ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৯:৪৩

কিডনিজনিত নানা সমস্যা, কারণ ও প্রতিকার

কিডনিজনিত নানা সমস্যা, কারণ ও প্রতিকার

কিডনি মানুষের শরীরের অন্যতম অপরিহার্য অঙ্গ। কিডনি ব্যতীত মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। সাধারনত প্রত্যেকের ২টি কিডনি থাকে। তবে বিরল উদাহরন হিসেবে জন্মগতভাবেই কারো কারো ১টি কিডনি থাকে। পুরোপুরি কর্মক্ষম থাকলে ১টি কিডনিই জীবনের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু যেখানে জীবন থাকে, সেখানে রোগও থাকে। আজ কিডনি বিকলতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি।

কিডনির কাজ:

কেন কিডনি শরীরের অপরিহার্য অঙ্গ, যে কারণে এটা ছাড়া জীবন চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আসুন, জেনে নেই কিডনির কাজ সমূহ:

১. শরীরের বিপাক ক্রিয়ায় উৎপন্ন যাবতীয় বর্জ পদার্থ প্রস্রাবের সাথে বের করে দেয়া।

২. শরীরে পানির ভারসাম্য রক্ষা করা।

৩. শরীরে লবণের ভারসাম্য রক্ষা করা।

৪. শরীরে এসিড ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা করা।

৫. কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করা।

কিডনি বিকলের কারণসমূহ: এটা ২ ধরনের হতে পারে।

১/ হঠাৎ কিডনি বিকল: কোন কোন ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই কিডনি বিকল হয়। কারণ নিম্নরুপ:

> অতিরিক্ত পরিমানে বমি বা পাতলা পায়খানা হওয়া বা মাত্রাতিরিক্ত ঘামানো।

> যেকোনো কারণে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যভাবে অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়া।

> ব্যথার কিছু ওষুধ, হারবাল ওষুধ, মাছের পিত্ত, অতিরিক্ত কামরাঙ্গা বা বিলিম্বি খাওয়া।

> জীবানু সংক্রমণ।

> সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে কিডনি যান্ত্রিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া।

> কিডনীর প্রদাহ।

> প্রস্রাবের প্রবাহ পথে যেকোনো কারণে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া।

২/ দীর্ঘদিনে কিডনি বিকল:  কোন কোন ক্ষেত্রে কিডনি দীর্ঘদিনে তিলে তিলে তুষের আগুনের মতো বিকল হয়। কারণসমূহ হলো-

> ডায়াবেটিস।

> কিডনির প্রদাহ।

> উচ্চ রক্তচাপ।

> প্রস্রাবের প্রবাহ পথে বাধা পাওয়া।

> বংশগত কিডনি রোগ ইত্যাদি।

কিডনি বিকল হলে যেসব লক্ষণ / উপসর্গ দেখা দেয়:

১. প্রস্রাবের পরিমান কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া।

২. শরীর ফুলে যাওয়া।

৩. রক্তচাপ (ব্লাড প্রেশার) বেড়ে যাওয়া

৪. রক্তসল্পতা।

৫. খাবারের রুচি কমে যাওয়া।

৬. দুর্বলতা।

৭. শ্বাসকষ্ট।

৮. চামড়া ফ্যাকাশে ও লাবণ্যহীন হওয়া।

৯. বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।

১০. খিঁচুনি হওয়া।

১১. অজ্ঞান হওয়া ইত্যাদি।

ডায়াবেটিসের কারণে কিডনি বিকল হওয়া:

বাংলাদেশের ৭১ লক্ষ ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের প্রতি ২জনের ১জন জানেই না যে তার ডায়াবেটিস আছে। টাইপ টু ডায়াবেটিস সাধারনত ৩৫ বছর বয়স থেকে শুরু হয়। আরো আগেও শুরু হতে পারে। টাইপ টু ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ এমন ধরনের রোগ, যা সাধারনত শুরু থেকে প্রথম ৫-৮ বছর কোন লক্ষণ বা উপসর্গ প্রকাশ করে না। শরীরের ভিতরে নীরব ঘাতকের মত তিলে তিলে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমুহ নষ্ট করে পরবর্তীতে হঠাৎ হার্ট এটাক, স্ট্রোক বা শরীর ফুলার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। তখন পরীক্ষা করলে দীর্ঘ দিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে।

সময়মত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার কারণে অনেকের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কয়েক বছর ধরে মস্তিস্ক , কিডনি, হৃদপিণ্ড, চোখসহ যাবতীয় অঙ্গকে তিলে তিলে নষ্ট করে। পরীক্ষা করলে দেখা যায়, কিডনী নষ্ট হয়ে কর্মক্ষমতা প্রায় শেষ পর্যায়ে। তখন রোগীকে ডায়ালাইসিস বা কিডনী সংযোজন করে বেঁচে থাকতে হয় বাকি জীবন।

ওষুধের কারণে কিডনি বিকল হওয়া:

কিছু ওষুধের কারণে কিডনি হঠাৎ করে বা দীর্ঘমেয়াদে তিলে তিলে বিকল হতে পারে। এগুলোর মধ্যে ব্যথার এক ধরনের ওষুধ, জীবানুনাশক কিছু ওষুধ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কিছু ওষুধ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কেউ কেউ নিজের আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী বা বন্ধু বান্ধবের পরামর্শে এলার্জির জন্য মাছের পিত্ত আস্ত গিলে খায়। তারপর কিছু দিনের মধ্যেই তাদের কিডনী বিকল হয়। তাছাড়া যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রেশার বা ডায়াবেটিসের রোগী, যারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যথার ওষুধ খাচ্ছেন এবং আরো অনেকের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে খুব বেশি সংখ্যায় বা বেশি পরিমানে কামরাঙ্গা বা বিলিম্বি ফল খেলে কিডনি বিকল হতে পারে। অনেক হারবাল ওষুধের কারণেও কিডনি বিকল হতে পারে।

কিডনি নষ্ট হলে যেসব হরমোনের ঘাটতি/ সমস্যা দেখা দেয়: কিডনি কিছু হরমোন তৈরি করে। তার মধ্যে গুরুত্বপূরর্ণ কয়েকটি নিম্নরুপ-

১. ইরাইথ্রোপয়েটিন: এ হরমোনটি কিডনি থেকেই মূলত নির্গত হয়। অস্থিমজ্জায় রক্ত তৈরির জন্য কাঁচামালের পাশাপাশি এ হরমোনটি আবশ্যক। মাচ, শব্জি এবং মশলা থাকা সত্ত্বেও আগুন না থাকলে যেমন তরকারি রান্না করা যায় না, তেমনি যথেষ্ট পরিমান লৌহ (আয়রন) এবং অন্যান্য কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও এই ইরাইথ্রোপয়েটিন হরমোন না থাকলে অস্থিমজ্জায় শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত তৈরি হতে পারে না। ফলে যে রোগীর কিডনি বিকল হয়, তার শরীরে রক্তাল্পতা দেখা দেয়।

২. ভিটামিন ডি: ভিটামিন ডি হাড় এবং রক্তের ক্যালসিয়াম এবং ফসফেটের ভারসাম্য রক্ষা করে। ভিটামিন ডি নিজের ভূমিকায় অবতীর্ন হওয়ার আগে প্রথমে লিভারে এবং পরে চূড়ান্তভাবে কিডনিতে সক্রিয় হয়। ফলে কারো কিডনি বিকল হলে তার শরীরে ভিটামিন ডি কাজের জন্য চূড়ান্তভাবে উপযুক্ত হতে পারে না। ফলে রোগীর হাড় দুর্বল হয়ে যায়।

৩. রেনিন: এ হরমোন কিডনী থেকে নির্গত হয়। ইহা রক্তের চাপ (ব্লাড প্রেশার) এবং শরীরে লবন ও পানির পরিমানের ভারসাম্য বজায় রাখার কাজে অংশগ্রহন করে। ফলে কারো কিডনি বিকল হলে এ হরমোনোটি যথেষ্ট পরিমানে নির্গত হতে পারে না বিধায় রক্তচাপ এবং লবন ও পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়, বিশেষ করে রক্তচাপ বেড়ে যায়।

ডায়ালাইসিস কী:

কিডনি বিকল হওয়ার কারণে যখন জীবন অচল হয়ে পরে, তখন জীবন চালিয়ে নেয়ার জন্য কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়। সেটা সম্ভব না হলে অন্য এক ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থার নাম ডায়ালাইসিস। উভয় কিডনি স্থায়ীভাবে বিকল হয়ে গেলে কিডনী প্রতিস্থাপন করতে পারলে সেটাই সর্বোত্তম হয়।

ডায়ালাইসিস দুই ধরনের:

১। হিমোডায়ালাইসিস।
২। পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস।

আমাদের দেশে রোগীরা সাধারণত হিমোডায়ালাইসিস পদ্ধতিতে চিকিৎসা গ্রহন করে। যাদের উভয় কিডনি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে, উন্নত দেশে তারা সাধারণত হাসপাতালে গিয়ে সপ্তাহে তিন দিন প্রত্যেকবার চার ঘন্টা করে ডায়ালাইসিস গ্রহন করে। আর্থিক কারণে আমাদের দেশে অধিকাংশ রোগী সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস গ্রহন করেন।

হিমোডায়ালাইসিসের সুবিধাসমূহ:

> ডায়ালাইসিসের জন্য কম সময় লাগে।

> ডায়ালাইসিসের জন্য নিজেকে কিছু করতে হয় না, সব করেন প্রশিক্ষিত নার্স।

> ডায়ালাইসিসের সেন্টারে অন্য রোগীদের সাথে দেখা হয়, ফলে অনুভূতি ভাগাভাগি করে মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকা যায়।

> সপ্তাহে একাধিকবার হাসপাতালে আসতে হয় বিধায় যেকোনো সাস্থ্য সমস্যার বিষয়গুলোতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যথাসময়ে সমাধান করা যায়।

হিমোডায়ালাইসিসের অসুবিধাসমূহ:

> সপ্তাহে একাধিকবার হাসপাতালে আসতে হয়।

> অনেক সময় একজন সঙ্গী সাথে আসতে হয়।

> ডায়ালাইসিস প্রয়োজনের তূলনায় অপর্যাপ্ত হতে পারে।

> ডায়ালাইসিস চলাকালীন বিভিন্ন জটিলতার উদ্ভব হতে পারে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত