক্সাসডি’

মেডিভয়েস রিপোর্ট: প্রেসক্রিপশনে যেসকল ওষুধ দেয়া হয়, রোগীদের মধ্যে অনেকেই তা নির্ধারিত সময়ে খেতে ভূলে যান। যাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই এমনটা হয়, তাদের সময়মত ওষুধ খেতে আর কোন চিন্তা নেই। ‘প্লেক্সাসডি’ আপনাকে ওষুধ খাওয়ার সময় মনে করে দিবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ওষুধ খাওয়া ভুলে যাওয়ার অভ্যাসটা আপনার জন্য কঠিন হয়ে যাবে।

প্লেক্সাসডি এর অ্যাপ কিংবা ওয়েবসাইট আপনাকে আরো চমকপ্রদ কয়েকটি সেবা দিয়ে থাকে। যেমন, স্মার্ট এপয়েন্টমেন্ট, ই-প্রেস্ক্রিপশন, ডিজিটাল রশিদের ব্যবস্থা, অনলাইন রিপোর্ট, ফলো-আপ মনে করিয়ে দেয়া, ক্লাউড সংগ্রহ ব্যবস্থা।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্লেক্সাসডি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজিম মাহমুদ বলেন, এই উদ্যোগটি শুরু করার পেছনে ছিলো কিছু হতাশাজনক অভিজ্ঞতা। যা আমার জন্য সুখকর ছিলো না। বাবা বিদেশে অবস্থান করার কারনে পরিবারের সকলের স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হতো পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে। ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য অবস্থার পর্যাপ্ত সঠিক তথ্যের অভাবে মায়ের কিডনী ড্যামেজ হয়ে গিয়েছিল। তখন থেকেই ভাবতে থাকি কীভাবে স্বাস্থ্যসেবার এই সমস্যা দূর করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে রোগীর সংখ্যা যেমন অনেক; ঠিক তার বিপরীতে মাথাপিছু চিকিৎসকের সংখ্যা অতি নগণ্য বলা চলে। বিএমডিসি থেকে সনদপ্রাপ্ত (সরকারি-বেসরকারি) চিকিৎসকের সম্মিলিত অনুপাতে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে সেবাপ্রার্থী ১ হাজার ৮৪৭ জন।দেখতেই পারছেন চিকিৎসা খাতে কী রকম বিশাল ঘাটতি রয়েছে। এমনও দেখা যায় অধিক রোগীর চাপে চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেকেই গাফলতির স্বীকার হচ্ছেন। এই সমস্যাগুলো বিবেচনা করেই  ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার একটি উদ্যোগ হিসেবে প্লেক্সাসডি এর যাত্রা শুরু। এক কথায় বলতে গেলে প্লেক্সাসডি এমন একটি অনলাইন প্লাটফর্ম যেখানে একজন চিকিৎসা সেবা প্রার্থী সকল ধরণের স্বাস্থ্য সেবা পেতে পারেন।

নাজিম মাহমুদ বলেন, প্লেক্সাসডি ক্লাউড নির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার করে যার মাধ্যমে একজন রোগী তার সমস্ত মেডিকেল ডাটা ক্লাউডে আপ্লোড করতে পারেন এবং পরবর্তীতে যখন তিনি আবারো স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসবেন তখন এই ডাটাগুলো সামনে হাজির হবে। আপনার পুরো মেডিকেল ইতিহাস বিবেচনা রেখে আপনার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে যা রোগীর জন্যে খুবই উপকারী। এই ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা মানুষের হাতের মুঠোয় মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ে এসেছে। এই অ্যাপটির মাধ্যমে একজন সেবাপ্রার্থী যে কোনো ধরণের কাজ করে নিতে পারে; অনলাইন এপয়েন্টমেন্ট থেকে শুরু করে পেমেন্ট, রোগীর মেডিকেল ইতিহাসের ডাটা আপ্লোড, প্রেসক্রিপশন নেওয়া ইত্যাদি কাজ অনায়াসে করতে পারবেন যে কেউ।

প্লেক্সাসডি’র শুরুর গল্প:

নাজিম মাহমুদের চিকিৎসা সেবায় যে খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন তার পরে তিনি তার কিছু বন্ধুদের সাথে তার এই উদ্যোগের চিন্তার কথা বলেন এবং সেটি নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করেন বাজার গবেষণা এবং খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন স্বাস্থ্যসেবার ইকো-সিস্টেম কীভাবে বজায় রাখা যায়। চিকিৎসাসেবা খাতের বিভিন্ন সমস্যা এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বেশ কয়েক বছর নাজিম মাহমুদ এবং তার দল কাজ করেন।

২০১৭ সালে তারা প্রথম তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু করেন কিন্তু কোনো উদ্যোগ শুরু করতে গেলে একটু তো বাধা আসবেই। প্লেক্সাসডি এর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছে; তারা তাদের ওয়েবসাইটের কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ রাখেন। কিন্তু এর মাঝে তারা তাদের কাজ বন্ধ রাখেননি। ৫-৬ জন রোগীর সমস্যা নিয়ে তারা প্রোটোটাইপ নিয়ে কাজ করেছে এবং স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব সমস্যাগুলো এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে খুঁজে বের করার প্রয়াস চালিয়েছে। ২০১৯ সালে আবারো ওয়েবসাইট চালু করে তারা এবং এখন পর্যন্ত পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছে।

১৫ এপ্রিলে তাদের অফিসিয়াল অ্যাপ চালু করা হয়। ছয় মাসের বানিজ্যিক কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত ২৫ টি চেম্বার, ২০০ জন চিকিৎসক এবং ৫৬০০ চিকিৎসা সেবা প্রার্থী নিয়ে কাজ করছে। প্রতিদিন প্রায় ১০০-১২০ টি এপয়েন্টমেন্ট এবং প্রতি মাসে ১৫০০০-১৬০০০ ব্যবহারকারী প্লেক্সাসডি থেকে সেবা গ্রহণ করে থাকে। 

প্লেক্সাসডির কাজ করার পদ্ধতি:

একজন সেবাপ্রার্থী সহজেই তার পছন্দের চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে প্লেক্সাসডি এর অ্যাপ কিংবা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। প্রথমে তারা তাদের এপইয়েন্ট তৈরি করে নেয় তাদের জন্য উপযোগী চিকিৎসক নির্বাচনের মাধ্যমে। এরপর যখন একজন সেবাপ্রার্থী চিকিৎসকের চেম্বারে যাবে তখন সেখানে একজন প্রতিনিধি রোগীর সকল মেডিকেল ডাটা সফটওয়্যারে প্রদান করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ক্লাউডে আপ্লোড হয়ে যাবে। এরপর সেবাপ্রার্থীর হাতে একটি প্রচারমূলক পত্র (brochure) দেয়া হবে যেখানে প্লেক্সাসডি এর মৌলিক সেবাগুলো বর্ণনা করা থাকবে। এগুলো হলো-

স্মার্ট এপয়েন্টমেন্ট:

আপনি আপনার এপয়েন্টমেন্ট ঘরে বসেই পূরণ করতে পারবেন। এই ব্যাপারটি  নতুন নয় কিন্তু আপানার চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাতের সম্ভাব্য সময় আপনি আন্দাজ করতে পারবেন না। দেখা যায় হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে নির্ধারিত সময়ের ২-৩ ঘন্টা পর একজন চিকিৎসকের সাক্ষাৎ মিলে। প্লেক্সাসডি’র স্মার্ট এপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থাতে সফটওয়্যারের এলগরিদমের সাহায্যে চিকিৎসকের সাক্ষাৎকারের  কাছাকাছি সময় নির্ধারণ করতে পারে এবং এর মাধ্যমে একজন সেবাপ্রার্থীর ঘন্টার পর ঘন্টা বসে সময় নষ্ট করাও হয় না। 

ই-প্রেস্ক্রিপশন:

সচরাচর দেখা যায় প্রেসক্রিপশন লিখতে ৫-১০ মিনিট সময় লেগে যেতে পারে, কিন্তু প্লেক্সাসডি প্রেসক্রিপশন তৈরিতে নিয়ে এসেছে পরিবর্তন যা আগের থেকে আরো নির্ভুল এবং প্রস্তুত করতে আগের থেকে কম সময় নেয়। প্লেক্সাসডিতে চিকিৎসক নির্ধারিত হয় একটি নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার বিশেষজ্ঞ নির্ধারণের মাধ্যমে। সফটওয়্যারের এলগরিদম রোগ অনুযায়ী ওষুধ সুপারিশ করে থাকে এবং চিকিৎসার সমাধানের সম্ভাব্য ধরণও সুপারিশ করা হয়ে থাকে। এই সফটওয়্যার একজন চিকিৎসক গত এক বছর ধরে যে সকল ওষুধ তার রোগীদের দিয়ে থাকেন এর মধ্যে থেকে সুপারিশ করবে। সফটওয়্যারটি রোগীর পূর্বের মেডিকেল ইতিহাস বিবেচনা করে ক্রস-চেক করবে এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিবে যে তার জন্যে যে ওষুধ প্রেসক্রিপশনে দেয়া হয়েছে তা ঠিকঠাক আছে কি না। এক্ষেত্রে ভুল ওষুধ প্রদান যাতে না হয় সেটি সমাধান করার জন্য একটি প্রচেষ্টা চালাচ্ছে প্লেক্সাসডি। 

ডিজিটাল রশিদের ব্যবস্থা:

প্লেক্সাসডি সেবাপ্রার্থীদের খরচের হিসাবের সুবিধার জন্য ডিজিটাল বিলের ব্যবস্থা করেছে। একজন রোগী তার খরচের সকল হিসাব এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে খোঁজ রাখতে পারবেন। মাসিক, দ্বিমাসিক, ত্রৈমাসিক এবং বাৎসরিক হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রাখতে পারবেন।   

অনলাইন রিপোর্ট: 

ক্লিনিক কিংবা হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর আবার একজন রোগীকে পুনরায় ফিরে আসতে হবে না রিপোর্ট নেয়ার জন্য। ওয়েবসাইট কিংবা অ্যাপের মাধ্যমে আপনার কাছে রিপোর্ট পৌঁছে যাবে এবং আপনাকে একটুও কষ্ট করতে হবে না। এমনকি আপনার রিপোর্ট আপনার চিকিৎসকের কাছে একইভাবে পৌঁছে যাবে যাতে পরবর্তীতে কোনো নির্দেশনা দেয়ার প্রয়োজন হলে তিনি যেন দিতে পারে। 

ওষুধ খাওয়ার সময় মনে করে দেয়া: 

প্লেক্সাসডি এর অ্যাপ কিংবা ওয়েবসাইটের  মাধ্যমে আরো একটি চমকপ্রদ সেবা দিয়ে থাকে। প্রেসক্রিপশনে যেসকল ওষুধ দেয়া হয় তা নির্ধারিত সময়ে যাতে আপনি গ্রহণ করতে পারেন সেটি নিশ্চিত করার জন্যে এই ব্যবস্থা। আমরা অনেকেই ওষুধ খাওয়ার সময় ভুলে যাই, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ওষুধ খাওয়া ভুলে যাওয়া কঠিন হয়ে যাবে আপনার জন্যে। 

ক্লাউড সংগ্রহ ব্যবস্থা:

একজন রোগীর সকল ধরণের তথ্য ক্লাউডে সংরক্ষিত থাকে। যে কোনো সময় যে কোনো স্থান থেকে সে তথ্য আপনি সংগ্রহ করতে পারেন। 

ফলো-আপ মনে করিয়ে দেয়া:

আপনার যদি এমন কোনো অসুখ হয়ে থাকে যার জন্য আপনাকে বারংবার চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে সে ক্ষেত্রে প্লেক্সাসডি অ্যাপ এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আপনাকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিবে। তাছাড়া আপনার সকল সাক্ষাতের তথ্য সংগ্রহ করে রাখবে যা ফলো-আপের সময় দরকারী। 

নাজিম মাহমুদ চিকিৎসা খাতে স্বাস্থ্যসেবা উন্নতির প্রসঙ্গে বলেন, “বাংলাদেশের চিকিৎসাখাতের উন্নতি করা এতো সহজ কাজ হবে না। হাসপাতাল এবং রোগী বাদেও অনেক বিষয় কাজ করে এখানে। এখানে অনেক স্টেক-হোল্ডার, চিকিৎসক, প্রযুক্তি, ওষুধশিল্প ইত্যাদি। যদি সবাই একযোগে চিকিৎসা খাতের জন্য কাজ না করে তাহলে উন্নতি সম্ভব না। সবাই প্রেসক্রিপশন এবং ওষুধ নিয়ে চিন্তা করে, সেবা খাতে প্রযুক্তির উন্নতি নিয়ে বা অন্যান্য যে বিষয় আছে এই সেবার সাথে যুক্ত সেটি নিয়ে ভাবা হয় না বলে এখনো উন্নতি হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা খাতের ঝামেলাগুলো থেকে মুক্ত করার জন্যে প্লেক্সাসডি কাজ করছে; মানুষের হাতের মুঠোয় এখন স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এর পেছনে হাসপাতালগুলোর ভূমিকা রয়েছে অনেক কিন্তু উপযুক্ত প্রযুক্তির এখনো অভাব রয়েছে তাই এখনো এই সেবা প্রদানে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে”। অর্থাৎ বলা যায় যে, বাংলাদেশে যেখানে মাথাপিছু চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক কম তখন এই ধরণের উদ্যোগ রোগী এবং চিকিৎসকের মধ্যে মেলবন্ধনের কাজ করে থাকে। আর এই ধরণের উদ্যোগগুলো কার্যকরী করার জন্যে প্রয়োজন চিকিৎসা খাতের সাথে যুক্ত সকল ধরণের ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক।

প্লেক্সাসডি চেষ্টা করে যাচ্ছে সর্বোচ্চ নির্ভুলভাবে সেবা প্রদান করার জন্যে। অনেক সময় ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। সেক্ষেত্রে প্লেক্সাসডি নিশ্চিত করছে এইচআইপিএএ (HIPAA) এর ১৯৯৬ সালের পলিসি অনুযায়ী ব্যবহারকারীর তথ্য গোপনীয় করা থাকে শুধুমাত্র ব্যবহারকারী ব্যবহার করতে পারবে। চিকিৎসক এপয়েন্টমেন্টের সময় থেকে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত সেই তথ্যগুলো দেখতে পারবেন। প্লেক্সাসডি তাদের এই কার্যক্রমের জন্য মাত্র ৩০ টাকা নিয়ে থাকে চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পরে। প্লেক্সাসডি এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং চিফ মার্কেটিং অফিসার রিজভী শেখ প্লেক্সাসডি নিয়ে বলেন, “প্লেক্সাসডি আপনার স্বাস্থ্যসেবার পরম বন্ধু হিসেবে কাজ করবে। যে আপনার সেবার পূর্বে, সেবার সময় এবং সেবার শেষের আপনার পাশে থাকবে”। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বন্ধু হিসেবে প্লেক্সাসডি চিকিৎসক এবং রোগী উভয়ের ভরসা অর্জন করতে নিরলসভাবে কাজ করার জন্য দৃঢ় প্রতীজ্ঞাবদ্ধ।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত