ডা. এম রাজিবুল ইসলাম রাজন

ডা. এম রাজিবুল ইসলাম রাজন

জেনারেল প্র্যাকটিশনার ও মেডিকেল এডুকেটর

ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ জেনারেল প্র্যাকটিশনারস' সোসাইটি (বিজিপিএস)


২৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০১:২২ পিএম

জিপি শুরু করার পূর্ব প্রস্তুতি ও সফল হওয়ার কার্যকরী টিপস

জিপি শুরু করার পূর্ব প্রস্তুতি ও সফল হওয়ার কার্যকরী টিপস

ইউএসএ এবং কানাডাতে যে চিকিৎসক সম্প্রদায়কে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান বলা হয় তাদেরকে ইউকে, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে বলা হয় জেনারেল প্র্যাকটিশনার বা জিপি। বাংলাদেশ বিএমডিসি রেজিস্টার্ড ৯৫ হাজারের অধিক চিকিৎসকের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার চিকিৎসক মারা গিয়েছেন, প্রায় ২ হাজার চিকিৎসক কর্মসূত্রে প্রবাসী, প্রায় ১০ হাজার চিকিৎসক বিভিন্ন কোর্সে অধ্যায়নরত আছেন এবং প্রায় ১২ হাজার চিকিৎসক পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন। এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আমরা সেকেন্ডারি/টারশিয়ারি কেয়ার ফিজিশিয়ান বলতে পারি। বাকি যে ৬৮ হাজার চিকিৎসক আছেন, তাদেরকে আমরা বলতে পারি প্রাইমারি কেয়ার ফিজিশিয়ান বা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান বা জেনারেল প্রাকটিশনার সংক্ষেপে জিপি।

কোথায় জিপি শুরু করতে পারেন:

১. বেসরকারী হাসপাতাল

২. ক্লিনিক

৩. ডায়াগনস্টিক সেন্টার

৪. বড় ফার্মেসি

৫. বাজার বা নিজের বাসার নিচে চেম্বার তৈরি করে

চেম্বারের সরঞ্জামাদি:

 ১. টেবিল - ১টি

 ২. ডাক্তার চেয়ার - ১টি

 ৩. রোগী দেখার চেয়ার - ২টি

 ৪. রোগী অপেক্ষার চেয়ার - ৩টি

 ৫. রোগী এক্সামিনেশন বেড(সিঁড়ি সহ) - ১টি

 ৬. স্টেথোস্কোপ - ১টি

 ৭. ব্লাড প্রেসার মাপার মেশিন - ১টি

 ৮. ওজন ও উচ্চতা মাপার মেশিন - ১টি

 ৯. বাচ্চাদের ওজন মাপার মেশিন - ১টি

১০. টর্চলাইট - ১টি

১১. পার্কাসন হেমার - ১টি

১২. থার্মোমিটার - ২টি

১৩. ব্লাড সুগার মাপার মেশিন - ১টি

১৪. টিউনিং ফর্ক - ১টি

১৫. ফার্স্ট এইড বক্স

১৬. প্রেস্ক্রিপশন প্যাড ও ভিজিটিং কার্ড

১৭. সাইনবোর্ড

সফল জিপি হওয়ার কার্যকরী টিপস:

> আপনার বিএমডিসি স্থায়ী রেজিস্ট্রেশন আপ-টু-ডেট মেয়াদ আছে কিনা তা দেখে নিবেন। মনে রাখবেন একজন ব্যবসায়ী যেমন ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসা করে ঠিক একই রকম আমাদের দেশে চিকিৎসা সেবা প্রদান করার জন্য চিকিৎসকদের অবশ্যই হালনাগাদ মেয়াদের বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন লাগবেই।

> আপনি যে এলাকায় জিপি শুরু করতে চান সেখানে মোটামুটি এক বর্গকিলোমিটার এলাকায় বসবাসরত জনসংখ্যা আনুমানিক কত হবে তা শুরুতেই জেনে নিবেন। কারণ, এরাই হল সম্ভাব্য রোগী। এর জন্য আপনি স্থানীয় কাউন্সিলর অথবা চেয়ারম্যান অথবা ইউপি মেম্বারের সাহায্য নিতে পারেন।

> আপনার এলাকায় আপনার জিপি সেন্টারের কাছাকাছি কয়জন এমবিবিএস ডাক্তার জিপি করে তা জেনে নিবেন এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, কোন প্রয়োজনে তাদের সাথে সবার আগে আপনার পরামর্শ করতে হবে।

> আপনার জিপি সেন্টারের কাছাকাছি কোন কোন ফার্মেসিতে মোটামুটি সব কমনলি প্রেসক্রাইবড ওষুধ পাওয়া যায় তা জেনে নিবেন। কারণ, রোগীরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করবে ডাক্তার সাহেব এই ওষুধগুলো কোথায় পাব।

> আপনার জিপি সেন্টারের কাছাকাছি কোথায় সাধারণ ইনভেস্টিগেশনগুলো তুলনামূলক কম খরচে ভালোভাবে করে তা জেনে নিবেন। কারণ, আপনি যখন কোন রোগীকে ইনভেস্টিগেশন করতে দিবেন তখনই রোগী জিজ্ঞাসা করবে ডাক্তার সাহেব কোথা থেকে করব, এর জবাবে আপনাকে যেন ইতস্তত করতে না হয়।

> আপনার জিপি সেন্টার এর কাছাকাছি কোন বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে তুলনামূলক কম খরচে ভর্তি রোগী ভালো চিকিৎসা সেবা পাবে তা জেনে নিবেন। কারণ, কোন রোগীকে যদি এডমিশন দিতে হয় তাহলে আগে থেকে আপনি হাসপাতাল বা ক্লিনিক পছন্দ করে রাখলেই ভালো।

> আপনার জিপি সেন্টার শুরু করার দিনে একটি মিলাদের আয়োজন করতে পারেন। সেখানে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবৃন্দ যেমন মসজিদের ইমাম, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, স্থানীয় বিএমএ ও স্বাচিপ নেতৃবৃন্দসহ এমবিবিএস চিকিৎসকদেরকে ডাকতে পারেন।

> সম্ভব হলে জিপি সেন্টার শুরু করার আগে এলাকায় মাইকিং ও জুম্মার নামাজের পর লিফলেট বিতরণ করাতে পারেন।

> এখন সবার মোবাইলেই ডুয়েল সিম ব্যবহার করা যায়। আপনি একটি মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করতে পারেন শুধুমাত্র রোগীদের জন্য যা আপনার লিফলেট, সাইনবোর্ড, ভিজিটিং কার্ড ও প্রেসক্রিপশন প্যাডে থাকবে। বলবেন, খুব জরুরী প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে। বেশিরভাগ রোগীই শুধুমাত্র প্রয়োজনে ফোন করেন। আপনি হয়তো কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়েছেন, নির্দিষ্ট ডাক্তারকে না পেলে আপনাকে ফোন করে বিকল্প জেনে নিতে পারেন। তবে মোবাইলে চিকিৎসা দেয়াটা ঠিক নয়। রোগীর সাথে সম্পর্ক হবে পেশাদারী কিন্তু মানবিক।

> চেম্বারে আপনার যিনি সহকারী থাকবেন তাকে আগে থেকে নির্দেশনা দিয়ে রাখবেন যে আপনার চেম্বার শুরু করার যে সময় তার এক ঘন্টা আগে সে যেন পৌছায়। তাহলে সে চেম্বার পরিষ্কার করে রাখতে পারবে এবং কোন রোগী যদি নির্দিষ্ট সময়ের আগে আসে আপনাকে ফোনে জানাতে পারবে।

> আপনার সহকারীর কাছে একটি হার্ডবাইন্ডিং রেজিস্ট্রার খাতা দিয়ে রাখবেন। সেখানে তারিখসহ রোগীর নাম, সংক্ষিপ্ত ঠিকানা ও মোবাইল নাম্বার লিখা থাকবে। এতে আপনি বুঝতে পারবেন কোন এলাকার রোগীরা বেশি আসছে, প্রতি সপ্তাহে ও প্রতি মাসে কয়টি করে রোগী দেখা হচ্ছে, কারা নিয়মিত ফলোআপে আসছে।

> আপনার চেম্বারে যে নির্দিষ্ট সময় বসার কথা প্রয়োজনে তার ৫-১০ মিনিট আগে চেম্বারে পৌঁছাবেন। রোগী যদি এসে দেখে চেম্বারে চিকিৎসক উপস্থিত নেই তাহলে বিকল্প চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। এছাড়াও রোগী ভবিষ্যতে ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন হলে আপনাকে বিবেচনায় রাখবে না।

> আপনার সরকারিকে আগে থেকে নির্দেশনা দেওয়া থাকবে ভিতরে যদি কোন রোগী নাও থাকে তারপরও নতুন রোগী আসার সাথে সাথে আপনার চেম্বারে প্রবেশ করবে না। নতুন রোগী আসার কথা সহকারি এসে আপনাকে জানাবে। তারপর রেজিস্ট্রার খাতায় নাম, ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার লিপিবদ্ধ করবে। এরপর আপনার অনুমতি নিয়ে চেম্বারে রোগী প্রবেশ করাবে।

> প্রতিটি নতুন রোগী আসার পর কুশল বিনিময় শেষে আপনি যখন তার ডিটেলস লিপিবদ্ধ করবেন প্রেসক্রিপশন এর উপরে বা নিচে কর্ণারে ছোট করে এমন একটা কিছু লিখে রাখবেন (যেমন: জেলা অথবা পেশা অথবা কার রেফারেন্সে এসেছে) যা দেখলে  ফলোআপের সময়/ অনেকদিন পরেও এই রোগীটি চিনতে আপনার কোন অসুবিধা না হয়। আপনি যখন কোন রোগীকে রিকল করতে পারবেন তখন দেখবেন রোগী আপনার উপর কতখানি সন্তুষ্ট হয়।

> যদি আপনি কোন রোগীকে একাধিকবার চিকিৎসাসেবা দেবার পরও আশানুরূপ সুস্থতা বা ফলাফল না পান তবে তাকে অবশ্যই নিকটস্থ একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করবেন। রেফার করার পূর্বে আপনি রোগীকে অবশ্যই বুঝিয়ে বলবেন তাকে কেন রেফার করা হচ্ছে এবং এটাও বলবেন যার কাছে রেফার করা হচ্ছে তিনি কি চিকিৎসা দিচ্ছেন তারা যেন আপনাকে দেখিয়ে যান। সম্ভব হলে যে ফলোআপে আপনি রোগী রেফার করবেন সেদিন রোগী থেকে আপনার কন্সালটেশন ফি নিবেন না।

> আপনি কোন স্পেশালিটিতে কোন বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করবেন তা আগেই ঠিক করে রাখবেন। এক্ষেত্রে বিবেচনায় নিবেন আপনার চেম্বার থেকে নিকটতম দূরত্বে যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বসেন, আপনার মেডিকেলের শিক্ষক, আপনার মেডিকেলের সিনিয়র, আপনার ব্যাচমেট যার রোগীর সাথে ব্যবহার অত্যন্ত ভালো এবং যিনি আপনাকে রোগী দেখেছেন এমন একটি ফিডব্যাক দিবেন। যে রোগীকে রেফার করবেন তার প্রেসক্রিপশনে যতদূর সম্ভব বিস্তারিত রেফারাল লেটার লিখে দিবেন। সম্ভব হলে রোগী রেফার করার সময় রোগীর সামনেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে ফোন করে জানিয়ে দিবেন।

> অবশ্যই ফলোআপ অথবা পুরাতন রোগীকে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও গুরুত্বের সাথে চিকিৎসা প্রদান করবেন। কেন না মনে রাখবেন আরো অনেক চিকিৎসক থাকার পরও তিনি আপনার কাছে এসেছেন বিশ্বাস করে এবং আগে আপনার চিকিৎসাসেবা তার উপকার করেছে তাই।

> আমি মনে করি, প্রতিটি রোগীই ভবিষ্যৎ নতুন রোগীর উৎস। তাই সব রোগীকেই জিজ্ঞাসা করবেন তার পরিবারের আর কার কি কি উল্লেখযোগ্য অসুখ আছে এবং তারা কোথায় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করছে? দেখবেন আপনার রোগী নিজেই বলছে যে তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের আপনার কাছে নিয়ে আসবেন। এছাড়াও রোগী বিদায় দেয়ার সময় বলবেন নতুন রোগী পাঠানোর জন্য। আপনি দশজনকে বললে হয়তোবা পাঁচজনই নতুন রোগী পাঠাবে।

> একটা রোগী দেখার সময় যদি বাইরে কোন রোগী অপেক্ষমান না থাকে তবে সেই রোগীকে একটু তুলনামূলক বেশি সময় দিন। রোগীর পরিবারের সদস্যদের কথা জিজ্ঞাসা করুন। রোগীর সাথে একটি আন্তরিকতা মূলক সম্পর্ক তৈরি করুন। কিন্তু মনে রাখবেন কখনোই আপনার ব্যক্তিত্ব যেন হালকা না হয়ে যায়।

> সম্ভব হলে আপনার চেম্বারে একটি ভালো মানের ব্লাড সুগার মাপার মেশিন রাখবেন। কেননা অনেক ডায়াবেটিস রোগী আপনাকে দেখাতে এসে তৎক্ষণাৎ ব্লাড সুগার মাপতে চাইতে পারে।

> আপনার চেম্বারকালীন সময়ে যদি কোন নামাজের সময় হয় তবে রোগী না থাকলে নিকটস্থ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়বেন আর রোগী থাকলে সম্ভব হলে রোগীসহ চেম্বারেই নামাজ পড়বেন।

> কখনো রোগী বসিয়ে রেখে ঔষধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সময় দেবেন না।

> সম্ভব হলে চেম্বারে কোন ইমারজেন্সি রোগী দেখবেন না। যেমন: সাপে কাটা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, বিষ খাওয়া ইত্যাদি। কারণ, এইসব রোগী ম্যানেজ করার জন্য হাসপাতাল প্রয়োজন। রোগীর সাথে যে বা যারা থাকবে তাদেরকে সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলবেন যে এই রোগী হাসপাতলে ভর্তি করা অত্যন্ত প্রয়োজন, দ্রুত হাসপাতালে নিলে আমার থেকে ভালো সেবা পাবে।

> যদি আপনি কোনদিন আপনার চেম্বারে বসতে না পারেন তাহলে সম্ভব হলে আগে থেকেই আপনার একজন সহকর্মীকে অনুরোধ করবেন তিনি যেন সেদিন আপনার চেম্বারে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন। তাহলে কোন রোগী আপনার চেম্বারে এসে চিকিৎসা সেবা না পেয়ে ফেরত যাবেনা।

> যারা জিপি করেন তাদের মধ্যে অনেকেই হোম ভিজিটে যেতে চান না। আপনি আগে থেকেই ঠিক করে নিবেন যে আপনি হোম ভিজিটে যাবেন কি যাবেন না। যদি হোম ভিজিট যেতে হয় তবে চেম্বারকালীন সময়ে না গিয়ে চেম্বারে আগে অথবা পরে যেতে পারেন। হোম ভিজিটে গেলে অবশ্যই সাথে আপনার চেম্বারের সহকারীকে নিয়ে যাবেন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত