ডা. তাইফুর রহমান

ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


০৩ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:৪৭ এএম
আপডেট: ০৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০২:১৫ পিএম

হৃদরোগ মহামারী: কী খাবো, কী খাবো না?

হৃদরোগ মহামারী: কী খাবো, কী খাবো না?

বলা নাই কওয়া নাই বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে টিংটিঙে বিমলটারই হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল। সে নিরামিষভোজী। গরু, খাসীতো খাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। ডিম, দুধও খুব একটা খায় বলে জানি না। প্রচন্ড স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ। কথায় আছে- যা কিছু হারায়, গিন্নি বলে, ক্যাষ্টা ব্যাটাই চোর।

সবার হাহাকার। দেখুন.. কোলেস্টেরল মেপে দেখুন..! কোলেস্টেরল, যেন এক মহা আতঙ্কের নাম। কি সেই কোলেস্টেরল? সহজ ভাষায় কোলেস্টেরল হচ্ছে- শরীরের মধ্যে থাকা একধরণের মোমের মতো ফ্যাট বা চর্বি। আমাদের শরীরে ফ্যাট থাকে তিনভাবে।

১. নিউট্রাল ফ্যাট বা ট্রাইগ্লিসারাইড।

২. ফসফোলিপিড।

৩. কোলেস্টেরল।

চর্বি মানেই খারাপ কিছু, তা নয়। শরীর গঠনের জন্য একটা অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটাও বিষাক্ত হয়ে যায়। আর এটা শুধু খাবার থেকে আসে এমনটা নয়। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা যায়, শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্র ২০ ভাগ ভাগ খাবার থেকে আসে আর ৮০ ভাগই লিভারের কারসাজি।

সুতরাং খাবারের সঙ্গে চর্বি বেশি ঢুকলে অথবা লিভার বেশি তৈরি করলে কোলেস্টেরল বাড়বে। নিরামিষ খেলেও প্রতিদিন শরীরে গড়ে কোলেস্টেরল ঢুকবে ২০০-৪০০ মিগ্রা। বাইরে থেকে একফোঁটা কোলেস্টেরল না ঢুকলেও লিভার রোজ ছাড়বে ১০০০-১৫০০০ মিগ্রা।

কারো কারো বংশগতভাবেও জ্বিনের প্রভাবে কোলেস্টেরল বেশি থাকে। এর জন্য দায়ী কোলেস্টেরল রিসেপ্টর। এটা এত গুরুত্বপূর্ণ যে, ১৯৮৫ সালে এই রিসেপ্টরের ভূমিকা আবিষ্কার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়ে যান দু’জন চিকিৎসা বিজ্ঞানী।

কোলেস্টেরলের পরিমাণ জানতে হলে আমরা লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করি। ১২ ঘন্টা খালি পেটে থেকে তারপর রক্ত পরীক্ষা করলেই কেবলমাত্র সঠিক মাত্রাটা পাওয়া যাবে। পরীক্ষায় আমরা Total cholesterol, Triglycerides, HDL, VLDL, LDL এর মাত্রা দেখি।

হার্টের রক্তনালীতে ব্লক তৈরি করায় মূল ভূমিকা পালন করে এলডিএল কোলেস্টেরল। এটি অক্সিডাইসড হয়ে রক্তনালীগাত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে। সেখানে চর্বি জমে জমে ব্লক তৈরী করে ও রক্তনালীকে সরু করে দেয়। পক্ষান্তরে, এইচডিএল কোলেস্টেরল জমানো চর্বিগুলোকে পরিস্কার করে। তাই এটাকে ভালো বা বন্ধু কোলেস্টেরল বলে। এটা বেশি থাকলে ভালো।

করণীয় কী? কী খাবো, কী খাবোনা?

আমরা রোগীদের একটা সিল মেরে লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দেই যে- গরু, খাসী, চিংড়ি, কলিজা, মগজ, গিলা, তেল, চর্বি, ঘি, মাখন, ছানা খাবেন না। লাল সিগনাল, আর কখনো খাবেন না। অথচ হাজার বছর যাবৎ মানুষ এগুলো খাচ্ছে। হ্যা, তখন এতটা এভেইলেবল ছিল না এই খাবারগুলো। মানুষ পরিমিত খেত, মানুষ কায়িক পরিশ্রম করতো। অথচ, এখন হৃদরোগের এই মহামারীর যুগে গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১. স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম খেতে হবে। সাধারণভাবে যেই তেল ঠান্ডায় জমে যায় সেগুলো সেচুরেটেড ফ্যাট, যেমন- প্রাণীজ চর্বি, পাম ওয়েল, নারিকেল তেল।

২. আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরের জন্য উপকারী। পলি আনস্যাচুরেটেড আরো ভালো। এগুলোতে ওমেগা- 3 ফ্যাটি এসিড থাকে। যেমন- সামুদ্রিক মাছ, বাদাম ও বাদাম জাতীয় খাবার। তবে সব ধরনের মাছই ভালো। মাছের তেল HDL বাড়ায়, তাই বেশি খান। তবে, মাথার মগজটা পরিহার করুন।

৩. US-FDA এর নির্দেশনা হলো সপ্তাহে ৩৫০ গ্রাম গরু/ খাসীর কম চর্বিযুক্ত মাংস খাওয়া যাবে। বরং এটা শরীরের জন্য খুব দরকারি। কারণ, এতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, আয়রন, জিংক ও ফসফরাস থাকে।

৪. ঝোলটা কম খাবেন। কারণ, এখানেই পুরো চর্বিটা গলে গলে জমা হয়।

৫. প্রতিদিন এক কাপ গরুর দুধ খাওয়া যাবে। এতে আছে ক্যলসিয়াম, ভিটামিন ডি ও পুষ্টি। এছাড়াও ৩০ গ্রাম পর্যন্ত পনির খাওয়া যাবে প্রতিদিন।

৬. ইদানিং সাদা চিনিকে এক প্রকার বিষ বলা হচ্ছে। তবে, সারাদিনে ২-৩ চামচ খেলে কোন ক্ষতি হবে না। WHO ৬ চামচ পর্যন্ত অনুমোদন দিয়েছে।

৭. চিংড়ি মাছে গরু/ খাসির চাইতে দ্বিগুণ কোলেস্টেরল থাকে তাই প্রতি সপ্তাহে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত খেতে পারবেন।

৮. মুরগী খান, চামড়াটা বাদ দিয়ে দিন। সোজা বাংলায় বলা হয় যত পা বেশি তত বেশি খারাপ কোলেস্টেরল।

৯. তবে হাঁসটা কম খান। গিলা, কলিজা খাবেন না। মগজে তো পুরোটাই কোলেস্টেরল।

১০. কায়িক পরিশ্রম বাড়ান। বাড়তি মেদ ঝেড়ে ফেলুন। খাবারের সব কোলেস্টেরল পুড়িয়ে ফেলুন।

১১. ডায়াবেটিস থাকলে নিয়ন্ত্রণ করুন। কারণ, ডায়াবেটিস থাকলে কোলেস্টেরলের নিয়ন্ত্রণ এলোমেলো হয়ে যায়।

১২. ট্রান্সফ্যাট থেকে বাঁচুন। যত দোষ, নন্দ ঘোষ এর মতোই আমরা শুধু গরু, খাসি নিয়ে মেতে আছি। হার্টে ব্লক শুনলেই সবাই জিজ্ঞেস করে গরু খান? অথচ, নিরবে ধ্বংস করে যাচ্ছে নিরব ঘাতক, ট্রান্সফ্যাট। এটা একটা মারাত্মক বিষ- সায়ানাইড।

হোটেল, রেস্তোরাঁয় শুরুর দিনের তেলটা শেষদিন পর্যন্ত চলতে থাকে। পুনঃপুন গরম হওয়ার সময় পোড়া তেল বাতাসের হাইড্রোজেন গ্রহণ করে ট্রান্সফ্যাটে রূপান্তরিত হয়। ট্রান্সফ্যাট সরাসরি হার্টে আঘাত করে। ইন্ফ্লামেশন করে। দ্রুত ব্লক সৃষ্টি করে।

আমরা তেল পাল্টাই- সয়াবিন, সরিষা, রাইসব্রান, সূর্যমুখী। লাভ নাই। ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের এই যুগে তেলকে সুন্দর, ক্রিস্টাল ক্লিয়ার করা ও বহুদিন সংরক্ষণ করার জন্য মিশানো হয় বাড়তি হাইড্রোজেন। ব্যাস, হার্ট ফ্রেন্ডলি আনসেচুরেটেড ফ্যাটটা হয়ে গেল সেচুরেটেড তারপর একলাফে বিষ- ট্রান্সফ্যাট।

USFDA এর লিমিট হলো প্রতিদিন মাত্র ২ গ্রাম ট্রান্সফ্যট। আমেরিকায় আগে হার্ট অ্যাটাকের রেট ছিল অনেক বেশি ছিল। লম্বা সময় ধরে জরিপ হলো, দেখা গেল তাদের দৈনিক ট্রান্সফ্যাট কনসামপশান হচ্ছে ৬ গ্রাম। এখন সরকার নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং সাথে সাথে হার্ট অ্যাটাকের রেটও কমে আসছে।

পৃথিবীর অনেক দেশই আইন করে ভোজ্যতেলে হাইড্রোজিনেশন নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু আমরা সেই তিমিরেই রয়ে গেছি! আমাদের কেন জরিপ নাই, হিসাবও নাই। সেটাই ভালো, ঠেলাঠেলির ঘর, খোদায় রক্ষা কর।

ও হ্যা। একবার হার্টে ব্লক ধরা পড়লে আজীবন কোলেস্টেরলের ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। কোলেস্টেরলের মাত্রা নরমাল হয়ে গেলেও।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত