ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৫ ঘন্টা আগে
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।


০৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০৯:১২

সুস্থ শরীরেও কেন ক্যান্সার পরীক্ষা?

সুস্থ শরীরেও কেন ক্যান্সার পরীক্ষা?

কয়েকদিন আগে প্রবাস থেকে একজন আমাকে মোবাইল করে জানতে চাইলেন যে তিনি দেশে ফিরে রক্ত পরীক্ষা করাবেন। কি জন্য রক্ত পরীক্ষা করাবেন জানতে চাইলে বললেন- শরীরে ক্যান্সার আছে কি না জানতে চাই। আমি জানতে চাইলাম- তা শারীরিক সমস্যা কি কি? তিনি বললেন- না, শরীরে কোন সমস্যা নাই।

- সমস্যা নাই, তাও পরীক্ষা করাবেন কেন?

- অনেকেই তো ক্যান্সার হয়ে মারা গেলো। আমার শরীরের ভিতরে ক্যান্সার আছে কি না জানতে চাই।

- দেশে ফিরে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন।

এভাবে যারা অতি-স্বাস্থ্য সচেতন তারা আগাম কিছু পরীক্ষা করাতে চান। এই সুযোগে অনেক দালালের সুবিধা হয়। তারা দেশি বিদেশি বড় বড় ডায়াগনোসিস্টিক সেন্টারে মোটা কমিশনের বিনিময়ে প্যাকেজ করে শরীর চেক আপ করার নামে টাকা হাতিয়ে নেয়। সহজ উপায়ে বেশী টাকা কামাই করলে সাধারণত এমন সখ হয়। বিদেশ ভ্রমণও হলো, চেক আপ করাও হলো। চেক আপ করার পর বন্ধুদের সাথে মোবাইলে তার বিদেশে গিয়ে চেক আপের কথা বলে বেড়ায় গশর্ব করে। আর দেশী ডায়াগনোসিস্টিক সেন্টারের বদনাম করে যেভাবে দালালদের মুখ থেকে শুনেছে।

অনেক সময় বিদেশ যেতে ভিসা পেতে দালালরা ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে ভিসা সংগ্রহ করে। আজব আজব রোগের নাম লিখা থাকে সেই সব রিপোর্টে। সেই রিপোর্ট যখন বিদেশী ডাক্তারের হাতে পড়ে তখন তারা প্রচার করে বাংলাদেশী ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট ভুল হয়। এমন রিপোর্ট স্ক্যান করে কেউ কেউ ফেসবুকেও ভাইরাল করেছে।

কয়েক বছর আগে একটা রিপোর্ট পেলাম মহিলা রোগীর। তিনি বড় একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন একজন পল্লী চিকিৎসকের এডভাইস অনুযায়ী। তিনি চিকিৎসককে বলেছিলেন যে তার শরীরে ক্যান্সার আছে কি না তা জানার জন্য কোন রক্ত পরীক্ষা লাগলে লিখে দেয়ার জন্য। সেই অনুযায়ী তিনি সাত আটটা পরীক্ষা করিয়েছেন। মজার কথা হলো তিনি প্রোস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন (PSA) টেস্টটাও করিয়েছেন। সব পরীক্ষার রিপোর্ট ভালো। কিন্তু যেখান থেকে পরীক্ষা করিয়েছেন সেখানকার প্যাথলজিস্টের দেখা তিনি পাননি।

রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে বিএসসি পাশ করা একজন পার্সন। তিনি মেডিকেল পার্সন নন। তাই, তার রিপোর্ট বুঝার জন্য আমার কাছে এসেছিলেন। মনে রাখবেন, অধিক মুনাফা করার জন্য কেউ কেউ মেডিকেল পার্সনের পরিবর্তে অন্য প্রফেসনের লোক দিয়ে প্যাথলজি করাতে পারেন। প্রোস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন পজিটিভ হয় প্রোস্টেট ক্যান্সারে সাধারণত। ছেলেদের পুরুঙ্গের গোড়ায় ও মুত্রথলির নিচে মুত্রনালীর বেষ্টন করে প্রোস্টেট থাকে। মেয়েদের প্রোস্টেট নাই। প্রোস্টেটে ক্যান্সার হলে মুত্রনালী বন্ধ হয়ে প্রশ্রাব আটকে যায়। আগাম কেউ রক্ত পরীক্ষা করালে রক্তের পিএসএ বেশী দেখে প্রোস্টেট ক্যান্সার সন্দেহ করতে পারে।

কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল এই মহিলা রোগীর পিএসএ পরীক্ষা করানো হলো কেন? নিজে নিজেই চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করলাম। মহিলা যখন পল্লী চিকিৎসককে উপদেশ লিখে দিতে বলেছেন তখন তিনি গুগলে সার্চ দিয়েছেন ক্যান্সার রোগের রক্ত পরীক্ষা কি কি আছে। মহিলা/পুরুষ বিবেচনা না করে সবগুলি লিখে দিয়েছেন। এও হতে পারে বেশী কমিশন পাওয়ার আশায় সবগুলি পরীক্ষা লিখে দিয়েছেন।

সিবিসি (CBC) নামে রক্তের একটা পরীক্ষা খুব করা হয়। সাভাবিক অবস্থায় যদি অনেকগুলো রোগীর রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করা হয় তবে ইনসিডেন্টাল ফাইন্ডিং হিসাবে দুই এক জনের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়বে। কারণ, প্রথম দিন থেকেই রোগীর শারীরিক সমস্যা নাও হতে পারে। রক্তকণিকার অনেক পরিবর্তন হবার পর ব্লাড ক্যান্সারের উপসর্গ শুরু হয়। উপসর্গ শুরুর আগেই রক্তে ক্যান্সার সেলের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

স্বাভাবিক সংখ্যার চেয়ে যদি অপরিক্ক রক্ত কণিকার পরিমাণ বেড়ে যায় তবে ব্লাড ক্যান্সার সন্দেহ করা হয়। যে ব্লাড ক্যান্সারে অপরিপক্ব কোষ থাকে তাকে একুট লিউকেমিয়া বলে। যে ব্লাড ক্যান্সারে পরিপক্ব কনিকা থাকে তাকে ক্রনিক লিউকেমিয়া বলে। পরিপক্ব কোষের সংখ্যা অসম্ভব বেশী হয়ে গেলেই ক্রনিক লিউকেমিয়া বলা হয়।

অনেক মেয়েদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার হয়। সার্ভাইকাল ক্যান্সার বলে যাকে। এই ক্যান্সার কিন্তু এক দুই দিনে হয় না। পুরাপুরি ক্যান্সার হয়ার আগে, কোন কোন ক্ষেত্রে ৪/৫ বছর আগে থেকে সার্ভিক্সের কোষে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রাথমিক ভাবে ভিআইএ (ভায়া) টেস্ট করে সন্দেহ করা হয়। ভায়া টেস্ট পজিটিভ হলে অথবা গাইনিকোলজিস্ট মনে করলে পেপ টেস্ট করে সার্ভিক্সের অস্বাভাবিক সেল ডিটেক্ট করে জরায়ুমুখের ক্যান্সার সন্দেহ করেন। গাইনিকোলিস্ট পেপ স্মিয়ার কালেকশন করেন। প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ পেপ টেস্ট পরীক্ষা করেন। ভায়া সেন্টারে ভায়া পরীক্ষা হয়।

ক্যান্সার মার্কার নামে রক্তের কিছু পরীক্ষা আছে। এগুলো কনফার্ম পরীক্ষা না। উপসর্গ দেখে ক্যান্সার সন্দেহ হলে অথবা চিকিৎসা দেয়ার সময় ওষুধে কেমন কাজ করছে তা দেখার জন্য এইসব মার্কার দেখা হয়। অনেক মার্কার আছে। তার মধ্যে PSA, AFP, beta-HCG, CA-125, Carcinoemryonic antigen সচারাচর করা হয়।

পিএসএ(PSA)-এর কথা আগেই বলা হয়েছে যে প্রোস্টেট ক্যান্সার হলে সাধারণত এটা পজিটিভ হয়।

এএফপি (AFP) সাধারণত পজিটিভ হয় ওভারি (ডিম্বাধার) ও টেস্টিসের (অন্ডকোষ) ক্যান্সার এবং লিভারের ক্যান্সারে (হেপাটোসেলুলার ক্যান্সার)।

CA-125 পজিটিভ হয় সাধারণত ওভারিয়ান ক্যান্সার, এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার, ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্যান্সার, লাংস (ফুসফুস) ক্যান্সার, ব্রেস্ট (স্তন) ক্যান্সার ও পরিপাক তন্ত্রের ক্যান্সারে।

বিটা-এইচসিজি (HCG) পজিটিভ হয় প্লাসেন্টাল ক্যান্সার (কোরিওকার্সিনোমা) ও জার্মসেল ক্যান্সার (ওভারি ও টেস্টিস) ক্যান্সারে।

কার্সিনোএম্ব্রায়োনি এন্টিজেন পজিটিভ হয় পরিপাক তন্ত্রের, সারভিক্স, লাংস, ওভারি ও ব্রেট ক্যান্সারে।

যাহোক, খামখা কেউ যদি ক্যান্সারের আগাম কোন পরীক্ষা করাতেই চান তবে উপরে উল্লেখিত পরীক্ষাগুলো করাতে উপদেশ দেয়া যেতে পারে। তবে মনে রখতে হবে কোনটি মেয়েদের আর কোনটি ছেলেদের পরীক্ষা।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত