ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।


১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০৯:৩৩ এএম
আপডেট: ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০৯:৩৭ এএম

লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা: রক্তের চর্বি কমাতে করণীয়

লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা: রক্তের চর্বি কমাতে করণীয়

আজকাল অনেক রোগীকে চিকিৎসকগণ অন্যান্য পরীক্ষার সাথে লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষাটা করাতে বলেন। এটা রক্তের পরীক্ষা। এটা কেন করা হয় তা নিয়ে অনেকেরই ধারণা নেই। তাই, এ সম্পর্কে কিছুটা ধারনা দেয়ার চেষ্টা করব।

কোলেস্টেরল এক ধরনের চর্বি। শরীরে এটি বেড়ে গেলে বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়। কোলেস্টেরল কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। যেমন, ট্রাইগ্লিসারাইড, এলডিএল, এইচডিএল এবং টোটাল কোলেস্টেরল। এর মধ্যে এইচডিএল হলো উপকারী। অন্য তিনটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

কোলেস্টেরল বেশী হলে রক্তনালিতে জমা হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় এথেরোসক্লেরোসিস। এটি হুক্কার কাইয়ের মতো। যারা হুক্কা দেখেছেন তারা কাই কী বুঝতে পেরেছেন। হুক্কার ধুয়া থেকে ময়লা জমা হয় হুক্কার লইচ্চায়। লইচ্চা মাঝে মাঝে শিক ঢুকিয়ে পরিস্কার করে দিতে হয়। না হলে লইচ্চার নল সরু হয়ে বন্ধ হতে থাকে। যেসব মেয়েরা হুক্কা দেখেন নাই তাদের জন্য উদাহরণ দেয়া যায় রান্নাঘরের সিংকের পাইপের সাথে। সিংকে তৈলাক্ত জিনিসপত্র ধোয়ামুছা করলে পাইপে চর্বি জমে পাইপ বন্ধ হয়ে যায়। গরম পানি ঢেলে ব্রাশ দিয়ে সেই তেল ছাড়ানো হয়। তদ্রুপ রক্তনালীর গায়ে কোলেস্টেরল জমে জমে এথেরোসক্লেরোসিস হয়ে রক্তনালির স্বাভাবিক যে রক্তস্রোত তা বাধাগ্রস্ত হয়। এভাবে হার্টের রক্তনালী আক্রান্ত হলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ব্রেইনের রক্তনালী আক্রান্ত হলে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাতে হাত পা প্যারালাইজড হবার সম্ভাবনা থাকে। পায়ের রক্তনালী আক্রান্ত হলে পায়ের আঙ্গুলে পচন ধরার ঝুঁকি থাকে।

রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যাবার অনেক কারণ আছে। প্রথমত, আমাদের খাদ্যাভ্যাসের কারণে। বেশি শুয়ে বসে থাকার কারণে। কিছু অভ্যাস আছে যেমন- ধূমপান, মদ্যপান, জর্দা সেবন এসব কারণেও হয়। আর কিছু রোগ রয়েছে এটার জন্য দায়ী যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ইত্যাদি। আর কিছু ওষুধ আছে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

স্টেরয়েড এবং হাইড্রোকোথায়াজাইড ওষুধ রোগকে বাড়িয়ে দেয়।

কোলেস্টেরল বাড়লে যেমন ক্ষতিকর আবার তেমন উপকারী কোলেস্টেরলও আছে। সেটা হলো এইচডিএল। এটা শরীরের অন্যান্য অঙ্গ থেকে কোলেস্টেরল সংগ্রহ করে লিভারে নিয়ে যায়। পরে লিভার দিয়ে এটা বেড়িয়ে যায়। তাই এইচডিএল বাড়লে আমাদের জন্য উপকারী। যদি কারো ওজন বাড়তে থাকে তবে তার এইচডিএল কমে যেতে থাকে । ডায়াবেটিস হলেও এইচডিএল কমে যেতে পারে। নিয়মিত হাঁটায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখায়, মাছ বেশি খাওয়ায় শরীরের জন্য উপকারী কোলেস্টেরল বাড়ে। যে কারণে অপকারী কোলেস্টেরল বেড়ে যায়, সেই কারণেই উপকারী কোলেস্টেরল কমে যায়।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায় হলো আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। বিশেষ করে লাল মাংস, খাসির মাংস, গরুর মাংস এগুলো এড়িয়ে যেতে হবে। শাক-সবজি এবং মাছ বেশি করে খেতে হবে। আর নিয়মিত হাঁটতে হবে। ডায়াবেটিস অথবা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর খারাপ অভ্যাস যেমন ধূমপান এবং মদ্যপান এড়িয়ে চলতে হবে।

ভালো কোলেস্টেরল কমে গেলে এবং মন্দ কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে আমরা বলি ডিজলিপিডিমিয়া। এই অবস্থায় নিয়মিত চেকআপের প্রয়োজন আছে। আমরা অনেক সময় বলি ফাস্টিং লিপিড প্রোফাইল। আট ঘণ্টা খালি পেট থেকে এরপর লিপিড প্রোফাইল চেক করতে হবে। তাতে সঠিক রেজাল্ট আসবে। তিন থেকে ছয় মাস পরপর এটা করতে হবে।

আর যাদের ডিজলিপিডিমিয়া নেই, সে যদি রোগটি বাড়তে দিতে না চায় তার জন্য পরামর্শ হলো স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া। যেমন, শাকসবজি এবং মাছ বেশি করে খেতে হবে। গরুর মাংস, খাসির মাংস এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। ধূমপান এবং মদ্যপান ত্যাগ করতে হবে। এভাবেই সে ভালো থাকতে পারবে। এরপরও যদি বংশগত কারণে যাদের কোলেস্টেরল বেড়ে যায় তাদের ওষুধ খেতে হবে।

কেউ কেউ লিপিড প্রোফাইলের রেজাল্ট পড়ে বুঝতে চান। লিপিড প্রোফাইল হলো বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষা। এই পরীক্ষার রিপোর্টে প্রথমে থাকে পরীক্ষার নাম, তারপর থাকে রেজাল্ট এবং শেষে থাকে রেফারেন্স ভেলু বা নর্মাল ভেলু। কম থাকতে হবে, ইংরেজিতে বলে লেজ দ্যান। চিহ্ন দেয়া হয় < এই ভাবে। যদি লিখা থাকে < 200 mg/dl অর্থাৎ প্রতি ডেসিলিটারে ২০০ মিলিগ্রামের কম থাকতে হবে। অনুরূপ, > 35 mg/dl অর্থাৎ প্রতি ডেসিলিটারে ৩৫ মিলিগ্রামের বেশী থাকতে হবে।

যেহেতু রিপোর্টে নরমাল ভেলু বা রেফারেন্স ভেলু লিখা থাকে সেহেতু সাধারনের জন্য লিপিড প্রোফাইলের নরমাল ভেলু মুখস্থ করার প্রয়োজন মনে করি না। যখন রিপোর্ট পান রেজাল্টের সাথে নরমাল ভেলু মিলিয়ে দেখবেন ঠিক আছে কিনা। রক্তের চর্বি কমানোর জন্য লিপিড লোয়ারিং ড্রাগ বা ট্যাবলেট আছে। অন্য রোগীর দেখাদেখি বা নিজের বুদ্ধিতে এইসব ওষুধ খাবেন না। ডিজলিপিডিমিয়া হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন।

শুনে শুনে জ্ঞান অর্জনের একটা কৌতুক বলে শেষ করতে চাই। একদিন আবহাওয়া খুব গরম ছিল। বাইরের থেকে ঘরের ভিতর আরো বেশী গরম ছিলো। বাসায় এক পিচ্চি মেয়ে ছিলো। মেয়েটার আন্টি বাইরে থেকে ঘরে ঢুকেই বলল গরম অনুভব করে বলে উঠলো "ও মাই গড!" পিচ্চি মনে করলো গরমের ইংলিশ হলো "ও মাই গড।" এরপর থেকে যখনই বেশী গরম লাগে তখনই বলে "ও মাই গড।" তার আব্বু জিজ্ঞেস করেন "তুমি এত ঘনঘন ও মাই গড বলো কেন?" পিচ্চি বলে "ও মাই গড মানে হলো ইস কি গরম!"

- কার কাছে শিখেছ, মামনি?

- আন্টি বলেছে।

তেমনি আরেকটি ঘটনা বলি। এক স্থুলকায় মেয়ে তার আন্টিকে ডায়াবেটিসের ওষুধ খেতে দেখে নিজেও ডায়াবেটিসের ওষুধ খেয়েছিল। কারণ, তার আন্টিও তার মতো স্থুলকায় ছিলেন। সে মনে করেছিল ওষুধটি চর্বি কমানোর জন্যই। কাজেই, স্থুলকায় হলেই ডায়াবেটিস নয়। আবার ডায়াবেটিস হলেই স্থুলকায় নয়। ওষুধ খেতে হবে ডাক্তারের পরামর্শে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত