১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০৫:৪৭ পিএম
আপডেট: ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০৭:৪৪ পিএম

আলো ছড়াচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদ

আলো ছড়াচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদ

মো. মনির উদ্দিন: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে গত ১০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচিত ছাত্র সংসদের উদ্যোগে কলেজে একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য লাইব্রেরি ও বোন্স লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ছাত্র সংসদের এসব সৃষ্টিশীল কার্যক্রমে উপকৃত হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরাই। চমেক ছাত্র সংসদের বিভিন্ন কার্যক্রমের কারণে পড়াশোনার মানোন্নয়নে বেশ কিছু ইতিবাচক কাজ হয়েছে।

মেডিভয়েসের পক্ষ থেকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের দৃশ্যমান নানা কার্যক্রম। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জীবন দেওয়া শহীদ মিলনের নামে মিলন মুক্তমঞ্চ স্থাপন করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা জানান, ডাইনিংয়ের সংস্কার ও খাবারের মানও উন্নত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ক্যাম্পাস থেকে হলে যাওয়ার পথে আলোকশয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম বোন্স লাইব্রেরি

ছাত্র সংসদের উদ্যোগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম বোন্স লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়েছে। এ লাইব্রেরিটি এখন অনেকটাই সমৃদ্ধ। বর্তমানে লাইব্রেরিতে অর্ধশতাধিক বোন্স সেট আছে। ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

তবে উন্মুক্ত থাকা সত্ত্বেও ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অন্য কোনো সংগঠনের প্রতিনিধি অংশ নেয়নি। এতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মনোনীত পূর্ণ প্যানেল বরাবরই নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে আসছে।  

চমেক ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি ডা. ওয়াসিম সাজ্জাত রানা মেডিভয়েসকে বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদ সারা বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অন্যতম নজির। চমেসুর একটি বোন্স লাইব্রেরি স্থাপন করে, যা বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম।

তার দাবি, চমেসুর এ রকম উন্নয়নমূলক কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।  

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ১০-১৫ বছর আগে কোনো রাজনৈতিক দলেরই অস্তিত্ব ছিল না উল্লেখ করে ডা. রানা আরও বলেন, ‘চমেকের অডিটরিয়াম দশ বছর তালাবদ্ধ ছিল। নবীন বরণের জন্য বছরে একবার খোলা হতো। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা তুলনামূলক কঠিন, এর মাঝখানে একটু বিনোদন ও প্রশান্তি দরকার। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ছাত্র সংসদের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের জন্য মেডিকেলের পড়াশোনার বাইরে জ্ঞান চর্চা নিশ্চিতের লক্ষ্যে একটি সাহিত্য লাইব্রেরি, অবসর সময় কাটানোর জন্য ইনডোর রুম করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভালোভাবে জানার জন্য ইনডোর রুমে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের আলোকে একটি ফটো গ্যালারি করা হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছে।’

ছাত্র সংসদ সূত্র জানায়, নির্বাচন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও অন্য কোনো ছাত্র সংগঠন এতে অংশ নেয়নি। ফলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মনোনীত পূর্ণ প্যানেল পূর্ণ প্যানেল বরাবরই নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে।

তবে বর্তমান ছাত্র সংসদের নেতারা চান আগামী ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সব দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করুক।

এ ব্যাপারে ডা. ওয়াসিম সাজ্জাত রানা বলেন, ‘এমন যদি হয়, নিজেদের অবস্থার কারণে বা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য বর্তমানে দাঁড়িয়ে নির্বাচন করতে ভয় পায়, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। এমনও হতে পারে আমাদের ভালো কাজ দেখে তারা পিছপা হয়ে যান। তারপরও তাদেরকে স্বাগত জানাবো, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য।’    

ছাত্র সংসদ কিভাবে ভূমিকা রাখছে জানতে চাইলে সদ্য সাবেক ভিপি ডা. জামিউর রহমান আকাশ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের জীবনধারাকে আরও সহজতর করা, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে ক্যাম্পাসে সুন্দর একটি পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সংসদ কাজ করে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে একাডেমেডিকেলি মেধা-মননের উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের একঘেয়েমি দূর করার জন্য বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক কাজগুলো এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়। ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায়ও খুব ভালোভাবে মনোযোগ দিতে পারে।

পড়াশোনা ও ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব—এ দুইয়ের মধ্যে কিভাবে সমন্বয় করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. আকাশ বলেন, ‘ক্লাসে অংশ নেওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ে আমরা ছাত্র সংসদের কাজগুলো গতিশীল করি। আসলে কোনো একটি কাজে ব্যস্ত থাকলে শরীর মন সবই সুস্থ থাকে। এ কারণে কাজ এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে খুব একটা সমস্যা হয় না। দিনের বিভিন্ন সময় নানা অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় অপচয় হয়ে যায়, অপচয় না করে আমরা ছাত্র সংসদের জন্য কাজ করি।’

নিজের মেয়াদে ছাত্র সংসদের উদ্যোগে সম্পাদিত বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ সময়ে লেকাচার গ্যালারিগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে।  প্রধান ছাত্রাবাসের ডাইনিংয়ের উন্নয়ন সাধন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যাধুনিক স্টুডেন্ট ওয়ার্ড করা হয়েছে। অসুস্থ হলে যেখানে একজন স্টুডেন্ট ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে পারে। চট্টশী রোডে মেডিকেল কলেজের হোস্টেলটি প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো।  ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে নতুন হোস্টেলের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ছাত্রীদের হোস্টেল কান্তা ছাত্রী নিবাসের ডায়নিংয়ের উন্নতি সাধন করা হয়েছে। ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে একটি বৃত্তি চালু হয়েছে, যা এ বছর দুইজন মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয়েছে।’

মেডিকেলের লাইব্রেরিটিতে আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিরা বলেন, পৃথিবী ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে বিভিন্ন রিসার্চ ওয়ার্কে স্টুডেন্টদেরকে যুক্ত করতে হবে, যাতে তারা বিভিন্ন রিসার্চ ওয়ার্কগুলোতে কাজ করার সুযোগ পায়।

মেডিকেলগুলোতে ছাত্র সংসদ গঠনের পরামর্শ

অন্যান্য মেডিকেলে এ রকম ছাত্র সংসদ হলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে উল্লেখ করে সাবেক ভিপি ডা. আকাশ বলেন, ‘আমাদের মেডিকেলের সর্বোচ্চ গভর্নিং বডি হচ্ছে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল, ছাত্র সংসদের ভিপি ও জিএস এ বডির সম্মানিত সদস্য। এ সুবাদে ছাত্রদের অধিকার আদায়ে খুব বলিষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারি। ছাত্রদের যে কোনো দাবি-দাওয়া অ্যাডামেকি কাউন্সিলের মিটিংয়ে উপস্থাপন করতে পারি। আমার ধারণা, ছাত্র সংসদ হলে প্রত্যেকটা ক্যাম্পাসই এ রকম ছাত্রবান্ধব হবে। প্রতিটি ক্যাম্পাসেই ছাত্রবান্ধব কাজগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে এবং ছাত্র রাজনীতিতে গতি আসবে।’

চমেক অধ্যক্ষের বক্তব্য

ছাত্র সংসদের নানা রকম ইতিবাচক কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মাদ জাহাঙ্গীর মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এটি আমাদের সবার প্রচেষ্টার আরেকটি অর্জন। আমি এখানে দশ বছর ধরে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের মনে হয়েছে, ছাত্র সংসদ শুধুমাত্র সংসদ নয়, একটি শিক্ষকদের সমপর্যায়ের। অ্যাকাডেমিক ইকুইভ্যালেন্ট। তাদের ভিপি ও জিএস আমাদের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সম্মানিত সদস্য। এতে একটি সুবিধা আছে। তাহলো- অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে কোনো সিদ্ধান্ত হলে তারা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন না। সংসদ থেকে যখন এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়, তখন বাকিদেরও এ বিষয়ে আর ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকে না।’

পাশাপাশি ছাত্র সংসদের মাধ্যমে কলেজের শৃঙ্খলাও নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক সেলিম জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘ছাত্রদের মধ্যে অনেক সময় রাজনীতি ছাড়াও অর্থ বা ক্ষমতার স্বার্থে সংঘাত হয়। বিগত ১০ বছর এখানে সংসদ চলছে, ১০ মিনিটের জন্যও কোনো সংঘর্ষ হয়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বর্তমান যে সম্পর্ক তা একেবারে ভাই ও বোনের মতো। আমি অবাক হয়ে যাই, তারা কিভাবে এ ভ্রাতৃত্ব ও চেইন অব কমান্ড নিশ্চিত করছে। তাছাড়া ছাত্রদের জন্য সরকার যে টাকা দেয়, এটা অন্য কাউকে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত না। কিন্তু আমি যখন সংসদকে দেবো, তারা সরকারের হিসাবের মধ্যেই। ভর্তির সময় সংসদের জন্য যে টাকা সংগ্রহ করি, এটা সংসদকে দিয়ে দিই।’

চালু হচ্ছে ডিজিটাল ইকো সিস্টেম

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ মনোনীত প্যানেল থেকে ঘোষিত ইশতিহারে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করার জন্য ডিজিটাল ইকো সিস্টেম চালু করার কথা ছিল। এর আওতায় একটি অ্যাপসের মাধ্যমে পড়াশোনা ও হাজিরাসহ সার্বিক আপডেট শিক্ষার্থীদের কাছে চলে যাবে। এটি অনেকটা নোটিস বোর্ডের মতো। এজন্য সবারই আলাদা আলাদা আইডি থাকবে।’

এর মাধ্যমে কলেজের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমগুলো শিক্ষার্থীরা অনায়াসে জানতে পারবে জানিয়ে পঞ্চম বর্ষের এ শিক্ষার্থী বলেন, এটি বাংলাদেশে আর কোনো মেডিকেলে নাই।

ইশতেহার অনুযায়ী বর্তমান সংসদ নতুন ছাত্রাবাস ও লাইব্রেরি সংস্কার করবে বলেও জানান ৫৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. হাবিবুর রহমান।

চমেক ছাত্র সংসদের বর্তমান ভিপি এম এ আওয়াল রাফি বলেন, ‘ইশতেহারের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করার আগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি মতবিনিময়ের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে সামনের দিনগুলোতে ক্যাম্পাসের জন্য কী কী করা উচিত এবং কে কে কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে—এসব বিষয় জানাতে বলা হয়। এর ভিত্তিতে ইশতেহার তৈরি হয়। সবার মতামতসম্বলিত ইশতিহার অনুযায়ী, নির্মাণাধীন নতুন অ্যাকাডেমিক ভবনে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি স্থানান্তর করা হবে। আমাদের মাঠের পাশে একটি গণকবর আছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসকদের স্মরণে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে।’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত