ঢাকা      মঙ্গলবার ২৪, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৯, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


বেড়ে উঠার গল্প: সুরক্ষিত দূর্গ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে

এক টুকরো জমাটবদ্ধ রক্তপিণ্ড শোয়ার জন্য এক আরামদায়ক তোশক পায় সুরক্ষিত দূর্গ জরায়ুর ভিতরে। ভিতরের গাত্রটা হরমোনের প্রভাবে মোটা হয়ে মানব-ভ্রূণকে ৪০ সপ্তাহ বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেয়। এই দূর্বল স্বত্বাটাকে চারদিকে পাতলা পর্দা দিয়ে ঘিরে ফেলে। পর্দার ভিতরে পানি ভর্তি করে দেয়। এই পানিতে থাকে বাচ্চার জন্য রোগ প্রতিরোধক।

মায়ের পেটে ছোটখাটো আঘাত লাগলেও বাচ্চাটা সুরক্ষিত থাকে। পানির ভিতরে নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠতে পারে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। পুরো সময়টাতে এই পানি খায় ও প্রস্রাব করে। এতে করে কিডনি সিস্টেম সচল হয়।

ডেলিভারির সময় হলেই পর্দাটা ছিঁড়ে যায় এবং ভিতরে থাকা এন্টিসেপটিক পানির একটা ফ্লাশ হয় বাচ্চা বের হওয়ার রাস্তায়। এতে করে পুরো রাস্তাটা পরিষ্কার হয়ে যায় এবং পিচ্ছিল হয়।

জরায়ুগাত্রে লেপ্টে থাকা মাংসপিন্ডটা প্লাসেন্টা। সেখান থেকে আসা রক্তনালী দিয়ে শিশুর নাভীর মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের সাথে সংযুক্ত হয়। এই প্লাসেন্টা ছেঁকে ছেঁকে মায়ের রক্ত থেকে খাদ্যের নির্যাস পাঠায় শিশুর শরীরে। পুরো সময়টাতে মাসিক বন্ধ থাকে তাই বাড়তি ঝামেলা থেকে বেঁচে যান মা।

ডেলিভারির দিন যতই ঘনিয়ে আসে মা আর চলতে পারে না। হাত পায়ের সব গিরাগুলো যেন আলগা হয়ে যায়। কেন জানেন? নির্দিষ্ট হরমোন তৈরী হয়। ফলে গিরাগুলো লুজ হয়ে যায়। লুজ হয় বলেই বাচ্চার চাপে পর্যাপ্ত স্পেস তৈরী হতে পারে এবং নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হয়।

ফুসফুস দু'টি চুপসে থাকে জন্মাবধি। শরীরের কোন একটা অংশ বাতাসের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে স্টিমুলাস পায়। সুতীব্র চিৎকারে খুলে লাইফবোট, বেলুন, দুটো ফুসফুস।

পৃথিবীতে এসেই জানান দেয় তার আগমনী বার্তা। কিভাবে মায়ের বুকের দুধ খেতে হয় সেটা যেন মায়ের পেট থেকেই শিখে আসে। অভ্যস্ত ভঙ্গিতে খায় মাতৃদুগ্ধ। ক্ষুধা পেলে কাঁদতে হয় সেটাও খুব ভালোভাবেই জেনে ফেলে ছোট্ট শিশুটি।

ফুটফুটে, সুন্দর, মায়া কাড়া চাউনিতে শুয়ে আছে ছোট্ট শিশু। মাথার সামনে, পেছনে দুইটা থলথলে জায়গা, প্রতিটি শ্বাসের সাথে উঠানামা করছে, প্রতিটা হৃৎস্পন্দনের সাথে পিটপিট করছে।

ভয় পাবেন না। এটা কোন রোগ নয়। এই ফাঁকা জায়গা দু'টো আছে বলেই বাচ্চাটার নরমাল ডেলিভারিটা হয়েছে। ডলিভারির সময় চাপে মাথাটা সংকোচিত হয়ে বেরিয়ে আসে। এই দুটি ফাঁকা জায়গা না থাকলে পৃথিবীতে কোন নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হতো না।

মায়ের মাথায় থাকা পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে প্রচুর প্রোলাকটিন হরমোন তৈরি হয়। ফলে পর্যাপ্ত দুধ আসে মায়ে বুকে, বাচ্চা দুধ খেয়ে বেড়ে উঠে। এটা স্বয়ংক্রিয়। নির্দিষ্ট সময় পর হরমোন কমে আসে, দুধ নিঃসরণও কমে আসে। আল্লাহ সন্তানকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

বাচ্চার লালন পালনে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয় মাকে। ডেলিভারি পরবর্তী সময়ে দুধ পান করানো মায়েদের নিঃসৃত কিছু হরমোনের কারনে একটা লম্বা সময় পর্যন্ত মায়ের মাসিক বন্ধ থাকে।

বাচ্চার মাথার পেছনের অংশ আগে ডেভেলপ করে, সামনের অংশ পরে। মানুষের মস্তিষ্কের সামনের অংশে থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় বুদ্ধিমত্তা, চিন্তা -চেতনা, লজ্জা বোধ। সামনের অংশ পরিপূর্ণ হয় না বলেই সে বিছানায় পেশাব- পায়খানা করতে পারে। এই ছোট্ট, অবুঝ শিশুটা সবকিছুতেই পিতা-মাতার মুখাপেক্ষী। সে বলতে পারে না, চলতে পারে না, নাইতে পারে না, হাত দিয়ে খাইতে পারে না।

তার শরীরে মা-বাবার ডিএনএ বহমান। তাই চেহারা, চরিত্রের মিল থাকে। এতে মায়াটা আসে, বাচ্চাকে বুঝা সহজ হয়। বাচ্চাটাও ফলো করে মা-বাবার প্রতিটা বলা, চলা, কাজ। একসময় হাতের আঙ্গুল ধরে হাঁটতে শিখে, হাঁটে। হাজারো প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে পিতা-মাতাকে।

মনটা কাঁদার দলার মতো আকৃতিহীন হওয়ায় ইচ্ছামত বানিয়ে নেওয়া যায় সন্তানকে। সত্যিকারের মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা প্রত্যেক মা বাবার অবশ্য কর্তব্য। এতে কষ্ট স্বীকার করলেও স্বার্থক।

মানুষ নিজের বাচ্চার জন্য যতটুকু কষ্ট সহ্য করতে পারে আর কারো জন্য বোধহয় ততটুকু সম্ভব হয় না।

দেখতে দেখতে বাচ্চাটা হাসে, খেলে, দৌড়ায়, বড় হয়। তারপর একদিন ------। জীবনের বোঝা হাতে নেয়, পিঠে ঝুলায় বইয়ের ভারি ব্যাগ। হেঁটে চলে যায় স্কুলের গেইটটার দিকে। মা-বাবা তাকিয়ে থাকেন--- ঝাপসা হয়ে আসে চক্ষু জোড়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

সমাজে কিছু মানসিকভাবে অসুস্থ ডাক্তার বিদ্বেষী মানুষ আছে। অসুখ হলে ইনিয়ে বিনিয়ে…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

স্রষ্টার সৃষ্টি বড় অদ্ভুত, মেডিকেল সায়েন্স পড়লে এটা ভাল বুঝা যায়। মাছের…

বদ লোকের গল্প!

বদ লোকের গল্প!

উপজেলায় নতুন তখন। সবাইকে ঠিকঠাক চিনিও না। হঠাৎ একদিন আমার রুমে পেট…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস