১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০৩:৫১ পিএম
আপডেট: ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০২:২৩ এএম

চিকিৎসায় প্রতি বছর বিদেশে চলে যাচ্ছে ৪০০ কোটি ডলার

চিকিৎসায় প্রতি বছর বিদেশে চলে যাচ্ছে ৪০০ কোটি ডলার

মেডিভয়েস ডেস্ক: বাংলাদেশ থেকে বিদেশগামী রোগীর সংখ্যা দিন দিন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ‍ও যুক্তরাষ্ট্র বাদেই শুধু ভারতেই পাড়ি দিচ্ছেন বছরে ২ লাখ ৩৫ হাজার বাংলাদেশী রোগী। এর বাইরেও অন্যান্য দেশ মিলিয়ে বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এভাবে বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের প্রায় ৪০০ কোটি ডলার অর্থ দেশের বাহিরে চলে যাচ্ছে।

১৮ অক্টোবর (শুক্রবার) দেশের অন্যতম বিজনেস পত্রিকা ‘দৈনিক বণিক বার্তা’য় প্রকাশিত এক সংবাদে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংবাদে বলা হয়েছে, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর কতসংখ্যক রোগী বাইরে যান, বছর পাঁচেক আগে সেই হিসাব করেছিল বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এ বাবদ কী পরিমাণ অর্থের বহির্গমন ঘটে, তার একটি আনুমানিক হিসাবও করেছিল সংস্থাটি। হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ সালেই চিকিৎসা বাবদ দেশের বাইরে গিয়েছিল ২০৪ কোটি ডলার। ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে ১ লাখ ২৮ হাজার বাংলাদেশী রোগীর চিকিৎসায় এ অর্থ ব্যয় হয়েছিল। বর্তমানে এ বাবদ ব্যয় হচ্ছে আনুমানিক ৪০০ কোটি ডলার। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সীমান্তবর্তী লোকজন ছোটখাটো রোগের চিকিৎসায়ও ভারতমুখী হচ্ছেন। রোগ একটু জটিল হলে দেশের সব প্রান্ত থেকেই নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ভারত যাচ্ছেন। মধ্য ও উচ্চবিত্তরা যাচ্ছেন থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায়। তবে সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন কেবল উচ্চবিত্তরাই। আর অতি ধনীরা চিকিৎসা নিতে পাড়ি দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশে। সব গন্তব্যেই বাড়ছে বাংলাদেশী চিকিৎসাগ্রহীতার সংখ্যা।

আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের (ইওয়াই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া রোগীদের ৬২ শতাংশই অসংক্রামক নানা ব্যাধির (এনসিডি) চিকিৎসার উদ্দেশ্যে মেডিকেল ট্যুরিস্ট ভিসা নিচ্ছেন। সংক্রামক, মাতৃত্ব, নবজাতক ও পুষ্টির অভাবজনিত বিভিন্ন রোগের (সিএমএনএনডি) চিকিৎসা নিতে ভারতে যাচ্ছেন ২৯ শতাংশ রোগী। আঘাতের চিকিৎসায় ভারতে যাওয়া রোগী ৮ শতাংশ। বাকিরা অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় দেশটিতে যান।

২০১৭ সালে চিকিৎসা ভিসায় (এম-ভিসা) দেশটিতে যান ২ লাখ ২১ হাজার ৭৫১ জন বাংলাদেশী, যা তার আগের বছরের চেয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ বেশি। বৃদ্ধির এ হার বিবেচনায় নিলেও গত বছর শুধু এম-ভিসায় ভারত গেছেন ২ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশী। আরো বেশিসংখ্যক বাংলাদেশী রোগী আকর্ষণে ভিসা প্রাপ্তি সহজ করেছে দেশটি। এছাড়া কোনো নাগরিক ভারতে থাকাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তির জন্য প্রাথমিক ভিসা এখন থেকে আর মেডিকেল ভিসায় রূপান্তরের প্রয়োজন পড়বে না। আগে থেকেই আক্রান্ত এমন রোগের (অঙ্গ প্রতিস্থাপন ছাড়া) ইনডোর মেডিকেল ট্রিটমেন্ট প্রাথমিক ভিসাতেই করানো যাবে। এর ফলে ভারতে বাংলাদেশীদের চিকিৎসা গ্রহণ আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়াও থাইল্যান্ডে বাংলাদেশী রোগীরা বেশি চিকিৎসা নেন সুমিতাভেজ, বামরুনগ্রাদ ও ব্যাংকক হাসপাতালে। এসব হাসপাতালে গড়ে গল ব্লাডারস্টোন অস্ত্রোপচারে ৮ হাজার ২৬৫ ডলার (৭ লাখ টাকা), হার্ট বাইপাস সার্জারিতে ১৫ হাজার ডলার (১২ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টাকা), হার্ট ভাল্ব রিপ্লেসমেন্ট ১৭ হাজার ২০০ ডলার (১৪ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬০ টাকা), গ্যাস্ট্রিক বাইপাস ১৬ হাজার ৮০০ ডলার (১৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০ টাকা) এবং মস্তিষ্কের জটিল অস্ত্রোপচারে ৫৯ হাজার ৭০৮ ডলার (৫০ লাখ টাকা) খরচ হয়। বাংলাদেশ থেকে মূলত হূদরোগ, ক্যান্সার ও নিউরোলজি রোগীরা থাইল্যান্ডে বেশি যান। ইনফার্টিলিটির চিকিৎসায়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশী দেশটিতে যাচ্ছেন। থাইল্যান্ডে চিকিৎসা বাবদ বাংলাদেশীদের খরচ হচ্ছে বছরে শতকোটি ডলারের মতো।

তবে উচ্চবিত্ত পরিবারের রোগীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। গত বছর দেশটিতে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৫ হাজার বাংলাদেশী। সিঙ্গাপুরে যাওয়া রোগীদের বেশির ভাগ চিকিৎসা নিয়েছেন ক্যান্সার, হার্ট ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের। দেশটিতে করোনারি এনজিওপ্লাস্টিতে ১৩ হাজার ৪০০ ডলার, হার্ট বাইপাস ১৭ হাজার ২০০ ডলার, গ্যাস্ট্রিক বাইপাস ১৩ হাজার ৯০০ ডলার ও হিস্টারেকটমিতে ১০ হাজার ৪০০ ডলার খরচ হয়।

এ ব্যাপারে মেডিকেল ট্যুরিজম ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান মেডিএইডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাব্বির আহমাদ তানিম বলেন, চিকিৎসা খরচ বাবদ নিয়ম অনুযায়ী কী পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে নেয়া যাবে, তার ঘোষণা দিতে হয় নাগরিকদের। তবে এক্ষেত্রেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে। অনেকেই মূল খরচের চেয়ে কম পরিমাণ অর্থ উল্লেখ করে। আর উল্লেখ না করা এ অর্থের বেশির ভাগ দেশের বাইরে যায় নানা অবৈধ উপায়ে। ফলে চিকিৎসা বাবদ কী পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট বিভাগের অধ্যাপক ও পরিচালক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় এমনিতেই বেশি। তার ওপর আবার বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। বিদেশনির্ভরতার কারণে যে ব্যয় বাড়ছে, তা রাশ টেনে ধরতে না পারলে এবং পুরো স্বাস্থ্য খাতকে শৃঙ্খলায় না আনা গেলে ভবিষ্যতে দেশের চিকিৎসাসেবা কাঠামো বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত