০৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০৩:৪৩ পিএম
আপডেট: ০৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০৩:৪৫ পিএম

“৮০ শতাংশ শৈশব ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য”

“৮০ শতাংশ শৈশব ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য”

মেডিভয়েস ডেস্ক: ক্যান্সারে আক্রান্ত ৮০ শতাংশের বেশি শিশুর ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য। কিন্তু মধ্য এবং স্বল্প আয়ের দেশে এই হার ২০ শতাংশের বেশি নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, সার্জারি ও রেডিওথেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে শিশু ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব বলে দাবি তাদের।

৩ নভেম্বর (রোববার) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক সংবাদে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংবাদে বলা হয়েছে, বড়দের পক্ষে ক্যান্সার নির্ণয়ের মোকাবেলা করা কঠিন, তবে বাচ্চাদের পক্ষে এটি আরও সহজ। যদিও গত কয়েক দশক ধরে ক্যান্সার নিরাময়ের অগ্রগতি বিশ্বব্যাপী সমস্ত শৈশব ক্যান্সারের প্রায় ৮০% চিকিৎসা করা সম্ভব করেছে। কিন্তু ভারতসহ পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে এ নিরাময় শতাংশ কম, কারণ এসব দেশে এখনও পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা কেবল মানুষের মধ্যেই কম নয়, তবে ডাক্তাররাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। এ বিষয়ে সকলেই ক্যান্সারের বিশেষজ্ঞদের উপর নির্ভর করে।

অনেক গবেষণায় শিশু ক্যান্সারের কারণগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। তবে জানা গেছে, শিশুদের মধ্যে খুব কম ক্যান্সার পরিবেশগত বা জীবনধারা বিষয়ক কারণে ঘটে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ শিশু ক্যান্সারের ঝুঁকির কারণ এবং স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর প্রকোপ বেশি। এইচআইভি, এপস্টাইন-বার ভাইরাস ও ম্যালেরিয়া ইত্যাদি শৈশবে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

গান্ধী ক্যান্সার ইনস্টিটিউট এবং গবেষণা কেন্দ্রের (আরজিসিআইআরসি) পেডিয়াট্রিক হেমোটোলজি-অনকোলজির সিনিয়র পরামর্শদাতা ডা. সন্দীপ জৈন বলেছেন, "বড়দের ক্যান্সার থেকে শৈশব ক্যান্সার একেবারেই আলাদা। ভারতে নিরাময়ের হার ৪০-৮০% এর মধ্যে রয়েছে। এর বিভিন্ন কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে, অবকাঠামো, বিশেষজ্ঞের প্রাপ্যতা এবং প্রশিক্ষিত স্টাফ ইত্যাদি। যেগুলো সর্বত্র একরকম নাও হতে পারে। "

ডা. জৈন বলেন, “বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আমরা যে বিষয়টি মনে রাখি তা হলো দীর্ঘকালীন ফলাফলের কথা মাথায় রেখে চিকিৎসা পদ্ধতিটি সাজানো উচিত। তাদের সঠিক যত্ন এবং পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরী। এমনকি এটিও বুঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রাথমিক রোগের পাশাপাশি এর চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থাকতে পারে।

তিনি বলেন, শুধু সাধারণ মানুষই নয়, এমনকি নার্স এবং শিশু বিশেষজ্ঞরাও ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন যা শিশুদের মধ্যে রুটিন পরীক্ষার সময় বাছাই করা যায়। এক্ষেত্রে, 

ম্যাক্স হেলথ কেয়ারের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. পি কে জুলকা বলেন, সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছার পরে লোকেরা আমাদের কাছে আসে। ক্যান্সারের উন্নত নিরাময়ের হারের চাবিকাঠি হলো সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা। আমরা কিছু ক্ষেত্রেও দেখি যে, লোকেরা বিকল্প থেরাপিতে আছেন। তারা চাইলে মূল ক্যান্সারের চিকিৎসার পাশাপাশি সেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারে। তবে মাঝারি দিকে চিকিৎসা বন্ধ করা এবং বিকল্প চিকিৎসার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা ভাল নয়।

তিনি বলেন, বাচ্চাদের মধ্যে নিরাময়যোগ্য ক্যান্সারের মধ্যে রয়েছে রক্ত, লিম্ফ নোডস, কিডনি টিউমার, জীবাণু কোষের টিউমার ইত্যাদি। প্রাথমিক রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং চিকিৎসা সম্মতি এবং ওষুধের ডোজগুলো অনুসরণ করা নিরাময়ের মূল চাবিকাঠি।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস অ্যাডহোম গেহব্রিয়াসাস বলেন, ক্যান্সারের কারণে বিশ্বে অনেক শিশু পরিপূর্ণ জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ধনী দেশের তুলনায় দরিদ্র দেশে এ সমস্যা প্রকট। আশা করা যায়, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এক্ষেত্রে কার্যকর হবে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বড়দের মতো শিশুদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্যান্সার অন্যতম কারণ। শূন্য থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতিবছর নতুন করে ৩ লাখ শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর হার চারগুণ বেশি। কারণ মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব করা হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব তো রয়েছেই।

এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ২০৩০ সালের মধ্যে ক্যান্সারে শিশু মৃত্যুর হার ৬০ ভাগ কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। শিশুদের ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ-২০৩০ ঘোষণা করেছে সংস্থাটি। যেখানে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুদের ক্যান্সারে আক্রান্তের হার ৬০ ভাগ কমিয়ে আনতে হবে। সেটি নিশ্চিত করতে পারলে কমপক্ষে ১০ লাখ শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

সংস্থাটির তথ্য মতে, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ক্যান্সার। ২০১৮ সালে ৯৬ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফুসফুসে, প্রোস্টেট, কোলোরেকটাল, পেট ও লিভার ক্যান্সার পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে জরায়ুমুখ, স্তন, কোলোরেকটাল, ফুসফুস, থাইরয়েড ক্যান্সার মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। তবে শিশুদের মধ্যে লিউকোমিয়া, মস্তিষ্কের ক্যান্সার, লিম্ফোমা, নিউ টিউব্লাস্টোমা ও উইলমস টিউমারের মতো কঠিন টিউমারজনিত ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি।

উচ্চ আয়ের দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত ৮০ শতাংশের বেশি শিশুর ক্যান্সার নিরাময় করা হয়। মধ্য এবং স্বল্প আয়ের দেশে এই হার ২০ শতাংশের বেশি নয়। তবে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, সার্জারি ও রেডিওথেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে শিশু ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব। অন্যদিকে রোগ নির্ণয়ে ভুল বা বিলম্ব, মাঝপথে চিকিৎসা ছেড়ে দেয়া, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবা না পাওয়ার কারণে এ রোগে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।

প্রসঙ্গত, ক্যান্সার একটি একক কোষের জেনেটিক পরিবর্তনের সঙ্গে শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্যান্সার টিউমারে রূপ নেয়। যদি চিকিৎসা না করা হয় তাহলে এটি সাধারণত বাড়তে থাকে, শরীরের অন্যান্য অংশে আক্রমণ করে এবং মানুষের মৃত্যু ঘটায়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ক্যান্সারের তুলনায় শিশুদের ক্যান্সারে আক্রান্তের বেশির ভাগেরই কারণ জানা যায় না।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত