ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৫ ঘন্টা আগে
ফররুখ খাতির

ফররুখ খাতির

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ


০৯ অক্টোবর, ২০১৯ ১৮:৩৬

চিকিৎসা গবেষণায় স্বাক্ষর রাখার স্বপ্ন দেখতেন চে গুয়েভারা

চিকিৎসা গবেষণায় স্বাক্ষর রাখার স্বপ্ন দেখতেন চে গুয়েভারা

‘‘আমার মাঝে একটি ধারণা জন্মাচ্ছে ও রূপ নিচ্ছে- তা হল এই সভ্যতাকে ঘৃণা করা। বিশাল হৈচৈ আর হট্টগোলের মধ্যে যান্ত্রিক মানুষদের উদ্ভট জলছবি এক শান্তি বিঘ্নকারী জঘন্য চরিত্র।’’

১৯২৮ সালের ১৪ই জুন, আর্জেন্টিনার রোজারিও শহর। স্থপতি গুয়েভরা লিন্চ ও তাঁর প্রগতিশীল আধুনিকা স্ত্রী সেলিয়ার কোল আলো করে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে ছেলে সন্তান। বাবা মা নাম রাখলেন তেতে। এই তেতেই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন বিপ্লবী "চে"। ডাক্তার আর্নেস্তো চে গুয়েভারা।

ছোট চার ভাই বোন স্কুলে গেলেও যাওয়া হয়নি তেতের। সে ছিল আজন্ম হাঁপানি আক্রান্ত। ফলে মায়ের সান্নিধ্যেই কাটে জীবনের প্রথম আট বছর। তাই রীতিবিরুদ্ধ, প্রগতিশীল মা সেলিয়ার সাথে গড়ে ওঠে তার অনন্যসাধারণ হৃদ্যতা।

১৯৩৭ সাল। সানমার্টিন স্কুলে ২য় শ্রেণীতে ভর্তি হয় তেতে। হাঁপানির কারণে পড়ালেখায় ভাল ছিল না সে। তবে এই হাঁপানি কিন্তু তার দুরন্তপনার বাঁধ ভাঙতে পারেনি।

শৈশব থেকেই চে ছিলেন দুরন্ত ও স্বভাবনেতা। খামখেয়ালি হওয়া সত্ত্বেও সবাই তাকে পছন্দ করত তীক্ষ্ম মর্মভেদী চরিত্র আর চারিত্রিক রসবোধের জন্য।
১৯৪৬ সালে ১৮ তে পা রাখা চে রাস্তা নির্মাণ বিভাগের একটি খণ্ডকালীন চাকরিতে ঢুকেন। সিদ্ধান্ত নেন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হবার। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন দাদী ইসাবেলা।

দাদীর মৃত্যুই তাঁকে ডাক্তারি পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পরে অবশ্য চে জানিয়েছিলেন, ‘‘ব্যক্তিগত বিজয়ের আকাঙ্খায়’’ তিনি ডাক্তারি পড়তে চেয়েছিলেন। ভর্তি হয়েছিলেন বুয়েন্স আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অনুষদে। মেডিকেলে পড়ার সময়ই ডা. পিসানির এলার্জী পরীক্ষাগারে সহকারী গবেষকের চাকরি পান।

কাজ আর পড়া এই দু’য়ে মিলেই কাটতে থাকে তরুণ চের জীবন। মেডিকেলের এনাটমি আর ফিজিওলজির ক্লাশে চের আলাপ হয় সুন্দরী তিতার সাথে। নার্ভাস সিস্টেমের ক্লাশ কিংবা লাশ কাটার ফাঁকে ফাঁকে তাদের হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত তা আর প্রণয়ের পরিণতি পায়নি।

মেডিকেলে খুব ব্যস্ত সময় কাটাতেন চে। বই, দাবা, রাগবি, কবিতা, দার্শনিকতাতে ছিল তার তুমুল মগ্নতা। রাজনৈতিক বক্তৃতা শুনেছেন। বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। তবে ছাত্র রাজনীতি এড়িয়ে চলেছেন সযত্নে।

১৯৫০ সালের জানুয়ারীতে বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোর সাথে আর্জেন্টিনা ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নেন চে। তখন তিনি মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষে। পথে লরেটো নামের এক স্থানে একটি থানায় রাত কাটাতে হয় তাদের। পুলিশরা যখন জানতে পারলেন যে তারা মেডিকেল ছাত্র, তখন লরেটোতে প্র্যাকটিস করার অনুরোধ করলেন তাদের। তবে তাতে সাড়া দেননি চে’রা।

যাত্রা শেষে মেডিকেলের নতুন সেশন শুরুর আগেই ফিরে আসেন তারা। এরপর পাঁচ পেপার পরীক্ষায় একবারে পাশ করে চতুর্থ বর্ষে উঠে যান চে। একই বছরের অক্টোবরে চিচিনা নামের এক মেয়ের প্রেমে পড়েন চে। এই চিচিনাই ছিলেন তার প্রথম প্রেম। এ প্রেম পরিণতি না পেলেও রেখে যায় এক সুদূর প্রসারী প্রভাব। এই প্রেমই আঁতেল এক মেডিকেল ছাত্র কে পাঠিয়েছিল সমুদ্র যাত্রায়। উদ্বুদ্ধ করেছিল মটরবাইকে লাতিন আমেরিকা ভ্রমণে।

মটরবাইকে ভ্রমণকালে নিকোচিয়া শহরে এক বন্ধুর বাসায় যাত্রাবিরতি দিলেন চে ও গ্রানাদো। তবে বন্ধুর স্ত্রী তাকে দেখে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিলেন। তার প্রশ্ন- ‘যে এক বছরের মধ্যে ডাক্তার হবে, তার এমন ভবঘুরে দশা কেন?’ তবে চিলিতে পৌঁছেই পত্রিকার খবর বনে যান চে ও গ্রানাদো। লোকজন বিজ্ঞানী ভেবে তাদের যথেষ্ট সমাদর করেছিল।

পেরুতে ডা. হুগো পেশুচের সাথে তাদের পরিচয় হয়। তিনি সান পাবলো কুষ্ঠাশ্রমে তাদের কাজ করার অনুমতি দেন। সেখানে ক্যাথলিক নিয়ম ভঙ্গ করে গ্লাভ্স ছাড়াই রোগী দেখতেন চে। কারণ তিনি জানতেন যে কুষ্ঠ ছোঁয়াচে নয়। বিভিন্ন উপায়ে তারা রোগীদের মানসিকভাবে উজ্জীবিত রাখতেন। এমনকি ’৫২ সালের ১৪ জুন নিজের ২৪তম জন্মদিনে রোগীদের নিয়ে আমাজন নদী পাড়ি দিয়েছিলেন চে। ফলে রোগীরা চিরদিনের মত আপন করে নেয় তাকে।

লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ চের চেতনায় আনে আমূল পরিবর্তন। আর্নেস্তোকে চে হিসেবে গড়ে তোলার মূল ভিত্তিই ছিল এ ভ্রমণ।

১৯৫৩ সালে ডাক্তারি পড়া শেষ করেন চে। অতঃপর আবার ভ্রমণে বের হন। এই ২য় ভ্রমণকে তিনি "রাজনীতির স্টেথোতে লাতিনের পাল্স দেখা " হিসেবে উল্লেখ করেন।

পেরুতে পৌঁছলে মার্কসবাদী কর্মী হিলদার সাথে তার পরিচয় হয়। এই হিলদাই ছিলেন তার প্রথম স্ত্রী। গুয়েতেমালায় ফিদেল ক্যাস্ত্রোর লোক নিকোর সাথে তার বন্ধুত্ব হয়। বিপ্লবের সাথে তিনি এভাবেই সংশ্লিষ্ট হন। গুয়েতেমালার নেতের জঙ্গলে রেড ইন্ডিয়ানদের মাঝে তিনি আর্জেন্টাইন ডাক্তার হিসেবে কাজ করতে চেয়েছিলেন। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রাজি না হওয়ায়, ডাক্তার হিসেবে কাজের আগ্রহই তার চলে যায়। পরে অবশ্য সামাজিক চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে তিনি গবেষণা করেছিলেন। ডাক্তারিও করতে হয়েছিল বেশকিছু সময়।

ফিদেলের দলে যুক্ত হবার পর আমেরিকার বদ নজরে পড়ে যান তিনি। তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এরপর মেক্সিকোতে পাড়ি জমান তিনি। সেখানেই গেরিলা ট্রেনিংপ্রাপ্ত হন। অতঃপর ’৫৬ সালের নভেম্বরে কিউবার পথে পা বাড়ান চে। সেখানে জনগণকে রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে বলিষ্ঠ করে গড়ে তোলেন। কিউবায় স্বৈরশাসক বাতিস্তার পতন ঘটানোর লক্ষ্যে ’৫৭ সালের জুলাই এ গেরিলা ঘাটিতে ফিরে আসেন এবং চতুর্থ বাহিনীর দায়িত্ব পান। যুদ্ধ শুরু হলে তার বাহিনীর কাছে একে একে আত্মসমর্পন করতে থাকে শত্রু সেনারা। ফলে কিউবায় বিপ্লব ত্বরাণ্বিত হয়।

কিউবা বিজয়ের পর চে সামরিক বাহিনীর কমান্ডেন্ট, শিল্প দপ্তরের দায়িত্ব থেকে শুরু করে জাতীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পর্যন্ত পালন করেন। বিলাসবহুল জীবন তাকে হাতছানি দিতে থাকে। কিন্তু তিনি এ জীবন চাননি। চেয়েছিলেন বিপ্লবকে বিশ্ববাসীর দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে।

আট বছর কিউবান ভি আই পির জীবন যাপনের পর ফিদেলের সাথে মতবিরোধের জের ধরে কিউবা ছাড়তে হয় তাকে। ততদিনে তিনি এলাইদার মত সুন্দরী নারীর স্বামী। চারচারটে ফুটফুটে সন্তানের জনক। কিন্তু এসব পিছুটান তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তিনি গেরিলার সাজে বিপ্লব ছড়াতে কঙ্গোতে গিয়েছেন। সেখানে ব্যর্থ হয়ে গিয়েছেন বলিভিয়ায়। নয়মাস গেরিলা যুদ্ধ করেছেন বলিভিয়ায়। উদ্দেশ্য ছিল শুধু সাম্যবাদের বিপ্লবকে প্রতিষ্ঠিত করা।

মার্কিন গোয়েন্দা আর বলিভিয়ানদের যৌথ উদ্যোগে ’৬৭র আট অক্টোবর বন্দী হন চে গুয়েভারা। ৯ অক্টোবর তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রমাণস্বরূপ তার দুই কব্জি কেটে কিউবায় ফিদেলের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

মারা গেলেন চে। না, শুধু এক মার্কস্বাদী বা বিপ্লবী গেরিলা চে নন, মারা গেলেন একজন মহান চিকিৎসকও; যিনি উন্নত, মানবতাবাদী স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন। তার ভাষায়- ‘‘আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম চিকিৎসা গবেষণায় এমন অক্লান্ত স্বাক্ষর রেখে যাব যেন মানবতার কাজে লাগে।’’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত