ডা. কাওসার উদ্দিন

ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


১১ অক্টোবর, ২০১৯ ১২:০৬ পিএম

‘‘মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আমার হার্ট মাত্রা ছাড়িয়ে ধুপধাপ করছিল”

‘‘মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আমার হার্ট মাত্রা ছাড়িয়ে ধুপধাপ করছিল”

আজ শুক্রবার। বরাবরের মত সেই দিনটিও ছিল শুক্রবার, ছুটির দিনের একটি অন্যরকম সকাল। দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছি খুলনা মেডিকেলের সামনে। চারপাশে শত শত মানুষ, পরীক্ষার্থীদের সাথে বিভিন্ন বয়সের অভিভাবকবৃন্দ। এ যেন এক মহাসমাবেশ, পরীক্ষার্থীদের চেয়ে অভিভাবক বেশি।

আমরা কয়েক বন্ধু একসাথে। গম্ভীর মুখে যুদ্ধ শুরুর অপেক্ষায়। অনেকে ঘেমে অস্থির, দুশ্চিন্তায় না প্রচন্ড রোদে বোঝার উপায় নেই। এডমিট কার্ড হাতে কিছুক্ষণ পর লাইনে দাঁড়ালাম। আমার হার্ট মাত্রা ছাড়িয়ে ধুপধাপ করছিল। আমার সাথে জিগরি দোস্ত আশিক। যতই চেষ্টা করি ওর সাথে কথা বলে টেনশন কমানোর, ততই যেন টেনশন বেড়ে যাচ্ছে।

মনে মনে স্রষ্টাকে স্মরণ করছি আর বলছি 'Try your best, Allah will do the rest' এর মাঝেই হলে প্রবেশের ঘন্টা বাজলো। একে একে স্বল্প সময়ের চেকিং শেষে নির্ধারিত রুমের দিকে এগোচ্ছি সবাই। আমি আর আশিক ভিন্ন রুমে। আমার সিট পড়ল বিশাল বড় এক লেকচার গ্যালারীতে, খুবই সুন্দর রুম, বেশ বড় বড় কাঠের বেঞ্চ। বেঞ্চের এমাথায় একজন, আর ওমাথায় আর একজন। আশেপাশে পরিচিত অপরিচিত অনেকে আছে, সবার সাথে টুকটাক কথা বলে নিজেকে সহজ করার চেষ্টা করছি, কিন্তু পালপিটেশন কমছে না। পরে নিজেই নিজেকে বললাম, 'ভয় পেয়ো না। আল্লাহ যা করবেন ভালোর জন্যই করবেন, সামনে আরো একবার সুযোগ আছে। সুতরাং No tension, do foorti তে পরীক্ষা দাও।'

বুদ্ধিটা কাজে লাগলো, এতে মনে কিছুটা জোর এল, পালপিটেশন কমে গেলো! হঠাৎ মহারণের ঘন্টা বাজলো। ইনভিজিলেটর বাজখাই গলায় চিৎকার দিয়ে বললেন, 'Silence please, pin drop silence!' চারপাশে শুনশান নিরবতা, সবাই চুপচাপ। উত্তর শিট দেয়া হল, প্রাথমিক কাজ শেষে এবার দীর্ঘ প্রত্যাশিত প্রশ্ন খোলার অপেক্ষা। ঘন্টা পড়ার পর কাঁপাকাঁপা হাতে প্রশ্ন খুললাম।

এরপর আর কিছু মনে নেই, সম্ভিত ফিরলো এক টানা ঘন্টার শব্দে, সাথে আবারো চিৎকার 'Stop writing!' খাতা বন্ধ করে রোল নামের গোল্লা পূরণ ঠিক আছে কিনা আরেকবার মিলিয়ে নিচ্ছি, আর অপেক্ষায় আছি টিচারের ছো মেরে উত্তর পত্র নেয়ার। অবশেষে এক ঘন্টার মহাযুদ্ধ শেষ ক্লান্ত শ্রান্ত যোদ্ধারা সব একে একে যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে বাইরে চলে আসলাম।

বাইরে উৎকণ্ঠিত অভিভাবকবৃন্দ অপেক্ষা করছেন। 'পরীক্ষা কেমন হল?' সামনে আগত এমন প্রশ্নের উত্তর এর মধ্যেই ঠিক করে ফেলেছি, 'আলহামদুলিল্লাহ, ভাল দিয়েছি, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।' ক্লান্ত শ্রান্ত আমি আর আশিক মেডিকেলের কাছে ওর বাসায় গিয়েই উত্তরের হিসাব নিকাষ মিলিয়ে দু বন্ধুতে এক হেডফোন দুজনের কানে লাগিয়ে গান শোনা শুরু করলাম।

কিছুক্ষণ পরেই আমাদের আরেক বন্ধু বাড্ডা জেনারেলের বিখ্যাত লেখক গালিবের আগমন, উত্তর মিলানোর জন্য। আবার একসাথে গল্পগুজব চললো কিছুক্ষণ। এভাবে ১ দিন পার হল। পরদিন দোস্ত দীপুর আগমন, আমি আশিক আর দীপু তিন জন মিলে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনা শেষে গল্প করতে করতে একসাথে ঘুমিয়ে গেলাম। বিকাল তখন, কিছুক্ষণ পরই আশিকের আম্মার দরজায় ডাকাডাকি, রেজাল্ট দিয়েছে! আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা সবাই চান্স পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।

অল্প সময় পরেই এ বছরের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে। প্রার্থনা এই যেন যোগ্য আর মেধাবীরাই চান্স পায়, কোন প্রকার অনিয়মে যেন কলুষিত না হয় এই পবিত্র পেশার উত্তরসূরি বাছাই। পুনরাবৃত্তি না হয় কোন ঘৃণ্য অতীত।

পত্রিকায় দেখলাম আজ একজন কোচিং মালিক গ্রেফতার হয়েছে। তদন্ত হোক, দোষী হলে শাস্তি কাম্য। এর সাথে যারা জড়িত তারা সবাই গ্রেফতার হোক, কঠিন শাস্তি পাক, তা না হলে আল্লাহ এদেরকে কানা লুলা করে দাও যেন অপকর্মের শাস্তি আজীবন বয়ে বেড়ায়। পরীক্ষার্থীদের জন্য দোয়া ও শুভকামনা।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত