ডা. তাইফুর রহমান

ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


২৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০৬:২৭ পিএম
আপডেট: ২৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০৬:৫৬ পিএম

রোগীদের বিচিত্র ভাবনা: চিকিৎসকের অসহায়ত্ব

রোগীদের বিচিত্র ভাবনা: চিকিৎসকের অসহায়ত্ব

আপনারা চেম্বার না করলে শুক্রবারে মানুষ অসুস্থ হলে যাবে কোথায়? বেশ ভালোই খেদোক্তি করলো ভদ্রলোক।

ভাই আমরাওতো মানুষ, আমাদেরও শরির আছে, মন আছে, দুঃখ আছে, বেদনা আছে!

কে শুনে কার কথা! তার সোজা কথা তাইলে ডাক্তার হইছেন কেন?

হ্যা ভাই, জীবনের সব ভুলতো ওইখানেই কইরা ফেলছি।

মনে পড়ে, প্রথম যেদিন ইন্টার্নি ডাক্তার হিসেবে ডিউটি করি একটা ব্রটডেথ রোগী আসে। তার সবকিছু পরীক্ষা করে আমিই ডেথ ডিক্লেয়ার করেছিলাম। রাত দশটায় হোস্টেলে ফিরে মনে পড়লো মায়ের উপদেশ, মৃত মানুষ ধরলে গোসল করতে হয়। ঠাণ্ডা জলে এই শীতের রাতে কাঁপতে কাঁপতে গোসল করলাম। তারপর দিন জ্বর, উথাল-পাতাল জ্বর। কান ধরলাম, সবার জন্য সব নিয়ম না। বুঝলাম আমি কোনো সাধারণ মানুষ না!

সেদিন এক রোগীনী আমাকে জিজ্ঞেস করেন, এখানে ইকো করে কে? পুরুষ ডাক্তার নাকি মহিলা ডাক্তার?

আমি বললাম, হিজড়া ডাক্তার। ভদ্রমহিলা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে।

আমি জোরের সাথেই বললাম, দেখুন আমি ডাক্তার। আমি যখন ইকো করি তখন আমার মনেই থাকে না আমি পুরুষ না মহিলা। আমার কখনো মনেই হয় না আমি কোন মহিলার ইকো করছি। কখনো অনেক দ্বীনদার মহিলার ইকো করতে গেলে বলি, আপনার যেমন ইমান আছে, আমারও ইমান আছে। আল্লাহ আমাকেও দেখছেন। আল্লাহতো অন্তর্যামী।

মাঝে মাঝে ভাবি, ইমান ও ঈমানহীনতার দূরত্ব কয়েক মিলিমিটার মাত্র!

প্রায়ই শুনি ডাক্তাররা কত নির্দয়, মানুষ মারা যাচ্ছে আর তারা হাসে, বসে বসে খায়। মানুষের জীবন নিয়ে তারা খেলে, ধর্মঘট ডাকে!

আরে ভাই, যিনি কাফনের কাপড় বেঁচেন তারতো এই কাপড় থেকেই লাভ করতে হবে। এই কাপড় কাটতে গিয়ে কাঁদতে থাকলে তারতো চোখের জলই শুকাবে না।

কবর খোদককেতো কবর খুঁড়তে খুঁড়তে ক্লান্ত হয়ে কবরের পাশে বসেই খেতে হবে। কবর খুঁড়েই তার টাকা নিতে হবে, জীবিকা নির্বাহ করতে হবে।

তবুও যখন দেখি, ইকো করতে গেলে চেম্বারের রোগীগুলো বকে, চেম্বারে রোগী দেখতে থাকলে ইকোর রোগীগুলো বকে, স্বাভাবিকভাবেই তখন কষ্ট লাগে।

সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে রোগীরা বলেন, উনি বেড়াইতেছেন, রোগী দেখতে গেলে অনুষ্ঠানে আসা লোকজন বলেন ব্যবসা ভাই, ব্যবসা। ডাক্তাররা টাকা ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না।

আমরা আসলে কি করবো সেটা এক অনির্ধারিত নিয়তি। ভাবলেশহীন মানুষ হয়েও আমরা সামাজিক জীব। তবে বড় টানাটানির এ জীবন। মসজিদে গেলে পেন্ট টেনে টাখনুর উপড় তুলি, অফিসে গেলে টেনে টেনে নিচে নামাই, ইশ্ আরেকটু লম্বা হলে ভালো হতো।

আসলে দিনশেষে আমরাও মানুষ। মৃত্যু দেখে আমাদেরও মন ভারাক্রান্ত হয়, কান্না আসে। সেই কান্নার শব্দ কেউ শুনে না।

আমরাও গোধূলির আলোছায়া দেখে উদ্বেলিত হই, তিতাসের জল ছুঁয়ে উঠে আসা মৃদু বাতাসের ছোঁয়ায় আমরাও শান্ত হই। হৃদয় মনে খেলে যায় এক অ-প্রার্থিব অনুভূতি।

আজ গোধূলি লগ্নে বসে আছি খোলা জানালার পাশে
‘সন্ধ্যার ছায়া নামে এলোমেলো হাওয়া
ভালো লাগে জীবনের এই গান গাওয়া’। 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত