ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
ডা. তাইফুর রহমান

ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৫:১৫

হার্ট ফেইলিউর: পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা

হার্ট ফেইলিউর: পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা

কেরামত মোল্লা সারারাত সোজা হয়ে বসে কাটিয়ে দেন। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ, ঘুমাতে পারেন না। শুইলেই শ্বাসকষ্ট আর কাশি শুরু হয়ে যায়। ধড়ফড় করে ইঠে বসেন, তারপর আস্তে আস্তে শ্বাসকষ্টটা কমে আসে। গত আড়াই/ তিন বছর যাবৎ শ্বাসকষ্টটা শুরু হয়েছে।

প্রথম দিকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে শ্বাসকষ্ট হতো, রেষ্ট নিলে সেরে যেতো। তারপর আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। পরের দিকে সামান্য পরিশ্রমও করতে পারতেন না। দুইটা ইনহেলারও নিচ্ছেন অনেকদিন যাবৎ।

আগে কিছুটা কাজ হতো। বেশি কষ্ট হলে নেবুলাইজার ইউজ করতেন। এখন কিছুতেই কিছু হয় না, বরং বাড়ে। গত এক সপ্তাহ যাবৎ বলতে গেলে নির্ঘুম কাটছে রাত। আমার সামনে বসে আছেন মোল্লা সাহেব। হাঁপাচ্ছেন। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট।

: আপনার এই অবস্থাকে ডাক্তারি ভাষায় PND বলে Paroxysmal Nocturnal Dyspnea. এটা হার্ট ফেইলিউরের এডভান্স একটি stage ।

: তার মানে আমার হার্ট ফেইলিউর হয়ে গেছে!

: হ্যা। আপনার হার্ট ফেইলিউর হয়েছে।

: তাহলে আমি মরে যাব? হার্টফেল করলে তো মানুষ বাঁচে না।

: কথা ঠিক না। হার্ট ফেইলিউরের মানে আপনাকে বুঝতে হবে। হার্ট ফেইলিউর মানে হলো হার্ট তার কাজ পর্যাপ্ত পরিমানে করতে পারছে না।

হার্টের দুই ধরনের ফেইলিউর হয়:

১. ডায়াস্টোলিক ফেইলিউর।

২. সিস্টোলিক ফেইলিউর।

আমরা এখানে সিস্টোলিক ফেইলিউর নিয়ে কথা বলছি।

সিস্টোলিক ফেইলিউরে সমস্ত শরীর থেকে আসা রক্ত হার্ট ক্লিয়ার করতে পারে না। এতে করে ব্যাক প্রেসারে ফুসফুসে পানি জমে যায়। ফলে শ্বাসকষ্ট হয়। ব্রেইনসহ সমস্ত শরীরই রক্ত কম পায় তাই দূর্বল হয়ে যায়। হার্টের কর্মক্ষমতা বেশি কমে গেলে পেটে ও পায়ে পানি এসে যায়। এটাই হার্ট ফেইলিউরের লক্ষণ।

কেন হয় হার্ট ফেইলিউর?

১. হার্টের রক্তনালীতে যদি ব্লক থাকে হার্ট তার নিজের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও নিউট্রিশান পায় না। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে হার্ট মাসলগুলো দূর্বল হয়ে যায়। ধীরে ধীরে হার্ট বড় হয়ে যায় এবং প্রয়োজনীয় সংকোচন হয়ে পর্যাপ্ত চাঁপ প্রয়োগ করতে পারে না।

২. হার্ট অ্যাটাক হলে একটা রক্তনালী পুরোপুরি বন্ধ হয়ে হার্ট মাসল পঁচে যায়। পঁচে যাওয়া অংশ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

৩. হার্টের ভালভ নষ্ট হয়ে গেলে অর্থাৎ ভালব সরু হয়ে গেলে বা কপাটিকা বন্ধ না হলে রক্তের ব্যাক প্রেসার হয়। এতে করে পেছনের প্রকোষ্ঠগুলো বড় হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে ফেইলিউর হয়।

৪. দীর্ঘমেয়াদী ফুসফুসের অসুখেও রাইট হার্ট ফেইলিউর হয়।

৫. মহিলাদের ডেলিভারির পরপর কার্ডিও মায়োপ্যথি হয়ে হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।

৬. অতিরিক্ত উচ্চ রক্তচাপে হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।

৭. রক্তশুন্যতা থাকলে হার্টের অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। এতেও হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।

৮. ভাইরাস সংক্রমণের কারনে হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।

৯. অজানা কারণেও কখনো কখনো হার্ট ফেইলিউর হয়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা:

১. ইসিজি।

২. এক্সরে।

৩. ইকোকার্ডিওগ্রাম।

৪. প্রো বিএনপি।

৫. ব্লাড গ্লুকোজ, ক্রিয়েটিনিন, ইলেক্ট্রোলাইটস, এনজিওগ্রাম।

চিকিৎসা:

১. চিৎ হয়ে শুতে পারছেন না? মাথার দিকটা উঁচু করে শোওয়ান।

২. অক্সিজেন দিন।

৩. পানি পানের পরিমাণ কমিয়ে দিন। আলগা লবন বর্জন করুন।

৪ এসিই ইনহিবিটর দিন হার্ট থেকে যেই নালী দিয়ে রক্ত বের হয়ে যায় সেইটাকে মোটা কর দিবে এতে অল্প চাপেই রক্ত ক্লিয়ার করতে পারবে অর্থাৎ আফটারলোড কমবে। অনেকে প্রেশার নরমাল পেলে প্রেশারের ওষুধ ভেবে বন্ধ করে দেন। সেটা করা যাবে না।

৫. MI বা Ischaemic cause হলে নাইট্রেট দিতে হবে।

৬. ডাইইউরেটিকস দিন, প্রিলোড কমবে ও ফুসফুসের পানি কমাবে।

৭. লো ডোজ বিটা ব্লকার দিন, হার্টের রেট ও কার্ডিয়াক ডিমান্ড কমাবে।

৮. ডিগক্সিন দিন, হার্টের পাম্পিং অ্যাকশান বাড়াবে। হার্ট এটাক অবস্থায় দেয়া যাবে না।

৯. মরফিন দিন, ফুসফুসের পানি কমাবে ও এঙ্জাইটি কমাবে। হাঁপানির রোগী হলে দেয়া যাবে না।

১০. কারণের চিকিৎসা অতিদ্রুত দিতে হবে।

১১. সর্বোপরি, প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই উত্তম।

সার্জারি:

১. ব্যাটারী চালিত এসিস্ট ডিভাইস লাগানো যায়।

২. হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করা যেতে পারে।

প্রতিটি ফেইলিউরই যন্ত্রনাদায়ক, কষ্টের। হার্ট ফেইলিউরে যোগ হয় তীব্র মৃত্যুভয়। আতঙ্কের রাত্রি পাড়ি দেয় তারা সোনালী ভোরের প্রত্যাশায়। সুতরাং অবজ্ঞা নয় অতিদ্রুত, আরেকটি রাত্রি আসার আগেই চিকিৎসা শুরু করুন। শান্তির সমীরণ বয়ে যাক কষ্টের চৌকাঠে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত