ঢাকা বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ২ ঘন্টা আগে
ডা. মো. কামরুজ্জামান

ডা. মো. কামরুজ্জামান

এফসিপিএস (হিমাটোলজি) 
সহকারী অধ্যাপক (হিমাটোলজি) 
ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।
 

 


১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৯:২২

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের আরো তিনজন ডাক্তার রোগী দেখছে। তারা বাংলা বোঝেন না। তাই রোগীকে আমার টেবিলে পাঠালেন। রোগীর বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম- "আপনি বাংলাদেশী"?

- বাংলা ভাষা শুনে চোখে মুখে আনন্দের ঝলক নিয়ে বললেন- "জ্বি স্যার, বাংলাদেশের বগুড়ায়"। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বয়স ৪ বছর। এক বছর বয়স থেকে প্রতি মাসেই রক্ত নিতে হয়। বাংলাদেশের ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেছে থ্যালাসেমিয়া। বোনম্যারু ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হবে, তা না হলে সারা জীবন রক্ত নিয়ে বেচে থাকতে হবে।

- কেন ভেলোর আসছেন, জিজ্ঞেস করলে বললেন- "রোগটা ঠিক আছে কিনা এবং বোনম্যারু ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে"।

রোগীর রক্তস্বল্পতা আছে, পেটে হাত দিলেই বুঝা যায় প্লীহা ও লিভার বড়। দেশের রিপোর্টেও থ্যালাসেমিয়া মেজর। তাই এ যে থ্যালাসেমিয়ার রোগী তাতে কোন সন্দেহ নাই। যেহেতু আসছে রোগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাই সিএমসির প্রটোকল অনুসরণ করে টেস্ট লিখে দিলাম তাতে খরচ হবে আট হাজার সাত শো টাকার মতো। রিপোর্ট পেতে সময় লাগবে কমপক্ষে সাত থেকে দশ দিন।

এগুলো শোনেই বাবার চোখেমুখের আনন্দ মূহুর্তেই মলিন হয়ে কপালে চিন্তার ভাজ পড়ে গেল।

- স্যার, এত টাকা? এত দিন থাকতে হবে? আগে রিপোর্ট পাওয়া যাবে না?

- নির্দিষ্ট পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সময় দিতেই হবে। কোন মতেই আগে রিপোর্ট পাওয়া যাবে না।

এবার বোনম্যারু ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিষয়ে বললাম- যেহেতু আপন কোন ভাই বা বোন নাই, তাই বাবা অথবা মা ডোনার হতে পারবে সেক্ষেত্রে খরচ হবে বিশ লাখ রুপি। যদি অনাত্মীয় কাউকে ডোনার হিসেবে নিতে চান তবে খরচ হবে ত্রিশ থেকে পয়ত্রিশ লাখ রুপি।

- (একথা শুনে চোখ কপালে উঠে গেল) স্যার, আমার তো ভিটা বাড়ি বিক্রি করলেও পাঁচ-সাত লাখ টাকা হবে না।

- টাকার সমস্যা তাহলে এখানে আসছেন যে?

- স্যার, শুনলাম কারা নাকি ডোনেন্ট করে, ফ্রি চিকিৎসা দেয়। এখানে আসার পর জানলাম- ডোনেশন পেতে হলে ইন্ডিয়ান নাগরিক হতে হবে। শোনা কথায় ভিন দেশে এসে কত রোগীই যে ফতুর হয়ে যাচ্ছে। তবে জটিল রোগীরা উপকৃত হচ্ছে।

- দেশের সরকারী হাসপাতালে মাত্র ৮০০ টাকায়, প্রাইভেট হাসপাতালে ১০০০-১৫০০ টাকায় হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস করে থ্যালাসেমিয়া কিনা জানা যায়। ক্ষেত্র বিশেষ জেনেটিক মিউটেশন টেস্ট করা লাগে সেটাও দেশে বসেই বিদেশ থেকে করে আনা যায়।

মনে মনে ভাবি- দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের এপয়ন্টমেন্ট পেতে সময় লাগে না। কম টেস্টে, কম খরচে রোগ নির্ণয়। বিনিময়ে গালি। আহা বাঙালি, সোজা পথ চিনলে না।

রক্তরোগের জন্য হিমাটোলজিষ্ট দেখাতে হয় এটাই অনেকে জানে না। রক্তরোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কোথায় পাওয়া যাবে তাও জানে না। রেফারেল সিস্টেমও গড়ে উঠে নাই। আস্থার সংকট। দিন শেষে রোগীদের ভোগান্তি। চিকিৎসা পদ্ধতির চেয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার প্রতি জোর দিলে রোগীদের আস্থা ফিরে আসবে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ইন্সটিটিউশন/ফাউন্ডেশন হাসপাতাল) অত্যাবশ্যক।

বাংলাদেশে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনশিংহ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুরে হিমাটোলজিষ্ট আছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিএমএইচ ঢাকা, এপোলো হাসপাতাল ঢাকায় নিয়মিতই বোনম্যারু ট্রান্সপ্ল্যান্ট চিকিৎসা হচ্ছে। খরচ কিন্তু তুলনায় কম। বিএসএমএমইউ তেও শুরু হয়েছে।

থ্যালাসেমিয়ার মেজর (রোগী) এর জন্য মা-বাবা দুজনই সমানভাবে দায়ী। এর পূর্নাঙ্গ চিকিৎসা দেশেই সম্ভব।

থ্যালাসেমিয়া জেনেটিক বা বংশগত রক্তস্বল্পতা রোগ। মা বাবা দুইজনই বাহক হলে সন্তান রোগী হতে পারে। তাই বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা জানতে হবে। হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া কিনা তা জানা যায়। দুই জন বাহকের মধ্যে বিয়ে নিরুৎসাহিত করে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা যায়।

অথবা স্বামী স্ত্রী দুইজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে গর্ভাবস্থায় প্রথম দুই মাসের মধ্যে জরায়ুর পানি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায় অনাগত বাচ্চা থ্যালাসেমিয়া রোগী কিনা। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত