ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

লেখক, কলামিস্ট

বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ।


১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০২:৫৮ পিএম

মাহে রামাদানে ডায়াবেটিক রোগীদের করণীয়

মাহে রামাদানে ডায়াবেটিক রোগীদের করণীয়

আসছে মাহে রামাদান। প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় পায় চার থেকে পাঁচ কোটি ডায়াবেটিক রোগী এ মাসে সাওম পালন করেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সকল প্রকার পানাহার থেকে বিরত থাকার এই মহান প্রচেষ্টায় ডায়াবেটিক রোগীদের মুখোমুখি হতে হয় নানা প্রতিবন্ধকতার। চিকিৎসকদেরকেও আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে শুনতে হয় বিভিন্ন প্রশ্ন। তা নিয়েই আজকের এই লেখার অবতারণা। ডায়াবেটিক রোগীদের দীর্ঘ ১৪-১৫ ঘন্টার উপবাসে ঘটতে পারে নানা মারাত্মক দুর্ঘটনা। যেমন,  হাইপোগ্লাইসেমিয়া, হাইপারগ্লাইসেমিয়া, কিটো এসিডোসিস, পানিশূন্যতা, থ্রম্বোসিস প্রভৃতি।  সুতরাং সাওম পালন করতে হলে রোগীর ডায়াবেটিক রোগের নিয়ন্ত্রণ এর মাত্রা, চিকিৎসার মাধ্যম ও অন্যান্য শারীরীক অসুস্থতাকে অবশ্যই  বিবেচনায় রাখতে হবে। 
প্রথমেই দেখা যা সাওম পালনের ক্ষেত্রে কার ঝুঁকি কেমনঃ
খুব বেশী ঝুকিতে আছেন যারাঃ 

  • গত তিন মাসের মধ্যে যাদেরকে প্রকট হাইপোগ্লাইসেমিয়া অথবা কিটোসিস কিংবা হাইপারগ্লাইসেমিক কোমায় ভুগতে হয়েছে
  • যাদের বারবার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়
  • যাদের হাইপোগ্লাইসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে নেই 
  • টাইপ ১ ডায়াবেটিক রোগী
  • যাদেরকে প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করতে হয় 
  • গর্ভবতী নারী 
  • যাদের ডায়ালাইসিস করতে হয়

বেশী ঝুঁকিতে আছেন যারাঃ

  • যাদের মধ্যমাত্রার হাইপোগ্লাসেমিয়া আছে (ব্লাড গ্লুকোজ লেভেল ১৫০-৩০০ mg/dl, HbA1c  7.5 -9.0%) 
  • যাদের কিডনীর কর্মক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে 
  • যাদের ডায়াবেটিক জনিত রক্তনালীর জটিলতা আছে
  • যারা ইনসুলিন ও সালফোনাইল ইউরিয়েজ এর ব্যবহার করেন
  • যাদের প্রবল বার্ধ্যক্য ও আনুষাঙ্গিক শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে

কিছুটা ঝুঁকি আছে যাদেরঃ
যারা স্বল্পকালীন কর্মক্ষম সিক্রেটোগগ secretogogue)  ব্যবহার করেন

অল্প ঝুঁকিতে আছেন যারাঃ
যাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন কিংবা মেটফরমিন (Metformin)  কিংবা থায়াজোলিডিনেডিয়ন (Thiazolidinedione) দিয়ে ডায়াবেটিক পুরোমাত্রায় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মাহে রামাদানে  যে ব্যাপারগুলো ডায়াবেটিক রোগীদের লক্ষ্য রাখতে হবেঃ
রামাদান মাস শুরুর আগেই ডায়াবেটিক রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়ে নেয়া জরুরী। এ সময়ের খাদ্যাভাস, ঔষধ গ্রহণে নিয়ম ও প্রাত্যহিক জীবনাচরণ কেমন হবে সে সম্পকে চিকিৎসকের সাথে বিস্তারিত যোগাযোগ করতে হবে। এ ছাড়াও পুরো মাসেই নিয়মিতই চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ভাল হয়।

নিয়মিত গ্লুকোজ লেভেল পরীক্ষা করে দেখাঃ রামাদান মাসে নিয়মিত রোগীর রক্তের গ্লকোজ লেভেল পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে সাহরীর দু ঘন্টা পর এবং ইফতারের এক ঘন্টা আগে গ্লুকোজ লেভেল পরীক্ষা করে দেখা দরকার। এ সময় যদি গ্লুকোজ লেভেল নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে কম হয় তাহলে সাওম ভঙ্গ করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়াও যদি অন্য সময়েও শারীরিক দুর্বলতা বোধ হয় তাহলেও মেপে দেখতে হবে। 

খাদ্যাভ্যাসঃ অন্য সময়ের মতো রামাদানেও একই পরিমাণ খাবার খেতে হবে। সাহরীতে দুপুরের খাবারের সমপরিমাণ খাবার গ্রহণ করতে হবে। সাহরী খেতে হবে যতো দেরীতে সম্ভব আর ইফতার করতে হবে যতো দ্রুত সম্ভব। ইফতারের সময় খুব বেশী খাওয়ার চেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। এ সময় নিম্ন গ্লাইসেমিক খাবার মানে যেসব খাবার দীর্ঘসময় কম কম করে গ্লুকোজের সরবরাহ করে করে এমন খাবার পরিমান মতো খেতে হবে। যেমনঃ লাল আটা, লাল চালের ভাত, গোটা শস্য, শস্যবীজ ইত্যাদি। উচ্চ ক্যালরির খাবার যেমন, মিষ্টি, হালুয়া, শরবত, কোমল পানীয় কিংবা ভাজাপোড়া খাবার পরিহার করতে হবে। রাত ১০-১১ টার দিকে কিছু হালকা খাবার খেলে ভাল হয়। আর ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে সাহরি না করে কোনভাবেই  সাওম পালন করা উচিৎ নয়। 
শারীরিক পরিশ্রমঃ ডায়াবেটিক রোগীদের অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম করা ঠিক নয়। এতে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে যেতে পারে। তারাবীহের নামাজ নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম হিসেবে গন্য হবে তাই আলাদা করে পরিশ্রম করা জরুরী নয়। যদি হাটাহাটি  করতে হয় তাহলে তা সন্ধ্যার পর করাই শ্রেয়।
কখন সাওম ভেঙে ফেলতে হবেঃ ইসলামে জীবনে রক্ষা করাটাও ইবাদাত। তাই শারীরিক অবস্থা বেশী খারাপ হয়ে গেলে কোন দ্বিধা না করেই সাওম ভেঙ্গে ফেলতে হবে। যে কোন সময় যদি রক্তে সুগারের মাত্রা 3.3 mmol/l এর কম হয় কিংবা দিনের প্রথম ভাগেই গ্লুকোজ এর মাত্রা ৩.৯ সসড়ষ/ষ অথবা গ্লুকোজ লেভেল 3.9 mmol/l হয় তাহলেও সাওম ভেঙ্গে ফেলতে হতে পারে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে সাধারনত যে সব পরিবর্তন আনা হয়ঃ
টাইপ-১ ডায়াবেটিসঃ 
এ ক্ষেত্রে যেহেতু ইনসুলিনই একমাত্র চিকিৎসা সেহেতু চিকিৎসকের পর্যাপ্ত তত্ত্ববধান ছাড়া সাওম পালন করা খ্বুই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে চিকিৎসকের অনুমতি সাপেক্ষে তা করা যেতে পারে।

টাইপ-২ ডায়বেটিসঃ

  • এ রোগীদের ক্ষেত্রে যারা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেই রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন তাদের ক্ষেত্রে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি কম।
  • রামাদান মাসে স্বল্পকালীন কর্মক্ষম ঔষধের(short acting drug) তুলনায় দীর্ঘকালীন কর্মক্ষম(ষড়হম ধপঃরহম ফৎঁম ) ঔষধ দেয়া বেশী নিরাপদ।
  • মুখে ঔষধ খাওয়ার ক্ষেত্রে ওহংঁষরহ ংবহংরঃরুবৎ যেমন, মেটফরমিন, গ্লিটাজোন প্রভৃতি ঔষধ ব্যবহার করলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। কিন্তু সিক্রেটোগগ (ংবপৎবঃড়মড়মঁব) যেমনঃ সালফোনাইল ইউরিয়েজ, গ্লিনাইডস ব্যবহারে হাইপোগ্লাসেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। 
  • ডোজ এডজাস্টমেন্টঃ

এ সময় ডায়াবেটিকের চিকিৎসায় দেয়া ঔষধ গুলোর ডোজের পরিবর্তন করতে হতে পারে। যেমন, সালফোনাইল ইউরিয়েজ বাইগুয়ানাইড প্রভৃতি। তবে গ্লিটাজোনের ক্ষেত্রে এই ঝামেলা নেই।
 
টাইম এডজাস্টমেন্টঃ 

  • যারা মুখে ঔষধ খানঃ  তাদের ক্ষেত্রে  দিনে একবার ঔষধ খেতে হলে তারা খাবেন ইফতারের পর। যাদের কে দিনে দুবার ঔষধ খেতে হয় তাদের ক্ষেত্রে সকালের ডোজটা খেতে হবে ইফতারের পরে আর সাধারন সময়ের রাতের ডোজের অর্ধেক পরিমান ঔষধ খেতে হবে সাহরীর পর।
  • ইনসুলিন ব্যবহারের ক্ষেত্রেঃ

   স্বল্পকালীন কর্মক্ষম ইনসুলিন ব্যবহার করতে হবে খাবারের সাথে সাথেই। দিনে একবার নিতে হলে তা নিতে হবে ইফতারের সময়। দুইবার নিতে হলে ইফতারের সময় নিতে হবে সাধারন সময়ের সকাল বেলার ডোজটি এবং সাহরীর সময় নিতে হবে সাধারন সময়ে নেয়া রাতের বেলার ডোজের অর্ধেক। তিন ডোজ ইনসুলিন নিতে হলে স্বল্পকালীন কর্মক্ষম ইনসুলিন নিতে হবে ইফতার ও সাহরীর সময়। আর মধ্যবর্তী সময় কার্যক্ষম ইনসুলিন ব্যবহার করতে হবে সন্ধ্যার কয়েক ঘন্টা পর।
সূত্র: ডেভিডসন ক্লিনিকাল মেডিসিন, সিসিডি গাইডলাইন বারডেম, ইন্টারনেট

 

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৫, বর্ষ ২, জুন-জুলাই ২০১৫ তে প্রকাশিত)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত