ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)

ফিগো ফেলো (ইতালি)

গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।


১৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০৯:২১ এএম
আপডেট: ১৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০৯:২৯ এএম

“আবার তোরা মানুষ হ”

“আবার তোরা মানুষ হ”

না, আমি কোন তাৎক্ষনিক প্রতিক্রয়া জানাতে পারিনি। শুধু ক্ষণে ক্ষণে নিজের সন্তানের মুখটা ভেবে কেঁদেছি। আবরার নামক ছেলেটিকে যে পিটিয়ে মেরে ফেললো, এই ব্যাপারটা আমি আজ অবধি মেনে নিতে পারছি না।

মা হওয়ার সবচেয়ে বড় দূর্বলতা বোধ হয় এটাই। পৃথিবীর তাবৎ মায়ের কষ্ট অনুভব করা যায়। প্রতি মুহূর্তে একটা চাপা কষ্ট তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে। একটা বাচ্চাকে পেট থেকে পিঠে, অতঃপর হাত ধরে হাঁটা থেকে শুরু করে অক্ষরজ্ঞান, এরপর স্কুল-কলেজ গন্ডি পেরিয়ে ইউনিভার্সিটি লেভেল পর্যন্ত নিয়ে যেতে একটা মায়ের কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয় তা দিস্তার পর দিস্তা লিখেও বোধ হয় শেষ করা যাবে না।

উদ্দেশ্য কি? বাচ্চাকে মানুষের মত মানুষ করা। সেই বাচ্চা মানুষ হতে হতে যদি কিছু অমানুষের হাতে লাশ হয়ে বাড়ী ফেরে, মায়ের কেমন লাগে? ভাবতে পারি না।

আচ্ছা, এই যে আজ যাদের অমানুষ বলছি, আবরারকে হত্যার খবর জানার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তারাও তো দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপিঠে মানুষই হচ্ছিল সকলের চোখে তাই না! সবাই গর্ব করে নিশ্চয় বলতো, ওই দেখো অমুকের ছেলে বুয়েটে পড়ছে, ছেলেকে মাসাআল্লাহ্ মানুষের মত মানুষ করছে ওর বাপ-মা। বলতো না? মানুষ হতে হতে ওরা অমানুষ হয়ে উঠলো কিভাবে?

মৃত্যু পরোয়ানা জারী করার মতো তেমন কি কিছু ছিল ওর স্ট্যাটাসে? অবাক হওয়ার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলছি। র‌্যাগিং বন্ধ করার ব্যাপারে অনেকবারই গার্ডিয়ান পক্ষ থেকে অনুরোধ করে এসেছে। ভুক্তভোগী ছাড়া এদেশের কেউ কি ভেবেছে র‌্যাগিং এতোটা ভয়ানক হতে পারে!

আমরা সৌভাগ্যবান। মেডিকেল কলেজে ঢুকে সিনিয়র ভাই-বোনদের অপত্য স্নেহ পেয়েছি। র‌্যাগিং-ফ্যাগিং কি আমরা বুঝতামই না। প্রথম এ সম্পর্কে জানলাম, ইন্ডিয়ায় পড়তে যাওয়া এক ভাইয়ের কাছে। তাও তেমন সিরিয়াস কিছু না। এরপর দেখলাম মুন্না ভাই এমবিবিএস সিনেমায়, র‌্যাগিং কি জিনিস। কিন্তু এটা কত ভয়াবহ তা জানলাম কয়েক বছর আগে খুব কাছের এক ভাবীর মেয়ে যখন ঢাকায় টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং পড়তে গেল। ভাবী বলছিলেন, রাত তিনটায় যখন মেয়ে চুপ করে ফোন করেছে, ও কথা বলতে পারছে না, শুধু কাঁপছে ভয়ে। আশেপাশে অনেক মেয়ের কান্নার শব্দ। কেমন লাগে একটা মায়ের তখন! কিভাবে সেই মা রাত পার করে!

আমি শুধু ভাবি, যারা আজ র‌্যাগিং করছে, তারাও তো কোন এক সময় নতুন হয়ে ঢুকেছিল ক্যাম্পাসে। তাদের র্যাগিং হয়নি? তারা কি সেই অনুভূতি ভুলে যায়? নাকি ট্রাডিশন রক্ষা করতে তারা বদ্ধপরিকর? নাকি নিজেদের উপর হওয়া অত্যাচারের শোধ নেয়? সারারাত জেগে থেকে অনুজদের উপর অত্যাচার করা কি কোন সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ হতে পারে? ওদের ঘুমের দরকার হয় না? পড়ালেখা করে কখন ওরা? ওদের ক্লান্তি লাগে না? এসবের উত্তর একটাই হতে পারে, আর তা হল নেশা। সেটা ক্ষমতা, অর্থ বা মাদক যে নেশাই হোক না কেন!

সবাই অনেক রকম কথা বলছে। কিন্তু আমার বারবার মনে হচ্ছে, প্রতিটা বিদ্যাপীঠে সবার আগে র্যাগিং বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এটাই হওয়া উচিত প্রথম দাবী। দ্বিতীয়ত: দেশটাকে মাদকমুক্ত করুন। শুধু ব্যবসার খাতিরে এদেশের বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর হাতে নেশা তুলে দিবেন না। এদেশের নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রাইমারী কাস্টমারই হল, স্টুডেন্টস। আল্লাহর ওয়াস্তে এদের রেহাই দিন। তৃতীয়ত: ছাত্রদের দিয়ে কিংবা ছাত্রদের নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করুন সবাই। সবাই বলতে সবাই। দল-মত নির্বিশেষে। ওদের আর বলির পাঠা বানাবেন না প্লিজ। ওদেরকে একটু প্রাণ ভরে বাঁচতে দিন।

আর বাছারা, তোরাও নিজেদের ভালোটা বোঝ বাবা। বাবা-মায়ের স্বপ্নগুলো এমন করে গলা টিপে হত্যা করিস না। কোন বাবার কাঁধে তার তরতাজা জোয়ান ছেলের লাশ তুলে দিস না। এ ভার বহন করা যে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর রে বাবা। যেদিন বাবা হবি সেদিন বুঝবি। মায়ের নাড়ী ছেঁড়া ধনকে যখন তোরা পৃথিবী থেকে ছিঁড়ে ফেলিস, তাঁর কেমন লাগে সেদিন বুঝবি যেদিন তোর ভাই-বোনের বিয়োগে নিজের মায়ের বিলাপ দেখবি। জেগে ওঠ বাবারা। দেশের কোটি কোটি মা আজ তোদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের সন্তানের ভবিষ্যত ভেবে মরার আগেই যন্ত্রণায় কুঁকড়ে মরে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। মনে রাখিস,পাপ কিন্তু তার বাপকেও ছাড়ে না।

কেবল এক আবরারের বিচার শুধু নয়। আর কোনদিন কোন আবরার যেন বাঁচার আগেই মরে না যায় তা নিশ্চিত করাই আজ দেশের সকল বাবা-মায়ের দাবী। আমরা আমাদের সন্তানদের সুস্থ জীবন দেখতে চাই। স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই। আর তা না পারলে, চলেন আদিম যুগে ফেরত যাই। গ্রামে গিয়ে চাষাবাদ করা শিখিয়ে সন্তানদের চাষা বানিয়ে রাখি। লেখাপড়া শিখিয়ে মেধাবী চামার বানানোর চেয়ে অশিক্ষিত চাষা বানানোই শ্রেয় নয় কি!

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত