২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০৬:৪২ পিএম
আপডেট: ২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:৩৪ পিএম

বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ সেরেব্রাল পালসিতে আক্রান্ত: বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা

বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ সেরেব্রাল পালসিতে আক্রান্ত: বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা

তানভীর সিদ্দিকী: সারা বিশ্বে প্রায় এক কোটি ৭০ লক্ষের অধিক ব্যক্তি ও শিশু সেরেব্রাল পালসি (সিপি) রোগে আক্রান্ত। এছাড়াও এ রোগের সাথে বিভিন্নভাবে আরো প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ জড়িত রয়েছে। শিশু বয়সে সবচেয়ে বেশি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয় এই সিপি’র কারণে। এদের মধ্যে প্রতি চার জনের একজন কথা বলতে পারে না, প্রতি তিন জনের একজন চলাফেরা করতে পারে না, প্রতি দুই জনের একজনের মধ্যে বুদ্ধিহীনতা দেখা দেয় অধিকন্তু প্রতি চার জনের একজন সিপি’র পাশাপাশি এপিলেপসি (মৃগী) রোগে আক্রান্ত হয়।

বুধবার (২৩ অক্টোবর) বিশ্ব সেরেব্রাল পালসি দিবস-২০১৯ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিজঅর্ডার এন্ড অটিজম (ইপনা)’র এফ ব্লকে আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সেমিনার ও ফ্রি সেরিব্রাল পালসি ক্যাম্পে বক্তারা এসব তথ্য জানান।

সেরিব্রাল পালসি সেবা ক্যাম্প ও চিকিৎসকবৃন্দ-রেসিডেন্ট শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে শুভ উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া। সেমিনারে বক্তারা “হলিস্টিক এপ্রোচ টু সেরিব্রাল পালসি শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন। এছাড়াও সেরিব্রাল পালসি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা এবং বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনায় অংশ নেন বিভিন্ন শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞগণ।

বক্তারা বলেন, সেরিব্রাল পালসি জীবনব্যাপী সমস্যা। এটি মস্তিস্কের একটি স্থায়ী বা নন-প্রগ্রেসিভ ধরণের স্নায়ুবিক ভারসাম্যহীনতা যা গর্ভাবস্থায় অথবা জন্ম পরবর্তীকালে শিশুদের মস্তিস্ক গঠনের সময়ে কোন প্রকার আঘাতজনিত কারণে হয়ে থাকে। এ রোগের লক্ষণসমূহ হলো সাধারণভাবে হাত পায়ের মাংসপেশী অসাড় হয়ে যাওয়া, চলাফেরা করতে না পারা অস্থির কিংবা টলমল অবস্থায় হাঁটা সঠিকভাবে পা ফেলতে না পারা, কথা বলতে কষ্ট হওয়া, হাত দিয়ে কোন কিছু তুলতে না পারা, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কম্পন হতে থাকা, কোন খাবার সহজে গিলতে না পারা চোখের পেশির ভারসাম্যহীনতার কারণে নির্দিষ্ট দিকে দৃষ্টিপাত করতে না পারা, দাঁতের সমস্যা ইত্যাদি। এছাড়াও এর সাথে সাথে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা দেখা দিতে পারে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিক গুণাবলী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য কন্যা, চাইল্ড সাইকোলজিস্ট জনাব সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের অবদানের কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে “ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিজঅর্ডার এন্ড অটিজম (ইপনা) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, অতিদরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ পর্যন্ত তিনবারে মোট ২০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। বর্তমানে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রত্যেক দরিদ্র রোগী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমান বলেন, নিউরো ডিসঅর্ডারসহ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের উন্নত চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে। তবে এই রোগ ও সমস্যা আগেভাগে চিহ্নিত হলে এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা দেয়া গেলে তাদেরকে অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব।

সভাপতির বক্তব্যে ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিজঅর্ডার এন্ড অটিজমের (ইপনা) পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহীন আকতার বলেন, অটিজম ছাড়াও প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষার জন্য বর্তমান সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ইপনার বহির্বিভাগে আসা রোগীদের এক-তৃতীয়াংশ রোগীই সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো লেটস মুভ এ্যাস ওয়ান অর্থাৎ সকলে মিলে এক সাথে সেরিব্রাল পালসিকে মোকাবিলা করতে হবে। চিকিৎসক, থেরাপিস্টসহ সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে সেরিব্রাল পালসিকে প্রতিরোধ ও মোকাবেলা করতে হবে।

সেমিনারে সেরিব্রাল পালসির কারণসমূহ সম্পর্কে বলা হয়, জন্মকালীন সময়ে মস্তিস্কে অক্সিজেনের সরবরাহ কম হলে বা কমে গেলে শিশুর মস্তিস্ক ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে, গর্ভকালীন মায়ের জীবানু ঘটিত কোন সংক্রমণ হলে তা গর্ভের সন্তানকে আক্রান্ত করতে পারে এবং মস্তিস্কের গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে, জন্ম পূর্ব অথবা পরবর্তী সময়ে শিশুর মস্তিস্কে সংক্রমণ হলে, গর্ভকালীন সময়ে শিশু মস্তিস্কে আঘাত প্রাপ্ত হলে, কোনো কারণে কিংবা কোন দুর্ঘটনায় শিশু অপরিণত বয়সে মাথায় আঘাত পেলে মস্তিস্ক ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে, অপরিণত বয়সে শিশু জন্মগ্রহণ করলে, নবজাতকের বেশিমাত্রায় জন্ডিস হলে, কোষের অভ্যন্তরে অবস্থিত মানব বৈশিষ্ট্যের ধারক জিনের পরিবর্তন (মিউটেশন) সংগঠিত হলে মস্তিস্কের অস্বাভাবিক গঠন দেখা দিতে পারে।

সেমিনারে আরো বলা হয়, এই রোগ নির্ণয়ে প্রাথমিকভাবে কোনো শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ শিশুর লক্ষণসমূহ ও তার জন্ম ইতিহাস বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে সিপি আক্রান্ত কিনা তা সনাক্ত করতে পারেন। এক বা একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সিপি’র কারণ, সমস্যার গভীরতা ও পরবর্তী জটিলতাসমূহ সনাক্ত করা যায়। যেমন- এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ক্রেনিয়াল আল্ট্রাসাউন্ড, ইলেক্টোএনসেফালোগ্রাম বা ইইজি ইত্যাদি।

এর চিকিৎসা হলো, সিপি আক্রান্ত শিশুদের বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টীমের অধীনে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন। শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, অর্থপেডিক সার্জন, সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট, থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ এন্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট, ডেভলপমেন্টাল থেরাপিস্ট, স্পেশাল এডুকেশন টিচার, সমাজ কর্মী সমন্বয়ে এই টীম গঠিত হয়ে থাকে। প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি প্রতিরোধ করা যায় না, তবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কিছু কিছু পদক্ষেপ নিলে গর্ভবতী মা অথবা গর্ভধারণে ইচ্ছুক মহিলা এ ধরণের জটিলতাকে কমিয়ে আনতে পারেন।

সেমিনারে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোজাফফর আহমেদ, ইপনার ডেপুটি ডিরেক্টর (শিক্ষা) সহযোগী অধ্যাপক ডা. কানিজ ফাতেমা প্রমূখ। সঞ্চালনা করেন উপ-পরিচালক (প্রশাসন) সহযোগী অধ্যাপক ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত