১০ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:৪১ এএম
আপডেট: ১০ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:৫৯ এএম

‘বিএমডিসির যোগসাজশেই ভুয়া চিকিৎসক তৈরি হয়’

‘বিএমডিসির যোগসাজশেই ভুয়া চিকিৎসক তৈরি হয়’

তানভীর সিদ্দিকী: বিএমডিসির যোগসাজশেই ভুয়া চিকিৎসক তৈরি হয় বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি এন্ড রাইটস (এফডিএসআর) এর মহাসচিব ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন।

তিনি বলেন, ‘বিএমডিসি’র একটি দুষ্টু চক্র থেকে ভুয়া সনদ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। তারাই ভুয়া চিকিৎসক বানাচ্ছেন যার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আমরা পেয়েছি।’

শনিবার (৯ নভেম্বর) বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এফডিএসআর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আপনারা দেখেছেন মেডিকেলে পড়াশোনা না করেও অনেকেই বিএমডিসি থেকে সনদ নিয়েছে এবং তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রেক্টিস করছে। সম্প্রতি ওমর ফারুক নামের একজন ভুয়া ডাক্তারের নাম আলোচনায় উঠে এসেছে। তাদেরকে এ সার্টিফিকেটগুলো কে দিয়েছে? তারা তো এই বিএমডিসির যোগসাজশেই নিয়েছে।

তিনি বলেন, বিএমডিসি অন্য আরেকজনের নাম ব্যবহার করে, অন্য আরেকজনের নাম্বার দিয়ে ভুয়া চিকিৎসকদের তারা সার্টিফিকেট দিয়েছে এবং তারা এই ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রেক্টিস করছে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সংঠনের উপদেষ্টা ডা. আব্দুন নূর তুষার বলেন, এরই মধ্যে এরকম অসংখ্য ভুয়া রেজিস্ট্রেশনধারী চিকিৎসক পাওয়া গেছে। শুধু তাই না, একজনের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার আরেকজন ব্যবহার করছে। যেটা বিএমডিসির ভিতর থেকে করা না হলে এটা সম্ভব না। কেননা বিএমডিসি থেকে রেজিস্ট্রেশন নিতে গেলে সেখানে আসল সার্টিফিকেট এবং আসল দলিলাদি জমা দিতে হয়। তারপর এটা বিএমডিসি পরীক্ষা করে রেজিস্ট্রেশন দেয়। কিন্তু আপনারা দেখেছেন, একজন ওয়ার্ড বয়ও সেখান থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে চেম্বারে প্রেক্টিস করছেন। একজন ওটি বয় সেখান থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে সার্জারি করছেন। এরকম দুর্নীতির অসংখ্য উদাহারন আমরা দিতে পারি।

তিনি বলেন, ‘ভুয়া চিকিৎসক শনাক্তের পদ্ধতি, তার শাস্তি কী হবে, সে সম্পর্কে আইনের খসড়ায় কী কিছু বলা হয়নি। অথচ সারাদেশে লাখ লাখ ভুয়া ডাক্তার অপচিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জনসাধারণের সাথে প্রতারণা করে চলছে। তাহলে এটা কীভাবে ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা’ নিশ্চিত করবে?

প্রস্তাবিত ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন-২০১৮’ বাস্তবায়ন হলে চিকিৎসক ও রোগী- কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না বলেও জানান ডা. আবদুন নূর তুষার।

এর আগে লিখিত বক্তব্যে ডা. আব্দুন নূর তুষার বলেন, প্রস্তাবিত “স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইনের শুরুতে যে কয়েকটি বিষয় সংজ্ঞায়িত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি ধারা আমাদের কাছে বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। যেমন- ২(৮) চেম্বার, ২(৯) তথ্য, ২(১১) নমুনা, ২(১৭) হাসপাতাল, ২(২৭) স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি, ২(২৮) ক্ষতি ইত্যাদি। যার ফলে পরবর্তীতে এই আইনের ব্যাখ্যা প্রদান এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনের ১০(১) ধারাটি আমাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। কারণ, সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ি সরকারি চাকরিজীবী চিকিৎসকদের জন্য অফিস চলাকালীন সময় অথবা পালাক্রমিক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের সময়ে অন্য কোনো বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা প্রদান করা প্রচলিত চাকরি বিধির সুস্পষ্ট লংঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুতরাং এ বিষয়ে আলাদা কোন আইনের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।

১০(২) ধারায় ছুটির দিনে স্ব-স্ব কর্মস্থলের জেলার বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল বা ব্যক্তিগত চেম্বারে ফি গ্রহণপূর্বক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নেয়ার কথা বলা হয়েছে। আমরা মনে করি, প্রতিটি জেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন নিশ্চিত না করে এই ধারা প্রয়োগ করলে জেলার রোগীরা বিশেষায়িত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, প্রস্তাবিত আইনের ধারা ১১ এ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালসমূহে প্রদত্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার চার্জ বা মূল্য তালিকার কথা বলা হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টে একজন চিকিৎসকের বাধ্যতামূলক স্বাক্ষর থাকার কথা উল্লেখ করা হয়নি। অথচ এরকম নির্দেশনা না থাকার কারণে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসক ব্যতীত অন্যদের স্বাক্ষর সম্বলিত রিপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে সাধারণ জনগণ প্রতারিত হচ্ছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণের প্রস্তাবটিও বাস্তবসম্মত নয়। 

বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আইনের ধারা ১২ (১) এবং ১২ (২) আমাদের কাছে চিকিৎসকদের জন্য হয়রানিমূলক মনে হয়েছে। সারাদেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের চেম্বারের সামনে রোগীর অতিরিক্ত চাপ থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন রোগীর সাথে একাধিক আত্মীয় থাকে, তারাও চেয়ার ব্যবহার করেন। তাছাড়া অনেক নবীন চিকিৎসকই নানা ওষুধের দোকানে চেম্বার করেন, যেখানে সেবা গ্রহীতার বসার জায়গা সীমিত অথবা নেই বললেই চলে। সুতরাং চেম্বারের সামনে গ্রহীতার বসার ব্যবস্থা না থাকলে চিকিৎসককে জরিমানা করার দণ্ডটি আমাদের কাছে অযৌক্তিক এবং অমানবিক মনে হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনের ধারা ১৪(১) আমাদের কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। যেখানে দেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এখন পর্যন্ত জরুরি  সেবা প্রদানের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি, সেখানে মফস্বলের ছোট ছোট বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নূন্যতম জরুরি সেবা প্রদান নিশ্চিত প্রায় অসম্ভব।

ডা. তুষার বলেন, বলেন, সারাদেশে লাখ লাখ ভুয়া ডাক্তার অপচিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জনসাধারণের সাথে প্রতারণা করে চলছে। অথচ প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইনে ভুয়া চিকিৎসকদের শনাক্তকরণ এবং এদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়নি। এ ব্যাপারে আমরা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি এন্ড রাইটসের কোষাধ্যক্ষ ডা. ফরহাদ মনজুর, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. জাহিদুর রহমান, আইন বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. নোমান চৌধুরী, মিডিয়া সম্পাদক ডা. শাহেদ ইমরান, ডা. রাশেদুল হক, ডা. ওমর ফারুক লপ্তি, ডা. সুহেল মাহমুদ প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, সরকারি চাকরিতে কর্মরত কোনো চিকিৎসক অফিস সময়ে ব্যক্তিগত কোনো চেম্বার করতে পারবে না, ছুটির দিনে চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলের জেলার বাইরে জেলার বাইরে টাকার বিনিময়ে সেবা দিতে দিতে সরকারের অনুমতি লাগবে, চিকিৎসাসেবা বাবদ আদায়কৃত চার্জ বা মূল্য বা ফি রসিদের মাধ্যমে আদায় করতে হবে -এমন সব বিধান রেখে ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন-২০১৯’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। প্রস্তাবিত আইনটির মতামতের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং অনুমোদনের জন্য শিগগিরই মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত