গোলাম মাহাদি হাসান

গোলাম মাহাদি হাসান

শিক্ষার্থী, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ


১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০১:৫৭ পিএম
আপডেট: ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০২:০১ পিএম

কে দালাল, কারা টেস্টে ভুল রিপোর্ট দিচ্ছে তাদের চিহ্নিত জরুরি

কে দালাল, কারা টেস্টে ভুল রিপোর্ট দিচ্ছে তাদের চিহ্নিত জরুরি

রোগীর শারীরিক অবস্থা ভালো না। আইসিইউতে ভর্তি। লড়াই চলছে জমের সাথে ডাক্তারের। মাঝখানে ভুক্তভোগী রোগীর জ্ঞান ফিরেনি এখনো। নরোগীর অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করার লক্ষ্যে, কিছু টেস্ট আর্জেন্টলি কর‍তে দেয়া হলো।

দালালের পাল্লায় পড়ে তারা অনেকগুলো টাকা খরচা করে টেস্টগুলো করালেন দিনাজপুরেরই একটি অখ্যাত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। যেখানে উল্লেখ করা আছে, রোগীর শরীরে শ্বেত রক্তকণিকা ১০,৮০০/ঘন. মি.মি ব্লাডে (যা স্বাভাবিকই আছে), তারপর অণুচক্রিকার সংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার (যাও কিনা স্বাভাবিক), তবে রক্তে হিমোগ্লোবিনের লেভেল কম এবং পাশাপাশি রক্তে ই.এস.আর দেখানো হয়েছে ১২০ মি.মি. (১ম রিপোর্টে দ্রষ্টব্য)
.
রোগীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্লাড দেয়ার পরেও, ইনফেকশনের জন্যে এন্টিবায়োটিক দেয়া শুরু করলেও দেখা যাচ্ছে বাহ্যত রোগীর কোনো উন্নতিই হচ্ছে না। মাঝখান থেকে রোগীর এই ওষুধ, ওই ওষুধ (এখানেও আছে কতগুলো ফার্মেসি থেকে নিয়োগকৃত দালালের প্ররোচনা, এই ব্যাপারে অন্য আরেকদিন বলবো); আর এই টেস্ট, সেই টেস্ট সব করানোর পর রোগীর হাতে মোটামুটি টাকার পরিমাণ শূন্য! কী করা যায় এখন?

...অগত্যা, সিনিয়র স্যার আর মিড লেভেলের স্যাররা মিলে দামী দামী সব এন্টিবায়োটিকের (একেকটা ইঞ্জেকশন প্রায় ১২০০ টাকা করে; সপ্তাহে প্রায় ১৮-২০ হাজার টাকার মামলা) দাম পরিশোধ করে নিজেরাই রোগীকে ম্যানেজ করে দিচ্ছিলেন ওষুধ। 
.
এক সপ্তাহ পরেও, ইনফেকশনের জন্যে (সেনসেটিভ এন্টিবায়োটিকই দেয়া হয়েছে রোগীকে) এন্টিবায়োটিক, আর রক্তশূন্যতার জন্যে রক্ত জোগাড় (যা কিনা দায়িত্ব নিয়ে করেছে এই মেডিকেল পড়ুয়া শিক্ষার্থীগুলোই!) করে দেবার পরেও রোগীর খুব একটা উন্নতি হচ্ছিলো না দেখে স্যারদের মনে খটকা লাগলো। আবারও চেক করলেন আগের সব রিপোর্টগুলো। 

রিপোর্ট অনুযায়ী দেখানো সমস্যা পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেবার পরেও যখন সমাধান হচ্ছিল না, তখন স্যাররা আবারো টেস্টগুলো রিপিট করতে বললেন রোগীর ছেলেকে। ছেলেটির তৎক্ষণাৎ জবাব ছিলো- "স্যার, কয়েকদিন আগেও না এই টেস্টগুলা অনেক টাকা খরচ করে করালাম৷ এগুলো কেন আবার দেবেন? বাবাকে সুস্থ না করতে পারলে বলেন, বাড়ি নিয়ে যাই। আমরা এতো এতো টেস্ট করাতে পারবো না!"

...এর মানেটা কী দাঁড়ায়? এই যে, আমরা যে রোগীটার পেছনে এতো খাটনি করলাম, নিজেরা সবগুলো এন্টিবায়োটিক ম্যানেজ করে দিলাম- আমাদের এতো সব প্রচেষ্টাই কি তবে মিথ্যে হয়ে গেলো না-তার এই একটি কথায়?
.
তারপর স্যার নিজে উপস্থিত থেকে, নিজের টাকায় আবারো দিনাজপুরের ভালো, পরিচিত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে দিয়ে টেস্টগুলো রিপিট করালেন। এবং এতে দেখা গেলো (২য় রিপোর্টে দ্রষ্টব্য)- রোগীর শরীরে শ্বেত রক্তকণিকা প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার! স্বাভাবিকের চাইতেও প্রায় ১০ গুণ বেশি! তারপর অণুচক্রিকা সংখ্যা কমে কমে এসে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার! মাত্র!!

এই টেস্ট থেকে মোটামুটি ধারণা করা যাচ্ছে, রোগীর লিউকেমিয়া (ব্লাড ক্যান্সার) হয়েছে। যা শিউর করতে বোন ম্যারু টেস্টের প্রয়োজন। শুধুমাত্র হসপিটালের প্রতিটি আনাচে কানাচে এই দালাল চক্রের কবলে পড়ে হাজারো মানুষ চিকিৎসা নিতে এসে হচ্ছে প্রতারিত। রোগীদের এই প্রতারণার হাত থেকে রক্ষার মানসিকতা থেকেই, আমরা কখনো কখনো রোগীর লোককে ভালো কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম বলতাম। দরিদ্র মানুষ হলে ৪০-৫০% পর্যন্ত দাম কম রাখার জন্যে লিখে দিতাম। কিছু মানুষ এই নিয়ে কিছু বলেনি। আর কিছু মানুষ শুনিয়েছেন- "স্যার, এই টেস্টগুলা করালে আপনারা কত করে পান?"

ফলশ্রুতিতে, এখন আর কিছুই বলি না রোগীর লোকদের। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি- বোকা মানুষগুলো কিছু অতি ধূর্ত মানুষের হাতে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হয়ে যাচ্ছেন; শুধুমাত্র অতীতে কিছু মানুষকে এমন প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করার বাসনায় উপকার করতে চেয়ে যখন নিন্দিতই হলাম সেই মানুষের ভাষায় বা দৃষ্টিতে, তখন নতুন করে আর কাউকে তাই ভালো করতে চেয়ে নিন্দিত হতে চাই না আমরা।
.
ভালো হয়, যদি আপনারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই ব্যাপারগুলোয় সচেতন হোন। কে দালাল, কে আপনাদের সাথে ব্যবসা করছে- যতদিন না নিজেরা এগুলো বুঝতে পারবেন... ততদিন এমন ভুল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা দেয়া ভিন্ন আমাদেরও আর কিছুই করার থাকবে না৷
.
(বিঃদ্রঃ ডায়াগনস্টিক সেন্টার দু'টোর নাম কেটে দেয়া হয়েছে ছবি দু'টো থেকেই। পাছে না, এখনি আবার ভেবে বসেন- আমিই ২য় রিপোর্ট করানো ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন পেয়ে এই লিখা লিখছি!! এই কম বুদ্ধির মানুষের দেশে বিশেষ দ্রষ্টব্যের মতো করে ভাবার লোকের তো অভাব নেই!

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত